নিছক ধর্মীয় উন্মাদনার বশে নয় বরং দীর্ঘ-সময় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিলো। আর এ-ব্যাপারে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ দুই নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদভানী। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ১০ দিনের মাথায় বিচারপতি মনমোহন সিং লিবারহান-এর নেতৃত্বে গঠিত সরকারী তদন্ত কমিশনের সদ্য-প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে এ-তথ্য।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভারতের পার্লামেন্টে লিবারহান-প্রতিবেদন উত্থাপন করেছে সরকার। ১৭ বছর সময় নিয়ে তৈরী হওয়া প্রতিবেদনটির কিছু অংশ সোমবার একটি দৈনিক পত্রিকাতে ফাঁস হয়ে যাবার ফলে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে যায় কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রায় পাঁচ-মাস আগে স্বরাষ্ট্র-মন্ত্রনালয়ের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হয়েছিলো বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের সাথে সর্বমোট ৬৮ জন ব্যক্তিকে সুর্নিদিষ্টভাবে দায়ী হিসাবে চিহ্নিত করার সাথে-সাথে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করা হয়েছে উত্তর প্রদেশের সে-সময়কার মুখ্যমন্ত্রী কল্যান সিং এর। প্রতিবেদনে বলা হয় সিং দেখে-দেখে এমন সব প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন যারা অযোধ্যার মসজিদটি ধ্বংস করার সময় সচেতনভাবে নীরব-দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়াও কল্যান সিংয়ের সরকার হিন্দু-জঙ্গী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এর হাতে সরাসরি সরকারী ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। কল্যান সিং ছাড়াও উমা ভারতী, গোবিন্দ আচারিয়া, শঙ্কর সিং এর মত বিজেপি নেতারা বাবরী মসজিদ ধ্বংসের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। লিবারহান-প্রতিবেদনমতে, এরা চাইলে মসজিদ ধ্বংসের উন্মত্ততা বন্ধ করা সম্ভব ছিলো।

এদিকে, বাজপেয়ী ও আদভানীর ব্যাপারেও অত্যন্ত কড়া মন্তব্য করা হয়ছে প্রতিবেদনে। বিজেপির এই দুই শীর্ষ নেতাকে দলের ভেতরের 'ভূয়া মধ্যপন্থী' হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিজেপি মসজিদ ধ্বংসের ঠিক আগের দিন অযোধ্যা থেকে নয়াদিল্লী চলে আসেন। ঘটনার ব্যাপারে হাত না থাকার দাবী করলেও, কমিশনের সামনে বক্তব্য দেয়ার ব্যাপারে কখনোই সম্মত হননি বাজপেয়ী। অপরদিকে, বাবরী মসজিদ ধ্বংসের দিন অযোধ্যাতেই ছিলেন আদভানী। দায়-অস্বীকার করে কমিশনের সামনে বক্তব্যও দেন পরবর্তীকালে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্মীয় ভাবাবেগ চাঙ্গা করে দেয়ার লক্ষ্য থেকেই সে-সময় অযোধ্যা অভিমুখে রামরথ যাত্রা পরিচালনা করেছিলেন আদভানী।
উল্লেখ্য, এই দুই নেতা মসজিদ ধ্বংসের ব্যাপারে তাদের কোন ধরনের ভূমিকা না থাকার দাবী করছিলেন এতদিন পর্যন্ত। এরা নানান সময় বাবরী মসজিদ ধ্বংসের জন্য 'দুঃখ-প্রকাশ' করেছিলেন। বিজেপির অপর এক শীর্ষ-নেতা মুরলী মনোহর যোশীকেও

ঘটনার সাথে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তিন নেতা বাবরী মসজিদ ধ্বংস হবে না মর্মে বিচার বিভাগ, জনগন তথা জাতিকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলেন। মসজিদ ধ্বংসের ব্যাপারে সংঘ-পরিবারের বিস্তৃত প্রস্তুতির ব্যাপারে বাজপেয়ী-আদভানী-যোশী কিছু জানতেন বলে বিজেপির পক্ষ থেকে যে দাবী করা হয় তা আমলে নেয়নি তদন্ত-কমিশন। বাবরী মসজিদ ধ্বংসকে জাতির ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করে লিবারহান-প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার জন্য বিজেপির মধ্যে কখনোই কোন অনুতাপ কাজ করেনি।
বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে আকস্মিক ও স্বতঃস্ফূর্ত একটা ঘটনা হিসাবে চিত্রিত করার যে চেষ্টা বিজেপির পক্ষ থেকে করা হয় তা পুরোপুরি প্রত্যাখান করা হয়েছে লিবারহান-প্রতিবেদনে। মাদ্রাজ হাইকৌর্টে সাবেক বিচারপতি মনমোহন সিং লিবারহানের নেতৃত্বে পরিচালিত কমিশনের ১০০০-পৃষ্ঠা দীর্ঘ প্রতিবেদনে বলা হয় দীর্ঘ-প্রস্তুতি নিয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিলো। এ-প্রসঙ্গে আগে থেকেই অযোধ্যা ও ফৈজাবাদ থেকে লোকজন জড়ো করা, মসজিদ ভাঙার যন্ত্রপাতির যোগান, অস্থায়ী মন্দির স্থাপন, করার মত প্রসঙ্গগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে 'রাম জন্মভূমি আন্দোলন' নামধারী সংগঠন কর্তৃক সমর্থকদের কাছে থেকে আসা বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যাঙ্কে জমা রাখার প্রসঙ্গটি। তদন্তকারীদের মতে কোন ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া এসব কাজ ঠিকঠাক মত হয়ে যাওয়াটা কোনভাবেই সম্ভব ছিলোনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতা আর সম্পদের আগ্রহ থেকেই বাবরী মসজিদ ধ্বংসের আন্দোলন শুরু করেছিলো বিজেপি ও আরএসএস।
২৪/১১/০৯


Babri Mosque Report
Babri Mosque Report