• অনশন ধর্মঘটঃ শ্রেণী-সংগ্রামের ভ্রান্ত পদ্ধতি
    মাসুদ রানা

    ঈদের চাঁদে কলঙ্ক
    বাংলাদেশে এবার যেনো ঈদের চাঁদ উঠেছে বিশাল কলঙ্কের দাগ নিয়ে। উৎসবের আয়োজন ছাপিয়ে, চাঁদরাত ২৮শে জুলাই থেকে, ঢাকার তোবা ফ্যাশনের পোশাক শ্রমিকেরা অনশন করছেন। তাঁরা অনশন করছেন মালিকের কাছ থেকে তাঁদের তিন মাসের বকেয়া মজুরি ও বৌনাস আদায়ের লক্ষ্যে।

    ৩১শে জুলাই আমি তোবা ফ্যাশন কারখানায় গিয়েছিলাম অনশনরত সংগ্রামী শ্রমিকদের দেখার জন্য। দেখলাম, অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অনেকেরই বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

    আমার কাছে মনে হলো, শ্রমজীবী এই মানুষেরা প্রথমে হারিয়েছেন মজুরীর প্রাপ্য অর্থ, আর সেই অর্থ উদ্ধারের জন্য এখন হারাচ্ছেন স্বাস্থ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যের পূর্ণ পুনরুদ্ধার হয়তো কোনোদিন আর সম্ভব হবে না।

    ইংরেজিতে একটা কথা আছে, “মানি ইজ লষ্ট, নাথিং ইজ লষ্ট; হেলথ ইজ লষ্ট, সামথিং ইজ লষ্ট; ক্যারেক্টার ইজ লষ্ট, এভরিথিং ইজ লষ্ট।”

    আমি মনে করি শ্রমিকদের শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে অনশন তাঁদের হেলথ কিংবা ক্যারেক্টার কোনোটির ক্ষেত্রেই শুভ নয় - ক্ষতিকর। কীভাবে? তা নীচে ব্যখ্যা করছি।

    শ্রমিকের দেহ-সম্পদ
    কার্ল মার্ক্স যখন বলেছেন “সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া হারবার কিছু নেই”, তখন তিনি বুঝিয়েছেন সর্বহারার নিজের দেহ ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। আর, শ্রমিকের দেহ যে কী সম্পদ তা মার্ক্স ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বে।

    মার্ক্স তাঁর উদ্বৃত্তমূল্য তত্ত্ব বলেন, কর্মক্ষেত্রে শ্রমদানের সক্ষম করার উদ্দেশ্যে শ্রমিকের দেহ রক্ষার জন্য মালিক তাঁকে যে মজুরি দেয়, সেই দেহের শ্রম মালিকের কারখানায় তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি মূল্য তৈরি করে। মার্ক্স বলেন, শ্রমই একমাত্র পণ্য যে নিজের মূল্যের চেয়ে বাড়তি মূল্য তৈরি করতে পারে। আর, এই বাড়তি বা উদ্বৃত্ত মূল্যই মালিক তাঁর মালিকানার বলে মুনাফা হিসেবে আত্মসাৎ করে।

    আজ বাংলাদেশ যে হাজার-হাজার কোটি টাকার মালিক শতো-শতো ‘বড়োলোক’ দেখা যায়, তাঁদের সবাই হচ্ছেন শ্রমিকের উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎকারী। শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপনের মূল্যে তাঁরা ধনবান।

    পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে এই মালিক শ্রেণী রীতিমতো চোর-বাটপার। কারণ, তাঁরা শ্রমিকের দেহ রক্ষার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মজুরি পর্যন্ত বাকি রেখে ফাঁকি দেয় না। এমন কি চুক্তি করার পরও শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ করে না মালিকেরা।

    শুধু তাই নয়, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের দেহ নিরাপদ রাখার সংস্থানটি পর্যন্ত করেনা না মালিকেরা। ফলে, অগ্নিকাণ্ডে কিংবা ভবন ধ্বসে শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে শতে ও সহস্রে।

    আজকের অনশনরত শ্রমিকদের মজুরি-তষ্কর তোবা ফ্যাশন ও ২০১২ সালে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক-হন্তারক তাজরিন ফ্যাশন - উভয়ের অভিন্ন মালিক দেলোয়ার হোসেন উভয় প্রকারের অপকর্মের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

    অনশন ধর্মঘট কী এবং কেনো?
    অনশন ধর্মঘট হচ্ছে অহিংস আন্দোলনের এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে অন্যায়ের শিকার ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজেকে অভূক্ত রেখে অন্যায়কারীর মনে অপরাধবোধ সৃষ্টি করে ন্যায় কর্ম সম্পাদনে বাধ্য করা। অনশন ধর্মঘটের জন্যে পশ্চাত্যে আয়্যারল্যাণ্ড এবং প্রাচ্যে ভারতবর্ষ বিখ্যাত।

    প্রাচীন ভারতে অনশন ধর্মঘটের ঘটনা রামায়ণেও উল্লেখিত আছে। আর আধুনিক ভারতের ঔপনিবেশিক কালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে অহিংসা আন্দোলনের একটি পদ্ধতি হিসেবে অনশন ধর্মঘটের প্রবর্তন করেন মোহনদাস গান্ধী।

    প্রাথমিকভাবে মোহনদাস গান্ধী এবং পরবর্তীতে বাঙালী বিপ্লবী বাঘা যতিন ও পাঞ্চাবী বিপ্লবী ভগৎ সিং কারারুদ্ধাবস্থায় অনশন করে বিখ্যাত হন। কিন্তু মুক্তাবস্থায় গান্ধী বিভিন্ন সময়ে দেশবাসীর বিবেক জাগাতে অনশন ধর্মঘট করলেও, ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি আইন-অমান্য পদ্ধতির মধ্য দিয়ে।

    সাধারণভাবে, অনশন ধর্মঘটের দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে অহিংসা এবং জলুমকারীর মানবিকতা ও বিবেকবোধের ওপর বিশ্বাস। আন্দোলনের এই পদ্ধতিতে বিশ্বাস করা হয় যে, মজলুমের স্বেচ্ছাকৃত খাদ্যবঞ্চনা লক্ষ্য করে জুলুমকারীর বিবেক জাগ্রত হবে, অপরাধবোধ সৃষ্টি হবে এবং অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে তিনি উত্থাপিত দাবী মেনে নেবেন।

    মার্ক্সবাদ অহিংস আন্দোলনের দর্শনে বিশ্বাস করে না। মার্ক্সবাদ সক্রিয় ও সহিংস শ্রেণীসংগ্রামে বিশ্বাসী। কারণ, মার্ক্স পুঁজির ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদী শ্রেণী বিবেকশূন্য মুনাফাখোর। মুনাফার জন্যে হেন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। মুনাফার জন্যে সে হত্যা তো বটেই, এমনকি আত্মহত্যাও করতে পারে।

    এহেন পুঁজির মালিকের বিবেক জাগাতে শ্রমিকদের অনশন ধর্মঘট, পদ্ধতি হিসেবে আর যাই হোক মার্ক্সবাদী শ্রেণী-সংগ্রাম তত্ত্ব সম্মত নয়। তাহলে, বাংলাদেশের মার্ক্সবাদীরা শ্রেণী-সংগ্রামে অনশন ধর্মঘট পদ্ধতি ব্যবহার করেন কেনো?

    এর একটি সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে এই যে, সচেতনভাবে তাঁরা নিজেদেরকে মার্ক্সবাদী মনে করলেও, অসচেতনভাবে তাঁরা গান্ধীর অহিংসাবাদের অনুসারী। তাই, তাঁরা মুখে যতোই বিপ্লবী বুলি বকুন না কেনো, শেষ বিচারে তাঁরা শ্রমিক শ্রেণীকে মালিকের দয়ার ওপর অর্পণ করেন।

    কী করা উচিত?
    আমি মনে করি, মুক্ত শ্রমিকদের কোনো ক্রমেই নিজেকে নিষ্ঠুর ও নির্মম মালিকের বিবেক কিংবা দয়া-মায়া-লজ্জা জাগাতে নিজেকে খাদ্য-বঞ্চিত করে নিজের দেহ সম্পদের ক্ষতি করা ঠিক নয়।

    অনশন ধর্মঘট করলে শ্রমিকের শুধু দেহক্ষয়ই হয় না, তার সাথে তাঁর সবল-সংগ্রামী চরিত্রেরও ক্ষয় হয়। এটি হয় অনশন ধর্মঘটের অন্তর্নিহিত দর্শন ও বিশ্বাসের কারণে।

    বস্তুতঃ মালিকের বিবেক জাগাবার চেষ্টায় অনশনে শ্রমিকদের দেহ বিলীন করা হবে রূপতঃ অরণ্যে রোদন।

    তাই, আজকের শ্রমিককে তাঁর অধিকার ও মর্য্যাদার লড়াইয়ের মাধ্যমে জাগাতে হবে দেশের জনগণকে - সমগ্র জাতিকে, যেখানে মালিক শ্রেণী লঘিষ্ঠ এবং শোষিত মানুষই গরিষ্ঠ। মনুষ্যত্বের মর্য্যাদা-বোধে জাতীয় জাগরণের সামনের সারিতে সবল দেহে থাকতে হবে উৎপাদনক্ষম ও প্রজননক্ষম শ্রমিক শ্রেণীকে।

    রোববার, ৩রা অগাষ্ট ২০১২
    ধানমণ্ডি ১
    ঢাকা, বাংলাদেশ
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন