• গণ-অভ্যূত্থানঃ রাজনৈতিক সুনামি
    মাসুদ রানা

    প্রথম শোনা গিয়েছিলো ইয়ামেনের প্রেসিডেন্ট সালেহ ‘হত’। পরে শোনা গেলো ‘আহত’। তারপর তার ‘কন্ঠ’ শোনা গেলো কিন্তু সচল ছবি দেখা গেলো না টেলিভিশনের প্রচারিত ভাষণে।

    প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ-আঙ্গিনায় স্থাপিত মসজিদে শুক্রবার নামাজে গিয়ে বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন তিনি। মারা গিয়েছেন তার ১১ জন দেহরক্ষী। কেউ-কেউ বলছেন, সালে’র বিরোধী-গোত্রের নিক্ষিপ্ত গোলায় তিনি আহত হয়েছেন। আবার অন্যেরা বলছেন, মসজিদের ভেতরেই পাতা ছিলো বিস্ফোরকটি।

    প্রেসিডেন্ট সালেহ যে অন্ততঃ আহত, সে-বিষয়ে কোনো তর্ক নেই। শনিবার রাতে জানা গেলো প্রেসিডেন্ট সালেহ সৌদি-আরব পৌঁছেছেন চিকিৎসার জন্য।

    তিন যুগেরও অধিক কাল যাবৎ দুর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব-করা, রাজারই নামান্তর, প্রেসিডেন্ট সালে’র বিরুদ্ধে ইয়ামেনবাসী আন্দোলন শুরু করেছিলো ‘স্ট্যাটাস্কো’ পরিবর্তনের লক্ষ্যে। সালেহ মানলেন না।

    জনগণের আন্দোলনের প্রতি কোনো একনায়কই সময় থাকতে সাড়া দেন না। তিউনিসিয়াতে জেইন এল-আবেদিন বেন-আলি সাড়া দেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্লানিকর ভাবে পালাতে হলো তাকে।

    মিশরেও তিন দশকের প্রেসিডেন্ট হোসনে মুবারকও সাড়া দেননি। উল্টো বাগারম্বর করেছেন প্রায় শেষদিন পর্যন্ত। একটা সময়ে তাকে ছাড়তে হলো ক্ষমতা। তিনি পালাননি; ভেবেছিলেন পার পেয়ে যাবেন। তাই দেশেই কোনো এক সুখস্থানে ছিলেন তিনি। অবশেষে তাকে যেতে হয়েছে বন্দীত্বে -  খুন-খারাবি ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে।

    ইয়ামেনের প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ অতি চালক লোক। নন-কমিশনড্‌ সৈনিক থেকে শেষ পর্যন্ত ফীল্ড মার্শাল হওয়া এই একনায়ক বুঝতে পেরেছিলেন, তার দিন শেষ। তাই ঘোষণা করেছিলেন, তিনি আর নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। তার ছেলেকে তার উত্তরাধিকারী করবেন না। এবং ঘড়ির কাঁটাকে আবার পিছিয়ে দিবেন না। কিন্তু তিনিও বুঝতে পারেননি প্রস্থানের সঠিক সময়।

    জনসাধারণ - যারা নিতান্ত সাধারণ, নীরব জলধির মতো দৃশ্যতঃ শান্ত - একবার রাস্তায় নেমে রক্ত স্পর্শ করলে হয়ে ওঠে বিক্ষুব্ধ সমুদ্র, যা সৃষ্টি করতে পারে ‘স্ট্যাসকো’র বিরুদ্ধে ভয়াবহ রাজনৈতিক সুনামি।

    ইতিহাসের একনায়কেরা প্রায়শঃ অতীতের ব্যক্তিগত সাফল্যের ভিত্ততে গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাস এবং তাদের ঘিরে-থাকা সুবিধাভোগীদের দেয়া আমারদায়ক তথ্যে অন্ধ হয়ে যান। তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত ম্যানেইজ করে ফেলতে পারবেন।

    কিন্তু পারেন না তারা। শেষে যখন সব যায়, তখন নিঃসঙ্গ একনায়কগণ হয়তো ভাবেনঃ ‘আগে কেনো মেনে নিলাম না!’ এটি অনেকটা জুয়াতে বাজি জিতে আরও বেশি জিততে গিয়ে সব হারার পর ‘খেলা আগে কেনো শেষ করলাম না’ আফসোস করার মতো।

    উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য-প্রাচ্য আজ যা দেখাচ্ছে পৃথিবীকে, বাংলাদেশ তা দেখিয়েছিলো বিয়াল্লিশ বছর আগে ১৯৬৯ সালে। গণ-অভ্যূত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানের তথাকথিত লৌহ-মানব ফীল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়ে।

    সে-সময় ফ্রান্সও চেষ্টা করেছিলো একনায়ক জেনারেল দ্য গলকে গণ-আন্দোলনে উৎখাত করতে। স্মরণ-কালের সবচেয়ে বড়ো ‘ওয়াইল্ডক্যাট স্ট্রাইক’ (অননুমোদিত শিল্প ধর্মঘট) করে বিক্ষোভকারীরা ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। যা পরবর্তীতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তন এনেছিলো। কিন্তু গণ-অভ্যূত্থান তাৎক্ষণিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিলো।

    সুকান্ত তার এক কবিতায় ফ্রান্সের উল্লেখ করছিলেন ‘বিপ্লবী ফ্রান্স’ বলে। মানব সভ্যতায় অভিঘাত তৈরীর বিবেচনায় বিশ্বে তিনটি বিপ্লব শ্রেষ্ঠতমঃ আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধ, ফ্রান্সে বাস্তিল বিপ্লব এবং রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব।

    আমেরিকা, মন্তান্তরে, ফ্রান্স যদি বিপ্লবের মাতৃভূমি হয়, বাংলাদেশকে অবশ্যই গণ-অভ্যূত্থানের মাতৃভূমি বলা যায়।

    ২০১১ সালে তিউনিসিয়ান তরুণ বিদ্রোহী মুহাম্মদ বুয়াজিজি’র আত্মোৎসর্গ যেমন উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত ঢেউ তুলেছে অচলায়তনের বিরুদ্ধে, তেমনিভাবে ১৯৬৯ সালে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের আত্মদান ঢেউ তুলে শুধু সামরিক একনায়কত্বের পতন ঘটায়নি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেরও মানসিক জমিটিও তৈরী করেছিলো।

    ১৯৬৯ সালে বাঙালীর গণ-অভ্যূত্থান রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি অহিংস পদ্ধতি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলো, যা আজও বাঙালীর রাজনৈতিক চেতনা ও চর্চায় শক্তিশালী অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করছে। আর সে-কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা বার-বার এর পুনরাবির্ভাব দেখি। সুতরাং, এটি কোনো ‘সিরান্ডিপিটী’ বা আকস্মিকভাবে পাওয়া কোনো পদ্ধতি নয়। বাঙালীর রাজনৈতিক চর্চায় এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি।

    বাঙালীদের মধ্যে বিশ্ববোধের ও বিশ্বমানের বুদ্ধিজীবী থাকলে তারা এ-জাতির দীর্ঘ-কালের উপনেবেশ-বিরোধী ও স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে তত্ত্বায়িত করে বিশ্বের সম্পদ হিসেবে বিশ্ব-সভায় উপস্থিত করতে পারতেন।

    বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। কিন্তু এদের অধিকাংশের মান খুবই নিম্ন। কারণ, তারা বিশ্ববোধ সম্পন্ন নন। বিশ্বের ঘটনাবলী তাদের বোধে আঘাত করে না। এমনকি নিজ-দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশাও তাদের চেতনায় আঘাত করে না। তারা তাদের ‘এনার্জী ইনভেস্ট’ করেন দেশজ দ্বিদলীয় 'টাগ অফ ওয়্যারের' মধ্যে। একদিকে এক পক্ষের তৈলাক্ত বন্দনা এবং  অন্যদিকে অপর পক্ষের কর্কশ তিরষ্কারই এদের কাজ - নানা ভাবে, নানা ঢঙে।

    যে-জাতির বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বকে বোধে ধারণ করেন না, বিশ্বের প্রতি দায়িত্ববোধ করে না, বিশ্বও সে-জাতিকে পাতে নেয় না। ঘরের কোণে বসে সে-জাতির বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের সামান্যতাকে যতোই অসামান্য করে দেখান না কেনো, তাতে কিছুই অর্জন করা যায় না।

    উত্তর আফ্রিকা থেকে যে গণ-অভ্যূত্থান শুরু হয়েছে, তা গভীর অনুধ্যানের দাবী রাখে। বিশেষ-করে মিশরের তাহরির স্কোয়ার বা স্বাধীনতা চত্ত্বরের সংগঠন, আচরণ ও শক্তি পৃথিবীর জন্য একটি বিশাল শিক্ষা। আজ ভূমধ্য-সাগরতীরের ইউরোপের দেশে-দেশে তরুণ-তরুণীরা নিজ-নিজ দেশের অচলায়তের বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘তাহরির স্কোয়ার’ গড়ে তুলছে।

    গণ-অভ্যূত্থানের মাতৃভূমি বাংলাদেশেও তাহরির স্কোয়ার গড়ে উঠবে। কারণ, বাংলাদেশে দীর্ঘ কাল ধরে একটি অচলায়তন গড়ে উঠেছে। ওখানে রহমানিজম বা রহমানবাদের অচলায়তন তৈরী হয়েছে। জনগণ এর সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিক সবাই সেবাসঙ্গীত গাইছেন। সমবেত সেবাসঙ্গীতের উচ্চ-নিনাদে দেশের মনুষ্য-জীবন-বঞ্চিত কোটি-কোটি মানুষের হতাশা ও ক্ষুব্ধতা মিশ্রিত নিঃশ্বাসের সুনামি-ধ্বনি এখনও কানে আসছে না। কিন্তু ফুঁসছে তারা।

    পৃথিবী খাদ্য-সঙ্কটে ইতোমধ্যে নিপতিত। বাংলায় খাদ্য-সঙ্কট করাঘাত করলে যে দরোজা উন্মুক্ত হবে এবং যে-শক্তি বিমুক্ত হবে, তার ধাক্কা যে কতো ভয়াবহ হবে তা অকল্পনীয়।

    ইতিহাসের কারণে গণ-অভ্যূত্থানের পথেই বিমুক্ত নতুন শক্তি প্রকাশিত হতে চাইবে। কিন্তু তাকে ধারণ করার মতো এবং যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেবার মতো দর্শন ও সংগঠন প্রস্তুত না থাকলে, একটা নিশ্চিত রাজনৈতিক সুনামি বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করবে। আর যদি তাই হয়, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র কী হবে তা আমরা কেউ বলতে পারি না।

    রোববার, ৫ জুন ২০১১
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন