• ইলিয়াস গুপ্ত সুরঞ্জিত সুপ্ত
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এক ভাষণে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অর্থ কেলেঙ্কারি চাপা দিতে ইলিয়াস আলির ইস্যু সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ ইলিয়াস আলিকে ‘গুপ্ত’ করে কোলাহল তৈরী করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘটনাকে ‘সুপ্ত’ করে দিতে চাইছে আওয়ামীগ সরকার।

    দৈনিক প্রথম আলো সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথিত অর্থ বা ঘুষ কেলেঙ্কারির উপর বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে এবং সংবাদের উপর করা পাঠক-মন্তব্য নিয়ে পুনরায় সংবাদ তৈরী করে বিষয়টির শেষ দেখে ছেড়েছে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মন্তব্যের উপর প্রথম আলো তার পাঠকদের জন্য একটি অনলাইন জরিপ শুরু করেছে।

    জরিপের ফলাফল যা-ই হোক না কেনো, ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বক্তব্য একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বটে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি দূর্বল হয়ে পড়ে, দুটো প্রশ্নের সম্মুখিন হলে। প্রথমতঃ আওয়ামী লীগ যদি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘটনাকে ধামাচাপা দেবার জন্যই ইলিয়াসকে গুম করবে, তাহলে সেটি প্রথমেই করলো না কেনো? দ্বিতীয়তঃ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পদত্যাগের মধ্যদিয়ে মানুষের রাগ খানিকটা দমিত হবার পর - অর্থাৎ একটা সমস্যা থেকে বের হয়ে এসে - আওয়ামী লীগ আরেকটা সমস্যার জন্ম দিতে যাবে কেনো?

    আওয়ামী লীগ বিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এই উত্তরহীনতা থেকেই আসে বিএনপি-বিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এ-তত্ত্ব অতি সরল, যাতে বলা হচ্ছে, ইলিয়াস আলি ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন। কিন্তু বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা তৈরী জন্যে আন্দোলন করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে ইলিয়াস আলির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিকে।

    সিলেটের ইলিয়াস আলি বাংলাদেশের রাজনীতিতে শান্তির জালালি কবুতর নন। ছাত্রাবস্থায় তিনি প্রথমে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে, তারপর তিনি সামরিক একনায়ক জেনারলে এরশাদের সমর্থনকারী ছাত্র সংগঠনে, তারপর আবার বিএনপির ছাত্র সংগঠনে ফিরে এসে বিভিন্ন সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে ও মোকাবেলা করে মূল সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। এহেন ইলিয়াস আলির ব্যক্তিগত অনেক শত্রু  থাকতে পারে এবং এ-শত্রুদের মধ্যে অনেকে সাংঘাতিকও হতে পারে।

    কিন্তু এ-তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে দুটি যুক্তির কষ্টি পাথরে। প্রথমতঃ ইলিয়াসের উপর যদি শত্রু তাই মেটাবে, তাহলে তাঁকে খুন করা হলো না কেনো? রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে অন্য কোথাও শত্রু তা মেটানোর চেয়ে রাস্তায় খুন করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়াইতো শত্রু র জন্য অধিকতর নিরাপদ হতে পারতো। কিন্তু ইলিয়াস আলিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শত্রু রা ধরে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যদি খুনও করে, সেক্ষেত্রে সাধারণতঃ মুক্তিপণ দাবী করা হয়। কিন্তু জানা-মতো ইলিয়াসের জন্য কোনো মুক্তিপণ দাবী করাও হচ্ছে না। সুতরাং এটি ইলিয়াস আলির ব্যক্তি শত্রু র কাজ বলেও পুরোপুরি মেনে নেয়া যাচ্ছে না।

    বিএনপির বিরুদ্ধে আরেকটি ষড়যন্ত্রের প্রবক্তা হচ্ছে শেখ হাসিনা স্বয়ং। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়াই ইলিয়াস আলিকে লুকিয়ে রেখেছেন সরকার বিরুদ্ধে একটি হিসেবে এটি ব্যবহার করার জন্য। এটি হাস্যকর। কারণ, সরকারের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র থাকার পর ‘ওভার গ্রাউণ্ড’ একটি দল তার একজন নেতাকে লুকিয়ে রাখতে পারবে, এটি প্রায় অসম্ভব। এটি আণ্ডারগ্রাউণ্ড দল হলে হয়তো সম্ভব ছিলো। কারণ, আণ্ডারগ্রাউণ্ড দলগুলো গড়েই ওঠে গুপ্ত রাখার ক্ষমতা নিয়ে।

    বিএনপি যে-বিদ্যায় লুকাবার ক্ষমতা রাখে, আওয়ামী লীগেরও সে-বিদ্যায় বের করারও ক্ষমতা রাখে। তাই আওয়ামী লীগের অগোচরে বিএনপি তার এক কেন্দ্রীয় নেতাকে গুপ্ত করে রাখবে, তার সম্ভাবনা খুবই কম। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মতো দলগুলো দলীয় ক্যাপাসিটিতে গুম করতে পারে একমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। তাই, শেখ হাসিনার তত্ত্ব ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি।

    তাহলে ইলিয়াস আলির নিখোঁজ হওয়ার উত্তর কী? এখানে আসে তৃতীয় প্রকারের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এতে বলা হচ্ছে ইলিয়াস আলির নিখোঁজ হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপ’র মধ্যে কারও হাত নেই। এখানে কাজ করেছে তৃতীয় শক্তি, যেটি আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে পারে পদত্যাগ করার পরও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রীসভায় ফিরেয়ে আনতে এবং এর ফলে জনগণের অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নবাণ থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষার জন্য নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইলিয়াস গুম করার মতো অপারেশন পরিচালনা করতে।

    সুরঞ্জিত-প্রসঙ্গ এখন সুপ্ত আর ইয়ালিয়াস হয়েছেন গুপ্ত! ঘটনা দুটোর পরম্পরার পেছনে একটা সংযোগ থাকা সম্ভব ভাবাটা অসম্ভব নয়। কিন্তু বাজারের সস্তা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে এই সংযোগ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের ভাবতে হবে প্রচলিত বৃত্তের বাইরে।

    রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন