• আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ গাণিতিক
    মাসুদ রানা

    একই সাথে যখন দু’টি আন্দোলন সংঘটিত হয়, তখন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিকঃ এদের মধ্যে সম্পর্ক কী? বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই আন্তঃসংযুক্ত ও আন্তঃসম্পর্কিত। দর্শনের কাজ হচ্ছে সে-সম্পর্ক-সমূহের তত্ত্বায়ণ, আর বিজ্ঞানের অভীষ্ট লক্ষ্য সূত্রায়ণ। সমাজবিজ্ঞানে বৈজ্ঞনিক সূত্রায়ণ দুরূহ। তবে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে তত্ত্বায়ণ সহজতর।

    সহ-সংঘটিত দু’টি আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ককে গাণিতিক ও জ্যামিতিকভাবে দেখা যেতে পারে। নীচের লেখায় এ-বিষয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরে হলো, পরবর্তীতে যা আরও বিকশিত হতে পারে। গাণিতিক বিবেচনায়, তিন প্রকারে সম্পর্ক থাকা সম্ভবঃ (১) কজ্যাল রিলেশন বা কার্য-কারণ সম্পর্ক, (২) কোরিলেশন বা সহ-সম্পর্ক ও (৩) জিরো রিলেশন বা শূন্য সম্পর্ক।

    কার্য-কারণ সম্পর্ক

    দু’টি ঘটনা বা বিষয়ের মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্ক মানে হচ্ছে, এদের মধ্যে একটি ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ভ্যারিয়েবল বা স্বাধীন চল, আর অন্যটি ডিপেণ্ডেণ্ট ভ্যারিয়েবল বা অধীন চল। যেটি স্বাধীন চল, সেটি হচ্ছ কারণ; আর যেটি অধীন চল, সেটি হচ্ছে ফল।

    কার্য-কারণ সম্পর্ক স্কেইলার নয়, ভেক্টর। অর্থাৎ এর শুধু ম্যাগনিচিউড বা বিস্তার নয়, ডাইরেকশন বা দিকও আছে। সামাজিক পরিবর্তনের জন্য এটি জানা প্রয়োজনীয়। কোন্‌ আন্দোলন কোন্‌-কোন্‌ আন্দোলনের কারণ এবং কোন্‌-কোন্‌ আন্দোলন কোন্‌ আন্দোলনের ফল, তা বুঝা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনকামীদের জন্য বুঝা অত্যন্ত জরুরী।

    কোরিলেশন বা সহ-সম্পর্ক কার্য-কারণ সম্পর্কের মতো অতো স্পষ্ট নয়। তাই বুঝাটা একটু জটিল। সহ-সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কোন্‌টি স্বাধীন চল, আর কোনটি অধীন চল, তা নির্দেশ করা মুশকিল।

    সহ-সম্পর্ক

    ভৌত বিজ্ঞানে যেখানে প্রধানতঃ কার্য-কারণ সম্পর্ক খোঁজা হয়, সামাজিক বিজ্ঞানে প্রধানতঃ অনুসন্ধান করা হয় সহ-সম্পর্ক। কারণ, ভৌত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক চলগুলোর কোনটি কারণ ও কোনটি ফল তা নির্ণয়ের জন্য আমরা গবেষণাগারের কৃত্রিম পরিবেশে সবগুলো চলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করি। পরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় আমরা একটিকে স্বাধীন চল হিসেবে মেনিপুলেইট করে অন্যটিকে অধীন চল হিসেবে পরখ ও পরিমাপ করি। সূক্ষ্ম ও নির্ভুল যান্ত্রিক পরিমাপের মাধ্যমে কার্য-কারণ সম্পর্কের বিস্তার ও দিক নির্দেশ করে বৈজ্ঞানিক সূত্রায়ণ করতে পারি।

    উপরের বর্ণিত ভৌত বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির হুবহু ব্যবহার সামাজিক বিজ্ঞানে সম্ভব তো নয়ই, এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক শাখাতেও - যেমন মহাকাশ বিজ্ঞানে বা প্রকৃতি বিজ্ঞানে - সম্ভব নয়। তো, সেখানে আমরা কী করি?

    সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা প্রধানতঃ সহ-সম্পর্ক নির্ণয় করি। সমাজে আন্তঃসম্পর্কিত বহু চলের মধ্যে একটি চলকে কারণ ও অন্য একটিকে ফল মনে করে হাইপোথেসাইস বা প্রকল্প প্রণয়ণ করি এবং পর্যবেক্ষণ করি প্রকল্পিত স্বাধীন-চলের মধ্যে সংঘটিত দিকে ও বিস্তারে পরিবর্তন অধীন-চলের মধ্যে দিক ও বিস্তারে কী পরিবর্তন আনে। আমরা আমাদের এ-পর্যবেক্ষণ থেকে সহ-সম্পর্ক নির্ণয় করে গৃহীত প্রকল্পের পক্ষে বা বিপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

    প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে কার্য-কারণ সম্পর্ক যেখানে প্রধানতঃ ইউনিডাইরেকশনাল বা একমুখী, সামাজিক বিজ্ঞানে এটি বাইডাইরেকশনাল বা দ্বিমুখী এবং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে মাল্টি ডাইমেনশন্যাল বা বহুমখী। নীচে দু’টি উদাহরণ দিই।

    প্রকৃতিতে, সূর্যালোক বৃদ্ধি পেলে বায়ুমণ্ডলে তাপ বৃদ্ধি পায়। এখানে সূর্যালোক হচ্ছে কারণ বা স্বাধীন-চল এবং বায়ুমণ্ডলের তাপ হচ্ছে ফল বা অধীন-চল। এক্ষেত্রে এর বিপরীত গতিদিক সম্ভব নয়। অর্থাৎ, অন্য কোনো উপায়ে ধরা যাক অনেকগুলো উনুন জ্বালিয়ে দিয়ে বায়ুমণ্ডলের তাপ বাড়িয়ে দিলে সূর্যালোক বৃদ্ধি পাবে না।

    সামাজিক ক্ষেত্রে, শ্রমিকদের ওপর মালিকদের শোষণ শ্রমিক-আন্দোলন তৈরী করে। শ্রমিক আন্দোলন মালিকদের মধ্যে শ্রমিক-শোষণ সৃষ্টি না করলেও শ্রমিক-শোষণ হ্রাস করতে পারে। এমনকি, কখনও কখনও বৃদ্ধিও করতে পারে। আবার, শোষণ করলেই যে আন্দোলন হবে, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ এখানে কার্য-কারণ সম্পর্ক আলো ও তাপের মতো স্পষ্ট নয়। এখানে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, বহু মধ্যবর্তী চল বিভিন্ন মাত্রায় কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। নীচে আরেকটি উদাহরণ দিই।

    অর্থনীতি বিজ্ঞানে চাহিদা ও যোগান কার্য-কারণ সম্পর্কের সূত্রটি একমুখীন। চাহিদা বাড়লে যোগান বাড়বে। সোজা সূত্র। অনেকটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তাপ ও আলোর মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্কের মতো। এখানে যোগান চাহিদাকে নির্ধারণ করে না, চাহিদাই যোগানকে নির্ধারিত করে।

    ধরা যাক, বাজারে বছরে ১ হাজার গাড়ীর চাহিদা আছে ও এক হাজার গাড়ীর যোগান আছে এবং এর মধ্য দিয়ে ইকিউলিব্রিয়াম বা ভারসাম্য স্থাপিত হয়েছে। এখন, সেটেরিস প্যারিবাসে (মানে, সব কিছু স্থির রেখে) পরের বছর বাজারে যদি ২  হাজার গাড়ীর যোগান দেওয়া হয়, তাহলে তার ফলে কি গাড়ীর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে? না, অর্থনীতি বিজ্ঞান বলে, পাবে না।

    কিন্তু যোগান বৃদ্ধির সাথে যদি তৃতীয় একটি চলে পরিবর্তন আনি, তাহলে বর্ধিত যোগান তৃতীয় চলের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে চাহিদা বৃদ্ধি করতে পারে। এ-তৃতীয় চলটি হচ্ছে গাড়ীর মূল্য। অর্থাৎ, যদি আগের ১০ লক্ষ টাকা মূল্যে ১ হাজার গাড়ী যোগানের পরিবর্তে যদি ৮ লক্ষ টাকা মূল্যে একই গাড়ী ২ হাজার যোগান দেওয়া হয়, তাহলে অর্থনীতির সূত্র-মতে গাড়ীর চাহিদা বেড়ে যাবে।

    এমনকি, যোগান স্থির রেখে শুধু মূল্য কমিয়েও চাহিদা বৃদ্ধি করা যায়। কিন্তু মূল্য হ্রাস করে যদি যোগান শূন্যে নামিয়ে আনা হয়, তাহলেও কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধি পাবে না। কারণ, যার যোগান নেই, তার চাহিদাও নেই। যেমন, বাজারে স্মার্ট ফৌনের যোগান না আসা পর্যন্ত এর কোনো চাহিদাও ছিলো না।

    সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সামাজিক বিজ্ঞানে কার্য-কারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা বেশ কঠিন। তাই, আমরা দ্বিতীয় প্রকারের সম্পর্ক অর্থাৎ সহ-সম্পর্ক নির্ণয় করি। সহ-সম্পর্ক আমাদেরকে অনুমোদন করে দু’টি চলের মধ্যে অজ্ঞাত তৃতীয় কিংবা চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বা যে-কোনো সংখ্যক চলকে মেডিয়েটিং বা মধ্যবর্তী চল হিসেবে কল্পনা করতে, যার সাথে হয়তো আমাদের পরীক্ষণীয় স্বাধীন ও অধীন চলের সুনির্দিষ্ট কার্য-কারণ সম্পর্ক আছে, কিন্তু এ-মহূর্তে যা আমাদের কাছে অজ্ঞাত।

    ভৌতবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই সহ-সম্পর্ক ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভৌত-বিজ্ঞানে যে-গতিতে সহ-সম্পর্ক থেকে কার্য-কারণ সম্পর্কে যাওয়ার সুযোগ থাকে, সামাজিক বিজ্ঞানে সে-সুযোগ কম। আর এখানেই জন্ম নেয় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক। কারণ, আমরা বিভিন্ন প্রকল্প বা তত্ত্ব নির্মাণ করে ঐ সহ-সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে চাই।

    সহ-সম্পর্কের এ-ব্যাখ্যা-প্রচেষ্টা বা তত্ত্বায়ণ, তার সমর্থনে জন্ম নেয় আদর্শ। আদর্শ একটি বিষয়কে ব্যাখ্যা করে ঔচিত্যের ধারণা থেকে। জগত ও জীবন সম্পর্কে একটি বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করে এবং সে-অবস্থানের সাথে সঙ্গতি রেখে সমস্ত সহ-সম্পর্ককে কার্য-কারণ সম্পর্কের মর্যাদায় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন থেকেই আদর্শের জন্ম। আদর্শ মানুষকে তাঁর অনিশ্চিত জ্ঞানকে সুনিশ্চিত হিসেবে গ্রহণ করার বৈধতা যোগায়। এ-বিষয়টি আদর্শবাদীদের বুঝতে হবে।

    আদর্শবাদীদের আরও বুঝতে হবে যে, মানুষের আদর্শ নির্ধারিত হয় তার উদ্দেশ্য দ্বারা, আর উদ্দেশ্য নির্ধারিত তার অস্তিত্ব, বোধ ও কতিপয় মৌলিক প্রেষণার দ্বারা (এগুলো এখানে আলোচ্য নয়)। যা’হোক, আলোচ্য সহ-সম্পর্ক আবার তিন প্রকারেরঃ (১) নিগেটিভ বা ঋণাত্মক সহ-সম্পর্ক, (২) পজেটিভ বা ধনাত্মক সহ-সম্পর্ক ও (৩) জিরো বা শূন্য সহ-সম্পর্ক।

    ঋণাত্মক সহ-সম্পর্ক

    দু’টি আন্দোলনের মধ্যে ধনাত্মক সহ-সম্পর্ক বলতে কিন্তু আন্দোলনকারীদের মধ্যে সুসম্পর্ক, আর ঋণাত্মক সম্পর্ক বলতে তাঁদের মধ্যে খারাপ সম্পর্ক বুঝায় না। এগুলো গাণিতিক ধারণা, যাকে কোফিশিয়েণ্ট অফ কোরিলেশন বা সহ-সম্পর্কের সহগ হিসেবে প্রকাশ করা হয় এবং যাকে ইংরেজি ‘আর’ অক্ষর (লৌয়ার কেইস) দিয়ে নির্দেশ করা হয়। অঙ্ক কষে দেখা যায় যে, আর-এর মূল্যমান মাইনাস ওয়ান (-১) থেকে প্লাস ওয়ান (+১) পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর মধ্য বিন্দু হচ্ছে জিরো বা শূন্য (০)।

    দু’টি আন্দোলন বা দু’টি ঘটনার মধ্যে যদি ঋণাত্মক সহ-সম্পর্ক থাকে - অর্থাৎ, আর-এর মান যদি মাইনাস হয় - তাহলে বুঝতে হবে যে, একটির বৃদ্ধির সাথে অন্যটির হ্রাস ঘটবে। বিপরীতক্রমে একটির হ্রাসের সাথে অন্যটিরও বৃদ্ধি ঘটবে।

    একটি উদাহরণ দিই। আমরা যদি ঊনিশ শতকের নবজাগরণ আন্দোলনের সেক্যলার ধারার সাথে পরবর্তী পর্যায়ে উত্থিত হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের সম্পর্ক বিবেচনা করি, তাহলে দেখবো এ-দু’টির মধ্যে রয়েছে ঋণাত্মক সহ-সম্পর্ক। কারণ, বিকেকানন্দের হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন যতোই শক্তিশালী হতে থাকে, নবজাগরণ আন্দোলন সেক্যুলার ধারা ততোই দূর্বল হতে থাকে। সুতরাং এখানে আর-এর মান ঋণাত্নক।

    ধনাত্মক সহ-সম্পর্ক

    অন্যদিকে, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যখন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আইন-বিরোধী বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়, তখন তা বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে আত্মপরিচয়গত ঝুঁকি তৈরি করে। লক্ষ্যণীয়ভাবে, পরবর্তী বছর - ১৯০৬ সালে - ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে এবং হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ আশ্রিত বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুসলিম ধর্মীয় জাতীয়তাদী আন্দোলন শুরু হয়।

    দৃশ্যতঃ আন্দোলন দু’টি পরস্পরের বিরোধী হলেও গাণিতিক বিচারে এদের মধ্যে সহ-সম্পর্ক বা সহ-সম্পর্কের সহগ আর-এর মান ধনাত্মক। অর্থাৎ, একটির বৃদ্ধির সাথে অন্যটির বৃদ্ধি এবং হ্রাসের সাথে হ্রাস ঘটে। প্রশ্ন হতে পারে, পরস্পর বিরোধী দু’টি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আন্দোলনের মধ্যে ইতিবাচক সহ-সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব? উত্তরে বলা যায়, বস্তুতঃ রাজনীতির রেটোরিকে বা কথামালায় এটি অসম্ভব মনে হলেও গণিতে এটি সত্য। এটি দার্শনিকভাবেও সত্য। কারণ, একটি ধর্মবাদের বিপরীত অন্য একটি ধর্মবাদ নয়, বরং সেক্যুলারিজমই তাকে নিরসিত করতে পারে।

    উপরের তত্ত্ব থেকে আমরা এ-শিক্ষা পাই যে, একটি আন্দোলনের বিরুদ্ধে অন্য একটি আন্দোলন প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে কি-না তা নির্ভর করে তার দার্শনিক ও আদর্শিক সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্যের ওপর। আর এ-বৈশাসৃশ্য আমরা গাণিতিক ভাবে বুঝতে পারি আন্দোলন দু’টির সহ-সম্পর্কের সহগ আর-এর মূল্যমান থেকে। কীভাবে সহ-সম্পর্ক নিরূপণ করা যায়, সেটি গবেষণা পদ্ধতির বিষয়, যা এখানে আলোচ্য নয়।

    শূন্য কার্য-কারণ ও সহ-সম্পর্ক

    শূন্য সম্পর্ক কথাটা আপাতঃ প্যারাডক্সিক্যাল বা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। শূন্য সম্পর্ক যেখানে সম্পর্কের শূন্যতা বুঝায়, সেখানে তাকে সম্পর্ক বলারই বা দরকার কী? সাধারণ যুক্তিতে কথাটি ঠিক। কিন্তু গাণিতিকভাবে ঠিক নয়। গণিতে শূন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। যদিও পৃথিবীতে শূন্য বলতে কিছু নেই, কিন্তু শূন্য ছাড়া আমাদের চলে না।

    গণিতের নাম্বার লাইনে আমরা দেখি, বাঁদিকে ঋণাত্মক মান থেকে (-১.০০) ডানদিকে ধনাত্মক মানে (+১.০০) যেতে শূন্য অতিক্রম করতে হয়। এর অর্থ হচ্ছে একটি দার্শনিক প্রকরণকে সম্পূর্ণ নিঃশেষিত করা ছাড়া অন্য একটি প্রকরণে যাওয়া অসম্ভব। আবার, অন্য দিকে, একটি দার্শনিক প্রকরণকে শূন্যে পাঠানো সম্ভব নয়, যদি না তার বিপরীত প্রকরণ যোগান দেওয়া যায়।

    শূন্য কার্য-কারণ সম্পর্ক ও শূন্য সহ-সম্পর্ক মোটামুটি একই সম্পর্ক নির্দেশ করে, যেখানে সম্পর্ক যা-ই হোক না কেনো, তার মান শূন্য বা নগণ্য। তবে, কার্য-কারণ সম্পর্কের শূন্য আর সহ-সম্পর্কের শূন্যের মধ্যে প্রকরণগত পার্থক্য হচ্ছে গতিমুখগত। একমুখী কার্য-কারণ সম্পর্কের শূন্য যেখানে একটি স্বাধীন চলের শূন্য মান বুঝায়, দ্বিমুখী বা বহুমুখী শূন্য সহ-সম্পর্কের শূন্য কিন্তু একাধিক চলকের মিথষ্ক্রিয়ায় পরস্পরকে বাতিল করার ফলে শূন্য মানকেও নির্দেশ করতে পারে।

    এ-পর্ব এখানেই শেষ হোক। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে আন্দোলনে-আন্দোলনে সম্পর্কের জ্যামিতিক তত্ত্ব।

    রোববার, ১৩ অক্টোবর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


    এ-লেখার অন্যান্য কিস্তি পড়ুনঃ

    (১) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ প্রেক্ষিত
    (২) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ গাণিতিক
    (৩) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ জ্যামিতিক


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অনেকদিন পর একটি চমৎকার লেখা পড়লাম। ভাল লেগেছে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন