• কাদের সিদ্দিকীঃ শাড়ি না-পরা বীরপুরুষ
    মাসুদ রানা

    কাদের সিদ্দিকী প্রায়শঃ নিজের বীরত্ব বুঝাতে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কাহিনী উল্লেখ করেন। সর্বশেষ আজ মঙ্গলবারেও করলেন।

    আমি মনে করি না, এটি তাঁর বারবার উল্লেখ করা প্রয়োজন আছে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশিষ্ট ভূমিকা বাংলাদেশের সবাই জানেন। তিনি সে-জন্য শ্রদ্ধেয়। তিনি বীর। তিনি তাঁর নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সেটিও তাঁকে বীরত্বের সম্মান দিয়েছে।

    কিন্তু বীরত্বের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে কাদের সিদ্দিকীর যত্নের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। কেনো আমি এ-কথা বললাম, তার আগে তার নীতি-পাথর স্থাপন করে বলি, বীরেরা কখনও বন্দীকে হত্যা আর নারীকে অপমান করেন না।

    কাদের সিদ্দিকী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়তে গিয়ে সশস্ত্র শত্রুকে হত্যা করেছেন। সেটি বীরত্ব। কিন্তু তিনি বিজয়ী হবার পর শত্রুকে বন্দী ও নিরস্ত্র অবস্থায় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে যেভাবে জন-সমুখে হত্যা করেছেন, সেটি কিন্তু বীরত্ব নয়, বরং তার বিপরীত বৈশিষ্ট্য।

    পুরুষত্ব দেখাবার জন্য বাংলাদেশের পুরুষদের মধ্যে এক ধরনের লিঙ্গ-প্রদর্শনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এটি করতে যেয়ে নিজেদের পরিধান খুলে ফেললেও সম্ভবতঃ আপত্তির কিছু থাকতো না। কিন্তু খুবই আপত্তির বিষয় হচ্ছে, তাঁরা প্রায়ই বিপরীত লিঙ্গের পরিধেয় বস্ত্রকে নীচু দেখিয়ে পরোক্ষভাবে নিজেদের লিঙ্গ প্রদর্শন করেন।

    কিন্তু তাঁরা ভুলে যান, ঐ নীচু দেখানো বস্ত্রটি পরিধান করেন তাঁদের মায়েরাও। আর সেই বস্ত্রের নীচে ঢাকা নারীর যোনি-পথেই সকল বীরের জন্ম হয়েছে। অকৃতজ্ঞ বীরেরা সে-কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সেই বস্ত্রের অপমান করেন।

    আজ কাদের সিদ্দিকী গিয়েছিলেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে তাঁর সঙ্গীদের কয়েকজনকে পুলিস গ্রেফতার করে। কাদের সিদ্দিকী বীরের মতোই তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু পুলিস তাঁর প্রতিবাদে গ্রেফতারিত কর্মীদের মুক্তি দেয়নি। সুতরাং কাদের সিদ্দিকী এক অভিনব পন্থা ধরলেন। তিনি বিএনপি’র কার্যালয়ের সামনে গামছা পেতে শুয়ে পড়লেন। আর বললেন, তাঁকে মার-পিট করা হলেও তিনি নড়বেন না।

    তিনি বলেছেন, বিএনপির চলমান হরতালের কারণে দেশে যে-অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে, সে-ব্যাপারে দরদস্তুর করার জন্য তিনি বিএনপি কার্যালয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর পরিকল্পনা ছিলো আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও যাওয়ার। কিন্তু তাঁর এতোই ঘৃণার উদ্রেগ হয়েছে যে, তিনি আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে দেখা করে কথা বলার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন।

    বাংলাদেশের রাজনীতিকদের অনেক এ্যাকশনেইর আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। কাদের সিদ্দিকীর কর্মীদের গ্রেফতার করেছে পুলিস। এর জন্য তিনি দায়ী করছেন আওয়ামী লীগ সরকারকে। এটি সম্পূর্ণ ঠিক আছে। তিনি বলেছেন, ‘এমন অসভ্য সরকার আমি জীবনে দেখিনি।’ হয়তো এটিও ঠিক আছে।

    কিন্তু তিনি ‘আমরণ অনড়ন’ প্রকারের এই অভিনব প্রতিবাদটি পুলিস ভবন, কিংবা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে, কিংবা তাঁর নিজ-দলের কার্যালয়ের সামনে না করে, বিএনপির কার্যালয়ের সামনে করলেন কেনো?

    আমি ভাবি, তিনি আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পদার্পণ না করে ও দলটির নেতাদের সাথে কোনো কথা না বলে ঐ ‘আমরণ অনড়ন’ প্রতিবাদটি তো সেখানেও করতে পারতেন। বিএনপির কার্যালয়ের সামনে ভূমি-শয্যা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মধ্যে কী যুক্তি থাকতে পারে?

    বীর কাদের সিদ্দিকীর বীরত্ববোধ হয়তো খানিকটা কম্পিত হয়ে থাকবে এই ভেবে যে, আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে গিয়ে গামছা পেতে শুতে গেলে, পুলিস কিছু না করলেও আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁর বস্ত্রহরণ করতে পারে। গণস্থানে পুরুষের বস্ত্রহরণের নব্য দুর্যোধনপনা এ-দলের কর্মীদের মধ্যে অতীতে লক্ষ্য করা গেছে।

    ভীষ্মের মতো শ্বেত-শ্মশ্রুধারী বঙ্গীয় বীর কাদের সিদ্দিকী হয়তো ভেবে থাকবেন, মিত্র বিএনপির কার্যালয়ের সামনে শর-শয্যার মতো গামছা-শয্যা গ্রহণ করলে, বিএনপির নেতা-কর্মীদের দরদ বর্ষিত হবে তাঁর ওপর এবং তিনি নিরাপদে তাঁর বীরত্ব প্রকাশ করতে পারবেন। তিনি হিসেব-নিকেশ করেই এবং সুবিধা-অসুবিধা বুঝে তবেই এই বীরত্ব দেখিয়েছেন।

    যাহোক, পুলিস কাদের সিদ্দিকীর বীরত্ব দেখে তাঁর কর্মীদের ছেড়ে দেয়। ফলে কাদের সিদ্দিকী এবার ভূমি শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে গামছা ঝেড়ে গর্ব-স্ফীত বুকে বললেন, ‘আমি গামছা পরি। কিন্তু তাই বলে আমি শাড়ি পরা কোনো কাপুরুষ না। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমিই প্রতিবাদ করেছি।’ বাঙালী জাতি আবারও মুগ্ধ হলো।

    খবরটা দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতায় পড়ে কয়েকটি প্রশ্ন বেয়াড়া হয়ে উঠলো বলে বীর কাদের সিদ্দিকীকে জিজ্ঞেস না-করেই পারছি নাঃ  হে বীরবাহু, আপনার দেশে কোন্‌ কাপুরুষ শাড়ি পরে থাকে, বলবেন কি? আর কাপুরুষত্বের সাথে শাড়ি-পরিধানকে সংযুক্ত করলেন কেনো? শাড়ি নারীর বস্ত্র বলে?

    শাড়ি-পরা মানুষের নেতৃত্বাধীন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাঁরই অধস্তন এক নেতার সাথে কথাবার্তা বলে ফিরে যাবার কালে, তাঁরই দরোজার সমানে আপনি শাড়িকে নীচু করে নিজের বীরত্ব জাহির করলেন! আশ্চর্য্য বীরত্ব ও পুরুষত্ব আপনার!

    কিন্তু বলি হে পুরুষ, শাড়ি না পরে, গামছাই পরুন, কিংবা লেংটিই পরুন, কিংবা কিছুই না পরুন, কিন্তু শাড়ি-পরাকে খাটো করে বস্তুতঃ নারীকে খাটো করার মধ্য দিয়ে নিজের পুরুষত্ব কিংবা বীরত্ব কোনোটাই প্রকাশিত হয় না।

    তবে একটি বিষয় বিলক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে, আর তা হচ্ছে পশ্চাৎপদ একটি পুরুষবাদী বাঙালী মনোভঙ্গি যা বিশ্ব-সংস্কৃতিতে ‘অসভ্যতা’ হিসেবে বিবেচিত।

    মঙ্গলবার, ২৫ এপ্রিল ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন