• ক্ষমো প্রভূ অপরাধঃ বিনীত জামায়াত
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশে ধর্মবাদী জামায়তে ইসলামী’র আহুত হরতালে মার্কিন দূতাবাসের গাড়ী আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, দলটি নিজ উদ্যোগে তদন্ত করে নিজদের দোষ খুঁজে পেয়েছে। নিজ-তদন্তে নিজ-দোষ খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস বঙ্গে বিরল। তাহলে কি জামায়াতে ইসলামী সেই বিরল গুণের অধিকারী?

    বাংলাদেশে তদন্ত চলে শম্ভুক গতিতে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর রকেট-গতি। অপরাধ করার সাথে-সাথেই তদন্ত। তদন্তের সাথে-সাথেই দোষ স্বীকার। আর দোষ স্বীকার করার সাথে-সাথেই ক্ষমাপ্রার্থনা। উপরন্তু, ক্ষতিপূরণের অঙ্গীকার! তাহলে কি জামায়াতে ইসলামী বেশ মানবিক? 

    যে-দলটি ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতির বিরুদ্ধে, মানবতার বিরুদ্ধে তার কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়নি, কিংবা অদ্য সাধারণ মানুষের ও রাষ্ট্রের সম্পত্তি ধ্বংস করার জন্যও ক্ষমা চাচ্ছে না, সে-দলটির নেতারা তাঁদের পবিত্র-জ্ঞাত ‘আসমানী কিতাব’ পুড়ানোর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্থিব যন্ত্র-শকট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষতিপূরণের ওয়াদা-সহ ক্ষমা চাইলো! কী ব্যাপার?

    এটি দারুন এক বৈসাদৃশ্যের  ব্যাপার। এই বৈসাদৃশ্যের ভাব প্রকাশ করে বাংলা বাগধারায় বলা হয়ঃ ‘ভূতের মুখে রাম-নাম’। কিন্তু প্রকাশটা একেবারে ইসলাম-বিবর্জিত। ভীষণ ‘হিন্দুয়ানী’, যা জামায়াতী ‘ধর্মানুভূতি’কে আঘাত করতে পারে। কেনো বলি নাঃ ‘ইবলিশের মুখে আল্লাহ্‌-নাম’?

    নাহ্‌। এটিও ঠিক হলো না। কারণ, কুরআনে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে ‘আল্লাহ্‌’র নাম নিতে ‘ইবলিশ’-এর কোনো সমস্যা ছিলো না। বরং ‘ইবলিশ’ ছিলেন দারুন ‘আল্লাহ’-ভক্ত। বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডে নাকি এমন কোনো স্থান ছিলো না, যেখানে তিনি ‘আল্লাহ’কে ‘সিজদাহ্‌’ করেননি। তিনি সম্মানীত উপাসক ছিলেন। কিন্তু মানুষকে সম্মান ও ভক্তি করতে ‘ইবলিশ’-এর ছিলো ঘোরতর আপত্তি।

    ‘ইবলিশ’ ছিলেন ধোঁয়াহীন বিশুদ্ধ অগ্নিশিখায় তৈরী। বিপরীতে, মানুষ ছিলো মাটির তৈরী। আর, এখানেই ছিলো মানুষের প্রতি ‘ইবলিশ’-এর ঘৃণার কারণ। মার্ক্সবাদীরা হয়তো বলবেন, এইটি শ্রেণী-শত্রুতা। কিন্তু নিজের সৃষ্টিকর্তা ‘আল্লাহ্’‌র প্রতি কোনো ঘৃণা ছিলো না ‘ইবলিশ’ মহাশয়ের। তিনি যত্রতত্র সিজদাহ্‌ করছেন তাঁর প্রভূকে।

    জামায়াতে ইসলামীর কোনো ঘৃণা নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি। এ-দলটির ঐতিহাসিক ঘৃণা রয়েছে বাঙালী-সাধারণের প্রতি, যাঁরা প্রকৃতই মাটির মানুষ। জামায়াতের আদর্শগত ঘৃণা বাঙালী-সংস্কৃতি, বাংলা-ভাষা ও বাঙালী-সত্ত্বার প্রতি। সেই ঘৃণারই তীব্রতম প্রকাশ তাঁরা ঘটিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে। বাংলায় জন্মে ও বাংলায় বেড়ে এই দলটির নেতা-কর্মীগণ বাংলা ও বাঙালীত্বকে ধ্বংস করতে মত্ত হয়েছিলেন।

    ১৯৭১ সালে প্রভূ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাঙালীর উপর নাখোশ ছিলো। কারণ মুক্তিকামী বাঙালী তার স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে ‘সমাজতন্ত্র’র দাবি করতে শুরু করেছিলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব-পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের শত্রু সোভিয়েত-শিবিরের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলো। প্রভূর কাছে এই সমাজতন্ত্র ও সাম্যের ধারণাগুলো খুবই অপছন্দের। তাই পাকিস্তানী পুঁজিপতি ২২-পরিবারের অভ্যন্তরীন উপনিবেশ ও শোষণক্ষেত্র পূর্ববাংলায় সংঘটিত গণহত্যার পরও বাঙালীর মুক্তির অদম্য প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘সপ্তম নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিলো।

    হায়, সেদিন সমাজাতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্র যদি মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে তার অষ্টম নৌবহর পাঠানোর পাল্টা-হুমকি না দিতো, তাহলে কী হতে পারতো, তা যেনো আজ কল্পনা করাও কঠিন। সে-জন্যই বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী শক্তির কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ‘সিজদাহ’-যোগ্য প্রভূ (নাহ্‌, কথাটা পূর্ণ অর্থ-প্রকাশক হলো না। কারণ, এখন বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের পাইকারদের কাছেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপাস্য)।

    জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা তাঁদের ঘৃণিত বাংলায় হরতাল ঘটানো-কালে প্রভূ-রাষ্ট্রের পবিত্র বাহনে আক্রমণ করে যেনো পাপ-বোধে দগ্ধ হচ্ছে। দৃশ্যতঃ ক্ষমাটা চেয়েছে সে-জন্যই। অন্তর্নিহিত কারণ যা-ই হয়ে থাকুক, জামায়াতকে তখনও রক্ষা করেছে, এখনও রক্ষা করছে এবং ভবিষ্যতেও রক্ষা করতে পারে প্রভূ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং ভূতের মুখে রাম-নাম নিতে দেখে অবাক হবার বিষয় থাকলেও, মানবতা-বিরোধী অপরাধ করেও অনুতাপহীন জামায়াতে ইসলামীর মুখে মার্কিন প্রভূর দরবারে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে দেখায় অবার হবার কিছু নেই।

    কিন্তু অবাক বিষয় হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর হঠাৎ-করে রাষ্ট্রের উপর চড়াও হওয়ার বেনজির ঘটনা। জামায়াতে ইসলামীর ‘ক্যাডার’দের সাথে আওয়ামী লীগের ‘ক্যাডার’দের - এমনকি বিএনপির ‘ক্যাডার’দের - সাথে খুনোখুনির ঘটনা নতুন কিছু নয়। নতুন ঘটনা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি জামায়াতের ‘ক্যাডার’দের চড়াও হওয়া।

    জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তায় কাজ করেন অল্পই। তাঁদের কাজ - তা অন্যের হাতে লগি-বৈঠার আঘাত সহ্য করাই হোক কিংবা অন্যের হাত-পায়ের রগ-কাটাই হোক - পরিকল্পনার বাইরে তাঁরা সাধারণতঃ কিছুই করেন না। ভাবনার দাবি রাখেঃ ওঁরা হঠাৎ করে রাষ্ট্রের উপর ক্ষেপে গেলো কেনো? হাতের কাছে পাওয়া উত্তরটি হচ্ছেঃ রাষ্ট্রকে এই ইঙ্গিত দেয়া যে, ওঁদের কারাবন্দী নেতাদের কিছু হলে এর প্রতিক্রিয়া হবে ভীষণ।

    অবাক হবার কিছু নয় যে, মার্কিন শকট ভেঙ্গে ক্ষমা চেয়ে জামায়াতে ইসলামী বেবুঝ বাঙালীকে বুঝিয়ে দিলোঃ ‘মনে রেখো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখনও আমরা ‘সেজদাহ্’‌ করি, তিনি এখনও আমাদের প্রভূ। সুতরাং এতো ফেল্‌না মনে করো না আমাদের।’

    এই বার্তা তাঁদের জন্য হৃদ-কাঁপানো, যাঁরা নিজেরা মার্কিন প্রভূকে ‘সিজদাহ’ দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। ওঁদের কাছে সত্যি ভাবনার ব্যাপারঃ প্রভূর সিজদাহকারীকে আঘাত করলে প্রভূ আঘাত পাবেন না তো?

    বুধবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অসাধারণ। ধন্যবাদ মাসুদ রানা।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন