• কী লিখেছেন গুন্টার গ্রাস, কবিতায়?
    মাসুদ রানা

    সাহিত্যে নোবেল-জয়ী ৮৪ বছর বয়েসী জার্মান কবি এ-সপ্তাহে সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠেছেন বিশ্ব-জুড়ে, একটি কবিতা লেখার জন্য। কবিতার জার্মান শিরোনাম ‘Was gesagt werdenmuss’, যার ইংরেজি অনুবাদ ‘What Must Be Said’, আর বাংলায় হতে পারে, ‘যা বলতেই হবে’।

    কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে প্রায় সাথে-সাথেই। আর সেই সুবাদেই পড়তে পেলাম কবিতাটি। কোথায়ও বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে বলে চোখে পড়েনি আমার। বিশ্ব-বোধহীন আজকের বাঙালীর চেতনা সঙ্কটজনক-ভাবে স্থানিক ও আত্ম-কেন্দ্রিক বলে এর সম্ভাবনাও কম।

    তবুও জানতে চাইঃ কী বলেছেন কবি, যার জন্য ক্ষেপে উঠেছেন জার্মানী থেকে শুরু করে ইসরায়েল পর্যন্ত রাজনীতিক নেতারা? গুন্টার গ্রাস নিজেই ষাটের দশক থেকে যে-জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থক, তার নেত্রী অ্যান্দ্রিয়া নাহলেজ বলেছেন, গ্রাসের ‘কবিতাটি বিরক্তিকর’। প্রচলিত ও শক্তিশালী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখনই কোনো লেখা প্রকাশিত হয়, তখন ভাগ্যে ‘বিরক্তিকর’ জাতীয় কলঙ্ক জোটে। গুন্টার গ্রাসের লেখা কবিতাটির ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা।

    গুন্টার গ্রাসের কবিতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে ‘বিশ্ব-বিবেকের’ অতি সংবেদনশীল অস্ত্র ‘এ্যান্টি-সেমিটিজম’, অর্থাৎ ‘ইহুদি-বিদ্বেষবাদ’। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন কবি গুন্টার গ্রাসকে। তিনি ইঙ্গিতে বলেছেন, এক সময়কার নাৎসী বাহিনীর সদস্য গুন্টার গ্রাস যে ইহুদি-বিদ্বেষী হবে, তাতে আশ্চর্য্যের কিছু নেই।

    এখন পৃথিবীতে রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল যে-ইস্যুটি জীবন্ত, তা হচ্ছে ইরানের উপর ইসরায়লের ‘যে কোনো সময়ে আঘাত’ করার হুমকি। আর এ-হুমকির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ইসরায়লের বিরুদ্ধে ইরানের কাল্পনিক হুমকিকে ভিত্তি করে। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, সে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী চেষ্টা করছে গোপনে। ইরান বলছে, ‘করছি না’। কিন্তু ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বলছে, ‘না তুমি করছো’। এ-হচ্ছে অনেকটা হরিণ শাবকের বিরুদ্ধে বাঘের জল-ঘোলা করার অভিযোগের মতো।

    সত্য-দ্রষ্টা কবি গুন্টার গ্রাস এ-বিষয়টিকেই উপজীব্য করে লিখেছেন তাঁর কবিতা ‘যা বলতেই হবে’। আমার সন্দেহ, অধিকাংশ বাঙালী পাঠকেরই সুযোগ হবে না পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত কবিতাটি পাঠ করার। তাই আজকের লেখায় আমি আলোকপাত করছি এই কবিতাটার উপর।

    গ্রাসের কবিতাটি বিশাল, যার পূর্ণ অনুবাদ ও আলোকপাত এখানে সম্ভব নয় স্থানাভাবে। তবে, এর নয়টির মধ্যে আমি প্রথম চারটি স্তবক বাংলায় অনুবাদ করে তুলে দিলাম - কবিরা নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি কবির খাতায় নাম লিখাচ্ছি নাঃ

    Why do I stay silent, conceal for too long
    What clearly is and has been
    Practiced in war games, at the end of which we as survivors
    Are at best footnotes.

    কেনো আমি নীরব রয়েছি, গোপন রেখেছি দীর্ঘ কাল
    যা স্পষ্ট চর্চায় এবং হয়ে আসছে
    চর্চিত যুদ্ধ ক্রীড়ায়, যার শেষে আমরা বিজয়ীর বেশে
    সর্বোচ্চে থাকি পাদটীকায়।

    It is the alleged right to first strike
    That could annihilate the Iranian people--
    Enslaved by a loud-mouth
    And guided to organized jubilation--
    Because in their territory,
    It is suspected, a bomb is being built.

    এ-হলো প্রথম আক্রমণের দাবিকৃত অধিকার
    যা নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে ইরানবাসীদের  --
    যাঁরা শৃঙ্খলিত বাগাড়ম্বরে
    আর ধাবিত সাজানো উল্লাসে --
    কারণ তাঁদের সীমানায়
    সন্দেহিত, তৈরী হচ্ছে অণুবোমা অতিকায়।

    Yet why do I forbid myself
    To name that other country
    In which, for years, even if secretly,
    There has been a growing nuclear potential at hand
    But beyond control, because no testing is available?

    কেনো এখনও আমি রুখেছি নিজেকে
    মুখে আনতে নাম অন্য সে-দেশটির,
    যেখানে বহু বছর ধরে,  এমনকি গোপনেও,
    পরমাণু বিভব বেড়ে উঠেছে হাতে
    অনিয়ন্ত্রণে, কারণ পরীক্ষার নেই উপায়?

    The universal concealment of these facts,
    To which my silence subordinated itself,
    I sense as incriminating lies
    And force--the punishment is promised
    As soon as it is ignored;
    The verdict of "anti-Semitism" is familiar.

    এই সত্যেগুলোর বিশ্ব-গোপনতা
    যার অধীনস্থ হয় আমার নীরবতা
    আমি অনুভব করি কুৎসিত মিথ্যা
    ও শক্তি রূপে -- শাস্তি সংকল্পিত
    উপেক্ষার সাথ-সাথ;
    জানি পরিচিত রায় ‘ইহুদি-বিদ্বেষবাদ’।

    প্রায় সাড়ে চারশো শব্দের এই কবিতাটি আধুনিক ঢংয়ে লেখা। কবিতাটি গুন্টার গ্রাস শুরু করেছেন তাঁর আপন নীরবতাকে চ্যালেইঞ্জ করে। নিজেকে প্রশ্ন করার সাথে-সাথে তিনি একটি অন্যায় চর্চার কথা ইঙ্গিত করেছেন প্রথম স্তবকে এবং এর বর্ণনা দিয়েছেন দ্বিতীয় স্তবকে, আর সেটি হচ্ছে ‘প্রি-এম্পিটিভ এ্যাটাক’ বা অগ্রীম আক্রমণের 'ডক্ট্রিন'।

    ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনের ‘উইপেন অফ ম্যাস ডেস্ট্রাকশন’ আছে বলে সন্দেহ করে অগ্রীম আক্রমণ করার যে নীতি, তার ভিত্তিতেই সম্ভাব্য ইরান আক্রমণ জায়েজ করার তত্ত্বকে উন্মোচিত করেছেন গ্রাস তাঁর কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে, যদিও তিনি ইরাকের কথা এখানে উল্লেখ করেননি। কিন্তু এটি চর্চিত হয়ে আসছে, তার উল্লেখ তিনি বিলক্ষণ করেছেন।

    তৃতীয় স্তবকে আবার প্রশ্ন করেছেন কবি নিজেকে তাঁর নীরবতাকে কষাঘাত করে। তিনি বলেছেন, বিশ্ব-জুড়ে সত্যকে ঢেকে রাখার যে-চেষ্টা, তার কাছে তিনি এ-পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে এসেছেন। এ-স্বীকারোক্তির জন্য কবিকে অবশ্যই একটি সৎ সাহস অর্জন করতে হয়েছে নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করার মধ্য দিয়ে।

    চতুর্থ স্তবকে কবি মিথ্যাকে কুৎসিত অপরাধ রূপে অনুভব করেছেন এর শক্তি সম্পর্কে সচেতন থেকেও। তিনি এও বুঝেছেন, এই মিথ্যাকে উপেক্ষা করলে তার জন্য শাস্তিও তৈরী রয়েছে। তিনি জানেন, ইসরায়লের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু উচ্চারণ করলেই সারা পৃথিবী জুড়ে হৈচৈ তৈরী হবে, আর মহা অপরাধীর মতো তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চারিত হবে সেই সুপরিচিত অমোঘ রায়ঃ ‘তুমি হিহুদি বিদ্বেষী’।

    গুন্টার গ্রাস মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক শ্রম শিবির থেকে প্রেরিত হয়েছিলেন নাৎসী ভাফেন এসএস বাহিনীতে কাজ করার জন্য। এটি তাঁর নির্বাচিত পেশা ছিলো না - ছিলো বাধ্যতামূলক। আর, এ-কথা গ্রাস নিজেই ২০০৬ সালে তাঁর আত্ম-জীবনীতে উল্লেখ না-করলে আমরা হয়তো কখন জানতামই না যে, ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল-জয়ী গুন্টার গ্রাস তাঁর টিনএইজে মনের অনিচ্ছায় নাৎসীবাদের পক্ষে কাজ করেছেন।

    সাহিত্যে নোবেল-জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদের সমর্থক ছিলেন। ফ্যাসিবাদের প্রতি তার শ্রদ্ধার উদয় হয়েছিলো তাঁর পরিণত বয়েসেই। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর ‘বুঝা’র ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে শুধরে নিয়েছেন।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন-ভাবেই ‘টার্ন’ করেছেন যে, বাকী জীবনে জুড়ে তিনি যে-কোনো পরিস্থিতিতে একটি বিপজ্জনক আদর্শ হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদের’ বিরোধিতা করে গেছেন। যদিও বাংলার জাতীয়তাবাদী সুভাষ বসুর প্রতি তাঁর একটি মায়া রয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে তিনি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য প্রচলিত বিশ্ব-ব্যবস্থাকে চ্যালেইঞ্জ করে না - অন্ততঃ সরাসরি করে না - বলেই তাঁর পরিণত বয়সে ‘ফ্যাসিবাদী ফ্যাসিনেশন’ থাকার পরও কেউই তাঁকে গালমন্দ করেন না। অথচ, গুন্টার গ্রাস সারা জীবন জার্মান নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে স্থির অবস্থান নেবার পরও আজ তাঁকে এই ৮৪ বছর বয়সে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ গালি শুনতে হচ্ছে। তাঁকে যে এ-গালি শুনতে হবে, তা তিনি তাঁর কবিতায়ই উল্লেখ করেছেন। ঠাকুর ও গ্রাসের কবিতা ভিন্ন-ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরীতে সক্ষম হলেও এঁদের দু-জনের একটি জায়গায় মিলের জায়গাও আছে। সেটি হচ্ছে উপলব্ধির প্রতি সৎ থাকা এবং পরিণতি না বিবেচনা করেই নিঃসঙ্কোচে তা প্রকাশ করা।

    রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিশ্বাসের বাইরে কাজ করেননি। তিনি দর্শনে গান্ধীবাদী ছিলেন বলেই যে-কোনো সংঘাত ও হিংসার বিরোধিতা করেছেন। তিনি যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও বিপ্লবাত্মক সংগ্রামকে সমর্থন করেননি, একই ভাবে তিনি রাষ্ট্রশক্তির সশস্ত্র আক্রমণকেও সমানভাবে বিরোধিতা করেছেন। তাই, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সামরিক শক্তি যখন পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা বাগে নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালিয়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে হত্যা করলো, তার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দেয়া তাঁর নাইটহুড - অর্থাৎ ‘স্যার’ উপাধি - ফিরিয়ে দিয়েছেলেন।

    আজ যখন পৃথিবীর প্রবল শক্তিগুলো ইসরায়লের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে শুরু করে সামরিক আক্রমণের পূর্ব-প্রস্তুতি নিচ্ছে, কবি গুন্টার গ্রাস তখন নিজের নাৎসী ইতিহাস রয়েছে জেনে, তার বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্বেষবাদের অভিযোগ উঠবে জেনেও তিনি নীরবে বসে থাকেননি। তিনি বলেছেন, ‘যা বলতেই হবে’ বলে তিনি বিশ্বাস করেছেন। আর এখানেই আমাদের মতো বিষয়-বুদ্ধি সম্পন্ন সাধারণ মানুষের সাথে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা কবি গুন্টার গ্রাসদের পার্থক্য।

    রোববার, ৮ এপ্রিল ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

    masud rana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন