• একটি যথার্থ খবরঃ হাসিনা বিঁধলেন মেননকে
    মাসুদ রানা

    খবর
    খবর কাকে বলে? এর উত্তরে, আজ থেকে একশো ত্রিশ বছর আগে, ১৮৮২ সালে, নিউ ইয়র্ক সান পত্রিকার সিটি এডিটর ও প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক জন বি বৌগার্ট বলেছিলেন, ‘ইট ইজ নট এ্যা নিউজ ইফ এ্যা ডগ বাইট্‌স্‌ এ্যা ম্যান, বাট ইট ইজ এ্যা নিউজ ইফ এ্যা ম্যান বাইট্‌স্‌ এ্যা ডগ’ - অর্থাৎ, কুকুর যদি মানুষকে কামড়ায়, তাতে খবর হয় না, কিন্তু মানুষ যদি কুকুরকে কামড়ায়, তাহলে একটি খবর হয়।

    আজকের খবর হলো এই যে, নির্বুদ্ধিতার অভিযোগে বাম মহলে বহু-সমালোচিতা বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতি ‘অসভ্য’ ইঙ্গিতবাহী মন্তব্যের জবাবে ঐতিহাসিক নজির ও উদ্ধৃতি উল্লেখ করে, বাম-বিপ্লবী নেতা রাশেদ খান মেননকে ধ্বসিয়ে দিয়েছেন তাঁর জ্ঞানকাণ্ডে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচণ্ড কুঠারাঘাত হেনে।

    গতকাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়, শাসক দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের উন্মুক্ত অধিবেশনে, সাংবাদিকদের সামনে এই আঘাতটি হানেন, পৈতৃক-সূত্রে দলটির সভাপতি ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদের প্রশ্নাতীত অধিকারিনী শেখ হাসিনা।

    প্রেক্ষিত
    একদিকে ‘আনইনফর্মড’ ও ‘ইল-মৌটিভেইটেইড’ রাজনীতিক এবং অন্যদিকে ‘ইল-ইনফর্মড’ ও  ‘আনমৌটিভেইটেট’ পাবলিক নিয়ে চলছে বাংলাদেশের খাড়া-বড়ি-থোর আর থোর-বড়ি-খাড়া রাজনীতি। আর এর মধ্যেই প্রায়শঃ বিপুল তরঙ্গ তোলে অকিঞ্চিতকর একেকটি ঘটনা। একটি থিতিয়ে যেতে-না-যেতে আসে অন্যটি। এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতির অচলায়তনে কাটে দিন-রাত্রি-মাস-বছর।

    এই অচলায়তনে চলতি তরঙ্গটি হচ্ছে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যান। শেখ হাসিনার পরিষদে মন্ত্রী হবার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে গত কয়েকদিন ধরে সংবাদ শিরোনামে ‘হিরো’ হয়ে গিয়েছিলেন বরিশালের দুই কৃতি সন্তান - রাশেদ খান মেনন ও তোফায়েল আহমেদ।

    তাঁদের আঞ্চলিক ভক্তদের একজন লণ্ডনে বললেন, ‘হেই শেরে বাংলার পরে, আমাগো দুই মনু দেখাইয়া দেছে বাপের বেডা কারে কয়। শ্যাখের বেডি আমাগো মনু দুইডারে মন্ত্রী বানাইতে চাইছিলো, হেইডা হেরা ফেরাইয়া দেছে। এইডা এতিহাসে আর কেডা পারছে?’

    বরিশালের এই দুই কৃতি সন্তান বাংলাদেশের ইতিহাসে বিখ্যাত বটেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণ-কালে ছাত্র-রাজনীতিতে নেতৃত্ব-দানের সুবাদে তাঁরা বিখ্যাত। গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে রাশেদ খান মেনন সাম্যবাদী বিপ্লবী চেতনা বিকাশের আন্দোলনে এবং তোফায়েল আহমেদ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক উত্থানে উজ্জ্বল তারকা। তাঁরা বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায্যতঃ উল্লেখিত থাকবেন।

    পশ্চাত
    আশির দশকে জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কখনও কাছে আবার আন্দোলন-ত্যাগী নির্বাচনে কখনও দূরে সরে গিয়েছেন তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন পরস্পরের কাছ থেকে।

    অবশেষে গণ-ধিকৃত ও অভ্যূত্থানে পতিত স্বৈরশাসক হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে সাথে নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের নৌকোয় চড়ে ধান-নদী-খালের এই দুই কৃতি সন্তান পার হয়েছেন নির্বাচনী বৈতরণী। তোফায়েল আহমেদ নৌকার পুরনো মাঝি হলেও রাশেদ খান মেনন নিতান্তই যাত্রী।

    রাশেদ খান মেননের আশা ছিলো, তিনি মন্ত্রী হবেন। হবার যোগ্যতাও ছিলো তাঁর। তোফায়েল আহমেদের মন্ত্রী হবেন, এটি ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুটা জ্ঞাত এবং কিছুটা অজ্ঞাত কারণে দুজনের কেউই মন্ত্রী হতে পারেননি।

    তোফায়েল আহমেদকে আওয়ামী লীগের ভেতরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘মাইনাস ফর্মুলা’য় সংস্কারপন্থী চার কুচক্রীর একজন মনে করা হয়। সুতরাং তোফায়েল আহমদকে মন্ত্রী না করার কারণটি ছিলো সাধারণ্যে বোধগম্য। কিন্তু ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননকে কেনো মন্ত্রী করা হলো না, তা হাসিনা-ঘনিষ্টজন ছাড়া কারও কাছে বোধগম্য নয়।

    তোফায়েল আহমেদকে শাসক দলের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য পদ থেকে নির্মূল করে রোপণ করা হয়েছিলো উপদেষ্টা মণ্ডলীতে। তাতে তিনি কষ্ট পেয়ে রুষ্ট হয়েছিলেন। ফলে, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভায় কখনও যোগ দেননি তিনি। বরং সময় সুযোগ পেলেই সাংসদ হিসেবে সরকারের সমালোচনা করেছেন।

    ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননের রাগ দেখানোর কোনো উপায় ছিলো না। কারণ, রাগে রাজ ভিক্ষা হারাতে হয় বলে একটি প্রবাদ বাক্য আছে বাংলায়। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, এক সময় তাঁর ‘মূল্য’ বুঝবেন শেখ হাসিনা।

    যে-কোনো কারণেই হোক, ‘মূল্য’ বুঝে ক’দিন আগে মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেবার প্রস্তাব পাঠানো হয় ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা হাসানুল হক ইনু এবং তোফায়েল আহমেদ-সহ আওয়ামী লীগের আরও চারজনের কাছে।

    চার আওয়ামী সাংসদ সহাস্যে সম্মত হলেন মন্ত্রীত্বে। কিন্তু বেঁকে বসলেন তোফায়েল আহমেদ। মন্ত্রীত্ব নিতে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর উপলব্ধি হয়ে থাকবে ‘খুদ খেয়ে ভূখ নষ্ট করে লাভ নেই’।

    উপলব্ধিটি হতে পারে এই যে, পাঁচ বছর মেয়াদের ৮০% পার হয়ে যাবার পর, শেখ হাসিনার সরকার যখন চুরি-দুর্নীতি-সন্ত্রাসের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, তখন পড়ন্ত বিকেলে ক্ষণিকের মন্ত্রী হয়ে না হবে কোনো লাভ, না দেখানো যাবে কোনো কাজ।

    জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু হয়তো ভেবে থাকবেন, ‘ভিক্ষার চাল কারা-না-আকারা দেখে লাভ নেই, পাওয়া যে গেছে সেই ভাগ্যি!’ তিনি সানন্দে গ্রহণ করলেন মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব। এ-ছাড়াও হাসিনা-দাক্ষিণ্য নিশ্চিত পেতে তিনি খালেদা জিয়া সম্পর্কে ‘মাইনাস ওয়ান ফর্মূলা’র ঝড় তুলে আওয়ামী বলয় ছেড়ে বিপরীত বলয়ে যাবার তেমন কোনো সুযোগ আপাতঃ উন্মুক্ত রাখেননি। সুতরাং, তিনি তণু-মন ঢেলে রয়েছেন বলে ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য’ হয়েছেন।

    রাশেদ খান মেনন সম্ভবতঃ আশা করেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর সাথে পরামর্শ করে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব দিবেন।  কিন্তু তা না করে তিনি প্রস্তাব পাঠালেন মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিবের মাধ্যমে টেলিফৌনে।

    তথাকথিত বনেদী রাজনীতিক পরিবার থেকে আসা বাম-বিপ্লবী মেননের এতোদিনের সুপ্ত আত্ম-সম্মানবোধ হয়তো হঠাৎই অবজ্ঞার আগুনে জ্বলে উঠে থাকবে। তিনি মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

    বিকল্পের নিষ্ক্রিয় সন্ধানে-থাকা অলস পাবলিক ‘বাহ্‌বা! বাহবা!’ করে ওঠলো। ‘এই তো পেয়ে গিয়েছি বীর, যাঁরা মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখান করতে পারেন!’ 

    রাশেদ খান মেনন এ-পরিস্থিতিতে এক হাত উপরে উঠে বললেন, কোনো সভ্যদেশে একজন রাজনীতিকের কাছে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব মন্ত্রী-পরিষদ বিভাগের সচিবের টেলিফৌনের মাধ্যমে আসে পারে কি না তা তাঁর জানা নেই। অর্থাৎ, আচরণটি সুসভ্য রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে পড়ে না। সুতরাং, এর মাধ্যমে তিনি যে শেখ হাসিনাকে ‘সভ্যতা’র একটা ‘সবক’ পাঠালেন।

    লা-জবাব
    শেখ হাসিনা তাঁর নারী প্রতিপক্ষের আক্রমণের উত্তর যতোটা ঝাল ও ঝাঁজ মিশিয়ে দেন, পুরুষ প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সাধারণতঃ ততোটা করেন না। এটি পূর্বেও লক্ষ্য করা গিয়েছে। কিন্তু মেননের ‘সভ্যতা’র পাঠ সম্বলিত সমালোচনার উত্তর দিলেন তিনি আবেগকে সংযত করে গবেষক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঢংয়ে।

    প্রথমেই তিনি ঐতিহাসিক রেফারেন্স টেনে প্রতিষ্ঠিত করলেন এই সত্য যে, মন্ত্রীত্বের প্রস্তাবটা গণতন্ত্রের চর্চা-করা দেশগুলোতে ক্যাবিনেট সেক্রেটারী বা মন্ত্রী-পরিষদ বিভাগের সচিবের কাছ থেকেই আসে।

    জন্ম-লগ্ন থেকে বাংলাদেশের কাছে গণতন্ত্রের জন্য ভারতকে আদর্শ মনে করা হয়। এটি ইসলামিক মৌলবাদীরা ছাড়া প্রায় সকল রংয়ের ডান-বামের জন্যেই সমান সত্য। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সংবিধান রচনা থেকে শুরু করে বিবিধ আলোচনায়।

    এহেন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবেশে, শেখ হাসিনা ‘আদর্শ’ ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ম্যাটার্স অফ ডিসক্রিশন’ থেকে উদ্ধৃতি নির্দেশ করে জানান, ‘সভ্য’ ভারতের ঐ রাজনীতিকটি যখন প্রথম মন্ত্রী হন, তখন তিনি প্রস্তাব পেয়েছিলেন মন্ত্রীপরিষদের একজন কর্মকর্তার ফৌনের মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার মন্ত্রী হবার আগের ফৌনটি পেয়েছিলেন মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছ থেকে।

    বাম-পন্থায় ভারত-ভক্ত রাশেদ খান মেননের কাছে শেখ হাসিনার প্রশ্নঃ ‘ভারত কি তবে সভ্য দেশ নয়?’ রাশেদ খান মেনন সম্ভবতঃ ভারতকে ‘অসভ্য’ ও ‘অগণতান্ত্রিক’ মনে করেন না। কিংবা করলেও তা বলার মতো সাহস সম্ভবতঃ তাঁর নেই। আর এটি বুঝেই শেখ হাসিনা ভারতকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে বললেন, ‘যে নেতা বলেছিলেন, তিনি দেখে নিতে পারেন সভ্য দেশে এভাবে মন্ত্রী হয় কি না।’

    কিন্তু শেখ হাসিনা এখানেই থেমে থাকেননি। মেননের অস্ত্রেই মেননকে চূড়ান্ত আঘাত করে ধ্বসিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ওই নেতাকে যখন ২০০৯ সালে অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আপনি মন্ত্রী হচ্ছেন কি না, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিবের ফৌন এখনো পাইনি।’

    শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ আস্থার সাথে তাঁর দাবি যাচাই করে নেবার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘চাইলে আপনারা ওই সময়ের পত্রিকা দেখে নিতে পারেন।’

    এর পর শেখ হাসিনা উপসংহার টেনে বললেন, ‘সুতরাং মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করা না-করা উনার ব্যাপার।’ কিন্তু বস্তুতঃ সেই উপসংহারে শেখ হাসিনা ‘সভ্যতা’ কাকে বলে, তার একটা ঠ্যাং-ভাঙ্গা জবাব নিলেন মেননকে।

    সম্ভাব্যতা
    উপরের আলোচনার সমগ্রটাই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে, যদি দেখা যায় মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানের পেছনে কাজ করছে দৃশ্যপটের আড়ালে একটি রাজনৈতিক কলকাঠির খেলা।

    আমার অনুভূতি হচ্ছে, ব্যাপক তৎপরতা চলছে অন্তরালে, আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে ক্ষমতায় কে যাবে, বা কাকে যেতে দেয়া হবে, বা আনা হবে, তার ছক ও নকশা নিয়ে।

    আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে, তা নিশ্চিত বুঝলে তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রীত্বের প্রস্তাবকে শেখ হাসিনার সাথে তাঁর সম্পর্কের পুনর্গঠন ও দলে তাঁর অবস্থানের পুনঃসংহত  করার সুযোগ হিসেবে হাত-ছাড়া করতেন না।

    মার্ক্সবাদী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননও বাম থেকে ডানে গিয়ে ‘কূল-হারানো’র পক্ষে একটি ‘প্র্যাগমেটিক’ অর্থ খুঁজে পেতেন।

    কিন্তু তাঁরা তা করলেন না। এই দুই রাজনীতিককে ধুরন্ধর বুদ্ধিমান, উচ্চ সংযোগ-সম্পন্ন ও তথ্য-সমৃদ্ধ রাজনীতিক হিসেবে মেনে নিলে, তার ‘করোলারী’ বা অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে মানতে হবে যে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত অন্ধকার এবং এর বিকল্প হিসেবে অভূতপূর্ব একটি শক্তির জন্মের প্রস্তুতি চলছে।

    এটি খুব অসম্ভব নয় যে, রাশেদ খান মেননের সজ্ঞানে কিংবা অংশগ্রহণে তোফায়েল আহমেদ-সহ আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা সেই শক্তি জন্ম-দানে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বাম-ঘূর্ণিত-ডান মাহমদুর রহমান মান্না, নীরবে নিষিদ্ধ-ঘোষিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর-সহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সভায় উত্থিত বহিষ্কারের প্রস্তাব যথেষ্ট তাৎপর্য্যপূর্ণ।

    হাসিনাকে দিয়ে অধিক কিছু করিয়ে নেয়া যদি সম্ভব না হয়, কিংবা হলেও যদি তাঁকে নির্বাচনে পুনরায় পার করিয়ে আনা কঠিন প্রতিভাত হয়, তাহলে তাঁর বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তির প্রতিভূ আমেরিকা ও ভারতের ভাবনা কী?

    প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে যদি বিএনপি যদি ওয়ার্কেবল বা কাজের না হয়, কিংবা যদি গণবিরক্তি উৎপাদক হিসেবে চিহ্নিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বদলে যদি কিছু আনাটাই অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন কী আছে হাতের কাছে?

    দৃশ্যতঃ হাসিনার বিকল্প হিসেবে ভারতের তালিকার শীর্ষে আছেন পরীক্ষিত প্রার্থী হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। বাঙালীর বিস্মৃতির উপর নির্ভর করে হয়তো তাকে দিয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে।

    অধিকতর ‘ইনোভেটিভ’ বা সৃষ্টিশীল আমেরিকার পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের সুশীল বলে দাবিদারেরাও তাঁকে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেন।

    ইসলামী বিকল্প বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। বিশেষ করে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ তাঁদের জন্য একটি অনতিক্রম্য হিমালয়।

    বাকী থাকে সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা। আমার অনুভূতি হচ্ছে, সমাজের প্রবল শ্রেণীর কোনো-কোনো তথাকথিত ‘প্রগতিশীল অংশ’ সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটদেরকে পুরনো বুলি বদলে ‘যুগোপযোগী’ হয়ে এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে থাকবে। তাই, তাঁদের ভাষাতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

    যাঁরা সর্বহারা বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, তাঁরা ইদানিং ‘সমাজতন্ত্র’র পরিবর্তে ‘সাম্য সমাজ’ কিংবা ‘বিপ্লব’-এর পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন’ ইত্যাদি বলে নিজেদেরকে ‘সুইটেবল ফর দ্য সিস্টেম’ বা ‘ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত’ করে দৃশ্যপটে নিজেদেরকে বিকল্প হিসেবে হাজির করছেন।

    অনুভব
    কিন্তু রাজনীতির সমীকরণে প্রবিষ্ট বিভিন্ন উৎপাদকের অভিঘাতে শেষ পর্যন্ত এর চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা আগে থেকে নির্ভুল নির্দেশ করা সম্ভব নয়।

    বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক শ্রেণীর যে-মানুষগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছেন, তাঁদের কাছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব, দেশপ্রেম, আদর্শ, ঈমান, ধর্ম, ইত্যাদি সুখী শব্দগুলো ক্ষুধা, অমর্যাদা, দুঃখ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবন রক্ষার বিকট চিৎকারের আবহে নিতান্ত অর্থহীন।

    সেই মানুষদের মধ্যে যদি কখনও আত্মসচেতনার ঢেউ সঞ্চারিত হয় এবং তাঁদের মুখে নিজের ভাষা ফুটে ওঠে, তাহলে তা তাঁদের উপর চাপিয়ে দেয়া সমস্ত ‘ফলস্‌ কনশাসনেস’ বা ‘ভূয়া চেতনাকে’ সমূলে উৎপাটিত করে এক বিশাল সুনামির সৃষ্টি করতে পারে। সে-দিন হয়তো বেশি দূরে নয়। সে-দিনের চেহারা যে কতো ভয়ঙ্কর সুন্দর হতে পারে, তা হয়তো আমারও কল্পনার বাইরে।

    রোববার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন