• আইনের শাসন বনাম বাবর আহমেদের এক্সট্রাডিশান
    মাসুদ রানা

    পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বাবর আহমেদ গত শুক্রবার হাইকৌর্টে তাঁর এক্সট্র্যাডিশন শুনানিতে হেরে গিয়েছেন। দৈনিক গার্ডিয়ান আজ আহমেদকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক্সট্র্যাডিশানের বিরুদ্ধে আমার আট বছর ও দু’মাসের যুদ্ধে আজ আমি হেরে গেলাম।’

    আল-কায়েদার পক্ষে তহবিল সংগ্রহে সহযোগিতা করেছেন সন্দেহে সুশিক্ষিত ও সুদক্ষ পেশাজীবী বাবর আহমেদকে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে বন্দী রাখা হয়েছিলো এতোগুলো বছর। বিপরীতে, বাবর আহমেদের প্রার্থনা ছিলো, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার যেনো তার নিজ-দেশ ব্রিটেইনের আইনে ও ব্রিটেইনের আদালতে করা হয়।

    কিন্তু বাবরের আহমেদের প্রার্থনা সমস্ত পর্যায়ে প্রত্যাখাত হয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁকে অন্যান্যদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সত্যিই, ব্রিটিশ নাগরিক তাঁর নিজদেশে পরাজিত হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ী হয়েছে। স্বদেশে বিচারের অধিকার হারালেন বাবর আহমেদ।

    কিন্তু তা সত্ত্বেও বাবর আহমেদ একটি ‘বিজয়’ অর্জন করেছেন বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষায়ঃ ‘যুক্তরাজ্যের এক্সট্র্যাডিশান ব্যবস্থার মিথ্যা-যুক্তি প্রকাশ করে আমি নৈতিক বিজয় অর্জনের মাধ্যমে আমার মাথা উঁচু রেখে বিদায় নিচ্ছি।’

    বাবর আহমেদের ভাগ্য কী আছে কেউ জানেন না। তবে, তাঁর এলাকার এমপি সাদেক খান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাঁদেরই পাঠানো হয়, তাঁরাই প্রাণভয়ে নিজকে দোষী হিসেবে স্বীকার করে নেন এবং তার পর শুরু হয় তাঁদের নিভৃত কারাবাস।

    বাবরের আহমেদের জনক আশফাক আহমেদ বলেছেন, ‘ব্রিটেইনের ইতিহাসে এটি একটি লজ্জাকর অধ্যায় হিসেবে স্মরিত হবে।’ তাঁর আক্ষেপঃ ‘এই দেশে ৪০ বছর ধরে ট্যাক্স দিয়ে আসার পর আমি এই দেখে হতাশ যে, বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রের অন্যতম এই সিস্টেমটি আজ আমাকে এমনই কায়দায় নিরাশ করেছে, যা তৃতীয়-বিশ্বের একটি দেশের ক্ষেত্রে অধিক মানানসই। মনে হচ্ছে, মেট্রোপলিটান পুলিস, ক্রাউন প্রোসেকিউশন সার্ভিস এবং এমনকি কৌর্ট সবাই মিলে একমত হয়েছে ওয়াশিংটনে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার।’

    সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটেইনে ‘আইনের শাসন’ রয়েছে বলে একটি ধারণা বিরাজ করে। বাংলাদেশেও এ-ধারণার মুগ্ধ ধারক রয়েছেন ডানে-বামে সবর্ত্র। কিন্তু আহমেদ পিতা-পুত্রদের ধারণা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘যিনি ভোগেন, তিনিই বুঝেন’ সূত্র ঠিক হলেও, বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

    ‘দ্য রুল অফ ল’ বা আইনের শাসন হচ্ছে রাজনৈতিক ডিসকৌর্সে অতি জনপ্রিয় ফ্রেইজগুলোর মধ্যে একটি। তবে এই বিষয়টি ব্রিটেইনে কতোটুকু মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত, তা নিয়ে আইনের পণ্ডিতদের মধ্যে তর্ক আছে। এই তর্ক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই, গত বছর ‘দ্য রুল অফ ল’ শিরোনামের একটি গ্রন্থ ‘শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক গ্রন্থ’ হিসেবে ‘ঔরয়লে প্রাইজ’ পেয়েছে। এই পুস্তকের প্রণেতা কোনো ‘ল্যেম্যান’ বা সাধারণ মানুষ নন। তিনি হচ্ছেন ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলসের প্রাক্তন লর্ড চীফ জাস্টিস এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ল লর্ড টম বিংহ্যাম। 

    টম বিংহ্যামের বইটি একটি স্মারক গ্রন্থ। বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। ২০০৬ সালে ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে ‘সিক্সথ্‌ স্যার ডেইভিড উইলিয়ামস লেকচার’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বিংহ্যাম ‘দ্য রুল অফ ল’ বিষয়ে যা উপস্থাপন করেছিলেন, তা-ই পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ৫ বছর পর ২০১১ সালে।

    বিংহ্যাম তাঁর বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই ‘দ্য রুল অফ ল’ কথাটির উৎস ও অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই কথাটি ১৮৮৫ সালে প্রবর্তন করেন অক্সফৌর্ড ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ল’র প্রোফেসার আলবার্ট ভেন ডাইসী। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘এ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডী অফ দ্য ল অফ দ্য কনস্টিটিউশন’ গ্রন্থে ‘দ্য রুল অফ ল’ প্রথম ব্যবহার করেন, যদিও এর অন্তর্নিহিত মূল ধারণা প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এ্যারিস্টটলের লেখাতেও রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন বিংহ্যাম।

    ‘দ্য রুল অফ ল’ কথাটির অর্থ কী, তা বুঝাতে গিয়ে বিংহ্যাম প্রোফেসার ডাইসীর সংজ্ঞাকেই নির্দেশ করেছেন। ডাইসী তিনটি অর্থ নির্দেশ করেছেন। ডাইসী (এখানে একটির উপর আলোকপাত করা হচ্ছে) বলেছেন, ‘এর দ্বারা আমরা প্রথমেই বুঝি, কোনো ব্যক্তিই শাস্তিযোগ্য হতে পারেন না কিংবা আইনসম্মতভাবে তাঁকে দেহে ও বস্তুতে কষ্ট দেয়া যায় না, যদি না দেশের প্রতিষ্ঠিত সাধারণ আদালতের সামনে সাধারণ পদ্ধতিতে অন্যন্যভাবে তিনি একটি আইন ভঙ্গ করেছেন বলে প্রমাণিত হন’।

    ডাইসীর কথাগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিংহ্যাম বলেছেন, ‘ডাইসীর চিন্তা পরিষ্কার। যদি কাউকে - ধরুন, আপনাকে বা আমাকে - যদি শাস্তিযোগ্য করতে হয়, তাহলে তা কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তার নির্দেশে আমাদের দোষী সাব্যস্ত করার মাধ্যমে নয়, এটি হতে হবে দেশে প্রতিষ্ঠিত আইনের প্রমাণিত লঙ্ঘনের কারণে। এবং এই লঙ্ঘন প্রমাণিত হতে হবে দেশের প্রতিষ্ঠিত সাধারণ আদালতের সামনে - মন্ত্রী বা সরকারের পছন্দ করা লোকদের দ্বারা গঠিত কোনো ট্রাইবুনালে নয়।’

    বাবর আহমেদ বিংহ্যামের বই পড়েছেন কি-না, জানি না। কিন্তু বিংহ্যাম তাঁর বইয়ে আইনের শাসন বা ‘দ্য রুল অফ ল’ বলে যা বুঝিয়েছেন, তা বাবর আহমেদের পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।

    ব্রিটেইনের প্রতিষ্ঠিত আইনে, ব্রিটেইনের সাধারণ আদালতে এবং সাধারণ প্রক্রিয়ায়, বিচারের ফলে বাবর আহমেদের ভাগ্য কী জুটতো, তা বলা কঠিন। কিন্তু প্রাক্তন লর্ড চীফ জাস্টিস বিংহ্যামের সমর্থিত প্রোফেসার ডাইসীর সংজ্ঞানুসারে বাবর আহমেদের প্রতি যে ‘দ্য রুল অফ ল’ আইনের শাসন ব্যর্থ হয়েছে, তা স্পষ্ট প্রতীয়মান। আর এখান থেকেই বাবর আহমেদদের মধ্যে জেগে ওঠে নিজের আইনে শাসন করার ও শাসিত হবার আকাঙ্খা। বাবর আহমেদ তার নৈতিক বিজয় বলতে হয়তো সেটি বুঝিয়ে থাকবেন।

    জুরিসপ্রুডেন্সের একটি ডিক্টাম বা নীতিবাক্য আছে যা কমবেশি সকলেই জানেন, আর তা হচ্ছেঃ ‘এ্যা ম্যান ইজ ইনৌসেন্ট আনটিল প্রৌভেন গিল্টি’। স্পষ্টতঃ বাবর আহমেদের বেলায় এই নীতি উল্টে গিয়ে যে নীতির প্রয়োগ হয়েছে, তা হচ্ছেঃ ‘এ্যা ম্যান ইজ গিল্টি আনটিল প্রৌভেন ইনোসেন্ট’।

    নীতির এই পরিবর্তনটি এসেছে সে-দিন থেকে যেদিন (৫ অগাস্ট, ২০০৫) প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন ‘লেট নৌ-ওয়ান বি ইন এ্যানী ডাউট, দ্য রুল্‌স অফ দ্য গেইম আর চেইঞ্জিং’। অর্থাৎ, ‘কারও যেনো সন্দেহ না থাকে যে, খেলার নিয়মগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে’।

    সৌভাগ্যবশতঃ এর উত্তরে টম বিংহ্যাম বলেন, ‘দিস ওয়াজ নট, পারহ্যাপস্‌, এ্যা হ্যাপী ফ্রেইজ, সিনস্‌ নৌ রেসপনসিব্‌ল পার্সন হ্যাড এভার সাপৌসড্‌ দেয়ার ওয়াজ এ্যা গেইম’। অর্থাৎ, ‘এটি সম্ভবতঃ সুখের কথা নয়, কারণ কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি কখনই একে খেলা মনে করেননি।’

    রোববার, ৭ অক্টোবর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন