• জাতি প্রসঙ্গে ভাবনা (১)
    মাসুদ রানা

    জাতি-বিতর্ক
    রাশিয়ার সেইণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে গত ৬ সেপ্টেম্বর রুশ প্রেসিডেণ্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করতে গিয়ে ব্রিটেইনকে 'ক্ষুদ্র দ্বীপ' বলে অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছিলেন। এতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোন অপমানিত বোধ করে থাকবেন। তাই, তিনি প্রত্যুত্তরে সেইণ্ট পিটার্সবার্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ব্রিটেইন হতে পারে ক্ষুদ্রদ্বীপ, কিন্তু বৃটিশ জাতির চেয়ে বৃহত্তর হৃদয়ের আর কোনো জাতি পৃথিবীতে নেই।

    চারদিন পর, গত ১০ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেণ্ট বারাক ওবামা জাতির উদ্দেশ্য ভাষণদান-কালে মার্কিন জাতিকে 'এক্সেপশন্যাল' বা ব্যতিক্রমধর্মী বলে দর্পিত দাবী উচ্চারণ করেন। এর উত্তরে পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে প্রেসিডেণ্ট পুতিন মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসে উপসম্পাদকীয় লিখে ওবামার দাবীকে ভ্রান্ত ও বিপদজনক বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

    কিন্তু পুতিনের এ-প্রত্যাখ্যান ওবামা মেনে নেননি। তাই, তার দু'সপ্তাহ পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি মার্কিন জাতির ব্যতিক্রমধর্মিতার দাবী পুনরুচ্চারিত করে বলেন, 'কেউ হয়তো দ্বিমত করতে পারেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমেরিকা ব্যতিক্রমধর্মী।'

    তাতেও বিতর্কের শেষ হয়নি। অতি উচ্চ-পর্যায়ের এ-বিতর্ক সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরেও জীবন্ত থাকলো। গত ৪ অক্টোবর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের প্রেসিডেণ্ট রাফায়েল কোরেয়া বিতর্কে প্রবেশ করলেন। তিনি মার্কিন জাতির ব্যতিক্রমিতার ওবামা-দাবীকে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসী জার্মানীর জাত্যাভিমানের প্রতিধ্বনি বলে মন্তব্য করেন।

    বিষয়টি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনায় আগ্রহোদ্দীপক। কারণ, গত শতকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নব্বইয়ের দশকের আগে পর্যন্ত পাশ্চাত্যের দেশসমূহে 'পলিটিক্যাল কারেক্টনেস' রক্ষার্থে রাজনৈতিক চর্চা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ অনেকটা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হতো।

    কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পূর্ব-ইউরোপে জাতীয়তাবাদের যে নব উত্থান শুরু হয় এবং নতুন-নতুন জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়, তা ইউরোপীয় পণ্ডিতদের বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। বলাবাহুল্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে নতুন জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি পাশ্চাত্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের পক্ষে গিয়েছিলো।

    অদ্য জাত্যাভিমানের যে-দাবী ও পাল্টা-দাবী পৃথিবীর প্রবল জাতিসমূহের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে উচ্চারিত হচ্ছে, তাতে আমি মনে করি, বিশ্ববোধ সম্পন্ন বাঙালী পাঠকদের এ-বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আর, সে-প্রয়োজনবোধ থেকেই আমার এ-রচনার সৃষ্টি।

    জাতি কী?

    জাতি কাকে বলে প্রশ্নের অতি সুলভ ও অগণিত উত্তরের মধ্যে সঠিকটি বেছে নেওয়া সত্যিই কঠিন। কারণ, পৃথিবীর সকল মানুষই এক, আবার প্রতিটি মানুষই আলাদা বলে অভিন্নতার ও বিভিন্নতার বিবিধ মাত্রা নিরূপণ ও নির্দেশ করা সম্ভব।  বিভিন্নতার সর্বনিম্ন প্রান্তে প্রতিটি অনুপম ব্যক্তি থেকে শুরু করে অভিন্নতার সর্বোচ্চ প্রান্তে কোটি-কোটি ব্যক্তির সমাহারে যে-মনুষ্য প্রকরণ বা হোমোসেপিয়ান রয়েছে, তার মাঝখানে বহু প্রকরণ সম্ভব। তবে, এ-প্রকরণের আরোহণ ও অবরোহণ নির্ভর করে আমাদের পর্যেবেক্ষণের মাত্রার উপর - অর্থাৎ, আমরা অভিন্নতা ও বিভিন্নতা কোন মাত্রায় দেখছি, তার ওপর। আর, আমাদের পর্যবেক্ষণের মাত্রাও নির্ধারিত হয় আমাদের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, প্রয়োজন ও প্রেষণার দ্বারা।

    জাতির একটি জেনেরিক বা সাধারণ সংজ্ঞা নির্ণয়ের প্রচেষ্টায় আমার কাছে মনে হয়ঃ জাতি হচ্ছে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত কিংবা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় রপ্ত পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যমূলক এমন একটি সচেতন ও স্বীকৃত প্রকরণ, যা তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদেরকে একটি সাধারণ নৈর্ব্যক্তিক পরিচয় দান করে অন্য প্রকরণ থেকে আলাদা করে।

    সংজ্ঞানুসারে, পৃথিবীতে এক জাতি ছাড়া অন্য জাতির অস্তিত্ব অসম্ভব। কারণ, প্রকরণগত বৈষম্য ছাড়া জাতি কল্পনা করা যায় না। যে-বিশ্বে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্যসূচক প্রকরণগত সাধারণ বৈশিষ্ট্য নেই, সেখানে জাতির ধারণাই গড়ে উঠতে পারে না।

    অর্থাৎ, এ-পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য যতোক্ষণ না পর্যন্ত একদল মানুষের একটি প্রকরণ হিসেবে বোধিত হচ্ছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবে জাতি থাকলেও জাতিবোধ গড়ে উঠতে পারে না। প্রকৃত প্রস্তাবে জাতি গড়ে ওঠে এক প্রকরণের তুলনায় অন্য প্রকরণের ভিন্নতার সচেতনতা ও স্বীকৃতি হিসেবে।

    সৌশ্যাল আইডেণ্টিটি থিওরীর আলোকে দেখা যায়, জাতিবোধের বিকাশে মানুষকে অন্ততঃ তিনটি কগনিটিভ প্রৌসেস বা বোধিক প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত হতে হয়। এ-ত্রয়ী প্রক্রিয়ার প্রথমটি হচ্ছে ক্যাটেগোরাইজেশন, দ্বিতীয়টি কম্পারিজন ও তৃতীয়টি আইডেণ্টিফিকেশন। আমি এ-তিন প্রক্রিয়াকে বাংলায় আপাততঃ প্রকারায়ণ, তূলনায়ণ ও পরিচায়ণ নাম দিচ্ছি (এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় আমি পরে আসছি)।

    সোমবার, ৭ অক্টোবর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন