• অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীঃ নীরব নৃশংসতায়
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার প্রধানতঃ দু’টি টেম্পোরাল এ্যাপিয়ারেন্স বা সময়গত আবির্ভাব আছে। এদের একটি প্রি-ইলেকেশন বা নির্বাচনপূর্ব এবং অন্যটি পৌষ্ট-ইলেকশন বা নির্বাচনোত্তর। সাম্প্রদায়িকতার এ্যাণ্টি-থিসিস হিসেবে যে-অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়, তারও আবির্ভাব ঘটে নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচনোত্তর কালে।

    কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আবির্ভাব নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচনোত্তর কালে একটি নকশা মেনে চলে, যেখানে দেখা যায়ঃ অসাম্প্রাদায়িক ক্যাম্প নির্বাচনপূর্ব সময়ে যতো সংগঠিত ও শক্তিশালী, নির্বাচনোত্তর সময়ে ততো নয়; আর সাম্প্রাদয়িক ক্যাম্প নির্বাচনপূর্ব সময়ের যতোটুকু আক্রমণাত্মক, নির্বাচত্তোর কালে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়।

    পাঠকদের হয়তো মনে থাকবে, এক বছর আগে বাংলাদেশের ১৫ জন সেরা বুদ্ধিজীবী, উদ্যোগী হয়ে ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জাতীয় সম্মেলন' অনুষ্ঠিত করেছিলেন ঢাকায়। তারিখটা ছিলো ২৩ শে ডিসেম্বর। এ-সম্মেলন থেকে বুদ্ধিজীবীরা ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক' দিয়েছিলেন।

    সেদিনই আমি ‘অসাম্প্রদায়িকতা চেতনা প্রসঙ্গে’ দুই পর্বের একটি লেখা শুরু করেছিলাম। আর, সে-কারণে ঐ পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর নাম খুঁজে পেতে আমার বিলম্ব হয়নি। আজ তাঁদের নাম পুনরুৎপাদন করে জানাই, তাঁরা ছিলেনঃ

    (১) সালাহউদ্দিন আহমেদ, (২) সরদার ফজলুল করিম, (৩) মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, (৪) জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, (৫) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, (৬) সৈয়দ শামসুল হক, (৭) বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, (৮) কাইয়ুম চৌধুরী, (৯) হামিদা হোসেন, (১০) আনিসুজ্জামান, (১১) কামাল লোহানী, (১২) রামেন্দু মজুমদার, (১৩) সেলিনা হোসেন, (১৪) সুলতানা কামাল ও (১৫) মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

    কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, গত এক বছরে এ-পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর সম্মিলন তেমন আর কিছু করলো না। এমনকি, ঠিক এ-মুহূর্তে যখন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষগুলোর ওপর আক্রমণ নেমে এসেছে, তখনও সেই পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর সম্মিলিত প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

    বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালী-মননে প্রশ্নও আসছে নাঃ যে-বুদ্ধিজীবীরা এক বছর আগে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছত্র বিস্তৃত করে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে বললেন, তাঁরা আজ সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা সংঘটন-কালে নীরব কেনো? এ-সহজ প্রশ্নটা কেনো ‘সচেতন’ মানুষদের মনে আসছে না?

    উপরের প্রশ্নটি যদি উত্থিত হয়েও থাকে, তাহলে তার উত্তরটা কী? সবিনয়ে বলি, এ-প্রশ্নের উত্তর আমি দিয়ে রেখেছিলাম এক বছর আগে, ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আমার লেখার দ্বিতীয় পর্বেঃ

    “এই লেখার প্রথম পর্বে ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র স্বরূপ উন্মোচন করে দেখানো হয়েছে যে, এটি একটি বিমূর্ত ধারণা, যার মধ্যে কোনো ইতিবাচক সুনির্দিষ্টতা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবী সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী জাতীয় সম্মেললনে এই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানিয়ে জেলায় জেলায় কর্মসূচি পালনের কথা বলেছেন।

    অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, এর একটি সাময়িক রাজনৈতিক লক্ষ্য আছে। নিকট অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, ১৯৯০ এর গণ-অভ্যূত্থানের পর বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাবদল করে ক্ষমতায় আসছে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, তাদের প্রতিটি বিজয়েরই পূর্বগামী হয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আপাতঃ নির্দলীয় একটি সংগঠন ও আন্দোলন।

    ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হলো, তার আগে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটীর আন্দোলন। দ্বিতীয় বারে - অর্থাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচনে - আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ে প্রভূত সাহায্য করেছে সেক্টর কমাণ্ডার্স ফোরাম ও এর চালিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলন।

    বিষয়টিকে একটি ‘প্যাটার্ণ’ বা নকশা হিসেবে বিবেচনা করলে, এই ধারণা করা অমূলক হবে না যে, পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের জন্যেও আওয়ামী লীগের প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু কেন্দ্রিক আরেকটি আপাতঃ নির্দলীয় সংগঠন ও আন্দোলনের।”

    আওয়ামী লীগের প্রয়োজন থেকেই যে পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা জেগে উঠেছিলো, তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছেঃ আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচন বয়কটের সাথে পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর অসাম্প্রদায়িক চেতনার আন্দোলন ত্যাগের সহসংঘটন। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনে বিজয়ী হবেই, তখন অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীদের সম্মেলন করা কিংবা জেলায়-জেলায় যেয়ে অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন করার প্রয়োজন নেই।

    শুধু তাই নয়, পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর দাবীকৃত চেতনা যে মিথ্যা, তার প্রমাণ হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রাদায়ের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও নিপীড়নের খবর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও সম্মিলিত পঞ্চদশ বুদ্ধিজীবীর অচেতন অবস্থা। এই অচেতনার মূলে রয়েছে এই চেতনা যে, পরবর্তী নির্বাচন যেহেতু বহু পরের ব্যাপার, তাই সংখ্যালঘুর নির্যাতনের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক জনগণকে সংগঠিত করা আপাতত জরুরি নয়।

    এহেন চেতনার বুদ্ধিজীবীদেরকেই রাজনৈতিক ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী’। দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো-কোনো বুদ্ধিজীবী না-বুঝেও ভাড়া খাটতে পারেন। উপরের তালিকাতে এমন কতিপয় বোকা বুদ্ধিজীবীর নাম থাকা বিচিত্র নয়।

    শনিবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন