• ইংলিশ রায়টঃ আফটারম্যাথ
    মাসুদ রানা

    এক.
    জার্মান-উদ্ভূত ‘আফটারম্যাথ’-এর যথপোযুক্ত বাংলা শব্দ আমার জানা নেই। এটি ‘পরিণতি’র মতো স্থায়ীত্ব-নির্দেশক নয় আবার ‘প্রভাব’-এর মতো ভাব-নিরপেক্ষ নয়।

    সুঘটনার ‘আফটারম্যাথ’ হয় না। শব্দটির অর্থ-নিরূপণে অক্সফৌর্ড ডিকশনারীতে বলা হচ্ছেঃ দ্য কনসেক্যুয়েন্স অর আফটার-ইফেক্টস অফ এ্যান সিগ্নিফিক্যান্ট আনপ্লীসেন্ট ঈভেন্ট। অর্থাৎ, একটি তাৎপর্য্যপূর্ণ অপ্রীতিকর ঘটনার অব্যবহিত প্রভাব বা পরিণতি।

    ইংল্যান্ডে দু-সপ্তাহ আগে রায়ট সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্র কর্তৃক এক নাগরিকের বে-আইনী হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে। জিজ্ঞাসা পরিণত হয় জিঘাংসায়। ডুগ্যান-হত্যার উত্তর না পেয়ে টোটেনহ্যামে যে-প্রতিবাদ শুরু হয়, তা প্রতিকার না পেয়ে, প্রতিশোধের আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের দাহ্য অঞ্চলে।

    এখন চলছে ‘আফারম্যাথ’, যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাষ্ট্রের ‘রিট্রিবিউশন’। অর্থাৎ, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিশোধাত্মক শাস্তি। ‘রিট্রিবিউশন’-এ নৈতিকতার একটি সঙ্কট আছে। কারণ, শাস্তি ও প্রতিশোধ ধারণা দুটো দার্শনিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যমুখীনতার বিবেচনায় পরস্পরের সাথে বিরোধাত্মক।

    শাস্তির মধ্যে কর্তৃত্ব আছে, দায়িত্ব আছে, সংশোধনের লক্ষ্য আছে এবং সমগ্র প্রক্রিয়াটির মধ্যে একটি নৈর্ব্যক্তিক বিচার প্রক্রিয়া ও বিধি-বিধানের অনুসরণ আছে। শাস্তির লক্ষ্য হচ্ছে শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে আত্মীকরণ। অর্থাৎ, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন।

    কিন্তু প্রতিশোধ? প্রতিশোধে কী আছে? প্রতিশোধে আছে তীব্র আবেগ এবং বুদ্ধি-বিবেচনা-রহিতাবস্থা। প্রতিশোধের কোনো বিধি-বিধান নেই, কারণ মানব জাতি তার জ্ঞান ও নৈতিকতার বিকাশে ‘প্রতিশোধ’কে আরাধ্য বিষয় হিসেবে কখনও বিবেচনা করেনি। প্রতিশোধ তাই কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু ধ্বংস করতে পারে, বিলক্ষণ!

    প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং রিট্রিবিউশনের কথা বলেছেন। তিনি অপরাধের বিচারের চেয়েও শাস্তির প্রতিই বেশি আকর্ষিত। এমনকি তিনি বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনারা বিচার করুন, কিন্তু আমি শাস্তি দেখতে চাই।

    ‘হিউম্যান রাইটস ইন মাই সাইটস’ শিরোনামে আজ 'সানডে এক্সপ্রেস' পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোন। তিনি ব্রিটেইনের ওয়েলফেয়ার সিস্টেমে বা কল্যাণ-ব্যবস্থায় মানবাধিকারের অপ-প্রতিনিতিধিত্ব ও বঙ্কিম প্রয়োগ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। মানবাধিকার বিষয়ে ইউরোপীয়ান কৌর্ট যেভাবে কাজ করে, তারও সমালোচনা করেছেন ব্রিটেইনের প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, সেখানে তিনি মানবাধিকারের বর্তমান প্রয়োগের পরিবর্বতনের জন্য লড়বেন। অর্থাৎ, তিনি মানবাধিকারের নামে সহনশীলতার সমাপ্তি চান।

    প্রধামনন্ত্রী ক্যামেরোন রায়টের জন্য তাঁর লেখায় দোষারোপ করছেন ‘ডেস্ট্রাক্টিভ কালচার’কে অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতিকে। আর এর বিরুদ্ধে তিনি ‘ফূল ফৌর্স অফ ল’ প্রয়োগের কথা বলেছেন। ডেইভিড ক্যামেরোনের জন্য ‘কালচার’ হচ্ছে একই সাথে একটা পার্সপেক্টিভ ও টুল। দেশের সমস্যাকে তিনি ‘কালচার’-এর আলোকে দেখেন ও দেখাতে চান।

    রায়ট হবার কারণেই যে তিনি ‘কালচার’কে দোষারোপ করছেন, তা নয়। গত ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে জার্মানীর মিউনিখে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয়ান সিকিউরিটী কনফারেন্সে তিনি ‘মাল্টিকালচার’কে দোষারোপ করে বক্তৃতা করেছেন। অর্থাৎ, সেখানেও তিনি ‘কালচারাল’ পার্সপেক্টিভেই সমস্যা দেখার ও দেখাবার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, মাল্টিকালচারলিজম ব্যর্থ হয়েছে - ব্রিটেইনের সমাজকে নষ্ট করেছে। তাই একে রুখতে হবে। রুখতে হলে মাল্টিকালচারের চর্চার জন্য অর্থবরাদ্দ নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। বলাবাহুল্য, সে-দিনের আক্রমণে তার লক্ষ্য ছিলো মূলতঃ ‘মুসলিম কালচার’।

    আজ যখন তিনি ‘ডেস্ট্রাক্টিভ কালচার’-এর কথা বলছেন, তখন যে তিনি বস্তুতঃ ব্ল্যাক কালচারের বা কালো-সংস্কৃতির কথা বলছেন, তা কেউ না বললেও সবাই জানেন। ক্যামেরোনের ডেস্ট্রাক্টিভ কালচারের বিরোধিতা বস্তুতঃ  তাঁর সেই মাল্টিকালচারালিজমের বিরোধিতার সুনির্দিষ্ট প্রকাশ, যা এখন রায়টের সুবিধা নিয়ে পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রাকাশিত হচ্ছে।

    লক্ষ্যণীয়, ফেব্রুয়ারীতে তিনি ‘মাসকিউলার লিবারালিজম’ বা 'পেশল উদারনীতি' এর প্রয়োগের কথা বলেছেন। আর আজ তিনি ‘ফুল ফৌর্স অফ ল’র কথা বলছেন। উভয় ধারণাতেই রয়েছে শক্তি-প্রয়োগের হুমকী। দেখা যাচ্ছে, অনাকাঙ্খিত কালচারকে দোষারোপ করা, প্রচলিত ব্যবস্থায় অনাকাঙ্খিত কালচারগুলোর অবস্থান অস্বীকার করা, তাদের উপর থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থানুকল্য প্রত্যাহার করা এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এদের শাসনে আনা, এ-চার মূলনীতিই হচ্ছে ডেইভিড ক্যামেরোনের সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির নির্ধারক।

    প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশানুসারে গত দু-সপ্তাহ ধরে শাস্তি দেয়া হচ্ছে উপসাংস্কৃতিক ‘অপরাধী’দের। সাড়ে তিন পাউন্ডের পানীয় জল চুরির জন্য ছ’মাসের আর দাঙ্গা না করেও শুধুমাত্র ফেইসবুকের মাধ্যমে উস্কানি দেবার জন্য চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দিন-রাত আদালত খোলা রেখে 'অপরাধী'দের শাস্তি দেয়া হয়েছে।

    এ-পরিস্থিতি অবলোকনে পাবলিক প্রসিকিউশনের প্রাক্তন পরিচালক লর্ড ম্যাকডৌনাল্ড বিষয়টিকে ‘সম্মিলিত মাত্রাজ্ঞানহীনতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, 'এ-বিচারে জাস্টিস ও হিউম্যনিটি অনুপস্থিত'। অর্থাৎ, ‘ন্যায় ও মানবিকতা’ রহিত এ-বিচার।

    গতকাল কলম ধরেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টৌনী ব্লেয়ারও। তিনি বলেছেন, যেভাবে নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করা হচ্ছে, এটি ঠিক নয়। তাঁর মতে, রায়টটি একটি নির্দিষ্ট কারণ-উদ্ভূত একটি নির্দিষ্ট সমস্যা, যার সমাধান হতে হবে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। তিনি অতীতে তাঁরও একই রকমের ভুল হয়েছিলো বলে উল্লেখ করেছেন।

    দুই.
    সাধারণ ও বিদগ্ধজনেরা স্বভাবতঃই প্রশ্ন করছেনঃ রায়টের কারণ কী এবং তার প্রতিকারের পন্থা কী? আমরা জানি, মানুষ মাত্রই তার সম্মুখস্থ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা চাইতে ও করতে বাধ্য। এটি একটি ‘কগনিটিভ ডিমান্ড’ যা পূরণ করা ছাড়া সে তার চারপাশের ‘সেন্স মেইক’ করতে পারে না। আর, তা না পারলে, তার পক্ষে টিকে থাকাই সম্ভব নয়। তাই, ব্যাখ্যা সে করবেই।

    মানুষের প্রদত্ত ব্যাখ্যা প্রকৃত ঘটনার অন্তর্নিহিত রূপ ও কার্য-কারণ প্রতিফলিত করবে কি-না, তা নির্ভর করে প্রথমতঃ ব্যাখার বৈজ্ঞানিকতার উপর। আর সে-ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিক হতে পারবে কি-না, তা নির্ভর করে তার সামাজিক অবস্থান, মূল্যবোধ, স্বার্থবোধ, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার উপর। অর্থাৎ, সঠিকতা শুধু বুদ্ধির উপর নির্ভর করে না। বিভক্ত সমাজে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে সত্যের উপলব্ধি এক নয়। সমাজের কোনো-কোনো অবস্থান আছে যা সত্যের পক্ষে, আর কোনো-কোনো অবস্থান আছে সত্যের বিপক্ষে।

    রায়টের ব্যাখ্যায় আমারা মোটা-দাগে দু-ধরণের তত্ত্ব লক্ষ্য লক্ষ্য করছি। একটি হচ্ছে ইকোনোমিক থিওরী এবং অন্যটি সাব-কালচারাল থিওরী। বাংলায় বলা যায়, রায়টের অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও উপসাংস্কৃতিক তত্ত্ব। উপযুক্ত স্থানে আমি দেখাবো যে, প্রথমটির এ্যাপ্রৌচটি রিডাকশনিস্ট এবং দ্বিতীয়টির হচ্ছে ডিটারমিনিস্ট। কিন্তু তার আগে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা যাক ত্বত্ত্ব দুটোর স্বরূপ কী।

    রায়টের ইকোনোমিক থিওরী বা অর্থনৈতিক তত্ত্বঃ এ-তত্ত্ব মতে রায়টে অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছে অর্থনৈতিক ভাবে বঞ্চিত প্রকরণের মানুষ। কোনো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রকরণ ভুক্ত হবার কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক বঞ্চনায় পড়ে ও  জীবন-সমুখে কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেরে এক ধরণের হতাশা থেকে জন্মানো বিক্ষোভের কারণে এরা ঘটনার সুযোগে লুটপাট, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছেন।

    এ-তত্ত্বের ধারকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক কালের সরকারের আর্থিক বরাদ্দ-কর্ত্তন বঞ্চিত প্রকরণের মানুষদের বঞ্চনাকে তীব্রতর করে তুলেছে। বলা হচ্ছে, সরকারের বরাদ্দ কর্ত্তনের হার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বারাগুলোতে ব্যাপক, অথচ সেখানেই প্রয়োজন ছিলো বেশি। সরকারী কর্ত্তন-নীতির ফলে নেইবারহুডে-নেইবারহুডে ইয়ুথক্লাব-সহ বিভিন্ন যুব প্রকল্পের বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। তরুণ-তরুণীরা যে ইএমএ (এডুকেশন ও মেইন্টেন্যান্স এ্যালাউন্স) অর্থ পেতেন, তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

    উচ্চ-শিক্ষা উচ্চ অর্থমূল্যে ক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করার কারণে তাঁরা উচ্চ-শিক্ষার কথা ভাবছেনও না। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তাঁদের সামনে চাকুরী সম্ভাবানাও নেই। আছে সীমাহীন অনিশ্চিয়তা ও নৈরাশ্য। সুতরাং ওঁরাতো এ-সমাজ, রাষ্ট্র, পুলিসের প্রতি বিরূপ হবেনই এবং সুযোগ পেলে তার রাগ প্রকাশ করবেনই। অর্থনৈতিক তত্ত্ব-মতে, এবারের রায়টে তাই হয়েছে।

    রায়টের সাবকালচারাল থিওরী বা উপসাংস্কৃতিক তত্ত্বঃ এ-তত্ত্ব মতে রায়টের মূল কারণ হচ্ছে সমাজের মূল সাংস্কৃতিক স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং প্রায়শঃ বিরোধাত্মক উপসাংস্কৃতিক অবস্থান। এটি সুনির্দিষ্ট কোনো সম্প্রাদায়কে নয় বরং অনির্দিষ্ট উপসংস্কৃতিকে দায়ী করে এবং বলে যে, এ-উপসংস্কৃতি গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত পছন্দের মাধ্যমে। অর্থাৎ, রায়টকারীরা এমন একটি উপসংস্কৃতির ধারক, যা তাঁরা ব্যক্তি পছন্দের ভিত্তিতে ধারণ করে। ফলে, তাঁরা একটি দাঙ্গাবাজ ও অপরাধপ্রবণ সামাজিক প্রকরণ হিসেবেই গড়ে ওঠে।

    এ-তত্ত্ব মতে, এদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার অভাব আছে। কারণ, তাঁদের পরিবারগুলোতে শিশুদেরকে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য শেখানো হয় না। নৈতিকতার প্রতি তাঁদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তাঁরা সামাজিক দায়-দায়িত্বহীন একেকটা স্বার্থপর ব্যক্তি-একক। ওঁরা নিজের অধিকারটুকু ষোলা-আনা বুঝেন, কিন্তু দায়িত্বের বিষয়টি এক আনাও বুঝেন না। সমাজ ও অন্য মানুষের প্রতি এঁদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মমতা নেই। ওঁদের মধ্যে মান্যতা নেই, শৃঙ্খলা নেই এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নেই। সুতরাং, অর্থনৈতিক দারিদ্র বা বঞ্চনা না থাকলেও এঁরা তাই করতো। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানের সাথে এঁদের এসমস্ত প্রবণতার কোনো সম্পর্ক নেই।

    ব্রিটেইনের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষেরা এখন উপরোক্ত দুটো গড় তত্ত্বে বিভিক্ত হয়ে রায়টকে ব্যাখ্যা করছেন। এবং এ-ব্যাখ্যা তাঁদের পূর্বস্থিত রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত। উভয় ব্যাখ্যাতেই কিছু আপাত যুক্তি আছে। তাই যাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট ক্যাম্পের নন, তাঁরা উভয় তত্ত্ব থেকেই উপাদান সংগ্রহ করে একটা ব্যঞ্জন তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে নিজেদের কাজ সারছেন।

    উপসাংস্কৃতিক তত্ত্বের সমস্যা হচ্ছে যে, সাংস্কৃতিক শিক্ষণের অনুপস্থিতির কথা বললেও রায়টের মতো একটি সামাজিক প্রপঞ্চকে এরা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ‘রিডিউস’ করে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পান। তাই এই তত্ত্ব ‘রিডাকশনিস্ট’। কারণ, এটি সামাজিক ভ্যারিএবল বা চল্‌গুলোকে তার ব্যাখ্যার মধ্যে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। রায়টের মতো একটি কালেক্টিভ বিহেভিয়ার বা যৌথ আচরণকে এ-তত্ত্ব ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে বুঝার ব্যর্থ চেষ্টা করে। ফলে যথার্থ উত্তর পায় না।

    ‘সাংস্কৃতিক’ উপাদান থাকলেও এটি মূলতঃ সাংস্কৃতিক তত্ত্ব নয়। এটি হচ্ছে সমস্যার সামাজিক রূপকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিত্ব তত্ত্ব। এ-তত্ত্ব দু-দিকে কাটে। প্রথমতঃ সে ব্যক্তির দোষ দিয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়ায়। একক ব্যক্তিগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে একই ধরণের ব্যক্তিগত দোষ নির্দেশ করে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রকরণকে চিহ্নিত করতে চায়। সুতরাং এ-তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব ।

    অর্থনৈতিক তত্ত্বের সমস্যা হচ্ছে, এটি মানুষের আচরণকে অর্থনীতির ‘ডিমান্ড এ্যান্ড সাপ্লাই’র মতো কিছু অসচেতন ও অমননশীল নির্ধারণবাদী মেকানিজম হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। অর্থনৈতিক বঞ্চনা থাকলে বিদ্রোহ দেখা দেবেই, যা অনেকটা পূর্ব-নির্ধারিত। সেজন্য এটি ডিটারমিনিস্ট বা নির্ধারণবাদী।

    অর্থনৈতিক বঞ্চনা যদি রাষ্ট্র বিরুদ্ধে দ্রোহের কারণ হবে, তাহলে লিবিয়াতে - যেখান আজকের পৃথিবীতে দুষ্প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় অর্থানুকূল্য রয়েছে, খাদ্য ভর্তুকী রয়েছে, এমন কি বিয়ে করলেও অনুদান পাওয়া যায় - মানুষ রাস্তায় নেমে লুটপাট করলো কেনো?

    আবার, পূর্ব-লন্ডনে অর্থনৈতিক ভাবে বঞ্চিত হ্যাকনীতে রায়ট হলেও, একই ধরণের বঞ্চনা নিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে রায়ট হলো না কেনো? টাওয়ার হ্যামলেটসদের তরুণদের মধ্যে বঞ্চনা ও পুলিসের হয়রানী কিছুই কম নয়। তবে কেনো হলো না রায়ট?

    বাঙালী অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস রায়টের অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও উপসাংস্কৃতিক তত্ত্ব উভয়কেই চ্যালেইঞ্জ করে অকার্যকর প্রমাণিত করছে। কারণ, অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি টাওয়ার হ্যামলেটসে অপরাধ-প্রবণতা, ড্রাগসের ব্যবহার, পতিতাবৃত্তি, গ্যাংবাজী-সহ প্রায় সব ধরণের উপসাংস্কৃতিক উপাদান রয়েছে। তাতেও সেখানে রায়ট হলো না।

    টাওয়ার হ্যামলেটসে এসে অর্থনৈতিক ও উপসাংস্কৃতিক উভয় তত্ত্বই থমকে যায়, কারণ এখানে অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও উপসাংস্কৃতিক চর্চা তীব্র আকারে থাকার পরও রায়ট হয়নি। এখানে কোনো নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নেবার চেষ্টা করে লাভ নেই। কোনো না কোনো সামাজিক কারণের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি ছাড়া এ-পরিস্থিতি হবার সম্ভাবণ ক্ষীণ।

    এখানে একটি শক্তিশালী মাল্টি-ডিসিপ্লিনারী গবেষণা হওয়া দরকার। রায়ট সম্পর্কে পৃথিবীতে আমাদের যে-প্রচলিত জ্ঞান আছে, টাওয়ার হ্যামলেটসের গবেষণার ফল তাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

    এখানে শুরু করতে হবে একটির তত্ত্বের সন্ধানে গবেষণা। অর্থাৎ, তত্ত্বের পক্ষে উপাত্ত সংগ্রহ করে নাল-হাইপোথেসিস বা নেতি-প্রকল্পকে ফলসিফাই বা ভ্রান্ত প্রমাণিত করে প্রস্তাবিত প্রকল্প গ্রহণ করার যে-সাধারণ রীতি, তা চলবে না। এ-পদ্ধতিকে আসতে হবে পরে। প্রথমে তত্ত্বের সন্ধানে পরিচালিত করতে হবে একটি কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ বা গুণবাচক গবেষণা।

    গবেষণার জন্য প্রয়োজন রিসৌর্সের - অর্থের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালী সম্প্রদায় সংখ্যায় যতো বড়োই হোক না কেনো, রাজনৈতিক ক্ষমতায় যতোই শক্তিশালী হোক না কেনো, কিংবা এখানে ব্যক্তি-বিশেষ যতোই সম্পদশালী হোন না কেনো, ব্যক্তিগত লাভ বা নাম ছাড়া কেবলই সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে অর্থব্যয় করা বাঙালীদের মধ্যে প্রায় অসম্ভব।

    এখন-যে বাঙালীদের মধ্যে টেলিভিশন-ভিত্তিক দান-খয়রাত দেখা যাচ্ছে, সেখানেও আছে কারও জন্য ইহকালের নগদ-লাভ এবং কারও জন্য পরকালের স্বর্গ-লাভ।

    অর্থ-সুনাম-স্বর্গ প্রাপ্তির লোভের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মতো ‘বড়ো মানুষ’ যতো দিন না জন্ম দিতে পারে যে-জাতি, বিশ্ব মানবতার পরিধিতে সে-জাতির পক্ষে উঠে আসা ততোই সুদূর পরাহত।

    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স
    রোববার, ২১ অগাস্ট ২০১১

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন