• গণতন্ত্র সঙ্কটেঃ পথে ও পার্লামেন্টে
    মাসুদ রানা

    প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র চর্চার দুটো ভেন্যু - রাজপথ ও পার্লামেন্ট। রাজপথ জনগণের আর পার্লামেন্ট জন-প্রতিনিধির। রাজপথ হচ্ছে দাবীর, আর পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ণের। রাজপথে দাবী উচ্চারিত করেন জনগণ। পার্লামেন্টে সে-দাবীকে বিবেচনায় নিয়ে আইন তৈরী করেন জন-প্রতিনিধিগণ।

    কিন্তু পথের দাবী যখন পার্লামেন্টকে লক্ষ্য করে উচ্চারিত না হয়, কিংবা পার্লামেন্ট যদি পথের দাবীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন হয়, তখন গণতন্ত্র একটি সিস্টেম হিসবে কাজ করতে পারে না। ফলে যা দাঁড়ায়, তার একদিকে থাকে নৈরাজ্যবাদ ও অন্যদিক স্বৈরতন্ত্র। নৈরাজ্যবাদে রাষ্ট্র দুর্বল হয় আর স্বৈরতন্ত্রে হয় প্রবল। কিন্তু উভয় পরিস্থিতিই জনগণের জন্য দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টে আর বিএনপি রাজপথে। তার আগে বিএনপি ছিলো পার্লামেন্টে আর আওয়ামী লীগ রাজপথে। এভাবেই পালা-বদল হচ্ছে দু-দশক ধরে। উভয়ই শাব্দিক প্রকাশে গণতন্ত্রের জন্য যার-পর-নাই ‘নিবেদিত’। তারা জনগণকে ‘সম্মানীত’ বলে সম্বোধন করে এবং একমাত্র ‘জনগণের রায়’ নিয়েই ক্ষমতায় যেতে চায়।

    দেশের জনগণ জানেন, এগুলো মিথ্যা কথা। কিন্তু মিথ্যার সাথেই বসবাস বাংলাদেশের জনগণের। তাঁরা ঘুরে-ফিরে পালা-ক্রমে একবার আওয়ামী লীগ এবং আরেকবার বিএনপিকে ক্ষমতায় বসতে দেন। যেনো গৌল্ডফিসের স্মৃতি বাংলাদেশের জনগণের, যাঁরা ভাবেন শুধু বর্তমান নিয়ে। অতীত তাঁদের কাছে দ্রুত অপসৃয়মান, আর ভবিষ্যত অন্ধকার।

    তাই তাঁরা বিএনপির গুঁতো খেয়ে আওয়ামী লীগকে এবং আওয়ামী লীগের গুঁতো খেয়ে বিএনপিকে ভৌট দিয়ে পিংপং বলের মতো দুপক্ষের পিটুনি খেতে থাকেন। তবু শিক্ষা হয় না জনগণের। বস্তুতঃ অবলম্বন ছাড়া শিক্ষা অসম্ভব। উদ্বেগের বিষয়, সেই অবলম্বনই নেই সামনে।

    মাঝে সেনা-বিপত্তি না-ঘটলে প্রতি পাঁচ বছর পর বাংলাদেশ হাজার-হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন হয়। বেশির ভাগ মানুষই ঘুষ নিয়ে ভৌট দেন। ব্যক্তিগত হোক কিংবা এলাকার তথা কথিত উন্নয়নের নামে সমষ্টিগতভাবে ঘুষ নিয়ে ভৌট দেন জনগণ। মসজিদ-মন্দির-মাদ্রাসা-স্কুল থেকে শুরু করে পথ-ঘাট-সেতু-কালভার্ট কিংবা ফুটবল মাঠে ঘুষ দিয়ে ভোট কিনে নেন কোটিপতিরা।

    জনগণ ভাবতে চান না কেনো কোটিপতিরা এ-টাকা খরচ করছেন। কিংবা ভাবতে পারলেও কিছুই করার নেই বুঝে মেনে নেন ‘যা চলছে চলুক’ বলে। তাই প্রতিবারই নির্বাচিত হন যে-প্রতিনিধিরা, তাঁরা পার্লামেন্টে মোটেও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তাঁরা তাঁদেরই মতো যাঁরা সম-স্বার্থের কারণে একত্রিত হয়েছেন দলের নামে, সেই স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন।

    জনগণের নামে গোষ্ঠী বা দলের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিনিধিগণ নিজেরা লুটপাট করেন কিংবা লুটপাটে সাহায্য করে তার কমিশন ভোগ করেন। রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কলম হাতে আর কেউ ছুরি হাতে, যে যাঁর যোগ্যতা মতো নিজ-নিজ ক্ষেত্রে লুটতরাজ করেন। স্বাভাবিকভাবেই জনগণ লুন্ঠিত হবার জ্বালা অনুভব করেন। তখন আবার শুরু হয় পরিবর্তনের ডাক।

    যাঁরা সুযোগ-বঞ্চিত হন, তাঁরা ভাবেনঃ ‘পাঁচ বছর অপেক্ষা করা তো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার!’ তখন তাঁরা ডাক দেন পরিবর্তনের। এ-ডাকে অনেক সত্য কথাই থাকে, যা ক্ষমতায় থাকা-কালে তাঁরা বলেন না। বোকা জনগণ ভাবেন, ‘সত্যি কথাই বলছেন তাঁরা।’ তখনও তাঁরা জিজ্ঞেস করেন না, ‘বাছা, তোমরা তোমাদের আমলে কী করেছিলে বলো তো?’ ভুলে যান সবাই। গৌল্ডফিসের স্মৃতির মতো কিছুই মনে থাকে তখন।

    পার্লামেন্টে জন-প্রতিনিধিরা জনগণকে নয়, নিজ দল ও গোষ্ঠীরই প্রতিনিধিত্ব করেন বলে এক দলের প্রতিনিধির কথা অন্য দল শুনতে চায় না। কারণ, উভয় পক্ষই জানে উভয় পক্ষই নিজ-নিজ স্বার্থে কথা বলছে। সুতরাং সংখ্যাধিক্যের কারণে এক দল অন্য দলকে বঞ্চিত করে নিজেদের দলীয় ও গোষ্ঠীর স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়। যে-দল বঞ্চিত, সে-দল পার্লামেন্টে থাকতে চায় না। পার্লামেন্টের মেয়াদকে কতো সংক্ষিপ্ত করা যায়, সে ফন্দিই তারা করতে থাকে।  বর্তমানে বিএনপি করছে, তার আগে আওয়ামী লীগ করেছে। তার আগে বিএনপি করেছে এবং তার আগে আওয়ামী লীগ করেছে। এভাবেই চলছে।

    বিরোধী দল কেনো পার্লামেন্ট যায় না? কেনো তারা রাজপথে? প্রশ্ন করা হলে একই জবাব দেয় বিএনপি, যা আওয়ামী লীগ দিয়েছিলোঃ ‘পার্লামেন্টে কথা বলার জায়গা নেই, তাই রাজপথে আছি।’ আর, আওয়ামী লীগ বলছে সে-কথাই যা বিএনপি বলেছিলোঃ ‘গণতন্ত্র মানলে, রাজপথ ছেড়ে পার্লামেন্টে আসুন।’

    এ-কথাগুলো হচ্ছে অনেকটা নাট্যাভিনয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপের মতো। এগুলো প্রকৃত সত্ত্বার সংলাপ নয়। যে যে-ভূমিকায় যাবে, সে সেই সংলাপ বলবে। এখন আওয়ামী লীগ আছে ক্ষমতাসীনের ভূমিকায় আর বিএনপি বিরোধী দলের ভূমিকায়। অতীতে ভূমিকা ভিন্ন ছিলো, তাই সংলাপও ভিন্ন ছিলো। আগামীতে ভূমিকার পরিবর্তন হলে সংলাপেরও পরিবর্তন হবে। এখানে বিশ্বাস বা আদর্শের কোনো কিছু নেই।

    গণতন্ত্র সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রকৃত বোধ হচ্ছে, একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই গণতন্ত্র মানি, পার্লামেন্ট থাকি, নইলে নয়। কারণ কী? সম্ভবতঃ তাদের মনের কথা এই যে, ‘নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ না করা গেলে পার্লামেন্টে বসে অযথা সময় নষ্ট করে শত্রুপক্ষকে বৈধতা ও শান্তিতে থাকতে দিলে এবারের মেয়াদে তো পাচ্ছিই না, আগামীতেও সুযোগ পাবো না। তাই রাজপথে থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে পরবর্তী নির্বাচনকে যতো নিকটে আনা যায়, ততোই ভালো।’

    কিন্তু জনগণ কী করেন তখন? জনগণকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারেঃ ‘কেনো বাবারা ভৌট দিয়ে এমনই জন-প্রতিনিধি বানিয়েছেন, যিনি পার্লামেন্ট যাবেন বলে ভৌট চেয়ে, পেয়েও জিতে এখন পার্লামেন্ট-মুখো হচ্ছেন না?’

    কোনো কথা নেই জনগণের মুখে। কারণ, জনগণও বুঝেন না গণতন্ত্র কাকে বলে। গণতন্ত্র মানে যে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভৌট পেয়ে শুধু ‘বিজয়ী’ হওয়া নয়, বরং দায়িত্বে, কর্তব্য ও জবাবদিহিতায় আবব্ধ হওয়া, তা বোধের মধ্যে নেই কোনো পক্ষেরই।

    জবাবদিহিতা বলে কোনো পদার্থই নেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে। নেতৃত্ব যেখানে পারিবারিক সূত্রে লব্ধ, সেখানে জবাবদিহিদা আসে কী ভাবে? রাজা কি প্রজার কাছে কখনও জবাবদিহি করেন?

    বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই একটি ‘প্রজাতন্ত্র’। রাজ-পদলেহী পণ্ডিতেরা বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় রাষ্ট্রের চরিত্র চিহ্নিত করেছিলেন ‘প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে। ‘রিপাবালিক’-এর বাংলা অর্থ তাঁরা ‘জনতন্ত্র’ না বুঝে, বুঝেছেন ‘প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে। যেখানে ‘রাজা’ নেই, সেখানে ‘প্রজা’ আসে কীভাবে? আসলে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বিপ্লব না হবার কারণে সামন্তবাদী সংস্কৃতি থেকে আসা বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকগণ ‘প্রজা’ ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারেননি। এটি তাঁদের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা।

    তো, ‘প্রজা’ শব্দ যেহেতু আবির্ভুত হয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ণয়ে, ধারণা করা যায়, এই রাষ্ট্রের স্রষ্টাদের বোধে ও সংস্কৃতিতে ‘প্রজা’ প্রকরণ অস্তিত্বমান ছিলো। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘প্রজা’ শব্দের ব্যবহার হচ্ছে সামন্তবাদী রাজনৈতিক মনোভঙ্গির প্রতীক। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আমরা যে-একনায়কী শাসন দেখে আসছি নানা রূপে ও নানা রঙে, তা শতো-শতো বছর ধরে জনগণকে ‘প্রজা’ মনে করারই ফল বললে সম্ভবতঃ ভুল হবে না।

    রাজনীতিতে জবাবদিহিতা আসে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিক দলগুলোর মধ্য জবাবদিহিতা নেই। ডানেও নেই, বামেও নেই। উপরেও নেই নীচেও নেই। দূর থেকে দেখলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এটি সংস্কৃতির সমস্যা। অত্যন্ত নিম্ন-মানের সামন্তবাদী সংস্কৃতি বিরাজ করছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

    যতোদিন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা স্বাধীন না হবেন, আধুনিক মুক্ত মানুষ না হবেন, ততোদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে না। আর, যতোদিন রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে না উঠছে, ততোদিন পর্যন্ত পার্লামেন্টেই হোক, আর রাজপথেই হোক, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

    তাই প্রয়োজন সবার আগে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা ব্যক্তি-মানুষের মধ্যে মুক্তি নিয়ে আসবে। সাংস্কৃতিক বলতেই গান-বাজনা-তবলা-হারমোনিয়ামের ছবি ভেসে ওঠে অনেকের মনে। কিন্তু এগুলো সংস্কৃতি নয়, এগুলো হচ্ছে পার্ফমেন্স। সংস্কৃতি হচ্ছে রুচি-বোধ-মনোভঙ্গির সংমিশ্রণ।

    বাংলাদেশের বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা হয়েছে আশির দশক থেকে। এটি পশ্চাৎপদ ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুর্খ অনুকরণ। বাংলাদেশে যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ, যা ভারত বা পাকিস্তান নয়। এহেন দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা এই ব্যবস্থা মেনে নিচ্ছেন যে, যে দলের তিনি একজন সভ্য, তিনি কখনওই সে-দলের শীর্ষ নেতা কিংবা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, কারণ এটি সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে বংশানুক্রমে একটি পরিবারের জন্য। এটি কেমনতরো রাজনৈতিক জীবন-বোধ, রুচি ও মনোভঙ্গি?

    নেতৃত্বের সংজ্ঞা যেখানে এমন, সেখানে রাজনৈতিক সৃষ্টিশীলতা, গণ-সম্পৃক্তি ও জবাবদিহিতা নয়, বরং নেতৃত্বের মনোরঞ্জন ও অন্ধ আনুগাত্য হয় রাজনৈতিক কর্মীর সাফাল্যের মাপকাঠি। এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের স্থান যে মাথার উপরে নয় বরং পদতলে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?

    রাজনৈতিক কর্মীদের সংস্কৃতির পরিবর্তনে জনগণের অগ্রসর অংশেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। জনগণের অগ্রসর অংশ হচ্ছে তার ইন্টিলিজিনশিয়া অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী। এই বুদ্ধিবৃত্তির শ্রেণীর মধ্যেও রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি অপচ্ছায়া পড়েছে।

    কিন্তু, তাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনোবৃত্তিক ভাবে শক্তিশালী বলেই তাদের পক্ষে সচেতন চেষ্টার ফলে এই অপসংস্কৃতির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। এর জন্য যেটি প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে বস্তুগত প্রাপ্তি, প্রসংশা ও স্বীকৃতির লোভ সংবরণ ও ভয়কে জয় করা। তীব্র আত্ম-সম্মান ও আত্ম-মর্যদাবোধ নিয়ে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষের একজন করে ভাবতে শিখতে হবে। মনের রাখতে হবে, ইতিহাসে সমতলে আমরা সবাই মানুষ, নিজেকে নিজে পরাধীন না করলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই যে আমাদেরকে পরাধীন করতে পারে।

    একটি সমাজে গণতন্ত্র আসতেই পারে না, যদি না সে-সমাজে সাধারণ মানুষ মহান না হন। বাঙালী সমাজে এ-রকম লক্ষ-কোটি মানুষ দরকার - পার্লামেন্ট ও রাজপথে।

    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    রোববার, ১১ মার্চ ২০১২
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন