• জাতি-ভাষা-লিপি ও নাগরি প্রসঙ্গ (১)
    মাসুদ রানা

    একটি জনপ্রিয় ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিধ্বস্ত করতে লিখছি আজকের এ-লেখা। জানি, দীর্ঘ-কালের লালিত বিশ্বাসে আঘাত পেলে বিক্ষুব্ধ হবেন অনেকেই। অবশ্য, তাতে আক্ষেপের কিছু নেই। তবে প্রত্যাশা থাকবে, তাঁদের প্রতিক্রিয়া যেনো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক না হয়ে বিষয়-কেন্দ্রিক থাকে, যেভাবে থাকা উচিত বুদ্ধিবৃত্তিক বৈজ্ঞানিক বিতর্কে। আর তাতে বিষয় সম্পর্কে পাঠকের বোধ সমৃদ্ধ হয়, যা গালাগালিতে হয় না।

    আমি শুরু করতে চাই আন্তর্জালিক সংমাধ্যমে প্রকাশিত দু’টি পাঠের উদ্ধৃতি দিয়ে। প্রথমটি একটি প্রশ্ন, যা এসেছে বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে ডাক্তার জয়দীপ ভাদুড়ীর কাছে থেকে। আর, দ্বিতীয়টি হচ্ছে উত্তর, যা অজ্ঞাত স্থানের জনৈক জাহিদ ইকবালের। 

    প্রশ্নঃ “সিলেটি কি আসলেই একটি সতন্ত্র (স্বতন্ত্র) ভাষা? তাহলে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, চাপাই নবাবগঞ্জ এসব জায়গার ভাষাও এক একটা সতন্ত্র (স্বতন্ত্র) ভাষা, বাংলা নয়। তাই কি?”

    উত্তরঃ “All the district you mentioned above apart from Sylhet speak different dialect of Bangla whereas Sylheti or Nagori as is known academically is a language in it's own right with it's own alphabet”

    উপরে প্রশ্নটি আমার কাছে স্পষ্ট, কিন্তু উত্তরটি নয়। উত্তরদাতার ইংরেজি লেখায় ব্যাকারণ অনুসরণ না-করার কারণে অর্থ অস্পষ্ট থেকে গিয়েছে। তবে আপাততঃ ধরে নিচ্ছি তিনি বলতে চেয়েছেন, “উপরে আপনার উল্লেখিত সিলেট ছাড়া সকল জেলা বাংলার বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলে। যেভাবে বিদ্যায়তনিকভাবে জ্ঞাত, তাতে সিলেটি বা নাগরি হচ্ছে নিজস্ব বর্ণমালা-সহ নিজাধিকারেই একটি (স্বতন্ত্র) ভাষা।”

    প্রকৃতই পণ্ডিত এবং পণ্ডিত-সদৃশ অনেক ব্যক্তিকেই দেখেছি ‘নাগরি ভাষা’ বিষয়ে কথা বলতে, যাঁদের কেউ-কেউ আবার গবেষক গণ্য। উপরে বর্ণিত উত্তরদাতা পণ্ডিতই হোন, কিংবা পাণ্ডিত-সদৃশই হোন, তাঁর উত্তরের প্রত্যুত্তরের মধ্য দিয়ে এই ‘নাগরি ভাষা’ সংক্রান্ত কুহেলিকা কাটাবার চেষ্টা করবো। আর, তা করতে গিয়ে আমাকে আলোকপাত করতে হবে ভাষার সাথে জাতি ও লিপির সম্পর্কের ওপর।

    জাতি ও ভাষা
    ভাষা হচ্ছে একটি জাতির নির্ণায়ক উপাদন (ডিফাইনিং ফ্যাক্টর)। পৃথিবীতে প্রথম মানুষের বিকাশ হয়েছে ভাষাহীন যুথবদ্ধ প্রাণী হিসেবে। তারপর, ক্রমশঃ শ্রম প্রচেষ্টায় হাত এবং সবশেষে আঙ্গুলের সূক্ষ্ম ব্যবহারে মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কের সেরিব্র্যাল কর্টেক্সের বিকাশের ফলে, সুবিধা ও সহযোগিতামূলক জীবন নিশ্চিতির চেষ্টায় অর্থ (মীনিং), ভাব ও উদ্দেশ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে বস্তু, বিষয় ও ঘটনার শাব্দিক প্রকাশের উদ্ভব ও তাদের ব্যবহারের নিয়ম বিকশিত হয়েছে।

    পৃথিবীর সকল মানুষ অখণ্ড মানবতার অংশ হলেও ভিন্ন-ভিন্ন যে-সমস্ত ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দিয়ে প্রতিক্রিয়া ও অভিযোজনের মধ্য দিয়ে তারা ভিন্ন-ভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও জনজাতিতে বিকশিত হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাদের ভিন্ন-ভিন্ন ভাষা। মৌলিক বিচারে জাতি হচ্ছে বিবর্তিত প্রাকৃতিক প্রকরণ, আর ভাষা হচ্ছে শিক্ষালব্ধ শাব্দিক আচরণ।

    জাতি ও ভাষা উভয়ই ঐতিহাসিক কাল ধরে পরিবর্তনের ধারায় পরিপক্কতা লাভ করে অনন্ত উন্নয়নের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে। রূপতঃ জাতি হচ্ছে কঠিনাধার (হার্ডওয়্যার) এবং ভাষা হচ্ছে কোমলাধার (সফটওয়্যার)। তাই, স্বাভাবিক ভাষাহীন কোনো স্বাভাবিক জাতি নেই এবং স্বাভাবিক জাতিহীন কোনো স্বাভাবিক ভাষা নেই।

    জাতির সংজ্ঞা
    জাতি কী, তার সংজ্ঞা অগণিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে কোনো ধারণা বা কনষ্ট্রাক্টের একটি মাত্র সংজ্ঞায় সন্তুষ্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই, জাতির একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নিরূপণের জন্য প্রাণাতিপাত না করে বলা যায়ঃ

    জাতি হচ্ছে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত কিংবা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় রপ্ত এমন একটি পার্থক্যমূলক প্রকরণ, যা তার অন্তর্ভুক্ত সদস্যদেরকে একটি নৈর্ব্যক্তিক সাধারণ পরিচয় দান করে অন্য প্রকরণ থেকে পৃথক হিসেবে প্রত্যক্ষণীয় করে তোলে।

    উপরের সংজ্ঞায় জাতির বস্তুগত ও চেতনাগত দিক নির্দেশ করা হয়েছে। তার ফলে, এটি খুব সম্ভব যে, একটি জাতি বাস্তবে জাতি হিসেবে পৃথিবীতে বিরাজ করার পরও একটি সময় পর্যন্ত আত্মোপলব্ধিত ও স্বীকৃত নাও হতে পারে।

    ইতিহাসের ঠিক কোন্‌ পরিস্থিতিতে জাতি আবির্ভূত হয়, তা এখানে আলোচ্য নয়। তবে সাধারণ সূত্র হচ্ছে, উপরে উল্লেখিত জনগোষ্ঠী তখনই জাতি হয়ে ওঠে, যখন তাদের সাধারণ আত্ম-পরিচয়ের পক্ষে ইতিহাসকে সাক্ষী করে ভবিষ্যতের অভিন্ন নিয়তি মেনে নিয়ে সকলের জন্যে একটি সাধারণ উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে সার্বভৌম তথা স্বনিয়ন্ত্রিত ও স্বপরিচালিত হতে চায়।

    ভাষার সংজ্ঞা
    জাতি যেমন মানুষের সমষ্টি, ভাষাও তেমন শব্দের সমষ্টি। একটি জাতির সমূদয় শব্দ, তাদের বিবিধ রূপান্তর, ব্যবহারের কাঠামো ও বিধির সমন্বয়ে গঠিত ভাব ও অর্থ বিনিময়ের স্বীকৃত পদ্ধতির নামই ভাষা।

    অন্যভাবে বলা যায়, ভাষা হচ্ছে এক জাতির ব্যবহৃত শব্দভাণ্ডার যা অন্য জাতির শব্দভাণ্ডারের সাথে ধ্বনিগত (ফনোলজিক্যাল), রূপগত (মরফোলজিক্যাল), কাঠামোগত (সিন্ট্যাক্টিক্যাল), অর্থগত (সিম্যান্টিক) ও প্রয়োগগত (প্র্যাগমেটিক) একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পার্থক্যপূর্ণ।

    ভাষা বলতে আমরা মূলতঃ মৌখিক শব্দাচারকে বুঝি। ভাষা হওয়ার জন্য তার লিখিত রূপ অত্যাবশ্যকীয় নয়। বস্তুতঃ মানব জাতির লেখার ইতিহাস খুবই সাম্প্রতিক। অনেক জাতি আছে - যেমন বাঙালী - যাদের অধিকাংশ লোক লিখতে জানেন না। সুতরাং ভাষা বোঝাতে যাঁরা এর লিখিত রূপকে অত্যাবশ্যকীয় অংশ মনে করেন, তাঁরা ভ্রান্ত।

    ভাষা ও লিপি
    ইতিহাসে বিভিন্ন জাতি নিজ-নিজ ভাষাকে নৈর্ব্যক্তিক যোগাযোগে ব্যবহারের জন্য রেখা, আকার ও আকৃতির মাধ্যমে সাঙ্কেতায়িত করার প্রচেষ্টায় স্ক্রিপ্ট বা লিপির জন্ম দেয়। ভাষার যেমন উদ্ভব হয়েছে মানুষের উদ্ভবের অনেক পরে, লিপিরও তেমনি উদ্ভব হয়েছে ভাষার উদ্ভবের অনেক পরে। প্রচীন মিশরীয়দেরকে প্রথম লিপি ব্যবহারকারী জাতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

    একটি জাতির ভাষা তার সকল সদস্যের অধিকারে থাকলেও পরে উদ্ভাবিত লিপি সকলের অধিকার ছিলো না এবং এতো হাজার পরে এখনও নেই। বাংলাদেশে তো বটেই, এমনকি ইংল্যাণ্ডে পর্যন্ত এমন লোক আছেন, যাঁরা লিখতে ও পড়তে পারেন না।

    একটি জাতির অস্তিত্বের জন্য তার ভাষা প্রয়োজনীয় হলেও লিপি অত্যাবশ্যকীয় নয়, যদিও আধুনিক কালে দু’টিকেই অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক কালে দেখা গিয়েছে যে, অনেক সাক্ষর জাতিই নিরক্ষর জাতির কাছে পরাস্ত ও নাস্তানাবুদ হয়েছে।

    ভারতে আগত আর্যজাতি ভাষাগতভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের ভাষার লিখিত রূপ বা লিপি ছিলো না। তারা নিরক্ষর ছিলো। আর্যরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম শুদ্ধতায় বেদ মুখস্ত করে ভারতে প্রবেশ করেছিলো। তখন ভারতে প্রতিষ্ঠিত ছিলো সাক্ষর জাতির সিন্ধু সভ্যতা, যা শেষ পর্যন্ত নিরক্ষর আর্যদের কাছে শুধু অস্ত্রে নয়, ভাষা ও বোধেও পরাস্ত হয়েছিলো।

    পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দিগ্বিজয়ী চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে যে-মোঙ্গল জাতি বিশ্বের বিশাল বিশাল একাধিক সভ্যতাকে পরাস্ত করে মানবেতিহাসে এ-পর্যন্ত সর্ববৃহৎ নিরবিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলো, তাঁদের কোনো লিপি ছিলো না। কিন্তু তাঁদের ভাষা ছিলো এবং সে-ভাষায় তৈরি করা চেঙ্গিসীয় আইনের ভিত্তিতে নিজেদের পরিচালনা করেই মঙ্গোল জাতি পৃথিবীর অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো।

    ভাষাতে লিপির প্রয়োজন হয়েছে তথ্য লিপিবদ্ধ করার জন্য। ধারণা করা যায়, কৃষি আবিষ্কারের ফলে মানুষ যখন প্রথমতঃ স্থানু এবং দ্বিতীয়তঃ উদ্বৃত্ত উৎপাদন করলো, তখনই তার হিসাব রাখার প্রয়োজন হলো। আর, সে-প্রয়োজন মেটাতে তারা ভাষার লিখিত রূপ বা লিপি উদ্ভাবন করলো।

    এ-তত্ত্ব ঠিক হলে, এটি ভাবা বেশ যৌক্তিক যে, কৃষিজীবী (এ্যাগ্রেরিয়ান) সমাজের পূর্ববর্তী শিকারী-সংগ্রাহক (হাণ্টার-গ্যাদারার) সমাজে ভাষা খুবই প্রয়োজনীয় হলেও লিপির প্রয়োজন ছিলো না। তাই, যাযাবর আর্যজাতি কিংবা মোঙ্গল জাতির মধ্যে কঠোর আইন ও শ্লোক সৃষ্টিতে পারঙ্গম ভাষা থাকলেও তারা নিরক্ষর ছিলো। কিন্তু বিপরীতক্রমে নীল-তীরবর্তী কৃষিজীবী মিশরীয়দের কিংবা সিন্ধু-তীরবর্তী সিন্ধুসভ্যদের লিপি ছিলো।

    একই ভাষার একাধিক লিপি
    পৃথিবীতে আজ যে-ভাষা যে-লিপিতে লেখা হচ্ছে, তা কি শুরু থেকেই এরূপ ছিলো? উত্তর হচ্ছেঃ না। এ-ক্ষেত্রে আমরা দু’রকমের পরিবর্তন লক্ষ্য করি। প্রথম পরিবর্তন লক্ষ্য করি স্বয়ং লিপিতে। এ-পরিবর্তনকে আমি বলবো অন্তর্লিপি পরিবর্তন (ইণ্ট্রাস্ক্রিপ্ট) বর্তমানে যে-যে ভাষায় যে-যে লিপি যে-যে রূপে আছে, তার চিরদিন এক ছিলো না। বিবর্তনের ধারায় তা এখন বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। দ্বিতীয় পরিবর্তনকে আমি বলবো হচ্ছে আন্তর্লিপি (ইণ্টারস্ক্রিপ্ট) পরিবর্তন। অর্থাৎ, একটি ভাষার এক লিপি ছেড়ে অন্য লিপি ধারণ এবং তার মধ্য দিয়ে প্রকাশন।

    বর্তমানে আমরা যে-লিপিতে ইংরেজি লিখি, তাহচ্ছে রৌমান লিপি। কিন্তু এ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন যুগে ইংরেজি লেখা হতো রান লিপিতে। পরবর্তিতে রৌমান-শাসিত হওয়ার সূত্র ধরে ইংরেজি লিখতে রৌমান লিপির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

    আজ তুর্কী জাতি যে-লিপি ব্যবহার করছে, তাও রৌমান লিপি। কিন্তু তার আগে শতোশতো বছর ধরে তারা আরবি লিপি ব্যবহার করেছে। মাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোম্যান সাম্রাজ্য ধ্বংস থেকে আধুনিক তুর্কী জনতন্ত্র (রিপাবলিক) সৃষ্টির পর থেকে এর স্রষ্টা কেমাল পাশা আরবি লিপি পরিত্যাগ করে রৌমান লিপি গ্রহণ করেন।

    বাংলাতেও রৌমান লিপি ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত পূর্ব-বাংলায়। তারও আগে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বাঙালী শিক্ষামন্ত্রী আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেছিলেন। সেদিন যদি তা কার্যকর হতো, তাহলে আজকের বাংলাদেশে হয়তো আরবি হরফের বাংলা লেখা হতো।

    একই লিপির একাধিক ভাষা
    পৃথিবীতে ভাষার চেয়ে লিপির সংখ্যা কম। বিশ্বব্যাপী ইতিহাস জুড়ে জাতি-সমূহের মধ্যে সংযোগ ও আদান-প্রদানের ফলে তারা পরস্পর থেকে জন-ধন-জ্ঞান সবই বিনিময় করেছে। ফলে, একাধিক জাতি তাদের নিজ-নিজ ভাষার লিখিত রূপ দিতে অভিন্ন লিপির অংশীদার হয়েছে।

    ইরানী জাতির ভাষা ফার্সি এবং আরব জাতির ভাষা আরবি হলেও তাঁরা উভয়ই আরবি লিপি ব্যবহার করে। রৌমান লিপি ব্যবহার করে ইউরোপের প্রায় সমস্ত জাতি।

    বাংলা লিপি ব্যবহার করে বাঙালী, অসমী-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের কমপক্ষে ৭টি জাতি, যাদের প্রত্যেকের ভাষা ভিন্ন। ভারতের প্রতিটি জাতির রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা কিন্তু তাদের মধ্যে একাধিক জাতির রয়েছে অভিন্ন লিপি। ভারতে ব্যবহৃত লিপি সমূহের মধ্যে দেবনাগরি অন্যতম।

    দেবনাগরি লিপি ও বাংলালিপি উভয়ই এসেছে ব্রাহ্মিক লিপি পরিবার থেকে। ব্রাহ্মিক পরিবারের প্রধান তিনটি লিপির একটি নাগরি, যা ভারতীয় আর্যদের সংস্কৃত ভাষায় দেববাণী লিখতে যেয়ে দেবনাগরী নাম ধারণ করে।

    বাকি দু’টি লিপি হচ্ছে শারাদা ও সিদ্ধম। শারাদাও সংস্কৃত ও কাশ্মিরী ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেখান থেকেই আজকের গুরুমুখি লিপির উদ্ভব হয়েছে। আর, সিদ্ধম বা সিদ্ধং থেকে উদ্ভব হয়েছে বাংলা লিপি, তিব্বতী লিপি এবং জাপানের কানা লিপি, যা বৌদ্ধযুগের বাঙালীদের কাজ। বাংলা লিপিতে সংস্কৃতও লেখা হয়েছে।

    আমরা যদি দেহকে ভাষার রূপক হিসেবে দেখি, তাহলে লিপি হচ্ছে তার পোশাক। এক সময় মানুষ যেমন দেহে কোনো পোশাক পরিধান করতো না, তেমনি ভাষারও কোনো লিপি ছিলো না। কিন্তু মানুষ যখন পোশাক পরতে শুরু করেছে, তখন বিভিন্ন জাতির মানুষ বিভিন্ন সময়-কালে পোশাক পরেছে, আবার একই পোশাক বিভিন্ন জাতির মানুষ পরেছেন। তেমনিভাবে, একই ভাষা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লিপি ব্যবহার করেছে, আবার একই লিপি বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখনও হয়ে আসছে।

    বাংলালিপি যেমন বাংলাভাষা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি বাংলাভাষাও বিভিন্ন লিপিতে লেখা হয়েছে এবং আজও অনানুষ্ঠানিকভাবে হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে অনেক কাব্য ও কাহিনী আরবি লিপিতে রচিত হয়েছে। তাই বলে বাংলাভাষা আরবি হয়ে যায়নি কিংবা তাকে কেউ আরবি ভাষা বলেনি।

    আজ প্রতিদিন মুঠোফৌন ও আন্তর্জালিকার সংমাধ্যমে যে লক্ষ-লক্ষ বাঙালী রৌমান লিপিতে (অনেকেই ইংরেজী লিপি মনে করেন) যে তথ্য ও ভাবের আদান-প্রদান করেন, তাতে কি তাঁরা ইংরেজীভাষী হয়ে গেলন? নিশ্চয় নয়।

    আমি আমার লেখার পরবর্তী পর্বে দেখাবো, বাঙালী জাতির সিলেট অঞ্চলের লোকেদের মধ্যে একটি সম্প্রদায়ের একাংশ সম্ভাব্য বিশেষ কারণে আরবি কিংবা বাংলা লিপির পরিবর্তে দেবনাগরির পরিবর্তন ঘটিয়ে সিলেটী নাগরি লিপির প্রবর্তন ও ব্যবহার করেন। কিন্তু তাতে তাঁদের জাত যায়নি। তাঁরা আজ যেমন বাঙালী আছেন ও বাংলায় কথা বলেন, সেদিনও তাঁরা বাঙালীই ছিলেন এবং বাংলাতেই কথা বলতেন।

    এই লণ্ডনে আমাদের ছেলে-মেয়েদের কেউ-কেউ ইংরজীতে ‘Aamar shonar Bangla, ami tomai bhalobashi’ লিখে গাওয়ার চেষ্টা করে। সে-চেষ্টার তোমায় ভালোবাসি বলতে গিয়ে ‘টোমায় বাহ্‌লোবাশি’  বলে ফেলে। তাতে আমরা হাসিও না রাগিও না। কিন্তু কেউ যদি এসে বলেন আমাদের ছেলে-মেয়েরা যেহেতু বাংলা লিপিতে লিখতে পারে রৌমান লিপিতে লিখে এবং ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলে, তাই তারা আর বাঙালী নয়, তাহলে অনেক মা-বাবা সত্যি-সত্যি রেগে যাবেন।

    সোমবার, ৩ মার্চ ২০১৪
    সেইণ্ট পল্‌সওয়ে
    বোও, লণ্ডন
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন