• অন্তিম অন্ধকারঃ যার অন্ন জোটে বর্ণমালা ব্যবহার করে, সে-ই জানে না ‘বর্ণমালা’ বলে কাকে
    মাসুদ রানা

    রবীন্দ্রনাথ বাঙালীকে যতোটা চিনেছিলেন, সম্ভবতঃ আর কেউ চেনেননি এতোটা। এই লণ্ডনে এসে তিনি নাকি এক ‘শিক্ষিত’ বাঙালীকে বলেছিলেন, ‘ইংরেজি তো শিখতে পারননি, কিন্তু বাংলাটাও ভুলে গেলেন!’ মাতৃভাষাটা হওয়া উচিত শিক্ষা ও জ্ঞানের ভিত্তি - এটিই হবে সম্ভবতঃ রবীন্দ্রনাথের পরিহাসিক আক্ষেপের অন্তর্গত বাণী-চিরন্তনী। বিজ্ঞজনের সে-কথাই বাণী-চিরন্তনী হয়, যা যুগে-যুগে প্রযোজ্য। বাঙালীর জন্য বাংলা ভুলে যাবার প্রবণতা এখনও প্রযোজ্য।

    গত ২৪ জানুয়ারীতে ‘প্রথম আলো’ ভারতের দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’র সম্পাদকীয়র উপর একটি খবর প্রকাশ করেছিলো, যেখানে স্বাভাবিক কারণে প্রয়োজন হয়েছিলো ইংরেজির বঙ্গানুবাদ। ইংরেজি বুঝতে না পেরে ‘প্রথম আলো’ ভারতীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর মন্তব্য বাংলাদেশের জনৈক মন্ত্রীর দ্বারা প্রতিধ্বনিত হওয়াকে অনুবাদ করেছিলো ভারতীয় মন্ত্রীর দ্বারা বাংলাদেশী মন্ত্রীর নির্দেশিত হওয়া হিসেবে। প্রথম আলোর এ-ব্যর্থতা যে পাঠকের কাছে ভুল কূটনৈতিক বার্তা হাজির করেছিলো, তা বলাই বাহুল্য। একই দিনে ইউকেবেঙ্গলি লণ্ডন থেকে এই ভুলে আলোকপাত করে একটি খবর প্রকাশ করেছিলো।

    ইংরেজি বুঝতে পারার ক্ষেত্রে দারিদ্র বোধগম্য, কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রের 'প্রথম আলো'র দারিদ্রকে 'অন্তিম অন্ধকার' ছাড়া আর কী বলা যায়? কাজী নজরুল ইসলাম যে লিখেছিলেন ‘হে দারিদ্র, তুমি মোরে করেছো মহান’, তারই কি পরিহাসিক বাস্তবায়ন হচ্ছে বাঙালীর ভাষা-চর্চায়?

    আজকের ‘প্রথম আলো’র একটি আকর্ষণীয় সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে ‘ডিজিটাল হচ্ছে চাকমা বর্ণমালা’। রাজনৈতিক প্রচার-স্রোতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ ভাসছে বাঙালী, সেটি পরিজ্ঞাত। কিন্তু ডিজিটাল বর্ণমালা সত্যিই অভিনব। বর্ণমালা কীভাবে ডিজিটাল হতে পারে, তার স্বরূপ বুঝতে পুরো সংবাদটা পড়লাম।

    পড়ে বিপাকে পড়লাম বর্ণমালার ‘ডিজিটাইজিং’ ইস্যুতে নয়, বরং বর্ণমালার খোদ অর্থ নিয়ে। উপলব্ধি করলাম, ‘বর্ণমালা’ কাকে বলে সেটি বুঝতে পারেননি প্রথম আলো। সংবাদ প্রতিবেদকের নাম নেই বলে আমাকে পত্রিকাটির নাম ধরেই সমালোচনা করতে হচ্ছে।

    বাংলাদেশে এখন কীভাবে বিদ্যার সূচনা হয় জানি না। তবে বঙ্গজ হিসেবে আমার হয়েছিলো বর্ণমালা দিয়ে। তাই বিদ্যার প্রথম আলোই ছিলো বর্ণমালা। সেই ‘বর্ণমালা’ কাকে বলে, তা যখন ‘প্রথম আলো’ বুঝতে পারে না, তখন পরিহাস আতঙ্কে পরিণত হয়।

    ‘প্রথম আলো’ লিখেছে, ‘চাকমা বর্ণমালা প্রধানত ৩৩ টি’। চাকমা বর্ণমালা ৩৩টি? ভাবলাম, তাহলে মোট বর্ণ ক’টি? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, একটি ভাষার ৩৩টি বর্ণমালা হতে যাবে কেনো? তাও ‘প্রধানত’? অর্থাৎ, প্রধান তেত্রিশটি বর্ণমালা এবং অপ্রধান আরও আছে। প্রথমে মনে হলোঃ নিশ্চয় মুদ্রণ-ত্রুটি, যা আমাদের সবারই হয়।

    কিন্তু না। সংবাদটিতে একাধিক ‘বর্ণমালা’ নির্দেশ করে ‘বর্ণমালাগুলো’ উল্লেখ করা হয়েছে বার-বার। লেখা হয়েছে, ‘গবেষকেরা সর্বসম্মতিক্রমে বর্ণমালাগুলোকে অনুমোদন করায় ডিজিটাল-ব্যবস্থায় নিয়ে আসা সহজ হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে চাকমা বর্ণমালোগুলোকে বিজয় কি-বোর্ডের মাধ্যমে কম্পিউটারে সহজে লেখা ও পড়ার সফটওয়্যার তৈরি করা হবে বলে তাঁরা জানান।’

    সুতরাং বিষয়টিকে ছাপার ভুল বলে ধরে নেয়া যায় না। বিপাক থেকে উদ্ধার পেতে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সম্ভাব্য দুটো প্রস্তাবনার মধ্যে একটিকে সত্য বলে গ্রহণ করে। সত্যের প্রথম প্রস্তাবনা হচ্ছে ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন ঠিক এবং আসলেই চাকমা ভাষায় ৩৩টি প্রধান বর্ণমালা আছে। আর, দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হচ্ছে, ‘প্রথম আলো’ জানে না ‘বর্ণ’ কাকে বলে ও ‘বর্ণমালা’ কাকে বলে, কিংবা অন্ততঃ ‘বর্ণ’ ও ‘বর্ণমালা’র মধ্যে পার্থক্য কী তা সে জানে না। দুটোই প্রায় অসম্ভব প্রস্তাবনা। কিন্তু একটিকে আমার বাতিল করতেই হবে। তাই, নীচে বিচারে প্রবৃত্ত হই।

    আমার প্রথম সিদ্ধান্ত হচ্ছে, একটি ভাষার ৩৩টি বর্ণমালা অসম্ভব। কারণ, বর্ণমালা হচ্ছে একটি ধ্বনি-সংকেত পদ্ধতি যা অনেক সুচিন্তিত শ্রম ও দীর্ঘ সময় নিয়ে বিকশিত হয় এবং একাধিক ভাষাগোষ্ঠী এটি অংশীদার হয়ে ব্যবহার করে। যেমন, রৌমান বর্ণমালা ব্যবহার করে ইউরোপের রৌম্যান্স (ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, ইত্যাদি) ও জার্মানিক (জার্মান, ইংলিশ, ডাচ, ইত্যাদি) ভাষাগোষ্ঠীর সব সদস্য।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিকীকরণের পথে তুর্কীরা আরবী ছেড়ে রোমান বর্ণমালা ব্যবহার শুরু করে। মালেসিয়াও একই পথে ‘বাহাসা-মালে’য় গ্রহণ করেছে রৌমান বর্ণমালাকে। এমনকি, এক সময় বাংলা ভাষাতেও রৌমান বর্ণমালা ব্যবহার করার প্রস্তাব উঠেছিলো।

    একাধিক ভাষায় গৃহীত হওয়ার সৌভাগ্য শুধু রৌমান বর্ণমালারই নয়, আরও অনেকের সাথে বাংলা বর্ণমালারও আছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলা, অসমিয়া, ত্রিপুরী, ইত্যাদি ভাষার বর্ণমালা হচ্ছে বাংলা বর্ণমালা।

    সুতরাং আমি এই পর্যবেক্ষণে উপনীত হচ্ছি যে, একটি বর্ণমালার প্রচলন একই সাথে একাধিক ভাষায় সম্ভব, কিন্তু একটি ভাষার একই সাথে একাধিক বর্ণমালার প্রচলন অসম্ভব। ফলে, আমি বাধ্য হচ্ছি প্রথম প্রস্তাব বাতিল করতে যে, 'চাকমা বর্ণমালা প্রধানত ৩৩টি'। এটি অযৌক্তি ও হাস্যকর দাবী।

    এখন আসা যাক দ্বিতীয় প্রস্তাবনায়। বাংলাভাষা-ভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম বাংলা পত্রিকা বলে দাবীদার ‘প্রথম আলো’, যার অন্ন জোটে বর্ণমালা ব্যবহার করা থেকে, আর সেই জানে না ‘বর্ণমালা’ কী? এ-প্রস্তাবনা হাতে নেয়া কঠিন। কারণ ‘প্রথম আলো’ একটি বিশাল বাংলা-সংবাদপত্র হবার কারণেই ‘অবভিয়াস’ হিসেবে ধরে নেয়া হয় যে, সেতো বাংলা শব্দের অর্থ জানবেই। ‘অবভিয়াস’ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের এমনই এক পরিস্থিতি যেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়কে সত্য গণ্য করার জন্য প্রমাণ খোঁজা হয় না। তাই আমরা ‘অবভিয়াস’কে চ্যালেইঞ্জ করি না। কিন্তু একটি ‘অবভিয়াস’ যখন আরেকটি ‘অবভিয়াস’-এর সাথে সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তো চ্যালেইঞ্জ করতেই হয়।

    বাংলাদেশে সংবাদ-মাধ্যমে বাংলা-ভাষার যাচ্ছেতাই ব্যবহার এখন দুর্যোগ আকারে দেখা দিয়েছে। উচিত ছিলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে এগুলোকে চ্যালেইঞ্জ করা। কিন্তু অন্নদাতা গোষ্ঠীকে চ্যালেইঞ্জ করার মতো বুদ্ধিজীবী থাকার সম্ভাবনা বাংলাদেশে খুবই কম। তবুও কাউকে তো ঘন্টা বাঁধতেই হবে। একটি বৃহৎ প্রয়োজনের অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র আয়োজনে হলেও 'প্রথম আলো'র ভাষা-জ্ঞানকে আমার চ্যালেইঞ্জ করতে হচ্ছে। তবে আমি একটি প্রকল্প ধরে এগুবো, যাতে আঘাতটা একটু কম অনুভূত হবে।

    আমার প্রকল্প হচ্ছে, যে ‘প্রথম আলো’র মূল সমস্যা হয়েছে ‘মালা’ নিয়ে। ‘বর্ণ’ শব্দের অর্থ ‘প্রথম আলো’ বুঝে না, এটি প্রায় অসম্ভব। তবে এটি সম্ভব যে, ‘বর্ণ’ শব্দের সাথে ‘মালা’ শব্দ যুক্ত হয়ে ‘বর্ণমালা’ যে-একটি যৌগিক শব্দ হিসেবে শুধু বচনে নয়, প্রকরণেও স্বতন্ত্র, তা ‘প্রথম আলো’ বুঝতে পারেনি। সে ‘বর্ণ’ ও ‘বর্ণমালা’কে একই ধরে নিয়েছে। ‘বর্ণ’র অর্থ যে অক্ষর এবং ‘মালা’র অর্থ যে সমষ্টি - অর্থাৎ একত্রে বর্ণ+মালা=বর্ণমালা’র অর্থ যে অক্ষর-সমষ্টি, তা ‘প্রথম আলো’ বুঝেনি। এটি হচ্ছে অনেকটা ব্যক্তিকে জাতি হিসেবে ধরে নেবার মতো ভুল। জাতি অবশ্যই ব্যক্তির সমষ্টি। কিন্তু ব্যক্তি ও জাতি ভিন্ন প্রকরণ বোধের প্রতিনিধিত্ব করে।

    ‘প্রথম আলো’ ‘প্রধানত’ (‘প্রধানতঃ’) শব্দেরও অর্থ বুঝেনি। অক্ষরের ক্ষেত্রে প্রধান-অপ্রধান বলে কিছু নেই। বর্ণে যে প্রধান বিভক্তি আছে তা হচ্ছে বর্ণের স্বর-পার্থক্যগত। যে-বর্ণ স্বরগত ভাবে নিরপেক্ষ বা স্বাধীন, সেগুলো স্বরবর্ণ (ইংরেজিতে ‘ভাওয়েলস’) এবং যেগুলো অন্যবর্ণের স্বর মিশ্রিত করে ব্যঞ্জন তৈরী করে, সেগুলো ব্যঞ্জন বর্ণ (ইংরেজিতে ‘কনসোন্যান্টস’)। এ-ছাড়া উচ্চারণের স্থান, ধ্বনিগত ও শ্বাসগত পার্থক্যের কারণে বিবিধ বিভক্তি আছে।

    এছাড়াও বড়োজোর, বর্ণের সম্মিলন নিয়ে এক ধরণের প্রকরণের ধারণা আছে। যেমন বাংলায় যুক্তাক্ষর বলে একাধিক অক্ষরের সম্মিলন প্রথা আছে, যেখানে সন্ধিবদ্ধ অক্ষরগুলো কোথাও স্পষ্ট, আবার অতো স্পষ্ট নয়। যেমন, ‘শব্দ’ শব্দের মধ্যে ‘ব্দ’ যুক্তাক্ষরটি ‘ব+দ’ এর ফল। কিন্তু ‘পক্ষ’ শব্দের মধ্যে ‘ক্ষ’ যুক্তাক্ষর টি ‘ক+ষ’ হিসেবে অতো স্পষ্ট নয়। বাংলার উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি হিন্দির চেয়ে শ্রুতিতে আরও অস্পষ্ট। কারণ, বাংলায় ‘পক্ষ’র উচ্চারণ হচ্ছে ‘POKKHO' কিন্তু হিন্দিতে মূল সংস্কৃতের মতো এর উচ্চারণ হচ্ছে ‘POKSHHO’, যেখানে ‘ক’ ও ‘ষ’ দুটোই উচ্চারিত। ‘ক’ ও ‘ষ’ যেখানে আপেক্ষিক অর্থে মৌলিক, ‘ক্ষ’ সেখানে যৌগিক।

    ইংরেজিতে ‘বেইসিক্যালী’ আর ‘মেইনলী’ বলে দুটো বহুল ব্যবহৃত ‘এ্যাডভার্ব’ আছে, যাদের প্রথমটির দ্বারা মৌলিকত্ব, আর দ্বিতীয়টির দ্বারা প্রাধান্য বুঝানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে ইংরেজি প্রভাবিত বাংলায় যথাক্রমে এদের প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘মূলতঃ’ ও ‘প্রধানতঃ’। ইংরেজি ভাষার বোধ থেকে বিবেচনা করলে, ‘প্রথম আলো’র লেখা উচিত ছিলো, ‘চাকমা বর্ণমালায় মূলতঃ ৩৩টি অক্ষর’। কিন্তু সে-বোধের অভাবে সে লিখেছে, ‘চাকমা বর্ণমালা প্রধানত ৩৩টি’।

    'প্রথম আলো'র বিবৃতি শুধু ভুলই নয়, সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্তিকরও বটে। তবে, পত্রিকাটি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থেকে তা করেছে বলে আমি অনুযোগ করছি না। আমি বলতে চাই, ‘প্রথম আলো’ সম্ভবতঃ নির্দোষ (প্রোবেব্‌লী ইনোসেন্ট) কিন্তু নিশ্চিত অজ্ঞ (সার্টেইনলী ইগনোর‍্যান্ট)।

    একটি দেশের প্রধান সংবাদপত্র যদি সে-দেশে বাস-করা জাতিটির দর্পণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সে-দর্পণে বাঙালী জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক যে-চেহারা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমি সত্যিই আতঙ্কিত।

    রোববার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন