• আওয়ামী লীগঃ বাম-বিকল্পের অগ্রপথিক
    মাসুদ রানা

    রাজনৈতিক কৌশল
    বাংলাদেশের প্রধান ধর্মবাদী দল জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধকরণের রাজনৈতিক দাবি উত্থিত হয়েছে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে। আওয়ামী লীগ একটি দল হিসেবে, তারই নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে এই দাবিটি জানাচ্ছে। জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের অতীতের সহযোগিতার সম্পর্কটি স্মরণে এনে বিবেচনা করলে, দেখা যাবে বর্তমানের দাবিটি একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক কৌশল।

    আওয়ামী লীগ তার নেতৃত্বে ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি’র মধ্যে ঐক্য তৈরী করে বাংলাদেশে ক্ষমতা-ভোগের একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চায়। বস্তুতঃ আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক কৌশলটি খুব কার্যকরী। আর, এর ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচির সাম্প্রতিক সাফল্যও লক্ষ্যণীয়, যা অনুসৃত হয়েছে বাম-বিকল্পের সদ্য ঘোষিত একটি হরতাল কর্মসূচিতে।

    ১৯৭১ সালে কৃত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে চার দশক পর ধৃত ও প্রায় এক বছর ধরে বন্দী নেতাদের বিচার-প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে জামায়াত ইসলামী দলটি সমাবেশ ডেকেছিলো রাজধানী ঢাকায়। আওয়ামী লীগের জোট-সরকার এর অনুমোদন দেয়নি। এতে বাধাপ্রাপ্ত জামায়াত ইসলামী এক ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশে হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

    যে-করেই হোক, জামায়াতের হরতাল কর্মসূচি পালিত হবার পর ধর্মবাদীদের পক্ষ থেকে যে ‘বিপদের হুমকি’ প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তাতে ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ’র শক্তিগুলোর জন্য পরস্পরের কাছকাছি আসার একটা পরিবেশ তৈরী হয়েছে। এখানেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণিত।

    বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায়-আসা দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টি-সহ সকল ‘বুর্জোয়া’ শক্তিকে ‘লুটেরা ধনিক’ শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি হিসেবে এক শিবিরে ফেলে, তাদের বিকল্প হিসেবে, বাম-বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে, গত জুলাই মাসে যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল - সংক্ষেপে সিবিপি ও বাসদ। ইতিপূর্বে এর অন্তঃসারশূন্যতা ব্যাখ্যা করে আমি ‘ট্রিলজি’ লিখেছি, যা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

    কাছে আসা
    অদ্য লক্ষ্যণীয়, আওয়ামী লীগের সফল রাজনৈতিক কৌশলের কারণে, বামদের সেই বিকল্পের সংকল্প কেঁপে উঠেছে। বাম-সংকল্প এখন কোন্‌ দিকে হেলে পড়ছে, তা প্রতিফলিত হয়েছে সিবিবি-বাসদের ঘোষিত হরতাল কর্মসূচির পক্ষে প্রচারিত পৌস্টারের শিরোনামে। এতে লেখা হয়েছেঃ

    রাজাকারদের ‘ডরতালের’ জবাবে দেশবাসীর হরতাল
    ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

    কিছুদিন আগে ঢাকার অদূরে নিশ্চিন্তপুরে একটি পোশাক কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক হত্যার ঘটনার পর আশা করা হয়েছিলো, বাম-বিকল্প শক্তি একটা শক্তিশালী আন্দোলন শুরু করবে। ধারণা করা গিয়েছিলো যে, এর মধ্য দিয়ে তাদের বিকল্পের কর্মসূচি বেগবান হবে। আশা করা হয়েছিলো, বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র-কাঁপানো ও সরকার ধ্বসানো একটি কর্মসূচি আসবে। কারণ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় এরা নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল মনে করে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে শ্রেণী সংগ্রাম চালনা করতে-করতে, বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া-রাষ্ট্রের উৎখাত করে, শ্রমিক-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য।

    লক্ষ্যণীয়, বামদের সদ্য ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শ্রমিক হত্যার বিষয়টি ‘এক নম্বর’ হিসেবে স্থান পায়নি। বাম-বিকল্পের প্রচারিত পৌস্টারে ‘গার্মেন্ট অগ্নিকাণ্ড’র’ কথা উল্লেখ করে, বিচার চেয়ে, শাস্তি প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে তিনের মধ্যে দু-নম্বর দাবি হিসেবে। কারণ, পৌস্টারে এদের প্রধান ও প্রথম দাবি হচ্ছে জামায়াত-শিবির সহ সাম্প্রদায়িক দল ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার।

    আরও লক্ষণীয় হলো, এই দাবিটির মধ্যে শ্রমিকদের হত্যার প্রসঙ্গটি আনা হয়নি। ‘হত্যা’তো দূরের কথা, ‘নিহত’ হওয়ার কথাটা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে, ‘গার্মেন্ট অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী মালিক ও সরকারি কর্মচারিদের গ্রেফতার ও শাস্তি প্রদান কর।’

    এ-কথা বিশদে ব্যাখ্যা করার সম্ভবতঃ প্রয়োজন নেই যে, বিপ্লবীদের হরতাল-কর্মসূচির প্রচারপত্রে ‘গার্মেন্ট অগ্নিকাণ্ডের’ কথা এসেছে শুধুমাত্র ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ বজায় রাখার জন্য। হরতাল কর্মসূচি ঘোষণার শ্রেণী-বোধ ও প্রয়োজনীয়তা কী, তা প্রচারপত্রের উপরে উল্লেখিত শিরোনামেই প্রতিভাত।

    বাম-বিকল্পের প্রচারপত্রে প্রাধান্য-প্রাপ্ত জামায়াত-নিষিদ্ধকরণের এই যে দাবিটি, এটিও কিন্তু তাঁদের আপনার নয়। যদি তা-ই  হতো, তাহলে ছ-মাস আগে ঘোষিত বাম-বিকল্পের কর্মসূচিতে তা দেখা যেতো।  গত জুলাই মাসে ঢাকাতে একটি সংবাদ-সম্মেলন ডেকে বাম-বিকল্পের নেতৃবৃন্দ যখন কর্মসূচি ঘোষণা করলেন, তখন তাঁরা কী বলেছিলেন?

    ফিরে দেখা
    বাম-বিকল্পের নেতৃবৃন্দ কি ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের কথা বলেছিলেন? তা ‘দাবি’ হিসেবেই হোক কিংবা নিজেদের কর্মসূচি হিসেবেই হোক?  না, তাঁরা তা করেননি। তাঁরা তাঁদের ১৫-দফা কর্মসূচির অন্তর্গত করে কিছু কথা বলেছিলেন ১৫-দফার দ্বিতীয় দফাতে, যার পাঠ ছিলো নিম্নরূপঃ

    ‘‘২. ৭১-এর যুদ্ধপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-গণআকাঙ্খার পুনর্জাগরণ ঘটানো।

    * মানবতা বিরোধী যুদ্ধপরাধের বিচার ও শাস্তি প্রদানের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিরোধী চেতনার বিকাশ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

    * মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা।’’

    সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, বাম-বিকল্পের কর্মসূচি-প্রণেতাদের দূরদৃষ্টি কতো ক্ষীণ ছিলো। জুলাই মাসে ঘোষিত তাঁদের কর্মসূচি ডিসেম্বর মাসে এসে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচির চেয়ে পশ্চাদপদ ও অপর্যাপ্ত হিসেবে পরিগণিত হলো। কারণ, বাম-বিপ্লবীরা তাঁদের তথাকথিত ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’তে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি আসেনি।  

    কিন্তু এখন যখন আওয়ামী লীগ রাস্তায় নেমে তার দলীয় রাজনীতির স্বার্থে ধর্মবাদী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধকরণের কথা বললো, তখন বাম-বিপ্লবীদের কাছে আওয়ামী লীগকে অনুসরণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকলো না। বাংলাদেশের বাম-বিপ্লবীরা যে বোধে ও আবেগে তাঁদের কর্মীদেরকে উদ্দীপ্ত রাখেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ না করলে, সেই কর্মীরা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’য় ভেসে আওয়ামী লীগের মিছিলে যোগ দিতে শুরু করবে।

    কিন্তু নিতান্ত অনুসরণটাও বেশ বিব্রতকর। কোন্‌ মুখে বাম-বিপ্লবীরা বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগকে নীরবে অনুসরণ করবেন? তাই, ছ’মাস আগে যাঁরা ‘ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ’তো দূরের কথা, ‘ধর্ম’ শব্দটি পর্যন্ত উল্লেখ করার সাহস দেখাতে পারেনি, তাঁরাই পেছন থেকে এসে এক কদম আগে বেড়ে ‘হ্যাভী ডৌজ’ হিসেবে ‘হরতাল’ই ডেকে বসলেন। এতে একটা ‘লড়াকু’ ভাব অর্জন ও ‘মোটেও পিছিয়ে নেই’ অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব হলো।

    বাম-বিপ্লবীদের জন্য এই হরতালের মতো আর নিরাপদ কর্মসূচি আর কী হতে পারে? এমন নিরাপদ হরতাল সম্ভবতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ, ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগের জোট-সরকার। ক্ষমতাসীন দলটি বলছে, জামায়াত ইসলামীর রাজনীতি বন্ধ করতে হবে; ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ’র শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে; গার্মেন্ট কারখানায় অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে জামায়াতের কাজ; ইত্যাদি। এই পরিস্থিতিতে, তো আওয়ামী লীগেরই জামায়াতের বিরুদ্ধে হরতাল ডাকার কথা। কিন্তু পারছে না কেবল সরকারে আছে বলে। তাই, এহেন চমৎকার অনুকূল পরিস্থিতি বুঝেই বাম-বিপ্লবীরা হরতাল ডাকলেন, যা  হচ্ছে নিশ্চিত নিরাপদ ও আরামদায়ক  ‘বিপ্লবী’ তৎপরতা।

    ধর্ম ও রাষ্ট্র
    ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রাষ্ট্র যেহেতু প্রাকৃতিক নিয়মে চলে না, কিংবা সাংস্কৃতিক নিয়মেও নয়, তাই রাষ্ট্রকে বলতে হয় একটি আদর্শের কথা এবং চলতে হয় আদর্শের পরিপূরক আইন তৈরীর ও সেই আইনকে কার্যকর করার পথ ধরে। যাঁরা নৈরাষ্ট্রবাদী নন, তাঁদেরকে তো আইনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

    মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছেঃ তর্কের ঊর্ধ্বে ‘পবিত্র’-জ্ঞাত ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র চলবে, না বিজ্ঞানের মতো তর্কযোগ্য, পরীক্ষাযোগ্য, সংশোধনযোগ্য, পরিববর্তনযোগ্য ও প্রয়োজনে বাতিলযোগ্য জ্ঞান ও পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে চলবে?

    যে-বিশ্বাস ব্যক্তি-মানুষ সাম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে প্রধানতঃ জন্মগত ভাবে পান, যে-বিশ্বাসে যুক্তি-তর্ক-পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে না, সে-বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যদি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারিত হয়, তাহলে বিভিন্ন বিশ্বাসের নাগরিকগণ কখনও আইনের চোখে সমান বিবেচিত হবেন না। সে-রাষ্ট্রে কখনও ‘রুল অফ ল’ বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং পরিণতিতে সেটি একটি সুসভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে সুগঠিত হতে পারে না।

    যেহেতু ধর্মে বিধৃত বিষয়াদি হচ্ছে বিনা-তর্কে গ্রহণ করে বিশ্বাস করা বা ‘ঈমান’ আনার ব্যাপার, তাই নানা বিশ্বাসের নাগরিককে ধারণ করার মতো রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠানটি ধর্মকে ভিত্তি করে চলতে পারে না। রাষ্ট্রকে তাই হতে হবে ‘সেক্যুলার’ অর্থাৎ ইহজাগতিক বা অতিপ্রাকৃত ধারণার সাথে সংস্রব-হীন। রাষ্ট্র হবে ধর্মহীন। ধর্ম থাকতে পারে ব্যক্তির। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। কারণ, রাষ্ট্র কোনো মানুষ নয়। রাষ্ট্র হচ্ছে প্রতিষ্ঠান।

    শেখ মুজিবুর রহমান সেক্যুলারিজমের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’। তিনি বুঝতে চাননি কিংবা বুঝাতে চাননি যে, ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ আলাদা করা মানে হচ্ছে ধর্মের সংস্রবহীন করা। ধর্মীয় সংস্রব-হীন রাষ্ট্রের ধারণা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট ভাবে উচ্চারিত আদর্শবাদ হিসেবে না এলেও, বাঙালী জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিলো এটি, যা মুক্তিযুদ্ধ-কালে প্রধানতঃ জনপ্রিয় কাব্যে ও সঙ্গীতে প্রতিফলিত হয়েছে। এবং স্বাধীনতার পর এই সেক্যুলারিজমই বাংলায় ঐতিহাসিক অর্থ নিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ হিসেবে সংবিধানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো।

    শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ যা মূলগতভাবে জিয়াউর রহমানের আদর্শ হিসেবেও গৃহীত এবং যাকে আমি ‘রহমানিজম’ বা ‘রহমানবাদ’ বলি, সেই আদর্শের প্রভাবে ‘সেক্যুলারিজম’ তার ঐতিহসিক ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ অর্থটি হারিয়ে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ অর্থ লাভ করে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে।

    বাংলাদেশে এক সময়ে ‘সেক্যুলারিজম’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক বামপন্থীদের মধ্যেও ক্ষয়রোগ ধরেছে। তাই বাম-বিকল্পের ১৫-দফায় সেক্যুলারিজম কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ধর্মীয় রাজনীতিকে বিলুপ্ত করার দাবি বা কর্মসূচি আসেনি।

    অগ্রবর্তী
    অথচ প্রায় একবছর আগে, এ-বছরের ১৬ জানুয়ারীতে এই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘গোলাম আযম আটকঃ ‘কী লয়ে বিচার?’’ শিরোনামের একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিলো। লেখা শেষ করা যায় পাঠকের জন্য সেই লেখা থেকে দুটো অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করেঃ

    ‘‘গোলাম আযমের বিচার করতে হলে, বিচার করতে হবে সেই ধর্মবাদী রাজনৈতিক আদর্শের, যা পরাধীন ও শোষিত বাঙালীদের মধ্য থেকে ক্ষুদ্র হলেও একটি অংশকে স্বজাতির স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো এবং জায়েজ করেছিলো গণহত্যা ও ধর্ষণ। ...

    ...ধর্মবাদী রাজনীতির চর্চা বাংলাদেশে অক্ষুণ্ণ রেখে কোন্‌ যুক্তিতে আজ গোলাম আযমের বিচার হবে? গোলাম আযমের আদর্শিক অবস্থানের বিচার ছাড়া ব্যক্তি গোলাম আযমের বিচার আপাততঃ কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য চূড়ান্ত বিচারে কোনো সুখবর নিয়ে আসতে পারবে না। কারণ, ধর্মবাদী রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখে গোলাম আযমকে যদি ফাঁসি দিয়ে মারা হয়, তাঁর স্পিরিট মরবে না। গোলাম আযম বরং ‘শহীদ-ই আযম’ হয়ে শতগুণ শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হবেন।’’

    পরিশেষে বাম-বিপ্লবীদের বলিঃ আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে, নিজের পদভারে চলুন। পা চালানোর আগে মাথাটা খাটান। আর, মাথাটা খাটবেই না, যদি না বাংলাদেশের শোষিত ও নিপীড়িত মেহনতী শ্রেণীর মধ্যে যেয়ে, তাঁদের সাথে একাত্ম হয়ে, তাঁদের জন্য মানুষের মর্যাদা-সম্পন্ন জীবন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শ্রেণীসংগ্রামে অবতীর্ণ হোন। আজ শ্রেণী বিভক্ত বাংলাদেশের প্রধান দ্বন্দ্ব শ্রমের সাথে পুঁজির - অর্থাৎ, কয়েক হাজার কোটিপতির সাথে কোটি-কোটি শোষিত মানুষের। এই দ্বন্দ্বকে প্রধান (প্রিন্সিপাল কন্ট্রাডিকশন) ধরে বাকিগুলো বিবেচনা করুন। তবেই চক্ষুষ্মান হবেন, সামনে পথ খুঁজে পাবেন।

    রোববার, ৯ ডিসেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

চমৎকার বিশ্লেষন।

Mr. Rubel, you enjoy insulting people, don't you?

Do you have respect for yourself? If you have, that's good. But it would be even better, if you could respect others too.

Saying things about others using phrases like 'big lectures' and 'fertile brain' do not seem to you something disrespectful?

Can't Bengalis be civilised to the world standards? They better be!

@ আরিফ সাহেব

আমি তো উনার কোনো কথায় বা বক্তব্যে বিরোধী হয়ে কিছু বলিনি যা ব্যক্তি আক্রমনের পর্যায়ে পরে বরং উনি কিছু বাম আন্দোলনের সংকট তুলে ধরলেন, আমি কিনা সেই সংকট উত্তোলনের সমাধান তুলে ধরলাম. হইতো বলার ভঙ্গি তে সমস্যা থাকতে পারে যা স্বীকার করছি এবং ক্ষমা চাচ্ছি.
তা আরিফ সাহেব, কার নাম কেমন হবে আর ফাস্ট নাম কেমন হলে সার নাম কেমন হতে হয় এই বেপারে এখনো কোনো লিখা পাইনি, দিবেন নি একটা আপনার উর্বর মস্তিস্ক থেকে ?

@দেবাশীষ রুবেল

ধরুন আপনাকে বলা হলো, আপনার ফার্স্টনেইম আর সারনেইমের সম্মিলন বড়ো অদ্ভূত, তবে সেটি হবে অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি-আক্রমণ। কারণ, সেখানে আপনার বক্তব্য নয় বরং আপনার ব্যক্তিগত এ্যাট্রিবিউট নিয়ে বলা হচ্ছে, যেটি প্রাসঙ্গিক নয়।

আপনি কি বুঝতে পারছেন যে, আপনি ঠিক এ-কাজটিই করেছেন? এ-লেখার প্রসঙ্গে একটি কথাও আপনি বললেন না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ও সম্ভ্যাব্য ভবিষ্যত ঘটনাবলি নিয়ে এ-লেখায় উপস্থাপিত বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যায় আপনার প্রতিক্রিয়া কী তা জানা গেলো না। বরং আপনি চিন্তিত লেখক কেন 'ইংল্যাণ্ডে বসে লেকচার' না দিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে 'প্রকৃত বাম-বিকল্পের' আন্দোলন করছেন না, তা নিয়ে। আপনার এ-আচরণ কার কাজে এলো বলুন তো মশায়?

সাধারণতঃ যখন কোন বক্তব্যের বিপরীতে উপযুক্ত জবাব থাকে না অথচ বিশ্বাসগত অথবা বোধের ঘাটতিগত কারণে কিংবা উভয়ের সমিলনে সে-বক্তব্য মেনে নিতেও অপারগ হয়, তখন মানুষ বক্তব্য ছেড়ে বক্তার বিচার করতে শুরু করে। এ-প্রবণতা থেকেই ব্যক্তি-আক্রমণ, গালাগালি এবং কোন-কোন ক্ষেত্রে অভিশম্পাত পর্যন্ত করে থাকে মানুষ। যখন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নাস্তিক বেয়াড়া প্রশ্ন করেন, বিশ্বাসীর পক্ষে সে-বক্তব্য মেনে নেয়া সম্ভব হয় না অথচ উপযুক্ত জবাবও তাঁর কাছে নেই। ফলে নাস্তিকের নৈতিকতা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় - যা অনেক সময় 'তিনি বিচার করবেন' ধরণের অভিসম্পাত ও ফরিয়াদে পরিনতি পায়।

দয়া করে এ-সংস্কৃতি ত্যাগ করুন। উপস্থাপিত বক্তব্য 'সৎভাবে' বুঝতে চেষ্টা করুন, না বুঝলে প্রশ্ন করুন, তারপর প্রয়োজন হলে 'বস্তুনিষ্ঠ' সমালোচনা করুন - লক্ষ্য করুন 'বস্তুনিষ্ঠ' সমালোচনা। তাতে আপনিও সমৃদ্ধ হবেন, বক্তব্য-উপস্থাপনকারীও উপকৃত হবেন। নয়তো অযথা বচসায় আপনার অক্ষমতাই প্রকাশ পাবে কেবল, কারও কোন লাভ হবে না।

ধন্যবাদ।

ইংল্যান্ডে বসে এত বড় বড় লেকচার না দিয়া উনারতো উচিত দেশে এসে প্রকৃত বাম-বিকল্পের আন্দোলন শুরু করা.

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন