• এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান
    মাসুদ রানা

    ঘন-ঘন ডিজিট্যাল সালাম ও দোয়া চাওয়ার ছদ্মবেশে ভৌট প্রার্থনার অন্ততঃ দু-বছরের জন্য ইতি ঘটিয়ে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন হয়ে গেলো গতকাল। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে শনিবার গভীর রাতে। ভূমিষ্ঠ হওয়া নতুন শিশুর মতো জন্ম নিয়েছে নতুন নেতৃত্ব। আর সেই সংবাদ বয়ে রাতের অন্ধকারে মুঠোফৌন চিৎকার করে উঠলো। থামিয়ে দিয়ে, চেয়ে দেখি সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী এমদাদ চৌধুরীর শব্দবার্তা। বিজয়ী হয়ে তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের।

    আধো-ঘুম ও আধো-জাগরণের মধ্যে কে যেনো আবৃত্তি করে উঠলো কবি সুকান্ত ভট্টচার্য্যের বিখ্যাত কয়েকটি লাইনঃ

    যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
    তার মুখে খবর পেলুম:
    সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
    নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
    জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

    অভিনন্দন জানাই বিজয়ী প্রার্থীদেরকে, ভৌটার তথা সদস্যদের সমর্থন প্রাপ্তিতে সাফল্যের জন্য। বিজয়ে যেনো আত্মহারা না হোন। সামনে চলা সতর্ক ও অবারিত হোক।

    বিজয়ী হতে পারলেন না যাঁরা, তাঁদের প্রতিও অভিনন্দন রইলো সুচারু অংশগ্রহণের জন্য। পরাজয়ে যেনো বিহবল না হোন। সামনে সুগঠিত হোন।

    ধন্যবাদার্হ নির্বাচন কমিশন, যাঁরা স্বল্পায়ুর হয়েও দৃঢ়তার সাথে নির্বাচনটি পরিচালনা করলেন প্রয়োজনে অনায্য দাবিকে ভ্রুকুটি করে নিরস্ত করে। নিরপেক্ষ থাকুন। 

    একাত্মতা রইলো সাধারণ সদস্যদের প্রতি, যাঁরা কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, বরং ইতিবাচক যৌথ-প্রাপ্তির আশায় মহাসমারোহে ভৌট দিয়েছেন নিকট ও দূরবর্তী স্থান থেকে এসে। সংশ্লিষ্টতা যেনো দৃঢ়তর হয়। দাবি জীবন্ত রাখুন।

    লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাব বাঙালীর আর দশটা সংগঠনের মতো মামুলি নয়। ব্রিটেইনে বাংলা সংবাদ-মাধ্যমের সাংবাদিক, লেখক, উপস্থাপক, ও কলাকুশীলবদের সংগঠন, যা গুরুত্বের দিক থেকে বাঙালী সংগঠনের সমূহের মধ্যে শীর্ষে। এ-গুরুত্ব উপলব্ধিত প্রায়োগিক দিক থেকে। কারণ, এ-সংগঠনের সদস্যরা বাঙালী কমিউনিটিকে প্রতিনিয়তঃ চারপাশ, দেশ ও বিশ্ব সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন রাখার জন্য কাজ করেন।

    সভ্য সমাজে ‘ইনফর্মড ডিসিশন মেইকিং’ অর্থাৎ ‘তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ’-এর প্রয়োজনীয়তা বর্ধিষ্ণু। অন্ধ বিশ্বাসের উপর নির্ভর না করে, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যে-আধুনিক জীবন, সেখানে সংবাদ-মাধ্যম তথা সংবাদ-কর্মীরা মৌলিক ভূমিকা পালন করেন। এই ভূমিকাটি পালিত হয় ঘটনা ও বিষয় সমূহ সম্পর্কে তাঁদের বস্তুনিষ্ঠ বোধ অর্জন এবং সে-বোধের নিঃসঙ্কোচ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

    এহেন পেশায় নিয়োজিত ব্রিটেইনের বাঙালীদের সংগঠন হচ্ছে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব। গঠন-কালে স্বভাবতঃই বোধের দিক থেকে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব হয়তো ততো সমৃদ্ধ ছিলো না। কিন্তু বিকাশের প্রক্রিয়ায় এটি ঋদ্ধ হয়েছে নানা মাত্রায়।

    কারও কারও কাছ থেকে প্রায়শঃ শোনা যায় কমিউনিটি বিষয়ে রিপৌটিং করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার ও কোনো-কোনো ক্ষেত্রে প্রহৃত হওয়ারও ঝুঁকি ছিলো বলে, নিতান্ত আত্মরক্ষার্থে গঠিত হয়েছিলো লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব। এ-দাবি কতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ সে-প্রশ্ন না করেও জন্ম-দানের জন্য ধন্যবাদ জানানো যায় সেই পিতাদের। কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে না থেকে বর্তমানের দাবী পূরণ ও ভবিষ্যতের হাতছানিকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাবার প্রয়োজনীয়তাটুকু বুঝতে হবে।

    বাঙালী সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই স্মৃতিকাতরতা ও ভবিষ্যত-বিমুখতা লক্ষ্য করা যায়। প্রৌঢ়ত্ব তার জেষ্ঠ্যত্ব নিয়ে প্রায়শঃ বর্তমানের চাহিদাকে অস্বীকার করতে চায়। সে নানাভাবে বর্তমানকে অতীতের খাঁচায় পুরে রাখতে চায়। নিজেকে শাস্বত ও চিরভাস্বর করে দেখাতে চায়। সময়ের সাথে পিতাদের যৌবন যে বার্ধক্যে পর্যবসিত হয়, তাদের যোগ্যতা ও শিক্ষা যে যুগোপযোগী থাকে না, তা তাঁরা মানতে চান না।

    তাঁরা অতীতের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে ভবিষ্যতের দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে বর্তমানকে স্থবির করে রাখতে চান। তাঁরা নদীর স্রোত থামিয়ে দিতে, বাতাসের প্রবাহ বন্ধ করতে এবং বিকাশকে রুদ্ধ করতে চান।

    এটি যে তাঁরা নিতান্ত স্বার্থপর হয়ে তা করেন, তা না-ও হতে পারে। এটি আসে তাঁদের বোধের দারিদ্র থেকে। নতুনের প্রতি অনাস্থা থেকে। পরিবর্তনের প্রতি ভয় থেকে। এঁদেরকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন ও আধমরা বলে তিরষ্কার করে নবীণদের উদ্দেশ্যে বলেছেনঃ

    ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
    ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
    আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

    লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সামনে অনেক কাজ। এগিয়ে চলার দীর্ঘ পথ। এর জন্য চাই সুদূর প্রসারী দৃষ্টি, অমিত তেজ ও অফুরন্ত শক্তি। বর্তমানের তাগিদ ও ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাবার জন্য নতুন নেতৃত্বকে লড়তে হবে রক্ষণশীলতা ও প্রতিক্রিয়া-প্রবণতার বিরুদ্ধে। রক্ষণশীলতা হচ্ছে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা। প্রতিক্রিয়াশীলতা হচ্ছে বিকাশোন্মুখ শক্তিকে দমিত করে প্রগতিকে রুদ্ধ করার প্রবণতা। এ-বিষয়গুলো বুঝতে হবে বস্তুনিষ্ঠভাবে।

    লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে একটি নবজাগরণ আনতে হবে। বাতিল হয়ে যাওয়া ধারণা-প্রতীক-চর্চাকে বিকাশের পথে প্রতিস্থাপন করতে হবে। আর, করতে গেলে বাধা আসবে প্রাচীনের প্রাচীর থেকে। কিন্তু এ-বাধাকে অতিক্রম করার জন্য নেতৃত্বকে দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, দৃঢ়তা যেনো রূঢ়তায় রূপান্তরিত না হয়। বিকাশোন্মুখ নেতৃত্বকে এই প্রভেদ বুঝতে হবে।

    প্রাচীর তৈরী করে যদি কোনো প্রাচীন থেকে থাকেন, তাঁকে বা তাঁদেরকে বুঝতে হবে যে, সময় হলে চলে যেতে হয়। বুহ্য রচনা করে কিছুই রক্ষা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা শুনুন। তিনি বলেছেনঃ

    হেথা হতে যাও, পুরাতন।
    হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।

    শুরু করেছিলাম সুকান্ত ভট্টচার্য্যের কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে। তাই শেষও করবো তাঁকে দিয়েইঃ

    এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
    জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
    চলে যেতে হবে আমাদের।

    রোববার, ১ জুলাই ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

ঠিক বলেছেন রানা ভাই।
আধমরাদের ঘা মেরেই বাঁচাতে হবে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন