• অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রসঙ্গে (২)
    মাসুদ রানা

    ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র উদ্দেশ্য

    এই লেখার প্রথম পর্বে ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র স্বরূপ  উন্মোচন করে দেখানো হয়েছে যে, এটি একটি বিমূর্ত ধারণা, যার মধ্যে কোনো ইতিবাচক সুনির্দিষ্টতা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবী সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী জাতীয় সম্মেললনে এই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানিয়ে জেলায় জেলায় কর্মসূচি পালনের কথা বলেছেন।

    অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, এর একটি সাময়িক রাজনৈতিক লক্ষ্য আছে। নিকট অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, ১৯৯০ এর গণ-অভ্যূত্থানের পর বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাবদল করে ক্ষমতায় আসছে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, তাদের প্রতিটি বিজয়েরই পূর্বগামী হয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আপাতঃ নির্দলীয় একটি সংগঠন ও আন্দোলন। 

    ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হলো, তার আগে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটীর আন্দোলন। দ্বিতীয় বারে - অর্থাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচনে - আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ে প্রভূত সাহায্য করেছে সেক্টর কমাণ্ডার্স ফোরাম ও এর চালিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলন।

    বিষয়টিকে একটি ‘প্যাটার্ণ’ বা নকশা হিসেবে বিবেচনা করলে, এই ধারণা করা অমূলক হবে না যে, পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের জন্যেও আওয়ামী লীগের প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু কেন্দ্রিক আরেকটি আপতঃ নির্দলীয় সংগঠন ও আন্দোলনের।

    আওয়ামী লীগ তার ক্ষমতার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে। বিচার প্রক্রিয়া শেষে জনগণ যখন রায়ের অপেক্ষা করছেন, তখন ইন্টারনেটে বিচার বিষয়ে বিচারপতির অনুচিত ফৌনালাপ কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগ করলেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান। ফলে, বিচারের রায় স্পষ্টতঃ বিলম্বিত এবং সম্ভবতঃ ঝুলন্ত থেকে গেলো। 

    প্রশ্ন হচ্ছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনের জন্য এ-পরিস্থিতি সহায়ক না ক্ষতিকারক? দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সমীকরণে এই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য সহায়ক। 

    প্রথমতঃ বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কেউ ‘বিচার না-করা’র অভিযোগ আনতে পারবেন না। যে-দেশের মানুষ বিচার না চেয়ে ফাঁসি চান, সে-দেশের মানুষ বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের বিষয়টি ‘মাইণ্ড’ করবেন না। সুতরাং ‘স্কাইপ-কেলেঙ্কারি’র কারণে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি হয়নি।

    দ্বিতীয়তঃ বিচারের মধ্য দিয়ে একটি রায় বের করে নেয়ার ও সেই রায় কার্যকর করার পর আওয়ামী লীগকে জামায়াত ইসলামী ও এর বিশ্ব-মিত্রদের কাছ থেকে যে-তীব্র চাপের মধ্য পড়তে হতো, তাও এড়াতে পারলো আওয়ামী লীগ। 

    তৃতীয়তঃ ইস্যুটি অসমাপ্ত রেখে এর সাথে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জুড়ে দেয়ায় আওয়ামী লীগকে অনন্তঃ আরও একটি ক্ষমতায় থাকার ‘প্রয়োজনীয়তা’ জোড়ালো হলো। 

    চতুর্থতঃ জামায়ত ইসলামীকে চাপে রাখতে হলে বিচার ও রায় অতীতের ঘটিত কাণ্ডের চেয়ে ভবিষ্যত ঘটিতব্য হিসেবে দেখানো হবে বেশি ফলদায়ক। 

    পঞ্চমতঃ চাপ সৃষ্টি করে জামায়াতকে বিএনপির কাছ থেকে দূরে রেখে বিএনপিকে দুর্বল করা, আর তা না হলে অন্ততঃ খানিকটা কৌশল অবলম্বন করে জামায়াতকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’র জন্য একটি ‘থ্রেট’ হিসেবে দেখিয়ে সেই শক্তিগুলোকে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে আনা সহজ হলো। 

    জামায়াতকে সমাবেশ করার অনুমোদন না দিয়ে এবং বাধা তৈরীর মাধ্যমে অধিক আক্রমণাত্মক কর্মসূচি হিসেবে হরতাল ডাকতে এবং পুলিস ও আইন মন্ত্রীর উপর আক্রমণ করতে ‘এ্যালাউ’ করে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সামনে একটি ‘থ্রেট পার্সেপশন’ বা ভীতিবিক্ষণ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষতঃ আওয়ামী-অভিমানী বামপন্থীরা এই ভীতিবিক্ষণের নাম দিলো ‘ডরতাল’। আওয়ামী লীগের এই কৌশল এতোই পরিপক্ক ও কার্যকর যে, তাঁরা ঢাকার আশুলিয়ায় গার্মেন্ট-অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক হত্যার ঘটনায় হরতাল না ডেকে এবং সরকারকে ‘ডিস্টার্ব’ না করে বরং জামায়াতের ‘ডরতালের বিরুদ্ধে জনগণের হরতাল’ ডাকলো। এতে আওয়ামী লীগ প্রীত হলো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাঙ্খিত সেই ঐক্যের সদর দরজা উন্মুক্ত হলো।

    ভীতিবিক্ষণ ও অনুসরণ 

    পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর ২৩ ডিসেম্বরের ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জাতীয় সম্মেলনে’ নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন বেশ ক’জন ডাক সাঁইটে রাজনীতিক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, প্রমুখ। এ-ছাড়াও, এই সম্মেলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণঐক্য, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, সাম্যবাদী দল, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, সুশাসনের জন্য নাগরিক, আহমদিয়া মুসলিম জামায়াত, তরিকত ফেডারেশন। 

    ঢাকার মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর এই সম্মেলনে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেনঃ

    ‘যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক নেতাদের মুক্ত করতে জামাত-শিবির হরতালের নামে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে পুলিশ ও বিজিবি এমনকি আইনমন্ত্রীর গাড়িও তাদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। সুতরাং বোঝাই যায়, তাদের উদ্দেশ্য কতটা ভয়ঙ্কর।’

    এই ভীতিবীক্ষণের পর কী করণীয়, তা বেরিয়ে এসেছে তোফায়েল আহমেদের বক্তব্য থেকেঃ

    ‘আমাদের বড় দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি এখনো একতাবদ্ধ হতে পারেনি। স্বাধীনতাবিরোধীরা এই সুযোগ নিয়েই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।’ 

    মহাজোটের অন্তর্ভূক্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেনঃ

    এভাবে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করা সম্ভব হবে না। জামাতের সঙ্গ না ছাড়লে বিএনপিকেও রাজনীতি থেকে বিতাড়িত ও বর্জন করা হবে।’

    পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবী আহুত সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী জাতীয় সম্মেলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন সম্ভবতঃ নেই। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাজেদা চৌধুরী ‘বাংলাদেশের মালিক আওয়ামী লীগ’ বলে যে দাবিটি করেছেন, প্রকৃত প্রস্তাবে সে-দাবির স্বীকৃতিই হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’। আর এরই একটি উপাদান হচ্ছে ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’ - অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের অনুগামী হবার অনুভূতি।

    পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবী সচেতন কিংবা অচেতনভাবে মূলতঃ সেই প্রকল্পের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। ‘প্রগতিশীল’ প্রকরণের এই বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন থেকেও আজ ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র কথা বলছেন এবং বিমূর্ত এই ধারণাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে প্রচার করছেন। 

    প্রথমতঃ পূর্বেই দেখানো হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ‘অসাম্প্রদায়িক’ ছিলো না, ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে এড়িয়ে গিয়ে এক অদ্ভূত ও বিমূর্ত ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র কথা বলছেন। 

    দ্বিতীয়তঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে যে-বাঙালী জাতীয়তাবাদ ছিলো, সেটি আজ ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদে পর্যবসিত হয়েছে। বস্তুতঃ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ১৯৭১ সালের বাঙালী জাতীয়তাবাদের সাথে ১৯৪৭ সালের মুসলিম জাতীয়তাবাদের স্মৃতি মিশ্রিত এক ঐতিহাসিক ‘খিচুরি’। সেই ‘খুচুরি’ই ক্ষুধার্ত বুদ্ধিজীবীরা চেটেপুটে খেয়ে থেকে-থেকে ঢেঁকুর তুলছেন।

    তৃতীয়তঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে-গণতান্ত্রিক মাত্রা অর্জিত হয়েছিলো, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতূর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা ধ্বংস করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক সত্যটি বুদ্ধিজীবীরা স্মৃতিতে আনতে চান না। সম্ভবতঃ তাঁদের অনুভূতি জীবনান্দ দাশের ‘হায় চিল’ কবিতার সেই পংক্তির মতোঃ ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’

    চতুর্থতঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ‘ইনবিল্ট’ বা অন্তর্গঠিত যে-সাম্যের ধারণা ছিলো, যা সংবিধানের চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো, সেটিও আজকের বুদ্ধিজীবীদের কাছে অবলীলায় বিস্মৃত। 

    মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে দাবিদার শক্তিগুলো আজ বাঙালী আত্মপরিচিতের স্থলে ‘মডারেইট মুসলিম’ পরিচিতি, ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’, গণতন্ত্রের বদলে বংশ-পরম্পরার নেতৃত্ব ও শাসন এবং সমাজতন্ত্রের বদলে পুঁজিবাদী মুক্ত-বাজার অর্থনীতির জয়গান ও নানা সুবিধা ভোগ করে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র নামে লোক ঠকাচ্ছেন। এঁদের হাতে পড়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আজ একটি প্রতিক্রিয়াশীল বাগাড়ম্বরের পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস বুদ্ধিজীবীদের নেই। কারণ, অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী রাজকৃপা প্রত্যাশী ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছেন। 

    পুরনো চেতনার সীমাবদ্ধতা

    বাংলাদেশের রাজনীতির ‘পিন্‌’ যেনো ইতিহাসের ভাঙ্গা রেকর্ডে আটকে গিয়েছে। বারবার সেই একই পংক্তি গাওয়া হচ্ছে। কেউ সাহস করে বলছেন নাঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজকের সমস্যা সমাধানের জন্য অপর্যাপ্ত ও অনুপযুক্ত। 

    বাংলাদেশের আজকের সমস্যার জন্য দায়ী হচ্ছে ধনিক-বণিক শ্রেণীর স্বার্থে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ব্যবহার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রকে এই ধনিক-বণিক শ্রেণী ব্যবহার করে গত চার দশকে সম্পদের অবিশ্বাস্য উঁচু পাহাড় গড়ে তুলেছে। অর্থনীতির ‘থিওরী অফ সারপ্লাস ভ্যালু’ বা উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব আমাদের জানায়, সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় কোটি-কোটি শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করার মধ্য দিয়েই একমাত্র গুটিকতক লোকের পক্ষে এতো সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব। 

    কোটি-কোটি বাঙালী সাধারণের দুঃখ, দারিদ্র, দুর্দশা ও মানবেতর জীবনযাপনের জন্য এই ধনিক-বণিক শ্রেণীই দায়ী। এই শ্রেণীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের উভয় শক্তি। 

    এক-এক করে হাতে গুণে দেখানো যাবেঃ ১৯৭১ সালের ইসলামবাদী রাজাকার, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা ও বিপ্লববাদী বামপন্থী নির্বেশেষে কিছু লোক হাজার-হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে একটি এলিট শ্রেণীতে পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক বচনে তাঁরা একে অন্যকে যতোই গালাগালি করুন না কেনো, বাস্তবে এঁরা পরস্পরের বন্ধু, আত্মীয় ও পরিজন। সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে এঁরা পরস্পরকে নিমন্ত্রণ করেন এবং নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন। এঁরা একত্রে খান, একত্রে পান করেন, একত্রে ফূর্তি করেন। 

    রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ায় এঁরা কখনও পরস্পরের সহযোগী আবার কখনও প্রতিযোগী। কিন্তু কোটি-কোটি মানুষকে দারিদ্রে আটকে রেখে শ্রমদাস হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্নে এরা ঐক্যবদ্ধ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে এরা একেকটা যমপুরী তৈরী করেছে। নিজেদের প্রাসাদোপম বাড়ী সাজিয়েছে এরা পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট ও দামী উপকরণ দিয়ে। এঁদের প্রাচীর-পরিবেষ্টিত ও প্রহরী-রক্ষিত প্রাসাদের বাইরে লক্ষ-লক্ষ ছিন্নমূল মানুষ বাস করছেন প্রাগৈতিহাসিক কালের গুহাবাসীর মতো। 

    শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষেরা প্রায়শঃ খাদ্যহীন ও পুষ্ঠিহীন - চিরন্তন। যতোটুকুই বা তাঁরা খেতে পান, তাও প্রায়-বিষাক্ত। জলসমৃদ্ধ দেশে এঁরা বিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। সারা পৃথিবী জুড়ে পোশাক রফতানি করা এই বঙ্গদেশে এঁরা বস্ত্রহীন ও প্রায়-উলঙ্গ। সামান্য শীতে এঁরা প্রাণ হারান অকাতরে হাজারে-হাজারে। এঁরা স্বাস্থ্যহীন, চিকিৎসাহীন, রোগক্লিষ্ট ও কৃশ। এঁদের শিক্ষা নেই, সংস্কৃতি নেই, শিল্প নেই। এমনকি মনুষ্য-মর্যাদা-বোধ পর্যন্ত নেই। এঁরা বেঁচে আছেন মানবেতর প্রাণী মতো। এঁদের না আছে উপায়, না আছে অবলম্বন। এঁদের কাছে স্বাধীনতার কী অর্থ আছে? কী অর্থ আছে এদের কাছে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের? এঁরা কি নাগরিক? এঁরা কি স্বাধীন দেশের মানুষ? রাজনীতিকগণ এঁদেরকে কখনও সম্বোধন করেন ‘সম্মানীত দেশবাসী’ আবার কখনও ‘ভাই ও বোনেরা’ বলে সম্বোধন করেন। এর চেয়ে নিষ্ঠুর উপহাস আর কি হতে পারে? 

    তাই দেখি, এই মানুষগুলো যখন পোশাক কারখানার অমানবিক তালাবদ্ধ প্রকোষ্ঠে মেশিনের নিচে শোষিত হবার কালে আগুনে দগ্ধ হয়ে শতে-শতে প্রাণ হারান, তখন তাঁদের জন্য সম-শ্রেণী ছাড়া কেউ দাঁড়ান না। তাঁদের লাশগুলো ‘বেওয়ারশি’ হয়ে অযত্নে-অবহেলায় মাটি-চাপা দেয়া হয়। এহেন শ্রেণীর মানুষ কীভাবে স্বাধীন হয়? এঁরা পরাধীন। এঁরা ঔপনিবেশিক পরাধীনতার চেয়ে অধিক পরাধীন। এঁরা দাসত্বের মর্যাদাহীনতার চেয়ে ও অধিক মর্যাদাহীন।

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ‘বিজয়’ এঁদের জন্য কিছুই আনেনি। মুক্তিযুদ্ধের আগে এঁদেরকে ‘সোনার বাংলা’ গড়া হবে বলে আশা দেয়া হয়েছিলো, ভরসা দেয়া হয়েছিলো। সেই আশায় ও ভরসায় এঁরা যুদ্ধ করেছিলেন। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। এঁদের রক্তে নেয়ে এসেছে স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতা এঁদের নয়। কারণ, এঁদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। 

    তবে, এঁদের রক্তের বিনিময়ে কয়েক হাজার মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। ঔপনিবেশিক কালে যাঁদের অনেকেই সম্ভবতঃ ছাপোষা কেরানী কিংবা মুদির দোকানী ছিলেন বা হতে পারতেন, স্বাধীনতার পর তাঁরা হয়েছেন হাজার-হাজার কোটি টাকার মালিক। এঁদের বিলাসবহুল জীবন বিশ্ব-মানের। এঁরা প্রকৃতই স্বাধীন। সুতরাং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র জয়গান তাঁদের মানায়। এখন একাত্তরের রাজাকারাও সোৎসবে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস পালন করেন। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধের ভাতা দেন, পুরষ্কার দেন। কী আশ্চর্য্য এই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’!

    প্রয়োজন অন্য রকম চেতনার 

    বাংলাদেশের শোষিত ও  শ্রমজীবী শ্রেণীর মুক্তির পথে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দলগুলো আজ তত্ত্বে, আদর্শে, সংগঠনে, কর্মসূচিতে, আন্দোলনে চরম সঙ্কটে। সম্ভবতঃ বিপ্লবের স্বপ্ন ত্যাগ করে এই দলগুলো অবস্থিত ব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের স্থান করে নিয়ে ‘কিছু একটা’ করতে চাইছে। শোষণমূলক পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা তো দূরের কথা, কখনও কখনও এঁরা যৌথতার নামে পুঁজিবাদী শেয়ার-বাজারে অর্থলগ্নিও করে থাকে। 

    নৈতিকতার প্রশ্নে এরা বিদ্ধ হয় না। আদর্শের নামে এ-দলগুলোর কর্মীরা এতোই অন্ধ হয়েছেন যে, অন্ধত্বের ফাঁকে কখন যে খোদ আদর্শ পর্যন্ত চেলে যায়, সে-চৈতন্যও এঁদের নেই। বাইরে থেকে সমালোচনা করলে এঁরা রুদ্রমূর্তিতে তেড়ে আসেন। এঁরা নিজেদের বোধ, আবেগ ও কর্মের দেউলিয়াত্ব ঢাকতে আজ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’য় আশ্রয় নিচ্ছেন। 

    বাংলাদেশের কোটি-কোটি শ্রমজীবী মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ মনুষ্য-জীবন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্য রকমের চেতনা অর্জন করতে হবে। আর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নয়, প্রয়োজন হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের চেতনার। এই সেই চেতনা, যার মধ্য দিয়ে তাঁরা জাতির নামে বজ্জাতির স্বরূপ বুঝতে পারবেন; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবেন; অবস্থিত ব্যবস্থার অন্যায্যতা উপলব্ধি করতে পারবেন; নিজের দুর্দশার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন; সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকারের কথা বলতে পারবেন; নিজের জন্য ও সবার জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পরিপূরক ব্যবস্থা গড়তে ও গড়ার জন্য লড়তে, মরতে ও বাঁচতে পারবেন।

    এই লড়াই ঔপনিবেশিক পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বাঙালীর ১৯৭১ সালের লড়াইয়ের মতো সরল নয় - জটিল। কারণ, এটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে অভিন্ন বাঙালী জাতির মধ্যে ধনিক-বণিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহের সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ দিয়ে এই সংগ্রাম করা সম্ভব নয়। তারও চেয়ে উচ্চতর ও উন্নততর চেতনা - অর্থাৎ শোষণ-মুক্তির শ্রেণী চেতনা - গড়ে তুলে সংগ্রাম রচনা করতে হবে। আর সেই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ধনিক-বণিক শ্রেণীর কর্তৃত্ব থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে মুক্ত করে মানুষকে স্বাধীন করতে হবে। 

    এই কাজটি করার জন্য প্রধানতঃ শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহ থেকে এবং শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহের সাথে একাত্ম তরুণ-তরুণী-যুবক-যুবতীদের এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে যে-প্রচণ্ড অন্যায় ব্যবস্থা মানুষকে মর্যাদাহীন মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করেছে, এর বিরুদ্ধে নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ও অন্যায়ের প্রতি অনুগত সমস্ত শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। 

    যতোই মহত্ত্বের দাবি নিয়ে আসুক না কেনো, বোধে ও বিবেকে অন্যায় হিসেবে প্রত্যক্ষিত হলে প্রতিষ্ঠিত সমস্ত শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। এটিই প্রগতি, এটিই সভ্যতা, এটিই মানবতা। 

    রোববার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১২

    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

পড়লাম। খুব ভালো লাগলো। উতসাহিত করলেন।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন