• ইলিয়াস আলির অন্তর্ধান ও সাধারণের নিরাপত্তাবোধ
    মাসুদ রানা

    এক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র হিসেবে অখ্যাত, পরে সন্ত্রাসের দায়ে বহিষ্কৃত হয়ে কুখ্যাত এবং সবশেষে বিএনপির নেতা হিসেবে বিখ্যাত এম ইলিয়াস আলি - অর্থাৎ মোহাম্মদ ইলিয়াস আলি - হঠাৎ উধাও। সাথে তাঁর সাথে উধাও আরও এক আলি - গাড়ীচালক আনসার আলি - যার সম্মুখ নাম কখনও সম্মানে সংক্ষেপিত হবে না ইংরেজি অক্ষরে সম্ভবতঃ তাঁর দারিদ্র ও নগণ্যতার কারণে।

    দু’টি জলজ্যন্ত (মাছের মতো) মানুষ নিশ্চয় আকাশে (পাখীর মতো) উড়ে যেতে পারেন না? গেলেন কোথায় তাঁরা? গাড়ী আছে, অথচ গাড়ীর মালিক নেই, গাড়ীর চালক নেই। বাড়ীতে নেই, হোটেলে নেই, অফিসে নেই, জেলে নেই, মর্গে নেই কিংবা স্বর্গে আছে বলেও কোনো প্রমাণ নেই। তবে, সরকার-প্রধান শুরুতে বলে দিয়েছেন, ইলিয়াস আলিকে তাঁর নেত্রী খালেদা জিয়াই লুকিয়ে রেখেছেন।

    আশ্চর্য্য এক দেশ, বাংলাদেশ! তার চেয়েও আশ্চর্য্যের হচ্ছেন সে-দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কী অবলীলায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা দলেরও পেতে-কষ্ট তথ্যকে এক ঝটকায় ডিজিট্যাল প্রেজেন্টেশনের মতো হাজির করলেন তিনি! ডিজিট্যাল তথ্য-প্রযুক্তির পেছনে আছে পদার্থবিদ্যা আর শেখ হাসিনার ‘তথ্য’-নিযুক্তির পেছেনে আছে অপদার্থতা, যা সম্ভবতঃ তাঁর সহজাত এবং ইংরেজিতে যাকে বলা যায় ‘আনসাবস্টেনশিয়েলিটি’।

    ইলিয়াস আলির দল বিএনপি দায়ী করছে দেশের বিশেষ বাহিনীকে। এর নেত্রী খালেদা জিয়া বলছেন, র‍্যাব ধরে নিয়ে গিয়েছে ইলিয়াস আলি ও তাঁর ড্রাইভার আনসার আলিকে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, তথাকথিত ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী’দেরকে আইন বহির্ভুতভাবে খুন করিয়ে যে-সংস্থাটির বাড় বাড়িয়েছিলেন খালেদা জিয়া নিজে, আজ তাঁরই দলের নেতাকে গুম করার দায়ে তিনি দুষছেন তাদেরকে।

    কি অবলীলায় নির্লজ্জ অভিযোগ করছেন খালেদা জিয়া সেই র‍্যাবের বিরুদ্ধে, যাকে তিনিই গড়ে তুলেছিলেন নিজ হাতে। তাঁর পুত্রধন এ-বাহিনীকে সাজিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর রূপে। আর তাঁরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সেই র‍্যাবের পিঠে চড়েই বলেছিলেন হাস্যকর ইংরেজিতে ‘উই অ্যার লুকিং ফর শত্রুজ’!

    রাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীকে দিয়ে প্রতিপক্ষকে খুন করানোর ঘটনা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সেই প্রথম থেকেই। শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান দুজনের হাতই সে-খুনের রক্তে লাল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই সেই রহমানবাদের (রহমানিজম) উত্তারাধিকার বহন করে চলছে। তাই, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যেটি ক্ষমতায় আসে, সেটিই রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে বিভিন্ন মাত্রার প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন মাত্রায় শায়েস্তা করে।

    ভাগ্যচক্রে আজ বিএনপি কাঁদছে, কিন্তু বিএনপি কি অন্যকে কম কাঁদিয়েছে ক্ষমতায় থাকা কালে? আওয়ামী লীগের সৃষ্টি যদি হবে রক্ষীবাহিনী, তো বিএনপির সৃষ্টি হচ্ছে র‍্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান বা র‍্যাব।  আর এর শিকার হতে পারেন কখনও সিদ্দিক মাস্টার, কখনও ইলিয়াস আলি। তার মাঝখানে সিরাজ শিকদার আর মুফাখখার চৌধুরীদের কথা না হয় না-ই উল্লেখ করলাম।

    ইলিয়াস আলি যে-ধরনের রাজনীতিকই হয়ে থাকুন, তাঁর অন্তর্ধানকে খাটো করে দেখা যায় না। ইলিয়াস আলির অন্তর্ধান বাংলাদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তার মান নির্দেশকারী একটি সূচক। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরই অনুগামী কিংবা শব্দান্তরে অনুগত রাজনীতিক ও প্রকৃত অর্থেই বিখ্যাত এমপি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, রাজনীতিক হিসেবে তিনি নিরাপদ বোধ করছেন না।

    রাশেদ খান মেনন তাঁর কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন বেশ সাহসের সাথেই ঢাকার একটি জনসভায়। তখন একই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিসের বড়ো কর্তা। রাশেদ খান মেননের উচ্চারিত আশঙ্কার উত্তরে মন্ত্রী ও পুলিস-কর্তা আশাবাদের কিছুই শোনাতে পারলে না। অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তহীনতা বোধ বিরাজ করছে, তা উপলব্ধি এবং এর প্রকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা।

    সমস্ত রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলাদলি, কিংবা বিশ্বাস-অবিশ্বাস নির্বিশেষে একজন নাগরিক - তিনি সাধারণ কিংবা অসাধারণই হোন - আইনতঃ রাষ্ট্রের সম্পত্তি। তাই, কোনো নাগরিকেরই অন্য নাগরিককে হত্যা করা তো দূরের কথা, তাঁর আত্মহত্যা করারও অধিকার নেই। তাই, আত্মহত্যা করতে যেয়ে ব্যর্থ হলে আত্মহত্যা-চেষ্টাকারীকে আইনতঃ শাস্তি ভোগ করতে হয়। আর খুনের মামলায় সন্দেহিত খুনীর বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ হয় রাষ্ট্র।

    খুনীকে খুন-হওয়া ব্যক্তির মা-বাবাও ক্ষমা করতে পারেন না, কারণ তাঁরা তাঁর মালিক নন। ক্ষমা করতে পারেন একমাত্র রাষ্ট্রপতি, কারণ নিহতের মালিক রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রপতি হচ্ছে রাষ্ট্রের কর্ণধার। নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব যে রাষ্ট্রের, তার নৈতিক ভিত্তি এখানে প্রতিষ্ঠিত।

    লক্ষ-লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। কী ছিলো প্রেষণা তাঁদের আত্মত্যাগের পেছনে, যাঁরা অন্ততঃ যুদ্ধ করে শহীদী মৃত্যুবরণ করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য? সমস্ত কর্মসূচি আর দফা-দফা দাবীকে একপাত্রে রেখে ঘনীভূত করে বললে যা বলা যায়, তাহলো ‘জীবনের মূল্য’। স্বাধীনতা যুদ্ধের পেছনে একমাত্র প্রেষণা হচ্ছে জীবনের মূল্য প্রতিষ্ঠা করা। আর এই মূল্যকে বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায়, তা হচ্ছে স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিকাশের সম্ভাবনা।

    আজ আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে ভাবনার সময় এসেছে রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে। জটিল বিশ্বে সরলীকৃত ভাবনা ও চিন্তা কোনো অভিঘাত তৈরি করতে পারবে না। আমাদেরকে ভাবতে হবে বিদ্যা-সহযোগে ও বুদ্ধি-সহকারে।

    আমাদের আবেগ বেশি। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অতি আবেগ যে অপরিপক্কতা, তাও আমরা বুঝতে শিখিনি। কখনও ব্যক্তিত্বের নামে, কখনও ঐশ্বরিক কিংবা কখনও অনৈশ্বরিক আদর্শবাদের পদতলে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিকাশের সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা ভুলে যাই প্রশ্ন করতে।

    আমরা ভুলে যাই দ্রুত। যখন বিএনপি ক্ষমতা এসে মানুষের জীবনকে অতীষ্ট করে তুলেছিলো, তখন বাঙালী মরিয়া হয়ে ভৌট দিয়েছিলো আওয়ামী লীগকে। তার আগে আওয়ামী লীগের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ভৌট দিয়েছিলো বিএনপিকে।

    এখন আবার হয়তো আওয়ামী লীগের সর্বগ্রাসী লুন্ঠন ও নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য মানুষ ঝুঁকে পড়বে বিএনপির দিকে। বিএনপিও জানে এই মনস্তত্ব। তাই, ইলিয়াস আলির অন্তর্ধানকে পুঁজি করে সে অচিরেই ডাক দেবে সরকারের পদত্যাগের। আমরা হয়তো আবার একটি ওয়ান ইলাভেনের মতো পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছি।

    এভাবে আমাদের আর কতো কাল বৃত্তাকারে ঘুরতে হবে? বৃত্তের বাইরে আমরা কবে ভাবতে শিখবো? কবে আমরা চ্যালেইঞ্জ করতে শিখবো যা কিছু শিখানো হয়েছে পবিত্র ও মান্য হিসেবে, তার সব কিছুকেই পৃথিবীর সমতলে এনে?

    ইলিয়াস আলিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী, না-কি বিএনপি কিংবা জামায়াতের বিশেষ বাহিনী, না-কি বাংলাদেশে তৎপর ভিন-দেশী বিশেষ বাহিনী গুম করেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কিন্তু যা নির্দিষ্ট করে বলা যায়, তা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। নিশ্চিত করতে পারছে না মানুষের জীবনের আপন আঙ্গিনায় স্বাধীনতা। সেখানে মর্যাদাহীন এক অসহনীয় জীবন বইতে পারছে না মানুষ। বিকাশের সম্ভাবনাহীন জীবন থেকে মুক্তির জন্য তরুণেরার প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করে ছুটছে দ্বিগ্বিকহীন হয়ে। কিন্তু তবুও ভুলতে পারছে না তাঁরা বাংলাদেশকে।

    কী তবে করতে হবে? নিশ্চয় পরিবর্তন। কোন পথে? কে বাৎলে দেবে? নিজকেই খুঁজে নিতে হবে। কারণ জীবনের ধর্ম হচ্ছে বাঁচার জন বিকাশের পথে সংগ্রাম করা।

    রোববার, ২৯ এপ্রিল ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gamail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন