• আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ জ্যামিতিক
    মাসুদ রানা

    একাধিক আন্দোলনের সম্পর্ক শুধু গাণিতিকভাবে নয়, জ্যামিতিকভাবেও প্রকাশ করা সম্ভব। গণিতে যেখানে আমরা বিষয়সমূহ প্রকাশ করি সংখ্যায় ও চিহ্নে, জ্যামিতিতে তা করি রেখায় ও কৌণিক পরিমাপে।

    জ্যামিতিতে দু’টি রেখা যখন পরস্পরের সাথে না মিলে সমান দূরত্ব রেখে চলতে থাকে, তখন রেখা দু’টিকে পরস্পরের সমান্তরাল বলা হয়। কিন্তু রেখা দু’টি যদি সমান দূরত্ব বজায় না রাখে, তাহলে দু’টি ঘটনা ঘটতে পারে। হয় রেখা দু’টি কনভার্জেন্স বা সন্নিবেশের মাধ্যমে পস্পরের সাথে দূরত্ব হ্রাস করে এক বিন্দুতে মিলিত হতে পারে, অথবা ডাইভার্জেন্স বা বিপ্রকর্ষের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে অসীম দূরত্ব তৈরী করতে পারে।
     
    আমি জ্যামিতির এ-ধারণা তিনটিকে আন্দোলনে-আন্দোলনে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখাবো যে, এ-সম্পর্ককে শুধু গাণিতিক সহগের দ্বারাই নয়, জ্যামিতিক রেখার দ্বারাও প্রকাশ করা যায়। নিচের আলোচনায় সেটি প্রদর্শিত হলো।

    সন্নিকর্ষিক সম্পর্ক

    ইতিহাস বলে, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিণতিতে প্রকৃত বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়ে যায় এবং এর মুসলিম সংখ্যাধিক্যের পূর্বাংশ পাকিস্তানে এবং হিন্দু সংখ্যাধিক্যের পশিমাংশ ভারতের অংশ হয়। পূর্ব-বাংলা প্রকৃত প্রস্তাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হয় এবং ১৯৪৮ সাল থেকে নতুন আন্দোলনের ধারা শুরু হয় পূর্ববাংলায় তথা পূর্ব-পাকিস্তানে তথা আজকের বাংলাদেশে।

    আমি পাকিস্তানী অভ্যন্তরীন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮০-র দশকে সামরিক স্বৈরশাসক হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে দেখাবো দু’টি আন্দোলনের মধ্যে কীভাবে কনভার্জেন্স হতে পারে।

    ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব-পাকিস্তানের ৬ দফা আন্দোলন শুরু করার তিন বছর পর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারী মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ ডাকসুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা আন্দোলন শুরু করে। ছাত্রদের এ-১১ দফার আন্দোলন পূর্ব থেকে চলন্ত ৬ দফা আন্দোলনের সাথে কী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো?

    স্পষ্টতঃ জ্যামিতিক বিচারে এ-দুই আন্দোলনের মধ্যে সন্নিকর্ষিক সম্পর্কের কারণে কনভার্জেন্স বা সম্মিলন ঘটেছিলো। তিন মাসের মধ্যে দু’টি আন্দোলন একত্রে সন্নিবেশিত হয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন একনায়ক প্রেসিডেণ্ট ফীল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যূত্থান সংঘটিত করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছিলো।

    একইভাবে, আশির দশকে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ ডাকসুর নেতৃত্বধীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১০ দফা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫-দলের আন্দোলন, বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ৭-দলের আন্দোলন, বাম নেতৃত্বাধীন ৫-দলের আন্দোলন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ বা স্কপের ৫-দফা আন্দোলন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আন্দোলন ইত্যাদি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মজীবী পেশাজীবী সংগঠনের আন্দোলন একত্রে কনভার্জেন্সের মাধ্যমে এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যূত্থান সংঘটিত করে।

    বিপ্রকর্ষিক সম্পর্ক

    আমরা যদি এ-বছরের ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদীদের শাহবাগ চত্বর আন্দোলন  এবং ধর্মবাদীদের শাপলা চত্বর আন্দোলনের কথা বিবেচনা করি, তাহলে আমরা কী সম্পর্ক পাই?

    আমরা একটি ডাইভার্জেন্স লক্ষ্য করি। এ-দুটি আন্দোলন ডাইভার্জেন্স বা বিপ্রকর্ষের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান নেয়। এ-দু’টি আন্দোলনের কোনোক্রমেই একবিন্দুতে মিলিত হওয়া সম্ভব ছিলো না। ফলে, একটি সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। এ-পরিস্থিতিতে একমাত্র একটি আন্দোলনের সম্পূর্ণ পরাজয় কিংবা সম্পূর্ণ বিজয়ের মধ্য দিয়ে সঙ্কট নিরসন করা সম্ভব ছিলো। বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র শাপলা চত্বরের ইসলাবাদীদের গভীর রাতে আলো নিভিয়ে ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পরাজিত করে সঙ্কট নিরসন করেছিলো।

    আমরা গত কয়েক বছরে মিসরের ধর্ম-নিরেপক্ষতাবাদী আন্দোলন ও মুসলিম ব্রাদারহূডের আন্দোলনের মধ্যে প্রথমে কনভার্জেন্স ও পরবর্তীতে ডাইভার্জেন্স লক্ষ্য করলাম। মিসরের সমাজে প্রধানতঃ তিনটি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের স্ব-স্ব আদর্শ, সংগঠন ও আন্দোলন আছে। একটি সামরিক শক্তি, দ্বিতীয়টি ইসলামবাদী শক্তি ও তৃতীয়টি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি।

    প্রথম শক্তিটি দীর্ঘকাল যাবৎ মিসরে ক্ষমতায় ছিলো। তিন বছর আগে 'আরব বসন্ত' আন্দোলন শুরু হলে আমরা লক্ষ্য করলাম, প্রথম শক্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শক্তি কনভার্জ করে। রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে আন্দোলন দু’টি কনভার্জ করে মুবারকের পতন ঘটালো।

    কিন্তু পরবর্তীতে মুসলিম  ব্রাদারহূডের মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর এ-দুই আন্দোলনের মধ্যে ডাইভারজেন্স দেখা দেয়। ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদীরা তখন সামরিক শক্তির সাথে কনভার্জ করে মোহাম্মদ মুর্সিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে। আর ইসলামবাদী শক্তি দু’টো থেকেই ডাইভার্জ করে একক অবস্থান গ্রহণ করে। বাংলাদেশের মতো দেখা গেলো, সামরিক শক্তির হাতে থাকা রাষ্ট্র ইসলাবাদীদেরকে ম্যাসাকারের মাধ্যমে সঙ্কটের আপাতঃ নিরসন করে।

    সমান্তরাল সম্পর্ক

    দুই বা ততোধিক আন্দোলন যখন সহ-সংঘটিত হয় কিন্তু একটি অন্যটির সাথে সম্পূর্ণ সন্নিবেশিত কিংবা সম্পূর্ণ বিপ্রকর্ষিত না হয়ে পাশাপাশি থাকে, তখন আন্দোলন দু’টিকে বলা হয় সমান্তরাল। সমান্তরাল দু’টি আন্দোলনের মধ্যে যে-কোনো প্রকারের গাণিতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। কার্য-কারণ সম্পর্কের, সহ-সম্পর্কের কিংবা শূন্য সম্পর্কের সমান্তরাল সম্পর্ক থাকতে পারে।

    শূন্য কার্য-কারণ সম্পর্ক বা শূন্য সহ-সম্পর্কের সমান্তরাল দু’টি আন্দোলন কখনও কনভার্জ করে না বা মিলিত হয় না, তবে ডাইভার্জ করতে পারে। কিন্তু যে-কোনো মাত্রার কার্য-কারণ কিংবা সহ-সম্পর্ক - তা ধনাত্মকই হোক কিংবা ঋণাত্মকই হোক -  এক সময়ের সমান্তরাল দু’টি আন্দোলনের মধ্য কনভার্জেন্স কিংবা ডাইভার্জেন্স ঘটাতে পারে। এ-কনভার্জেন্স বা ডাইভার্জেন্স সাময়িকও হতে পারে কিংবা স্থায়ীও হতে পারে।

    আন্দোলনের সমান্তরাল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি আর দূর-ইতিহাসে না গিয়ে প্রথম পর্বে উল্লেখিত আমার বেনামী প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের ওপর আলোকপাত করে ধারণাটি ব্যাখ্যা করবো। যে-লেখা নিয়ে প্রশ্নের সূত্রপাত, তাতে আমার বক্তব্য ছিলোঃ

    “দু’টি সমান্তরাল আন্দোলন সদ্য সংঘটিত হয়ে গেলো বাংলাদেশে। একটি দেশের কেন্দ্রস্থিত ঢাকার উপকণ্ঠে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ও মর্যাদার দাবিতে। অন্যটি দেশের প্রান্তস্থিত সুন্দরবন-সংলগ্ন রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে।”

    উপরের বক্তব্যের সত্য-সম্ভাবনার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে এবং হতেই পারেঃ

    “কিন্তু শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির এ আন্দোনের সাথে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে 'দুই সমান্তরাল সত্ত্বা' হিসেবে আখ্যায়িত করা কতটা যৌক্তিক?”

    ইতোমধ্যে ব্যাখ্যাত তত্ত্বের আলোকে, আন্দোলন দু’টিকে সমান্তরাল হিসেবে আখ্যায়িত করার যৌক্তিকতা বুঝার জন্য দু’টি বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হবে। দেখতে হবে এ-আন্দোলন দু’টি (১) সহ-সংঘটিত কি-না এবং (২) এদের মধ্যে কোনো কনভার্জেন্স বা ডাইভার্জেন্স আছে কি-না।

    প্রথমতঃ আমরা সংবাদ-মাধ্যম থেকে জানি, ঢাকার গাজীপুরে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি ও মর্যাদা বৃদ্ধির আন্দোলন শুরু হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর, যা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলে। আর, কয়লা-ভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করে সুন্দরবন রক্ষা সংকল্পে রামপাল অভিমুখে বামপালের লংমার্চ শুরু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর, যা আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। সুতরাং আন্দোলন দু’টি সহ-সংঘটিত।

    দ্বিতীয়তঃ বাম রাজনীতির দার্শনিক ঘোষণা অনুসারে, শ্রমিকদের আন্দোলনে বামেদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। কারণ, বামেরা নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর সচেতন অগ্রগামী বাহিনী বা ভ্যানগার্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। একই সাথে তাঁরা এটিও মনে করেন যে, তাঁদের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণীরই স্বার্থ সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতির স্বার্থ যথার্থে সংরক্ষিত হতে পারে।

    উপরের দার্শনিক বা তাত্ত্বিক উপলব্ধির ভিত্তিতে, বামেদের প্রধান দল বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি তার দশম কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক প্রস্তাব’-এর ‘রাজনৈতিক কর্তব্য’ অধ্যায়ের ৫.৫ অংশে “চারটি কাজকে গুরুত্বের সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে” বলে যে-ঘোষণা দিয়েছে, সে-ঘোষণার দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হচ্ছেঃ

    “(২) দেশবাসীর সামনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, গণমুখী প্রগতিশীল বিকল্প কর্মসূচি উত্থাপন ও তা জনপ্রিয় করা।

    (৩) শ্রমজীবী মানুষসহ ব্যাপক জনগণের শ্রেণীগত ও অন্যান্য নায্য দাবির ভিত্তিতে পরিচালিত গণসংগ্রামের ধারায় তাদেরকে সচেতন ও সংগঠিত করে রাজনীতি ও সমাজে বর্তমান শাসক-শোষক শ্রেণীর আধিপত্য খর্ব করে এই বিকল্প শ্রেণী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।”

    স্পষ্টতঃ জাতীয় স্বার্থে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প-বিরোধী আন্দোলনে এবং শ্রমিক শ্রেণীর মজুরি ও মর্যাদা বৃদ্ধির আন্দোলনে বামেদের নেতৃত্বের বিষয়টি শুধু তাত্ত্বিক যৌক্তিকতার ভিত্তিতেই নয়, সচেতন ঔচিত্য বোধের ভিত্তিতেও কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত ও ঘোষিত। সুতরাং, এ-দুটি আন্দোলনই বামেদের নেতৃত্বে পাশাপাশি বা সমান্তরাল হিসেবেই পরিচালিত হওয়ার কথা। আমার লেখায় আমি তাই লিখেছিলামঃ

    “ঘটনা দু’টি দৃশ্যতঃ সম্পর্কহীন পরস্পরের সাথে, এদের শ্রেণী-অবস্থান ও চেতনার কারণে। তবুও, একটি সম্পর্ক রয়েছে ঔচিত্যে স্থাপিত এদের কাঙ্খিত যৌক্তিক নেতৃত্বের অভিন্নতার দর্শনে। আর, সে-নেতৃত্বের সাধারণ নাম ‘বাম’।”

    সমান্তরাল এ-দু’টি আন্দোলনের উচিত-সম্ভাব্য নেতৃত্বের অভিন্নতার কারণে, এদের মধ্যে কনভার্জেন্স ঘটা উচিত। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, দু’টির মধ্য সহ-সম্পর্ক শূন্য হওয়ার কারণে কোনো কনভার্জেন্স ঘটেনি। কেনো কনভার্জেন্স ঘটেনি, তার উত্তর আমি আন্দোলন দু’টির মাঝে না খুঁজে, খুঁজেছি তাতে অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণী প্রকরণের মধ্যে। আর এখানেই আবির্ভুত হয় আন্দোলনে-আন্দোলনে সম্পর্কের শ্রেণী তত্ত্ব (এ-বিষয়ে আমার নতুন করে কিছু বলার নেই)।

    আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থনে পোশাক শিল্পের মালিকেরা শ্রমিকদেরকে অমানুষের মতো ব্যবহার করে শোষণ তাঁদের শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য চুরি করে সম্পদের পাহাড় তৈরি করছে, আর তার ফলেই যখন তখন কর্মস্থলে অকাতরে শ্রমিকেরা বেশুমার লাশ হচ্ছে।

    এ-প্রক্রিয়ায় ২০১২ সালের নভেম্বরে যখন তাজরীন ফ্যাশনের আগুন ১২১ শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো, তখন শ্রমিকদের ভ্যানগার্ড হয়ে বামপন্থীরা মালিক শ্রেণী ও মালিক শ্রেণীর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো আন্দোলন করেননি। শ্রমিকেরাই নিজেদের শক্তিতে পুঁজিপতি শ্রেণী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁদের ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে। স্বভাবতঃই বামেদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুপস্থিতিতে এ-ঘৃণা ও বিক্ষোভ বেশি দূর এগুতে পারেনি।

    আবার, চার মাস পর, এ-বছরের এপ্রিলে সাভারের কারখানা ভবন রানা প্লাজা ধ্বসে যখন ১১৩০ শ্রমিক প্রাণ হারালেন, তখনও এ-বামেরা কার্যকর শ্রমিক শ্রেণীর ভ্যানগার্ড হয়ে পুঁজিপতি শ্রেণী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াননি। তখনও হাজার-হাজার শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে মালিক শ্রেণী মালিক শ্রেণীর স্বার্থ-রক্ষাকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো

    সর্বশেষ, গত মাসে যখন লক্ষ-লক্ষ শ্রমিক তাঁদের নায্য মজুরি ও মর্যাদার দাবীতে দীর্ঘ এক সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে আন্দোলন করলো, প্রাণ দিলো ও পুলিসের অস্ত্র কেড়ে নিলো, তখনও এ-বামেরা তাঁদের শক্তি সমাবেশিত করে দাঁড়াননি শ্রমিকদের পাশে। কেনো? বামেদের শক্তি নেই বলে? হতে পারে।

    কিন্তু আমরা দেখি, তাজরীন ফ্যাশনের শ্রমিক-হত্যার কিছু দিনের মধ্যেই - গত বছরের ডিসেম্বরে বামেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ইসলামবাদীদের বিরুদ্ধে হরতাল করেছিলেন সারা দেশে। কারণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয়ভাবে বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে হরতাল ডাকার স্পর্ধা দেখিয়েছিলো এবং রাষ্ট্রে পুলিস ও সরকারের মন্ত্রীর গাড়ীতে আক্রমণ করেছিলো। বলাবাহুল্য, সে হরতাল সরকারও সমর্থন করেছিলো।

    এপ্রিলেও শ্রমিকের পক্ষে পুঁজিপতি শ্রেণী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারেননি বাম-বিপ্লবীরা, কারণ তখনও তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে উঠে ইসলাবাদীদের বিরুদ্ধে চলা শাহবাগ আন্দোলনে শক্তি যুগিয়েছিলেন। কারণ, তখন তাঁরা মনে করেছিলেন (পত্রিকাতে বামেদের এক শীর্ষ নেতার দেয়া সাক্ষাতকার অনুসারে) যে, শাহবাগ আন্দোলন ‘প্রগতির দিকে বাঁক নিয়েছে’।

    সেপ্টেম্বরেও শ্রমিকদের আন্দোলনে ভ্যানগার্ড হতে পারলেন না বামেরা, কারণ এবারও তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সুন্দবনের ‘মহাপ্রাণ মাতৃমূর্তি’ দর্শন করে, তা রক্ষার জন্য রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে রাজধানী ঢাকা থেকে রামপালের দিকে লংমার্চ করেছেন।

    এই যে বারবার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এসে বামদেরকে ব্যস্ত করে ফেলে এবং তাঁরা শ্রেণীসংগ্রাম করার ফুরসৎ পান না, কিংবা অন্ততঃ মুখ্য মনে করতে পারেন না, তার কারণ কী?

    তাঁরা নিশ্চয় তাঁদের মার্ক্সবাদী তত্ত্বে জানেন যে, পুঁজিবাদী সমাজের প্রিন্সিপাল কণ্ট্রাডিকশন বা প্রধান দ্বন্দ্ব হচ্ছে পুঁজির সাথে শ্রমের দ্বন্দ্ব, যা অমীমাংসেয়। তাই সমস্ত সংগ্রামকে প্রধান দ্বন্দ্বের সাথে এ্যালাইন বা মিলিয়ে মূলতঃ পুঁজিপতি শ্রেণী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে অন্যান্য সকল শোষিত শ্রেণীকে সাথে নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়। এটি কোনো গোপন তত্ত্ব নয়। মার্ক্সবাদের বারংবার উচ্চারিত তত্ত্ব।

    তাহলে আটাকাচ্ছে কোথায়? আটকাচ্ছে শ্রেণীতে। তাই আমি সদ্য সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলন ও সুন্দরবন আন্দোলনের মধ্যে অসন্নিবেশিত সমান্তরাল আন্দোলনের পেছেন সমান্তরাল শ্রেণী অবস্থানকে নির্দেশ করেছিঃ

    “শ্রমিক শ্রেণী যখন বার-বার  শ্রেণী-চেতনায় জ্বলে ওঠে, বার-বার রক্ত দিয়ে শ্রেণী সংগ্রাম করে, তখন বাম ভ্যানগার্ডেরা সামনে থেকে নেতৃত্ব তো দেয়ই না, তাদেরকে এমন কি কখনও কখনও পেছনেও দেখা যায় না। এবারের শ্রমিক আন্দোলনে ঠিক তাই হয়েছে। ... বামেদের কাছে হয়তো দেশপ্রেমিক হওয়া এবং শ্রমিক শ্রেণীর ভ্যানগার্ড হওয়া এক ও অভিন্ন। কিন্তু বাস্তবে  যা আমরা দেখছিঃ লড়াকু শ্রমিক ও বাম-দেশপ্রেমিক দুই সমান্তরাল সত্তা। কারণ, তার মূলে আছে দুই ভিন্ন শ্রেণী-অবস্থান ও তা থেকে উদ্ভূত দুই ভিন্ন চেতনা।”

    অর্থাৎ, যাঁরা নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল বলে দাবী করেন, তাঁরা তত্ত্বে হলেও বাস্তবে উপাদানে, গঠনে, কাঠামোতে, অবস্থানে, আন্তঃসম্পর্কে, বোধে, আবেগে, প্রেষণায়, কর্মসূচিতে, সংগ্রামে, রুচিতে, সংস্কৃতিতে, সর্বহারা বিপ্লবী নন। হয়তো তাঁদের বিপ্লবের আকাঙ্খা আছে, কিন্তু তা সংঘটিত করার সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান জানা নেই। যা আছে, তা পুরনো মৌলবাদী ডগমা এবং তার উদ্ধৃতি ও অকার্যকর অনুকরণ। সেখানে আদর্শ আছে, আত্মম্ভরিতা আছে, কূটতর্ক ও বাগাড়ম্বর আছে; কিন্তু নেই নিপীড়িত মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁদের কষ্ট-দৃষ্টে অনুভূত বেদনা।

    রোববার, ১৩ অক্টোবর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com



    এ-লেখার পূর্বের কিস্তিগুলো পড়ুনঃ

    (১) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ প্রেক্ষিত
    (২) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ গাণিতিক


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন