• জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের গিনিপিগ
    DSC02789.JPG
    জাহিদুল ইসলাম সজীব

    ১৮৬৮ বালিয়াদির জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘জগন্নাথ পাঠশালা’ কালের পরিক্রমায় একে একে “জগন্নাথ স্কুল”, ব্রাহ্ম স্কুল, পুনরায় ১৮৭৮ সালে ‘জগন্নাথ স্কুল’, ১৮৮৪ সালে ‘জগন্নাথ কলেজ’, ১৯২১ সালে ‘জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’, ১৯৬৮ সালে ‘সরকারি জগন্নাথ কলেজ’, সর্বশেষ ২০০৫ সালে দীর্ঘ আন্দোলন এর ফসল হিসেবে রূপ নেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

    ২০০৫ সালে সংবিধানের ২৮ নং আইন বলে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। দীর্ঘ দিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল এই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সে দিন আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৭/৪ ধারায় একটি বিষফোঁড়া সৃষ্টি করে যায় তৎকালীন সরকার । ২৭/৪ ধারা মোতাবেক ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হইবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পৌনঃপুনিক ব্যয় যোগানে সরকার কর্তৃক প্রদেয় অর্থ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাইবে এবং পঞ্চম বৎসর হইতে উক্ত ব্যয়ের শতভাগ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ও উৎস হইতে বহন করিতে হইবে।‘  অর্থাৎ ৫ম বছর হতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে আর কোনো সরকারী বরাদ্দ দেয়া হবেনা এবং তখন বিশ্ববিদ্যালয় চলবে ‘নিজস্ব আয় ও উৎস’ (পড়ুন, ‘শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি’) থেকে প্রাপ্ত অর্থ হতে। কেন জবি’র জন্য এই নিয়ম করা হল?

    শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ জন্য ধনীকে আরও ধনী , গরীবকে আরও গরীব বানানোর কারিগর বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের এর পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তৈরি করে ২০ বছর মেয়াদী একটি কৌশল-পত্র। আর ঐ কৌশল-পত্র বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেই প্রথম গিনিপিগ হিসেবে বেছে নেয় সরকার ।

    কী আছে ২০ বছর মেয়াদী এই কৌশল পত্রে?

    মূলতঃ উচ্চ-শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে এ-ক্ষেত্রে অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করাই এই কৌশল-পত্রের লক্ষ্য। আর এ-উদ্যেশ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪ ধাপে উচ্চ-শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ৫০% হ্রাস করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এবং এক পর্যায়ে উচ্চ-শিক্ষার ব্যয়ভারের শতকরা ১০০ ভাগ অর্থই শিক্ষার্থীদেরকে বহন করতে হবে । এ সময়ের মধ্যে ধীরে-ধীরে উচ্চ-শিক্ষা থেকে ঝরে যেতে থাকবে দরিদ্র-নিম্নবিত্তের সন্তানেরা। আর তখনই বিশ্ব ব্যাংক ও তাঁদের দোসরদের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হবে; শিক্ষা পরিণত হবে পণ্যে। তখন শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের দ্বার অবারিত হবে । “টাকা যার, শিক্ষা তার” এই নীতিতেই পরিচালিত হবে শিক্ষা ব্যবস্থা।

    হল চাই ! হল চাই ! হল চাই!

    বিশ্ববিদ্যালয় নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে হলের ধারণাটি ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। অথচ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭ বছর পরও শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য কোন হল নির্মাণ করা হয়নি। অন্যদিকে জবির বে-দখলকৃত ১২ টি হলের মধ্যে মাত্র একটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য , জবির শিক্ষার্থীরা ২০০৯ সাল থেকেই হলের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। এসব আন্দোলনে প্রশাসন ও তাদের পেটোয়া বাহিনী বরাবরই দমন-নিপীড়ন মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।   হল উদ্ধারে বিভিন্ন তদন্ত কমিটীর নামে শিক্ষার্থীদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। সেই সাথে নতুন হল নির্মাণে ২০০৯ সাল থেকেই প্রশাসনের মিথ্যা আশ্বাস শুনে আসছে শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রেও আমরা ইউজিসি’র সেই ২০ বছর মেয়াদী কৌশল-পত্রের প্রভাব লক্ষ করি। কৌশল-পত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হল না করার সুপারিশ করা হয়েছে। আবাসিক হল না করার কারণ হিসেবে ছাত্র আন্দোলনকে দায়ী করা হয়েছে। কৌশল-পত্রে বলা হয়েছে, 'অধিক সংখ্যক আবাসিক হল সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।'

    ক্যাফেটেরিয়া ও পরিবহন

    হল নাই, তাই অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীকেই দূরবর্তী অঞ্চল থেকে বাসে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বছরে ৬০০ টাকা পরিবহন ফী দেয়ার পরও শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দুপুরেই অনাহার বা অর্ধাহারে কাটাতে হয়। কারণ জবির একমাত্র ক্যান্টিনটি খাবার এর দাম রীতিমত আকাশচুম্বী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করে আসছে ক্যান্টিনে নাকি ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। তাহলে প্রশ্নঃ আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকির টাকা কার পেটে যাচ্ছে?

    গবেষণার জন্য অর্থ নেই

    বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সেই বিদ্যাপীঠ যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব-নব ধারা আবিষ্কৃত হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিলিত প্রচেষ্টাই এ-ক্ষেত্রে মূল ভুমিকা রাখবে। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্ধ মাত্র ২ লক্ষ টাকা।

    শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

    শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নয় প্রতিবাদ প্রতিরোধের মডেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে স্লৌগান দিয়ে আসছে। যখনই প্রশাসন অযৌক্তিকভাবে  কোন ফী বৃদ্ধি করেছে, তখনই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছে।

    ২০০৮ সালে এবং ২০১০ সালে সেমিস্টার ফী বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ প্রতিরোধে সোচ্চার হয় এবং দাবি আদায়ে এর সংগ্রামে অটল থেকে প্রশাসনকে বর্ধিত ফী প্রত্যাহারে বাধ্য করে। ঐ সময় থেকেই বর্ধিত সেমিস্টার ফী প্রত্যাহারের পাশাপাশি ২৭/৪ ধারা বাতিলের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন জবি’র শিক্ষার্থীরা। এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইতিহাস সৃষ্টিকারী আন্দোলন শুরু করেন জবি’র শিক্ষার্থীরা। যেখানে আমাদেরকে জেল-সহ নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়।

    কোনো অত্যাচার নির্যাতন আমাদেরকে দাবি আদায়ের সংগ্রাম থেকে টলাতে পারেনি। এবং আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ৬ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৭/৪ ধারা বাতিল করে জবিকে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সরকারী অর্থ বরাদ্দ দেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন ২০১১-২০১২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উপর উন্নয়ন ফী’র নামে অন্যায্য ৫০০০ টাকার বোঝা চাপিয়ে দেয়, তখন তা প্রতিরোধ করার জন্য জবির সংগ্রামী শিক্ষার্থীরা কার্পণ্য করেনি।

    এখানে উল্লেখ্য, ৫০০০ টাকা উন্নয়ন ফী প্রত্যাহারের আন্দোলন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইল ফলক। এই অযৌক্তিক ‘উন্নয়ন ফী’ প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র ইউনিয়ন প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলো। গত ৮ ডিসেম্বর ছাত্র ইউনিয়ন এই দাবিতে বিক্ষোভ ও মিছিল সমাবেশ করে। পরবর্তীতে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের অন্যান্য সংগঠনকে সাথে নিয়ে ১১ ডিসেম্বর উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি উপস্থাপন করে । এই আন্দোলনে ৩ জানুয়ারী প্রগতিশীল ছাত্র জোটের  ব্যাংক অবরোধ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের নগ্ন হামলার শিকার হন পাঁচ ছাত্রী-সহ প্রায় ২০ জন জোট নেতা-কর্মী।

    আন্দোলনের তীব্রতায় বেসামাল প্রশাসন আন্দোলন দমনে নানান কূট-কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এরই অংশ হিসেব ১১ জানুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট মিটিংয়ে উপাচার্যকে কয়েকটি স্বৈরাচারী ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন, উপাচার্য একক ক্ষমতা বলে যে-কোনো ছাত্রকে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান, বহিষ্কার , ছাত্রত্ব বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করতে পারবেন। আমরা এ-স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রয়োগ দেখতে পাই যখন ১২ জানুয়ারী ৮ জন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে শো-কজ নোটিশ পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসন ও তাদের পেটোয়া বাহিনীর এমন দমন-নিপীড়ন মূলক নীতির সামনে নতি স্বীকার না করে জবির শিক্ষার্থীরা দাবির আদায়ের সংগ্রামে অটল থাকে । আন্দোলনকারীদের এমন দৃঢ়চেতা মনোভাবের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় জবি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০১১-১২) ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ফী ৫০০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৩০০০ টাকা করা হয় এবং আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সম্পূর্ণভাবে উন্নয়ন ফী প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়।

    মূল কথা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ চক্রান্তকে কখনও মেনে নেয়নি বরং এসকল চক্রান্ত প্রতিরোধে অবিচল দৃঢ়তার স্বাক্ষর রেখেছে জবির সংগ্রামী শিক্ষার্থীরা।

    আশঙ্কার অবসান হয়নি

    প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরবর্তী ৩ মাসে ২বার সংসদ অধিবেশন বসলেও এর কোনটিতেই উত্থাপিত হয়নি ২৭/৪ ধারা বাতিল সম্পর্কিত বিলটি। কিন্তু “উন্নয়ন ফী বিরোধী” আন্দোলনে আমরা ২৭/৪ ধারা অবিলম্বে সংসদে বাতিল করার দাবিতে অনড় ভূমিকা রাখায় গত  ৩০ জানুয়ারী, ২০১২ মন্ত্রী-পরিষদ সভায় জবি আইনের ২৭/৪ ধারা সংশোধনের বিলটি নীতিগত ভাবে অনুমোদিত হয়। কিন্তু আশঙ্কার বিষয়, প্রস্তাবিত বিলটিতে “অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত”  সরকারী অর্থ বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়। এবং সেই সাথে “অভ্যন্তরীণ আয়” বাড়ানোর জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, সরকার যে-কোনো মুহূর্তে জবিকে সরকারী অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিতে পারে এবং সেই সাথে অভ্যন্তরীণ আয়ের নামে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফী বাড়ানোর তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে।

    অন্যায়ের প্রতিবাদ চলবে

    আন্দোলন সংগ্রামের ফসল স্বরূপ জগন্নাথ কলেজ থেকে জন্ম নেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হবার পরও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থেমে নেই আন্দোলন। কারণ একটাই, শিক্ষার উপযোগী যথাযথ পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি এই প্রতিষ্ঠানে। তবে সর্বশেষ উন্নয়ন ফী বিরোধী আন্দোলনটির চরিত্র অন্য যে-কোনো আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন। কারণ এ-আন্দোলনের প্রধান দাবির সাথে কেবল মাত্র ভর্তিচ্ছুদের সরাসরি স্বার্থ জড়িত। কিন্তু জবির শিক্ষার্থীরা কোনো রকম অন্যয় সহ্য করে না। বরং নবীনদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব রকম অন্যায়-অত্যাচার, শো-কজ নোটিস-সহ নানা ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দাবি আদায়ের জন্য অটল ছিলো। আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নবীনরাও যে-কোনো অন্যয়ের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার হবেন ।

    রোববার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১২
    ঢাকা

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন