• কোকোর মৃত্যুর আফটারম্যাথঃ শেখ হাসিনার সঠিক নীতির ভুল পদক্ষেপ
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর পরবাসে মৃত্যুলীন হওয়ার সংবাদ পড়ে একটি নৌটে লিখেছিলাম

    “খালেদা জিয়ার স্বল্পালোচিত কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু তাঁর পরিবারের বাইরে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেইঞ্জ তৈরি করে থাকবে শেখ হাসিনার জন্য।

    সম্ভবতঃ ইচ্ছার বাইরে হলেও রাজনৈতিক সৌজন্যতা প্রদর্শনের প্রয়োজনে বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগের প্রধান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে হবে প্রধান বিরোধী দল ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্রের মৃত্যুতে।

    কিন্তু এই দুই নেত্রী তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে এমনই অরাজনৈতিকভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং পরস্পরের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে  ব্যক্তিগত হিংসা ও নিন্দা চর্চার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন, যা সারা জাতির সামাজিক সৌজন্যতার মনোস্তাত্ত্বকে রূপতঃ বিষাক্ত করে তুলেছে।

    দৃশ্যতঃ পরস্পরের প্রতি বিষাক্ত বাক্যবাণে খালেদা জিয়ার চেয়ে শেখ হাসিনা অনেক অগ্রগামিনী। তিনি নিজেকে তাঁর দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও দেশবাসীর কাছে যেরূপে জিয়া-পরিবার-ঘৃণাকারিনী হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন, সেখান থেকে কোকোর মৃত্যুতে সমবেদনা জানানোটা তাঁর জন্য বেশ জটিল হতে পারে।

    আবার, তিনি এই 'সুযোগ' কাজে লাগিয়ে উদারতার পরিচয়ও দিতে পারেন। তিনি এমনকি খালেদা জিয়ার প্রতি সমবেদনা প্রদর্শন করে রাজনৈতিক সংলাপের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। সুতরাং, যেকোনো বিবেচনায় কোকোর মৃত্যু শেখ হাসিনার জন্যে একটি চ্যালেইঞ্জ। দেখা যাক তিনি কী পদক্ষেপ নেন।”

    আমার লেখাটি ফেইসবুকে প্রকাশিত হওয়ার ৩ ঘণ্টা পর জানা গেলো শেখ হাসিনা রাত ৮টায় খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে যাবেন ঢাকার গুলশানে অবস্থিত বিএনপির কার্যালয়ে। তিনি গিয়েছেনও রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে। কিন্তু বিএনপি কার্যালয়ের ‘কপাট বন্ধ’ দেখে ৮টা ৪০ মিনিটে ফিরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে।

    উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া প্রথমে নিজ বাসভবনে ও পরবর্তীতে দলীয় কার্যালয়ে সরকারী প্রতিবন্ধকতায় অবরুদ্ধ হয়ে থাকার পর গত কিছুদিন ধরে স্বেচ্ছায় তাঁর দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন তাঁর ঘোষিত চলমান অবরোধ-আন্দোলনের অংশ হিসেবে।

    আজ খালেদা জিয়ার সাথে শেখ হাসিনার এই শোক-সাক্ষাতের প্রচেষ্টা রাজনৈতিকভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ধারণা করছি, আগামী কয়েকদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু রাজনৈতিক বিতর্ক চলবে। বিতর্ক চলবে দুই লাইনে।

    আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী পক্ষের লোকেরা বলবেন, শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার পুত্রের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিএনপি কার্যালয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা বলবেন, খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার সাথে দেখা করবেন না বলেই তিনি ঘুমের ভান করে নিজেকে দূর করে রেখেছেন। সুতরাং খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ অসহযোগিনী।

    বিএনপি ও বিএনপি পক্ষের লোকেরা বলবেন, খালেদা জিয়া যখন পুত্রশোকে মূহ্যমান এবং যখন তাঁকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, তখন দায়িত্বশীল পর্যায়ে যোগাযোগ ও আয়োজন করা ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তাৎক্ষণিকভাবে খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়াটা তাঁর সদিচ্ছাকে প্রতিফলিত করে না। সুতরাং শেখ হাসিনা অনান্তরিকতা প্রদর্শনকারিনী।

    এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রয়োজন হচ্ছে ঘটনাসমূহের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। কারণ, বংশধারায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ক্ষমতা সঞ্চালিত হওয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের এই বাংলাদেশে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রীর মধ্যে এক নেত্রীর পুত্রহারা হওয়া জনমনে একটি অভিঘাত সৃষ্টি করবেই। তাই, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে যখন অবরোধ আন্দোলন চলছে, তখন তাঁর ছেলের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনের উপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তবে কী ধরণের প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করছে প্রধানতঃ খালেদা জিয়ার পদক্ষেপের ওপর।

    আমি মনে করি, খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনা অনুভূত কিংবা প্রদর্শিত সমবেদনা একটি প্রশংসনীয় বিষয়। একটি ‘ডেমোক্র্যাসি’তে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান দলের শীর্ষ নেতার মধ্যে স্বজনহারানোর ঘটনায় পরস্পরের প্রতি সমবেদনা জানানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সৌজন্যতার অংশ। শেখ হাসিনা সেই সৌজন্যতা প্রদর্শন করে নীতিগতভাবে একটি ভাল কাজ করেছেন।

    কিন্তু বস্তবতা হলো এই যে, শেখ হাসিনা প্রায় সাথে-সাথেই খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর দলীয় কার্যালয়ে দেখা করতে গেলেও দেখা করতে পারেননি। তাই, তাঁকে ৫ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসতে হয়েছে দৃশ্যতঃ ব্যর্থ মনোরথে।

    শেখ হাসিনার এই ব্যর্থতা প্রত্যাশিত ও পূর্বপরিল্পিত কি না, সেদিকে দৃকপাত না করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই তাৎক্ষণিকভাবে যাওয়াটা প্র্যাক্টিক্যাল ছিলো না বলে তাঁকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হলো।

    খালেদা জিয়া পুত্রশোকে মূহ্যমান বলে দাবী করা হলে তাকে অভিনয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যৌক্তিক হবে না। তাই, শেখ হাসিনার উচিত ছিলো একটি অর্থপূর্ণ কণ্ডৌলেন্স ভিজিট বা শোক-সাক্ষাতের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন সম্পন্ন করেই রওনা হওয়া।

    শেখ হাসিনার প্রথমতঃ উচিত ছিলো একটি ইতিবাচক কণ্ডৌলেন্স স্টেইটমেণ্ট বা শোক-বার্তা দিয়ে এর ক্ষেত্র প্রস্তুতির সূচনা করা।

    দ্বিতীয়তঃ তাঁর উচিত ছিলো নিয়মের অনুমোদন সাপেক্ষে কোকোর মরদেহ দেশে আনার জন্যে সহায়তার ঘোষণা দেওয়া।

    তৃতীয়তঃ তাঁর উচিত ছিলো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের পর খালেদা জিয়াকে তাঁর নিজের বাসভবনে গিয়ে পুত্রশোকের ব্যবস্থা করা।

    চতুর্থতঃ শেখ হাসিনার উচিত ছিলো দলীয় পর্যায়ে দরদস্তুর করে এই ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে সরকারের প্রত্যাশিত সংলাপের প্রস্তাব করা।

    শেখ হাসিনার প্রকৃত রাজনৈতিক উপদেষ্টারা বিষয়টি নিয়ে যৌক্তিকভাবে ভেবে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন কি না, কিংবা তাঁকে সেই পরামর্শ দেওয়া যায় কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু নীতিগতভাবে সঠিক হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপ যে পদ্ধতিকগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ, তা তাঁর শোক-সাক্ষাত প্রচেষ্টার ব্যর্থতা থেকে স্বতঃপ্রমাণিত।

    তবে, আমি মনে করি এখনও সুযোগ আছে। শেখ হাসিনা যদি কোকোর মৃত্যুর ‘আফটারম্যাথ’ বা অনুগামী ঘটনার প্রতি ইতিবাচক না হন, তাহলে চলমান আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে।

    বিশেষতঃ খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান যদি ব্রিটেইনের স্বেচ্ছানির্বাসন ত্যাগ করে মালেসিয়া হয়ে তাঁর সহোদরের মরদেহ নিয়ে গ্রেফতারের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে জননীর পাশে দাঁড়াবার জন্যে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তাহলে রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুতর অভিঘাত তৈরি হতে পারে।

    শনিবার ২৪ জানুয়ারী ২০১৫
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন