• এ কোন্‌ দেশ? কেউ কাউকে চিনেন না!
    সত্যব্রত দাস স্বপন

    কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম বাংলাদেশের এক মন্ত্রী অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ সম্পর্কে বলছেন ‘কোথাকার মনু না আনু’। জাতীয় কমিটীর ডাকা হরতাল সম্পর্কে বাজে মন্তব্যও করেছেন তিনি। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদকে যা-তা বলে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, ঐ নামের মানুষটা তার চেয়ে কতোটা ছোটো।

    শেখ হাসিনা সরকারের তিনি একজন মন্ত্রী। তিনি আনু মোহাম্মদকে চিনেন না, তা আমার ভাবতে কষ্ট হয়। এ-অধ্যাপক ভদ্রলোকটি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে আসছেন। এর চাইতেও বড়ো যা আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়, তা হলো তিনি দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রাখার বিষয়টি।

    আনু মোহাম্মদ সম্ভবতঃ একজন মুক্তিযোদ্ধাও। তার সম্পর্কে এরকম মন্তব্য হাসান মাহমুদ সাহেবের মতো একজন শিক্ষিত রাজনীতিবিদের কাছ থেকে অবিশ্বাস্য।

    মন্ত্রী এখানেই থামেননি। তিনি জানতে চেয়েছেন জাতীয় কমিটি করার অধিকার কে দিয়েছে তাকে? কিসের হরতাল? কে তাদের এ-অধিকার দিলো?

    হাসান মাহমুদ সাহেব অবশ্যই জানার চেষ্টা করতে পারেন। একজন নাগরিক হিসেবে তার অবশ্যই সে-অধিকার আছে। তবে এটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেনো অন্যের নাগরিক-গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন না হয়।

    হাসান সাহেব কি যদি শুধুই ক্ষমতার দম্ভ প্রদর্শন কিংবা তার ‘অন্নদাতা’র দৃষ্টি আকর্ষণের কারণে এসব বলছেন? যদি তাই হয় তাহলে তাঁকে অবশ্যই বলতে চাই, হাসান সাহেব আপনিই কিন্তু একমাত্র ব্যক্তি নন এ-পৃথিবীতে, আরও বহু লোক আপনার জায়গায় ছিলেন।

    এ-জায়গাটা খুবই ক্ষণস্থায়ী। আপনি শিক্ষিত লোক, আপনাকে জ্ঞান দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। স্মৃতিভ্রম হতে পারে মনে করে শুধু এটুকু মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আপনাদেরই নেতা আমু সাহেব একসময় কতো কথাই না বলতেন, মনে হতো তিনিই আপনার দলের সব কিছু, আজ তিনি কোথায়?

    জনগণ নয়, একজন মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চুপ হয়ে গেছেন, এখন আর কথা বের হয় না। সাংবাদিকরাও আগের মতো পিছু নেয় না। আপনার খুঁটির জোর কি তার চাইতেও বেশি? মনে হয় না।

    কে বলতে পারে, হঠাৎ দেখবো আপনিও নাই। তাই বলি, চেষ্টা করুন আনু মোহাম্মদ সম্পর্কে জানতে। কিংবা তাদের কাছ থেকে জানুন, যারা ঢাকার রাজপথে আনু মোহাম্মদের সাথে ছিলেন বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে।

    আর কেউই যদি আপনাকে তথ্য দিতে না পারেন কিংবা এদের দেয়া তথ্য যদি আপনার মন মতো না হয়, তবে আপনার অন্নদাত্রীর কাছ থেকে জেনে নিন, ২০০৬ সালে এই জাতীয় কমিটির সাথে একাত্ততা ঘোষণা করে তিনি বিবৃতি দিয়েছিলেন এবং ক্ষমতায় গেলে দাবী মানবেন এরকম কথাও দিয়েছিলেন।

    হাসান সাহেব, তার কাছ থেকে জানুন, আনু মোহাম্মদের কাছে একটা ফোন করে (যদি এখনও না করে থাকেন) ভুল স্বীকার করে নিন। শালীনতা, ভদ্রতা, মান্যতা এসব খুব প্রয়োজন।

    আমার মাথা থেকে এ-বিষয়টা যাবার আগেই আরও একটা খবরে চোখ পড়লো। আওয়ামী লীগ নেতা কিবরীয়া সাহেব হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, ‘আসমা কিবরীয়া কে? তদন্ত রিপৌর্ট দেবার আগে তার কথা শুনতে হবে কেনো?’ একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিশ্চয়ই কারও কথা শুনবেন না রিপৌর্ট বিষয়ে। কিন্তু একজন বিধবা যিনি স্বামী হারিয়েছেন, তাঁর কথা শুনলেই সব শেষ হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয় না। আবার না শুনে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখাকে খুব একটা বড় কাজ বলে মনে হয় না।

    এ-দু’টি ঘটনা দেখে আমি আমি রীতিমত অবাক। মনে হচ্ছে এ-আবার কোন দেশে এলাম, কেউ কাউকে চিনছে না। সবাই এতো দম্ভ নিয়ে কথা বলছে কেনো?

    নিহত কিবরীয়া সাহেবের বিধবা স্ত্রীকে চিনছেন না কেনো সে-কর্মকর্তাটি? তদন্ত রিপৌর্ট ভালো কি মন্দ সেটা বড়ো কথা নয়। নিহতের স্ত্রী হিসেবে তাঁর একটা কথা তিনি বলতে যেমন পারেন, যে কেউ সেটা শুনতেও পারে। এর জন্য আসমা কিবরীয়াকে চিনবেন না। নাহ! এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

    হাসান সাহেব চিনছেন না আনু মোহাম্মদকে, তদন্তকারী কর্মকর্তা চিনছেন না নিহত মন্ত্রীর স্ত্রীকে, কী হচ্ছে এসব? মনে পড়লো দু' দিন আগে বলা বাংলাদেশের মাননীয়া প্রধান মন্ত্রীর একটি কথা।

    তিনি জানতে চেয়েছেন এবং বেশ দম্ভের সাথেই বলেছেন, তাঁর চাইতে বড়ো দেশপ্রেমিক কে? আশ্চর্য! এতো বিপদের কথা! কেউ কারও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন এটা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।

    আমি প্রধান মন্ত্রী বা অন্য কারও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবো না। তবে সবার দেশপ্রেম এক নয়, একেকজনের প্রেম একেক রকমের। যেমন আনু মোহাম্মদ আর হাসান মাহমুদের দেশপ্রেম কি এক? আনু মোহাম্মদ মনে করছেন, তার দেশের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব তার এজন্য তিনি একটি চুক্তির বিরোধিতা করছেন, জনগণের কাছে তিনি যাচ্ছেন, প্রচার করছেন চুক্তির বিপক্ষে। তিনি এবং তার সমর্থকের দেশের সকল আইন-কানুন মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে নিয়ে আন্দোলন করছেন।

    ডঃ হাসান মাহমুদ যদি মনে করেন, তিনি যা করছেন তা ঠিক, আপনি ও যান জনগণের কাছে প্রচার করুন চুক্তির পক্ষে। আনু মোহাম্মাদের চাইতে হাসান সাহেবের দল অনেক অনেক বড়ো। ডাক দিন জনগণকে।

    তা না করে একজন সম্মানিত ব্যক্তি সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করা ঠিক নয়। আমরা গণতন্ত্র, অধিকার এসব নিয়ে সারাদিন নিজেরা তো বলছিই, আইন আদালতকে দিয়েও বলাচ্ছি, অথচ নিজের বেলায় আমিত্ব। না এটা ঠিক নয়।

    এ দেশ আর জনগণকে কি পেয়েছেন আপনারা। যার যা ইচ্ছা বলছেন, যার যা ইচ্ছা করছেন। এসব কি এভাবেই চলবে? না, এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।

    হাসান মাহমুদের মতো মন্ত্রীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। কিবরীয়া সাহেব আপনার চেয়ে অনেক বড় মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি দেশের বাইরেও ছিলো, তার হত্যা-তদন্তের কর্মকর্তা তার দল ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায়ই তার বিধবা স্ত্রীকে কি বলছেন।

    মানুষ যখন হেরে যায় তখন রেগে যায়। আর রাগ করার পরিণাম হচ্ছে চোখে অন্ধকার দেখা আর আবোল তাবোল বলা। উপদেশ নয়, অনুরোধ করছি ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কখন চলে যায়, কেউ বলতে পারে না। ক্ষমতার দম্ভে আর যাই করুন, জনগণকে চিনতে ভুল করবেন না। কারণ ওদের কাছে যখন সুযোগ আসে তারা কিন্তু ঠিকই তার যথাযথ ব্যবহার করে। কংসের ভুমিকায় অবতীর্ণ হবার আগে মনে রাখবেনঃ তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।

    আর আনু মোহাম্মদ সাহেবদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই দিন দিন নয় আরোদিন আছে, এই দিন নিয়ে যাবে ওই দিনের কাছে। আপনারাও নিজেদেরকে বদলান। নতুন করে ভাবুন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারলে দেশ হারে, আর জিতলে ওদের দল জিতে। এসব ছেলে ভোলানো গান ভুলে যান। হারলেও ওরা হারে, জিতলেও ওরাই জিতে।

    ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দিন। তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছেড়ে দিন। বছরের পর বছর ওদের সাথে নিয়ে চেষ্টা তো করলেন অনেক, কখনও এ-নামে কখনও ও-নামে। এতে কোনো লাভ নেই।

    দেশের সম্পদ রক্ষা কিংবা দেশ বাঁচানোর কাক করতে হবে নিজেদেরকেই এবং তা করতে হবে জনগণকে সাথে নিয়ে। বহু করেছেন, এবার ওদেরকে ছেড়ে আসুন। নিজের পায়ে দাঁড়ান। জনগণের কাছে থাকুন।

    হাসান মাহমুদ কেনো, ভবিষ্যতে কেউ এ-রকম কথা উচ্চারণের সাহস পাবেন না। দেশকে ভালবাসার জন্য বড়ো ঘরে নেতার ঔরসজাত হতে হয় না, মা-বাবার-স্বামীর নাম ভাঙ্গিয়ে নয়, কারও দয়া-দাক্ষিণ্য লাগে না। লাগে আদর্শ। আর সে-আদর্শ আপনি ও আপনার সহকর্মীরা ধারণ করেন। জয় আপনাদের অনিবার্য।

    শুক্রবার, ১ জুলাই ২০১১

    লন্ডন, ইংল্যান্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন