• ইমরান খান নিয়ে একটি লেখা প্রসঙ্গে
    মাসুদ রানা

    কাদের মোল্লার ফাঁসির ঘটনায় পাকিস্তানের রাজনীতিক ইমরান খানের বিরুদ্ধ-অবস্থান প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও দৈনিক প্রথম আলোর জনপ্রিয় লেখক শান্তনু মজুমদারের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখার শিরোনাম “কে এই ইমরান খান?”

    ফেইসবুকে এক বন্ধুর মাধ্যমে শান্তনু মজুমদারের ঐ লেখাটার একটি লিংক পেলাম। সেখানে তিনি একটি মন্তব্যে লিখেছেন, লেখাটি ‘সময়োপযোগী’ ও ‘তথ্য সমৃদ্ধ’ কিন্তু ‘উপসংহারের’ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

    কাদের মোল্লার ফাঁসি সম্পর্কিত ইমরান খানের অবস্থান নিয়ে শান্তনু মজুমদারের লেখাটা পড়লাম। শান্তনু মজুমদারের মতো বুদ্ধিজীবীদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক, তাই বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে ক্রিটিক্যাল থিংকিং প্রৌমোট করার স্বার্থে নীচে আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।

    প্রথমতঃ লেখাটা আমার কাছে ‘তথ্য সমৃদ্ধ’ বলে মনে হয়নি। কারণ, ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতির ওপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা সম্পর্কে ইমরান খানের অবস্থান এখানে আলোচিত না হয়ে, আলোচিত হয়েছে পাকিস্তানী জামায়তে ইসলামের সাথে তাঁর সম্পর্ক, তালিবানের প্রতি তাঁর উদারতা, “এস্টাব্লিশমেণ্টের পেয়ারের মানুষ” হিসেবে তাঁকে মনে করা, ইত্যাদি। শান্তনু মজুমদার লিখেছেনঃ

    “যুদ্ধাপরাধীর শাস্তির বিরুদ্ধে তাঁর আস্পর্ধার আলোচনায় জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে এই ব্যক্তির রাজনীতির ধরনটা বোঝা।”

    ‘শাস্তির বিরুদ্ধে আস্পর্ধা’ কথাটার মানে কী তা বুঝার উপায় নেই। কিন্তু উপরের উদ্ধৃতিতে ‘রাজনীতির ধরন’ বুঝানোর একটি প্রতিশ্রুতি দৃষ্ট হলেও, তা রক্ষিত হয়নি। অর্থাৎ, লেখার কোথাও ইমরান খানের ‘রাজনীতির ধরন’ নিয়ে আলোচনা হয়নি।

    বস্তুতঃ জীববিজ্ঞানের যেমন জীবের প্রজাতি প্রকরণ, জড়বিজ্ঞানে পদার্থের আণবিক প্রকরণ আছে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও রাজনীতির চরিত্র বা প্রকার নির্ণয়ের স্বীকৃত ফ্রেইমওয়ার্ক আছে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে শান্তনু মজুমদারের জানার কথা। একটি রাজনীতির ধরন বুঝতে বা বুঝাতে সে-রাজনীতির ঘোষিত পলিসি ও প্রৌগ্র্যাম রেফার করে পলিটিক্যাল স্পেট্রামে বা স্কেইলে বুঝতে বা বুঝাতে হয়। কিন্তু শান্তনু মজুমদার লিখেছেনঃ

    “জামায়াতের সঙ্গে প্রদেশে সরকার গঠন, তালেবানদের ব্যাপারে উদারতা, সেনা-ঘনিষ্ঠতা - এত সব ‘বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত’ ব্যাপক ডানপন্থী ইমরান”

    শান্তনু মজুমদারের উপরের দাবীটি স্বব্যাখ্যাত নয়। হয়তো ইমরান খান ডানপন্থী। কিন্তু ‘যার বন্ধু ডানপন্থী, সে নিজেও ডানপন্থী’ এ-রকম একটা অতি সরলীকৃত ‘যুক্তি’ আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে না। ডানপন্থা কাকে বলে তাও শেখায় না। কিন্তু একজন এ্যাকাডেমিক স্কলারের কাছ থেকে ভাসা-ভাসা নয়, অল্প হলেও ক্রিটিক্যাল দৃষ্টি চাই।

    পলিটিক্যাল স্পেক্ট্রামে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করাকে কিন্তু ডানপন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করাকেই ডানপন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য, এর মানে এ-নয় যে, ইমরান খান বামপন্থী। বস্তুতঃ হ্যান্স আইসেঙ্কের পলিটিক্যাল স্পেক্ট্রামে বা স্কেইলে কড়া-বাম ও কড়া-ডানের মধ্যে অনেক মিলও নির্দেশ করে। মোটকথা, বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবী রাখে।

    ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর চালানো গণহত্যা সম্পর্কে কিন্তু ইমরানের খানের অবস্থান বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। ২০১১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান-প্রস্তাব দিবসে ইমরান খান প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীরের সাথে জিও টিভি’র একটি টকশোতে বলেছেন যে, পাকিস্তানে থাকতে তিনি জানতেন না বলে পাক-বাহিনীর কাজে কোনো অন্যায় দেখেননি।  কিন্তু ইংল্যাণ্ডে পড়তে এসে তাঁর এক বাঙালী বন্ধুর কাছে প্রকৃত বিষয় জেনে তিনি পাক-বাহিনীর কৃতকর্মকে অন্যায় মনে করেন। ইমরান খান মনে করেন, বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত।

    বিষয়টি আমি সন-তারিখ-সহ জানি এই জন্য যে, ইমরান খানের এ-কথাকে অপর্যাপ্ত মনে করে আমি ২৪শে এপ্রিল “শুধু ক্ষমাপ্রার্থনা নয়, পাঠ্যপুস্তকেও উল্লেখ চাই” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম।

    আমি মনে করি, শান্তনু মজুমদারের লেখাটা ‘সমৃদ্ধ’ হতো, যদি ইমরান খানের ঐ অবস্থানকেও অন্তর্ভূক্ত করে তাঁর পূর্বের অবস্থানের সাথে বর্তমান অবস্থানের দৃশ্যমান স্ববিরোধিতা আলোচিত হতো এবং তার রাজনীতি তাঁর দলের নীতি ও কর্মসূচির আলোকে ব্যাখ্যা করতেন। বস্তু ও বিষয়কে তাদের ভেতর থেকে বুঝাটাই মৌলিক।

    দ্বিতীয়তঃ শান্তনু মজুমদারের লেখাটা বিষয়ের বিচারে আজকের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষিত প্রাসঙ্গিক হলেও, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের বিবেচনায় আমার কাছে লেখার কণ্টেণ্ট ‘সময়যোগী’ও মনে হয়নি। ‘সময়োপযোগী’ ধারণাটির সাথে সময়ের দাবী পূরিত হওয়ার বিষয়টি জড়িত, যা শান্তনু মজুমদারের লেখায় অনুপস্থিত।

    এ-মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে-সঙ্কট চলছে, তার বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাব-মূলক লেখা হতে পারতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদারের পক্ষে একটি সময়োপযোগী কাজ। আমরা সঙ্গত কারণেই শান্তনু মজুমদার বা তাঁর মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে থেকে বাঙালী জাতির রাজনীতির এ-সঙ্কটকালে একটি সমাধান আশা করতে পারি।

    উপরসংহারে শান্তনু মুজমদার পাকিস্তানের ইমরান খানের সাথে বাংলাদেশের ডাঃ ইমরান সরকারের তুলনা করে হয়তো একটি অনুল্লেখিত ক্যাটেগোরির অভ্যন্তরীন বৈসাদৃশ্য নির্দেশ করে লিখেছেনঃ

    “ইমরানে ইমরানে কত তফাত। পাকিস্তানি ইমরান যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর বাংলাদেশের ইমরানরা গণজাগরণ মঞ্চ বানায় যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শেষ না করে ঘরে না ফেরার কথা বলে।”

    পাকিস্তানের ইমরান খান ছিলেন একজন পেশাদার খেলোয়াড়, আর বর্তমানে একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের ইমরান সরকার একজন প্রশিক্ষিত ডাক্তার, যিনি নিজকে নির্দলীয় নাগরিক হিসেবে দাবী করেন। এ-দু’জনের মধ্যে তুলনা করার আমি কোনো বৈধ কমন গ্রাউণ্ড দেখি না।

    শান্তনু মজুমদার বহুবচনে ‘ইমরানরা’ বলে বস্তুতঃ ব্যক্তিকে নয়, একটি ক্যাটেগোরি নির্দেশ করছেন। প্রশ্ন হচ্ছেঃ সেই ক্যাটেগোরিটি কী এবং এ-ক্যাটেগোরাইজেশনের পার্স্পেক্টিভ বা দৃষ্টিকৌণিক অবস্থানটা কী? এ-দু’টো বিষয় বুঝতে পারলে পাঠের উপলবব্ধি সম্ভবতঃ সহজতর হতো।

    শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

>>এ-মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে-সঙ্কট চলছে, তার বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাব-মূলক লেখা হতে পারতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদারের পক্ষে একটি সময়োপযোগী কাজ। আমরা সঙ্গত কারণেই শান্তনু মজুমদার বা তাঁর মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে থেকে বাঙালী জাতির রাজনীতির এ-সঙ্কটকালে একটি সমাধান আশা করতে পারি।<<

বাস্তবে বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান প্রস্তাব কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বা কলাম লেখকদের কাছ থেকে আসে নাই। এবং তা কেউ প্রত্যাশাও করে না। রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান রাজনীতিকদের কাছ থেকে বা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকেই আসে/আসবে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন