• আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ প্রেক্ষিত
    মাসুদ রানা

    লণ্ডনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ও ইউকেবেঙ্গলি.কমে প্রকাশিত আমার “সমান্তরালঃ লড়াকু শ্রমিক ও বাম দেশপ্রেমিক” শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনটির একাধিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। এদের মধ্যে কয়েকটি অসংলগ্ন পাল্টা-মত ও কয়েকটি প্রশ্ন।

    ফরহাদ মজহার নামে এক ব্যক্তি ইউকেবেঙ্গলির মন্তব্যের ঘরে মূল লেখাটি সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য না করে অন্যত্র প্রকাশিত তাঁর একটি রচনার পুরোটাই খালাস করে দিয়েছেন! তাঁর লেখার শুরুতে শ্রেণী তত্ত্বের উল্লেখ দেখে মনে হয়েছে, তিনি সেই ফরহাদ মহজার যিনি শ্রেণীসংগ্রাম ও জিহাদের অভিন্নতা দাবীর ভুল তত্ত্বের ভ্রান্ত চাষে মত্ত।

    তো, আমি ফরহাদ মজহারের ভ্রান্ত তত্ত্বের কুজ্ঝটিকা ছিন্ন করে ইতিপূর্বে মসি চালিয়েছি বলে এক্ষণে তাঁকে সম্পর্কহীন অহেতুক শব্দভাণ্ডার উজার করে ঢেলে দেওয়ার বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আমার বলার তেমন কিছু নেই।

    আর, প্রশ্ন-যেগুলো উত্থিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটি বিষয়গত এবং অন্যগুলো ব্যক্তিগত। এক ব্যক্তি নিজের নাম ও পরিচয় গোপন রেখে প্রশ্ন করেছেন, আমি কে ও আমার শ্রেণীগত অবস্থান কী এবং তা যাচাইয়ের উপায় কী; আমিও কেনো সুন্দরবন রক্ষা করতে চাই এবং সুন্দরবন রক্ষা করতে যাওয়া বামেদের সাথে আমার চাওয়ার পার্থক্য কী ইত্যাদি।

    লেখার বিষয়বস্তু ছেড়ে লেখককে নিয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্ন সভ্যজগতে আদরণীয় নয়। আমি কে এবং আমার শ্রেণী চরিত্র কী, এ-ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন আমি এর আগেও একাধিকবার হয়েছি। এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা করি না, কিন্তু আত্মগোপনকারীর কাছে আত্মপরিচয় দেওয়া নিশ্চয় অনৈতিক জ্ঞান করি। প্রশ্নকারীর ব্যক্তিগত পরিচয় আমি জানি না বটে, কিন্তু তাঁর প্রকরণ পরিচয় আমি বিলক্ষণ জানি।

    কল্পনার ওপর নির্ভর করে যাঁরা নিজেদেরকে ‘সর্বহারা শ্রেণীর একমাত্র সঠিক বিপ্লবী দল’ মনে করেন অথচ গঠনে ও অবস্থানে যাঁরা একান্ত পেটিবুর্জোয়া (মধ্যবিত্ত), কর্মসূচিতে লিবারেল বুর্জোয়া (পুঁজিবাদী) ও আচারে-আচরণে ফিউডাল (সামন্তবাদী), তাঁরা নিজেদেরকে আশ্চর্য এক অজ্ঞাত কারণে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে নির্ভুল মনে করেন! তাঁদের অসঙ্গতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা মাত্রই, তার উত্তর না দিয়ে অনেকটা মোল্লাদের মতো “নামাজ পড়িস ব্যাটা?’ জাতীয় প্লাটা প্রশ্ন করে প্রশ্নকারীকে “কাফের” জাতীয় কিছু একটা প্রতিপন্ন করতে চান।

    এটি অতি প্রাচীন মহাভারতীয় পদ্ধতি, যেখানে চতুর পাণ্ডবেরা পরাজয় এড়াবার জন্য মহাবীর কর্ণের জন্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করে তাঁকে নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অজ্ঞ পাণ্ডবেরা জানতেন না যে কর্ণ হচ্ছেন প্রথম কৌন্তেয় - ওঁদের অগ্রজ। তাঁদের মাতা কুন্তি জন্ম দেওয়ার পরও লালন করার সাহস না থাকায় ত্যাগ করেছিলনে বলে তিনি সূর্যপুত্র হয়েও সুতপুত্র হিসেবে বেড়ে উঠেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ও দাতাশ্রেষ্ঠ অস্তিত্ব নিয়ে।

    নব্য পাণ্ডবগণ কূপমণ্ডুক। কূপমণ্ডুক শব্দটির অর্থ হচ্ছে কূয়োর ব্যাঙ। তাঁরা রূপতঃ কূয়োয় বাস করেন বলে বাইরের পৃথিবী দেখতে পান না। বিপ্লব বলতে কী বুঝায়, সম্ভবতঃ সেটিও তাঁরা জানেন না। তাই, যুগের পর যুগ অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সাথে তাঁদের কোনো সংঘর্ষই বাঁধছে না। তাঁরা নিশ্চিন্তে আরামে গাড়ী-বাড়ী ব্যবসা-বাণিজ্য করে বহাল তবিয়তে বাস করছেন আর থেকে-থেকে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” হেঁকে নিজেদেরকে একমাত্র সঠিক সর্বহারা বিপ্লবী দাবী করছেন।

    এহেন প্রকরণের কোনো সভ্য যখন অভব্যভাবে নিজের নাম গোপন করে আমাকে প্রশ্ন করেন “আপনি কে? শ্রেণী সমীকরণে আপনার অবস্থান কোথায়?”, তখন তাঁকে দয়া পরবশে অর্বাচীন অনুজ ভেবে অনুকম্পা ও করুণা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না আমার। কারণ, সৎ চিন্তা করার মতো সাহসও এঁরা হারিয়েছেন, অথচ এটি হওয়া উচিত ছিলো না।

    আমি বরং “শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির এ আন্দোনের সাথে রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে 'দুই সমান্তরাল সত্ত্বা' হিসেবে আখ্যায়িত করা কতটা যৌক্তিক” প্রশ্নটির উত্তর দিই। প্রশ্নকারী যদি সত্যিই ক্ষত্রিয় হোন এবং শিক্ষণে উন্মুক্ত থাকেন, আমার ধারণা যে, আমার মসি-চালনা থেকে তিনি শিক্ষালাভ করতে পারবেন। 

    তবে, শিক্ষণ-তত্ত্ব বলে, শেখার জন্য প্রয়োজন মৌটিভেশন বা প্রেষণা। আদি ধর্মে ক্ষত্রিয় হলেও, কর্মে আচার্য্য আমি পরবাসে এক্ষণে। প্রশ্ন উপেক্ষা করা আচার্য্যের ধর্ম বহির্ভূত বিধায়, অধ্যবসায়ের সাথে এর উত্তর শিক্ষার্থীর হৃদয়ঙ্গম করানোই আমি ব্রত মানি।

    তাই, একটি আন্দোলনের সাথে অন্য একটি আন্দোলনের সম্পর্ক বুঝার ক্ষেত্রে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে উপস্থাপন করবো অর্বাচীন ও জ্ঞানী সকলের জন্য। পরবর্তী পর্বে সমাপ্য সেই তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রস্তুতিতে আপাতঃ এখানেই ইতি।

    শনিববার, ১২ অক্টোবর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


    এ-লেখার পরবর্তী কিস্তিগুলো পড়ুনঃ

    (১) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ প্রেক্ষিত
    (২) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ গাণিতিক
    (৩) আন্দোলন সম্পর্ক তত্ত্বঃ জ্যামিতিক

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন