• গোলাম আযমের রায়ঃ কী ও কেনো হতে পারে
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী-রূপান্তরিত-মানবতাবিরোধী-অপরাধী ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক গুরু গোলাম আযমকে আগামীকাল রায় শোনাবে দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। স্পষ্টতঃ এ-রায়টি হচ্ছে প্রত্যাশিত সময়ের অনেক পরে।

    প্রশ্ন হতে পারেঃ রায় আসতে এতো দেরী হলো কেনো? এ-প্রশ্নের সম্ভাব্য একটি উত্তর হতে পারেঃ ফেব্রুয়ারীতে সরকার তথা আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামীর ভেঙ্গে যাওয়া বুঝাপড়া মেরামত করতে সময় লেগেছে বলে।

    সুতরাং, ধারণা করা যায়, রায় তাহলে কী হতে পারে। রায় কী হতে পারে, তা নির্ভর করে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী জনগণকে ধোঁকা দেবার ক্ষেত্রে কোন্‌ মাত্রা নির্ধারণ করছে, তার উপর। এখানে অন্ততঃ দু’টি মাত্রা সম্ভব।

    প্রথম মাত্রাটি সরল, যেটি জামায়াতের কাম্য। আর, তা হচ্ছেঃ গোলাম আযমকে যদি শাস্তি দিতেই হয়, তাহলে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যে-কোনো মেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়া। তাতে তিনি ‘অসুস্থ’ হয়ে মোটামুটি হাসপাতালে থেকেই সে-মেয়াদ কাটিয়ে দিতে পারবেন। এটি আওয়ামী লীগের জন্য খুব স্বস্তির নয়। কারণ, এতে আবার ‘গণজাগরণ’ শুরু হবার আশঙ্কা থেকে যায়।

    যদিও ফেব্রুয়ারীর ‘গণজাগরণ’ তার প্রথম জন্মের কৃতকর্মের জন্যেই জাগরণ রূপে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারবে না, তবুও খানিকটা বেকায়দায় আওয়ামী লীগকে পড়তেই হবে। তবে, ঐতিহ্যগতভাবে ‘মাহে-রমজান’ ইসলামী অনুভূতির প্রজনন-কাল বলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ মুসলিম ধর্মীয় উৎসব ঈদ পর্যন্ত তেমন বেশি সুবিধা করতে পারবে না।

    দ্বিতীয় মাত্রাটি হচ্ছে জটিল, তবে তা আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধাজনক। এর আবার দু’টি পর্যায় আছে। প্রথম পর্যায়ে গোলাম আযমকে ফাঁসির রায় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁর বার্ধক্য ও অসুস্থতার বিবেচনায় কৃত প্রার্থনার প্রতি ‘মানবিক’ সাড়া দিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা। কারণ, শেখ মুজিবুর রহমান বলেই গিয়েছেন, ‘বাঙালী ক্ষমা করতে জানে।’

    জামায়াতে ইসলামী স্বভাবতঃ এই জটিল প্রক্রিয়াটি মানতে চাইবে না। কারণ, এটি প্রথমতঃ দীর্ঘমেয়াদী এবং দ্বিতীয়তঃ ঝুঁকিপূর্ণ। এ-ছাড়াও, এটি মানার জন্য প্রয়োজন আওয়ামী লীগের ওয়াদার উপর জামায়াতে ইসলামী পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, অথবা বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক পরাশক্তির এই গ্যারাণ্টি যে, শেষ পর্যন্ত গোলাম আযমকে মারা হবে না।

    যা ঘটিত ও ঘটমান, তাকে বিশ্লেষণ করা যায়। যা আসন্ন, তাকে শুধু আন্দাজ করা যায়। সুতরাং, আমার উপরের কথাগুলো আন্দাজ ছাড়া কিছুই নয়। আন্দাজ ঠিক হতে পারে, কিংবা ভুলও হতে পারে। কিন্তু তবুও আন্দাজ করতে হয়। তবে, আন্দাজের জন্য যেটি গুরুত্বপূর্ণ, তাহচ্ছে ঘটিত ও ঘটমান বিষয়ের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ভিত্তিষ্ঠিত হওয়া।

    বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলতে কী বুঝায়? সংক্ষেপেঃ বস্তু, বিষয় বা ঘটনার ব্যাখ্যায় বস্তুনিষ্ঠতা, পরিমাপ্যতা, কার্য-কারণ কিংবা সহ-সম্পর্ক নির্দেশ, প্রমাণ সাপেক্ষতা ও আত্ম-নিরপেক্ষতার ব্যবহার।

    আওয়ামী লীগ যেহেতু একটি রাজনৈতিক দল, তাই স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া এবং গেলে তা ধরে রাখাই তার লক্ষ্য। যে-সমস্ত রাজনৈতিক দল বলে, ‘আমরা ক্ষমতার রাজনীতি করি না’, তারা বস্তুতঃ রাজনীতিই করেন না। তারা বড়োজোর একেকটি প্রেশার গ্রুপ। রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জয়ী হতে হবে কিংবা জয়ী হয়েছে বলে দেখাতে হবে।

    শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি জয়ী হয়েছিলেন বলে দেখিয়েছিলেন। আর, ভবিষ্যতে যাতে তাও দেখাতে না হয়, সে-জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে অন্য সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। অবশ্য, সে-জন্য তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিলো।

    তাই, শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে জিতেই ক্ষমতায় থাকার হিসেব করতেই হয়। এখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে শেখ হাসিনার শ্রেষ্ঠত্ব। জীবিত শেখ মুজিবুর রহমানের গায়ের চামড়া দিয়ে যাঁরা জুতো বানাবার কথা বলেছিলেন, তাঁরা আজ রূপতঃ নিজেদের গায়ের চামড়া দিয়ে শেখ হাসিনার পায়ের জুতো বানিয়ে তাঁর পায়ে পরিয়ে কৃতার্থ হচ্ছেন। বেঁচে থাকলে শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভবতঃ শেখ হাসিনাকে হিংসে করতেন।

    গত কয়েক মাসে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের প্রতিটিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় কি শেখ হাসিনাকে বিচলিত করেনি? নিশ্চয় করতে থাকবে। আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক যে-পর্যায়ের পরাশক্তিরই সমর্থন শেখ হাসিনার কাছে আরধনার হোক না কেনো, তাঁকে-তো প্রমাণ করতে হবে যে, তাঁর দলের জনপ্রিয়তা আছে।

    শেখ হাসিনা জানেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ডিমিনিশিং রিটার্ন্স আছে। তাই, আগামী নির্বাচনে শুধু ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ দিয়ে জেতা যাবে না। আগামী নির্বাচনে জেতার জন্যেই হোক, কিংবা জেতা দেখাবার জন্যেই হোক, বিএনপির শক্তিক্ষয় করা ছাড়া নিশ্চিত বিজয়ের দৃশ্যতঃ কোনো উপায় নেই। সুতরাং অন্ততঃ বিএনপির জোট থেকে সরিয়ে এনে জামায়াতকে দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করানোই হবে আওয়ামী লীগের জন্য কার্যকর স্ট্র্যাটেজী।

    আওয়ামী লীগ সম্ভবতঃ জামায়াতের উপর স্ট্র্যাটেজিক হিজেমোনি বা কৌশলগত প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তাতেও কি শেষ রক্ষা হবে? রাজনীতির পূর্ব-পরিকল্পনা এক, আর জনগণের রাজনৈতিক বাস্তব আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা।

    কারণ, ডেমোক্র্যাসি বা গণতন্ত্র একটি সিস্টেম বা পদ্ধতি হিসেবে শুধু কোয়ান্টিটেটিভ বা সংখ্যাবাচকই নয়, এটি কোয়ালিটেটিভ বা গুণবাচকও বটে। তাই রাজনীতিতে দুয়ে-দুয়ে চার নাও হতে পারে।

    সংখ্যার জোরেই যদি গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারতো, তাহলে মিসরে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও মুসলিম ব্রাদারহূডের মোহাম্মদ মুর্সি ক্ষমতা হারাতেন না। গণতন্ত্রের যে গুণগত মাত্রা, তাকে অস্বীকার করে সংখ্যাধিক্যের জোরে প্রশাসন থেকে শুরু করে সবকিছুকে ‘মুসলিম ব্রাদারহূডেড’ করেছিলেন তিনি।

    বাংলাদেশে আওয়ামী লীগও সংখ্যার জোরে ঠিক একই কাজ করেছে। কিন্তু দেশটিতে মিসরের মতো মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী চেতনা বিকশিত না হবার কারণে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরার জন্য গণ-অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়নি।

    তাহরির স্কোয়ারের অনুকরণে শাহবাগ চত্বরে গণসমাবেশ হয়েছিলো বটে, কিন্তু সঠিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সঠিক পথ নির্দেশিত হতে না পারার কারণে তার অপমৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তাই বলে মানুষের মধ্যে মুক্তির চেতনার মৃত্যু ঘটেনি। তাই, কপট ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে হটিয়ে দিয়ে প্রকৃত মুক্তির চেতনা ভৌটের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে।

    কিন্তু তাতেও কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ, বিকল্প নতুন ও গুণবাচক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দ্বারা পুরনো সংখ্যাবাচক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পূর্ণ প্রতিস্থাপন না হলে কোনো পোশাকী পরিরবর্তনই মানুষের জন্য ভালো পরিণতি আনতে পারবে না।

    আওয়ামী লীগকে সরিয়ে বিএনপি, বিএনপিকে সরিয়ে আওয়ামী লীগ, আর মাঝখানে দোলখাওয়া ডান-বামের টানাটানির ক্লান্তিকর এই রাজনীতির প্রতি নতুন প্রজন্মের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান এবং নতুন রাজনৈতিক চিন্তার জন্ম দেওয়া ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো পথ খোলা নেই।

    রোববার, ১৪ জুলাই ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন