• গোলাম আযম আটকঃ ‘কী লয়ে বিচার!’
    মাসুদ রানা

    লণ্ডনের বাংলা সঙ্গীতশিল্পী শাহীনূর হীরক ফৌন করে জানতে চাইলেন, ‘গোলাম আযমকে নাকি ব্রিক লেইনের সঙ্গীতার সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে’? শুনে তো অবাক! গোলাম আযম লণ্ডনে? তাও ব্রিক লেইনের মিউজিক স্টৌর সঙ্গীতার সামনে? অভাবনীয়!

    ভুল শুনেছিলেন হীরক। গোলাম আযমকে আটক করা হয়েছে ঢাকায়। যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত গোলাম আযম ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেছিলেন। বিচারকগণ আবেদন না-মঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। ‘অসুস্থতা’র কারণে তাঁকে কারা-কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পাঠায়।

    গোলাম আযমের আটকে আহ্‌লাদিত নেতৃস্থানীয় কয়েকজন অপরাপর আহ্‌লাদিতদের ব্রিকলেইনে সঙ্গীতার সামনে সমাবেশিত হবার আহ্‌বান করেছিলেন আনন্দ-মিছিল করার জন্য। সে-সংবাদের অপভ্রংশ গুজব হয়ে পৌঁছেছিলো হীরকের কাছে।

    লণ্ডনে আনন্দ-মিছিলের আয়োজন এবং সে-সংবাদের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে লণ্ডনে গোলাম আযামের গ্রেফতারের গুজব, এর দুটোই বিশ্লেষণের জন্য আকর্ষণীয় বিষয়।

    প্রথমতঃ গোলাম আযমের আটকের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দ্বিতীয়তঃ এ-ঘটনাটি নাটকীয়। গুরুত্বপূর্ণ বলে আনন্দ মিছিলের আয়োজন। আর নাটকীয় বলে লণ্ডনের ব্রিক লেইনের সঙ্গীতার সামনে গ্রেফতারের গুজব।

    গুরুত্বপূর্ণ
    গোলাম আযম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে তাঁর আটক গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়। গোলাম আযমের আটক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনে তাঁর ভূমিকার গুরুত্বের কারণে, যদিও তিনি কোনো মানুষ হত্যা করেননি, কোনো নারীকে ধর্ষণ করেননি কিংবা কোনো বাড়ী আগুনে পোড়াননি।  সাধারণ অপরাধের বিচারের মতো যুদ্ধাপরাধ বিচার হলে গোলাম অযাম দোষী সাব্যস্ত হবেন না। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ কোনো সাধারণ অপরাধ নয়।

    সাধারণ অপরাধের চরিত্র যেখানে মাইক্রো বা ব্যাষ্টিক, যুদ্ধাপরাধ সেখানে ম্যাক্রো বা সামষ্টিক। সাধারণ অপরাধে মৌটিভ বা প্রেষণা যেখানে ব্যক্তিগত, যুদ্ধাপরাধে সেখানে সমষ্টিগত - প্রায়শঃ সম্প্রদায়গত বা জাতিগত। ফলে, যুদ্ধাপরাধে অপরাধী ও অপরাধের শিকার দুপক্ষই নৈর্ব্যক্তিক দুই ভিন্ন প্রকরণ বা ক্যাটেগোরীর অন্তর্ভুক্ত। তাই যুদ্ধাপরাধের ব্যাপ্তি ও প্রভাব ভয়াবহ।

    যুদ্ধাপরাধের পরিস্থিতি তৈরী হলে ব্যক্তিগতভাবে একজন ভালোমানুষও অপরাধী হয়ে উঠতে পারেন। আবার ব্যক্তিগভাবে একজন নিরীহ মানুষও যুদ্ধাপরাধের শিকার হতে পারেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে বিশ্বে যেসব বিখ্যাত মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে, তার মধ্যে আমেরিকার সমাজ মনোবিজ্ঞানী মিলগ্র্যামের পরীক্ষা শ্রেষ্ঠতম। এতে দেখা গিয়েছে, শিক্ষার্থীদেরকে ভুলের জন্য ইলেক্ট্রিক শক দেয়া ব্যক্তিগতভাবে ঠিক নয় জেনেও কর্তৃপক্ষীয় ‘শিক্ষার জন্য এটিই ঠিক’ তত্ত্বের কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষেরা অধ্যাপকের নির্দেশে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় ইলেক্ট্রিক শক প্রয়োগ করেছেন শিক্ষার্থীদের উপর, যদিও শাস্তিদাতারা নিজেও তীব্র অনুতাপে দগ্ধ হয়েছেন। 

    যুদ্ধাপরাধের পিছনে থাকে যে তত্ত্ব থাকে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে-তত্ত্বকে যে খুবই সুগঠিত ও সুবর্ণিত হতে হবে, এমন নয়। যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রয়োজনীয় তত্ত্বটির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ মানুষের সুনির্দিষ্ট আচরণের নিন্দা করে তার সাধারণ প্রকরণকে শায়েস্তা করা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের কাছে সুনির্দিষ্ট নিন্দনীয় আচরণ ছিলো ‘ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তান ভাঙ্গা’ আর এটি রুখতে  ‘শায়েস্তা করতে হবে বাঙালীকে’। এটি হচ্ছে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্র তৈরীর সাধারণ তত্ত্ব বা আদর্শ।

    জামায়তে ইসলামী যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করেছে এটি কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। হানদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য এবং পাকিস্তানীদের দ্বারা চিহ্নিত ‘দুশমন’ রোখার জন্য তারা যে প্যারামিলিট্যারী বাহিনী পর্যন্ত করেছে, তাও সত্য। এও সত্য যে, এ-দলটি বাঙালীদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে বাঙালীত্বের বিরুদ্ধে মুসলমানীত্বকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ধর্মবাদী তত্ত্বের ব্যাপক প্রচার করেছে।

    এটিও তর্কাতীত যে, অধ্যাপক গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর নেতা ছিলেন এবং এখনও এর তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে বিবেচিত। তাই, গোলাম আযমকে জড়িত করা ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার কখনও তার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছুতে পারবে না।

    সমগ্র বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য গোলাম আযমের ভূমিকা সম্পর্কে একটি ফয়সলা, অর্থাৎ গোলাম আযমের বিচার হওয়ার অপরিহার্য্য। গোলাম আযমের আটকের বিষয়টি যুদ্ধাপরাধের বিচার সংক্রান্ত মানুষের বোধ ও আকাঙ্খার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই, কোনো প্রকার পূর্ব-প্রস্তুতি বা ঘোষণা ছাড়াই সুদূর লণ্ডনে ব্রিক লেইনে আনন্দ মিছিলের আয়োজন হয়।

    নাটকীয়

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বলে দাবীদারদের মধ্য সর্বশ্রেষ্ঠ যে আওয়ামী লীগ, সে-বিষয়ে চেতনার পক্ষের শক্তির মধ্যে দৃশ্যতঃ কোনো বিতর্ক নেই। আওয়ামী লীগ যে এবারই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে, তা নয়। এর আগের মেয়াদে সরকার গঠন কালে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ গোলাম আযমের ব্যাপারে কী মনোভঙ্গি দেখিয়েছিলেন এবং তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে কী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অবিস্মরণীয়।

    যে-গোলাম আযমের কাছে এক সময় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ‘দোয়া’ চাইতে যান, সে-গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধে নতুন করে বিচারের জন্য আটক করা যে আওয়ামী লীগের নীতির ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় মোড়, তা নিরাপদে বলা যায়।

    গোলাম আযমের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় জনগণের কাছে কোনো নিশ্চিত ধরে নেবার বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পারস্পরিক মনোভঙ্গি কী, কিংবা আরও সুরনির্দিষ্টভাবে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কী, এ-বিষয়ে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পূর্বোক্তি করার ধারণা আছে বাংলাদেশের মানুষের।  কিন্তু গোলাম আযম ও তাঁর দল জামায়াতের প্রশ্নে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কোনো পাথর-কঠিন অবস্থান আছে বলে মানুষের জানা নেই।

    জামায়ত যদি নিশ্চিত করে যে, তারা আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে বিরাজ করবে, তাহলে দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। তখন হয়তো আমরা আবার দেখবো আওয়মী লীগের নেতৃবৃন্দ গোলাম আযমের দোয়া নিতে তাঁর বাড়ী যাচ্ছেন। যেহেতু, অনিশ্চয়তা থেকেই আসে গুজব। ছোট আকারে হলেও লণ্ডনে কিছুক্ষণের জন্য যে ব্রিক লেইনে গোলাম আযমের গ্রেফতার হবার গুজবটা এলো, তার পেছেনে হয়তো আছে ‘যেকোনো কিছু সম্ভব হবার’ ধারণা।

    গোলাম আযমের বিচার করতে হলে, বিচার করতে হবে সেই ধর্মবাদী রাজনৈতিক আদর্শের, যা পরাধীন ও শোষিত বাঙালীদের মধ্য থেকে ক্ষুদ্র হলেও একটি অংশকে স্বজাতির স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো এবং জায়েজ করেছিলো গণহত্যা ও ধর্ষণ।

    ‘কী লয়ে বিচার!’

    বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে প্রায়শঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসীদের বিচারের নজির নিয়ে আসে। কিন্তু নজিরদাতাগণ এটি উল্লেখ করেন না যে, নাৎসীদের বিচারের পাশাপাশি নাৎসীবাদকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দেশে-দেশে আইন হয়েছে। এমনকি, নাৎসীদের হাতে ইহুদীদের মৃত্যু বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করাও কোনো-কোনো দেশে আইনতঃ অপরাধ।

    ধর্মকে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধরে সৃষ্টি করা হয়েছিলো পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রবল ধর্মের নামে বাঙালীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষা, কৃষ্টি ও তার জাতিসত্ত্বাকে ধ্বংস করে কেবলই মুসলমান বানাতে চেয়েছিলো। পাকিস্তানের সে-চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়েই বাঙালীকে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত অপ্রস্তুত অবস্থায় একটি মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিলো। সে-মুক্তিযুদ্ধে ধর্মবাদী রাজনৈতিক আদর্শের দোহাই দিয়েই যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছিলো। আর, সে-যুদ্ধাপরাধের আদর্শিক গুরুদের অন্যতম ছিলেন গোলাম আযম।

    ধর্মবাদী রাজনীতির চর্চা বাংলাদেশে অক্ষুণ্ণ রেখে কোন যুক্তিতে আজ গোলাম আযমের বিচার হবে? গোলাম আযমের আদর্শিক অবস্থানের বিচার ছাড়া ব্যক্তি গোলাম আযমের বিচার আপাততঃ কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য চূড়ান্ত বিচারে কোন সুখবর নিয়ে আসতে পারবে না। কারণ, ধর্মবাদী রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখে গোলাম আযমকে যদি ফাঁসি দিয়ে মারা হয়, তাঁর স্পিরিট মরবে না। গোলাম আযম বরং ‘শহীদ-ই আযম’ হয়ে শতগুণ শক্তি নিয়ে আবির্ভুত হবেন।

    রোববার, ১৫ জানুয়ারী ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন