• জেনারেল ম্লাদিচের বিচার হবে জেনে মনে পড়ে শহীদ জগৎজ্যোতিকে
    মাসুদ রানা

    সাড়ে সাত  হাজার বসনিয়াকের গণ-হত্যাকারী বসনীয়-সার্ব বাহিনীর প্রধান কর্নেল জেনারেল রাতকো ম্লাদিচকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করেছে প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ার সরকার।

    যতোটুকু না মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার অনুষ্ঠানের ইচ্ছা, তার চেয়ে বেশি ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে সার্বিয়ার প্রবেশাধিকারের যোগ্যতার অর্জনের তাগিদ ফলবতী হয়েছে ‘বুচার অফ বসনিয়া’ নামে কুখ্যাত জেনারেল ম্লাদিচকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।

    খুনে-জেনারেল ম্লাদিচ যুদ্ধ-শেষে প্রথম ক’বছর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেইডের নাম-দামী গণস্থানে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০০১ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোদোবান মিলোসেভিচ গ্রেফতারিত হবার পর গা ঢাকা দিয়েছিলেন ম্লাদিচ। সার্বিয়ার সরকার তা জানতো না, এ-কথা ঠিক নয়। এখন সার্ব প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ বলছেন, ম্লাদিচের আত্মগোপনে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-কালে ‘সৌশ্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়া’ গঠিত হয়েছিলো ছ’টি রিপাবলিক - সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, মেসোডোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মন্টেনিগ্রো এবং দুটি স্বায়ত্ত্ব-শাসিত প্রদেশ - ভয়ভোদিনা ও কসোভো-মেতোহিয়া নিয়ে।

    দু-দশক আগে সমাজতন্ত্র-ঘোষিত রাষ্ট্রগুলোতে ভাঙ্গন শুরু হলে প্রতিটি রিপাবলিক তার প্রধান জনজাতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে স্বাধীন হতে চাইলে, স্বভাবতঃ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সার্বিয়া তথা সার্বদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় প্রায় সবক’টি জাতিসত্ত্বার। বিভিন্ন জাতিসত্ত্বা ও ধর্মীয় বিশ্বাসে জটিলভাবে বিভক্ত ও বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত অঞ্চলগুলো স্বাধীনতার প্রশ্নে অভাবনীয় আবেগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

    সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলোর পতনের সাথে পূর্ব-ইউরোপে বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রতিপত্তি-প্রত্যাশী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ইন্ধনে উত্তাপ আরও বেড়ে উঠলে, শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সালে সবগুলো রিপাবলিকের স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত এবং সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর সমন্বয়ে ‘ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়া’ গঠিত হয়। অবশেষে ২০০৬ সালে মন্টেনিগ্রোর স্বাধীনতা ঘোষণার ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ মোচন হয় যুগোস্লাভিয়া নামের রাজনৈতিক মানচিত্রের।

    আলাদা হতে চাওয়া এবং আলাদা হতে না-দেয়ার এই যে দ্বন্দ্ব, তার উভয় পক্ষেরই একটি আদর্শ থাকে। এ-আদর্শবাদের তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে প্রাপ্ত আপেক্ষিক মানবিক উপযোগিতাই মৌলিকভাবে এর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে বলে আমি মনে করি।

    আমি অন্যত্র দেখিয়েছি, পূর্ব-বাংলায় পাকিস্তানী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ধর্ম-নিরপেক্ষ বাঙালী জাতীয়তাবাদের কাছে পরাজিত হবার মূল কারণ হচ্ছে মানবিক উপযোগিতার ক্ষেত্রে প্রথমটির অসারত্ব এবং দ্বিতীয়টির আপেক্ষিক শ্রেষ্ঠত্ব। ইসলামিক সাম্যের বুলির আড়ালে বাঙালী জাতিসত্ত্বাকে হীন, এমনকি ধ্বংস করার, অন্তর্নিহিত সচেষ্টার মধ্যেই মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অসারত্ব প্রমাণিত হয়েছিলো। তাই তার কোনো মানবিক আবেদন ছিলো না - অত্যাচারী কিংবা অত্যাচারিত - কারও কাছেই নয়। মুসলিম-ভ্রাতৃত্বকে ভিত্তি করে সৃষ্ট পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু হবার পরও তাদেরকে নিম্ন-মানের মুসলিম মনে করা সংজ্ঞানুসারে আত্ম-বিভাজক ও আত্ম-পরাস্তক। বিপরীতক্রমে, বাংলা-ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালীর নিজেকে এক ও অভিন্ন করা সংজ্ঞানুসারে আত্ম-সমন্বয়ী ও আত্ম-রক্ষাত্মক।

    পূর্ব-পাকিস্তানের উপর পশ্চিম-পাকিস্তানের গণহত্যা, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, শিয়া-সুন্নী খুনোখুনী, লিবিয়ার বিরুদ্ধে পাশ্চমা আক্রমণে আরব লীগের সমর্থন, আরবের সমাজে অনারবদের ‘মিসকিন’ মনে করা, এর সবগুলোই বারবার ডেকে বলছে, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব একটি ইউটোপিয়া একটি মরিচিকা।

    একই-ভাবে যুগোস্লাভিয়ার সমাজতন্ত্র তথা সাম্যবাদের লাল ঝণ্ডার নিচে জাতিগত অসাম্য নিরসন বাস্তবে হয়নি, কিন্তু ভান করা হয়েছিলো জাতিভেদ নেই বলে। ভেদ আছে অথচ ভেদ নেই মনে করার মধ্যে যে বিভ্রম, তা-ই কুৎসিক রূপে প্রকাশ পেলো যুগোস্লাভ যুদ্ধে।

    বসনিয়া-হার্জেগোভিনা কি সার্বিয়ার সাথে থাকবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে এ-নিয়ে ছিলো দ্বন্দ্ব। সার্বিয়ার সাথে ফেডারেশনে থাকলে সার্বরা ফেডারেল পর্যায়ে নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে থাকবে। আর স্বাধীন হয়ে গেলে সেখানে বসনিয়াকরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করবে। সুতরাং অনেকটা পাকিস্তানের প্রভাবশালী জাতি পাঞ্জাবীদের মতোই দীর্ঘ কালের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বে অভ্যস্ত সার্বরা বসনিয়া-হার্জেগোভিনার স্বাধীনতা মেনে নিতে পারলো না।

    বিশ্বে যখন বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনেই নেয়া হলো, তখন তারা ‘স্বাধীনতার প্রতি স্বীকৃতি’র পশ্চিমা নীতিকে কাজে লাগাবার জন্য নিজেরাই নতুন ‘রিপাবলিকা স্রপ্সকা’ প্রতিষ্ঠা করলো। এর প্রেসিডেন্ট হলেন রাদোবান কারাদজিচ, আর সামরিক বাহিনীর প্রধান হলেন রাতকো ম্লাদিচ।

    কারাদৎজিচ ও ম্লাদিচ পাকিস্তানের জেনারেল টিক্কা খানের মতোই ‘পোড়া-মাটি নীতি’ অবলম্বন করেছিলেন। বসনিয়ার মাটিকে বসনিয়া-মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। আদি মানুষ উৎখাত করে মাটি দখলের এ-নীতিকে বলা হয় ‘এথনিক ক্লীনজিং’।

    ১৯৭১ সালে পূর্ব-বাংলা হানাদার বাহিনীর জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘মানুষ নয়, মাটি চাই পূর্ব-পাকিস্তানের’। বাংলার মাটিতে ৩০ লক্ষ বাঙালী মেরেছিলো পাকিস্তানীরা। কিন্তু ওদের বিচার হয়নি।

    কারাদাৎজিচের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ম্লাদিচের নির্দেশে এবং ডাচ বাহিনীর সাক্ষীগোপালীত্বে বসনিয়ার স্রেব্রেনিকার জাতি-সংঘের ‘সেইফ হ্যাভেন’ থেকে ধরে নিয়ে সাড়ে সাত হাজার বসনিয়াক পুরুষ ও বালককে হত্যা করে গণ-কবর দেয়া হয়েছিলো ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে।

    এটি খুবই স্বস্তির ব্যাপার যে, সাড়ে সাত হাজার খুনের ‘পারপিট্রেইটর’দের বিচার হবে। আমি সর্বতোভাবে এ-বিচার চাই। এর মধ্যে লোক-দেখানো আনুষ্ঠানিকতা বা ষড়যন্ত্র, যা-ই থাকুক না কেনো, তবু বিচার চাই। বসনীয় নারী, যারা পিতা-স্বামী-সন্তান হারিয়েছেন, তারা নায্য বিচার চাচ্ছেন গণহত্যার পারপিট্রেইটর’দের। একই কথা বলছেন আজ সারা পৃথিবীর সব স্বাভাবিক চিন্তার মানুষ। নিরাপরাধ সাড়ে সাত হাজার বসনিয়াক হত্যাকে পৃথিবীর সব মিডিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড়ো একক গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিচার প্রক্রিয়ার বৃত্তান্ত লিখছে।

    আমি পড়ছি এসব সংবাদ, আর বাঙালী হিসেবে আমার মন বার-বার ছুটে যাচ্ছে সেই বধ্যভূমিতে, যেখানে ‘পোড়া-মাটি নীতি’ অবলম্বনে আমার জাতির মানুষকে লাখে-লাখে হত্যা করা হয়েছে। বসনিয়ার মতো শুধু পুরুষ ও ছেলেদের নয়। হত্যা করা হয়েছে শিশু ও নারীদেরও। ধর্ষণ করা হয়েছে আমাদের মা-বোনদের। আগুনে পুড়িয়ে ছাড়কার করে দেয়া হয়েছে আমাদের হাজার-হাজার জনপদ। কে করেছে এ-অপরাধ? পাকিস্তান রাষ্ট্র। কিন্তু পৃথিবীতে আমরা তার বিচার পাইনি।

    আমার জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের অসমান্তরাল নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। শিশু-আমি সেদিন আমার জনকের সাথে রেডিওতে শুনেছিলাম তার বজ্রকন্ঠের ভাষণ, যার পুনঃশ্রবণ এখনও আমার শরীরে শিহরণ তোলে। মুজিব-ভক্ত আমার পিতা বলেছিলেন, ‘এবার আর আমাদের কেউ রুখতে পারবে না। স্বাধীন আমরা হবোই।’

    অবুঝ-আমি সেদিন বুঝিনি কেনো শেখ সাহেব যুদ্ধের নেতৃত্ব না দিয়ে বাড়ীতে বসে থেকে নিজেকে গ্রেফাতারিত হতে দিলেন। আমার পিতা বললেন, ‘তা না করলে ওরা বাঙালীকে নিঃশেষ করে দিতো’। তিনি যদি তাই জেনে থাকবেন, তাহলে যুদ্ধের আহ্‌বান করলেন কেনো? কিন্তু তবুওতো পাকিস্তানীরা ত্রিশ লাখ বাঙালী মারলো। আমার বাবার যুক্তি আমি মানতে পারিনি সেদিন। এবং আমি আজও মানি না সে যুক্তি, তা যিনিই দিন না কেনো।

    আজ বয়সে পরিণত ও পৃথিবীর ইতিহাস-জ্ঞাত আমি। নিজেকে প্রশ্ন করিঃ পৃথিবীতে কি এমন কোনো নেতা বা স্বাধীনতার পথিকৃৎ ছিলেন, যিনি তার জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রাণ দিতে বলে নিজে জীবিত অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধে অনুপস্থিত থেকেছেন? কি আশ্চর্য্য!

    যুদ্ধের ন’টি মাসের ভয়ঙ্কর কিন্তু আশায় উদ্দীপ্ত ও প্রলম্বিত সময় আমার শিশু-মনে যেভাবে গেঁথে গিয়েছিলো, তা এখনও জাগরিত। বিশেষ করে, কুশিয়ারা তীরবর্তী আমাদের গ্রামের বাড়ীতে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ-যুদ্ধে যেদিন শহীদ হলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাশ, সে-দিন আমার ছোট্ট বুক ফুলে উঠেছিলো আর স্বপ্নিল চোখ দুটো জলে ভরে গিয়েছিলো।

    আমার জননীর জননী অঝোরে কাঁদছিলেন জগৎজ্যোতির জন্য, আর তার অদেখা খোদার কাছে নালিশ জানাচ্ছিলেন ঘাতকদের বিরুদ্ধে। তিনি প্রার্থনা করছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে, যাতে শত্রুরা তার ক্ষতি না করতে পারে। আমার গলায় কান্নার একটি পিণ্ড আটকে গিয়েছিলো। আমি সশব্দে কাঁদতেও পারছিলাম না।

    এই যে আমি আজ লিখছি, এখনও এই চল্লিশ বছর পরও, কন্ঠে সেই পিণ্ড আর চোখে প্লাবন অনুভব করি শহীদ জগৎজ্যোতির জন্য। অসীম সাহসী ছিলেন তিনি। তিনি কলেজে পড়ুয়া ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন বিধবা মায়ের একমাত্র পুত্র জগৎজ্যোতি দাশ।

    আমি সে-দিন তার সহযোদ্ধাদের প্রতি একটু অভিমানী হয়েছিলাম পাক বাহিনীর গুলির মুখে তার লাশ নিয়ে ফিরতে না পারার কারণে। প্রিয় মাটিকে আকড়ে ধরা নিষ্প্রাণ জগৎজ্যোতিকে পাক-বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারেরা সেদিন টেনে-হিঁচড়ে থানা-সদরের বাজারে এনে অত্যন্ত কাপুরুষোচিতভাবে তার লাশের প্রতি অপমানকর আচরণ করেছিলো। তার হিন্দুত্বকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিলো অত্যন্ত নোংরা-ভাবে ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে।

    স্বাধীনতার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো দেখতে এক বাউলকে চোখের জলে সিক্ত হয়ে জগৎজ্যোতির মায়ের ভাষ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করে গান গাইতে দেখেছি আমি। বাউলের চার পাশের বৃত্তাকার ভীড়ে মানুষকে চোখের জলে ভাসতে দেখেছি।

    কিন্তু হায়! জগৎজ্যোতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে, তার বিচার হয়নি। কেনো হলো না? আর কেনোই বা হবে না?

    জগৎজ্যোতির স্মৃতি নিয়ে বেড়ে ওঠা কিশোর-আমি যখন পরবর্তীতে দেখলাম শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য পাকিস্তানের লাহোরে গেলেন, সে-দিন আমি জগৎজ্যোতি দাশ হয়ে হৃদয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম আর প্রচণ্ড এক অভিমানে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম অবিশ্বস্ততা ও অপমানের চাকুক খেয়ে।

    আমার মনে হলো, জগৎজ্যোতির শহীদ হওয়া বৃথাই গেলো। প্রতিবাদী যুবক জগৎজ্যোতির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় আছে জানি না। তবে এটুকু জানি, তার চেতনা শেখ মুজিবুর রহমানের বাহিত বাংলাদেশের মুসলিম পরিচয়, সংবিধানে জিয়াউর রহমান কর্তৃক কোরানিক বাক্যের প্রবিষ্টতা, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ইসলামের আরোপ, আর সবশেষে শেখ হাসিনার ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও ধর্ময়ীতার অদ্ভূত জগাখিচুরী কখনও মানবে না। এক্ষণে, জগৎজ্যোতির চেতনাকে ধারণ করে নিঃশঙ্ক চিত্তে বলতে চাইঃ ওরা কেউই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না! করে না!! করে না!!!

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে শহীদেরা। তারা মৃত। আজ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বৈষয়িকভাবে খুশি করার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রকারান্তরে ঘুষ দেয়া হচ্ছে। এমনকি, স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক-বাহিনীর সমর্থক ও সহযোগী জামায়াতে ইসলামী দলও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছে।

    হে বীরবাহু জগৎজ্যোতি, এরা কেমন মুক্তিযোদ্ধা যে তোমার হত্যার সহযোগীদের হাত থেকে দান গ্রহণ করছে? ওরা কেমন মুক্তিযোদ্ধা যে তোমার হত্যাকারী পাকিস্তানী পারপিট্রেইটরদের বিচার চাচ্ছে না? ওরা কেমনতরো মুক্তিযোদ্ধা যে সাম্রাজ্যাবাদের হাতে লুন্ঠিত দেশে নির্বিকার বসে রয়েছে?

    জগৎজ্যোতি, তুমি দেখো, তোমার প্রিয় বাঙালী জাতির চেয়ে কতো ক্ষুদ্রতর জাতি বসনিয়াকরা তাদের সাড়ে সাত হাজারের গণহত্যার বিচারে দাবী ছেড়ে দেয়নি। কিন্তু তোমার ত্রিশ লাখ মানুষের গণহত্যাকারী পাকিস্তানী জেনারেলদের কোনো বিচার চাওয়া হচ্ছে না। পাকিস্তান এখনও তোমার দেশের জনগণের প্রতি ক্ষমা চায়নি। কিন্তু কি লজ্জা দেখো, তোমার দেশের লোকেরা পাকিস্তানকে নানা ছুঁতোয় সমর্থন করছে।

    পৃথিবীর সমতলে দাঁড়িয়ে যখন আমি নিজেকে তোমারই মাতৃভূমিতে জন্ম-নেয়া ও তোমারই রক্তের একজন ভাবি, তখন আমার সে-রক্ত তরঙ্গায়িত হয়। তাই গত চার দশক যাবৎ যারা নতজানু হয়ে তোমার প্রিয় মাতৃভূমিকে বিশ্বে প্রতিনিধিত্ব করার নামে অপমানিত করছে, তাদেরকে আমি ক্ষমা করতে পারি না। আর ক্ষমা করতে পারি না নিজেকে, নিজের অক্ষমতার জন্য।

    তবুও ভালো লাগছে, অন্ততঃ বসনিয়াকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ করা সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচের বিচার হচ্ছে। আশা ছাড়ি না, জগৎজ্যোতি! একদিন হয়তো আমরাও বিচার করবো তোমার প্রিয় জন্মভূমি ও প্রিয় মানুষের প্রতি পাকিস্তানী পারপিট্রেইটরদের কৃত যুদ্ধাপরাধের। দালাল-বিচারের শিশুতোষ ‘মোয়া’তে আমরা ভুলবো না।

    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড
    ২৯ মে ২০১১
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটা ছবি দেখলাম – শেখ মুজিব পাকিস্তানে পাকিস্তানি নেতাদের সাথে স্ব-হাস্যে করমর্দন করছেন । সেটা ১৯৭৪ সালের কোন এক সময়ে, সম্ভবতঃ ইসলামী কোন এক সম্মেলনে । আরেকটা ছবিতে দেখা গেল, গলাগলি । কি বিচিত্র এই সেলুকাস !
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়া, যে যুদ্ধটাই হয়েছিল পাকিস্তানের সাথে, যে যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই দেশের দোশরদের সাথে মিলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে । বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দিয়েছে ১৯৭৪ সালে ।

অনেকদিন পর একটা চমৎকার লেখা পড়লাম।লেখাটা পড়ার সময় আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম অতীতে।মনে পড়ছে '৯১ থেকে '৯৫ সাল পর্যন্ত যুদ্বাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গনআদালত ও তার পরবর্তী আন্দোলনের কথা। প্রায় প্রতিটি কর্মকান্ডে স্বশরীরে উপস্থিত থেকেছি। আজ কি দেখতে পাচ্ছি। যাদের নেতৃত্বে যুদ্বাপরাধীদের বিরোদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি তারাই এখন যুদ্বাপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে। তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে। এইসব ভন্ড নেতৃত্বকে নিয়ে মন্তব্য আপনার লেখায় ছিল আনুপস্থিত।
আমি মনে করি, কেউ নিজের অক্ষমতার দোহাই দিয়ে নিজেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে। প্রত্যেকে প্রতেকের স্বঅবস্থান থেকে '৭১ -এর গনহত্যার বিচার দাবী এবং সেই লক্ষে কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারে। হউক লেখনী অথবা স্বশরীরে বা অন্য কোন প্রদ্ধতিতে । আমি দেখেছি দেশের মানুষের প্রতি আপনার কি গভীর ভালবাসা, যুদ্বাপরাধীদের বিরোদ্ধে ঘৃন্যা, সেই সাথে যুদ্বাপরাধীদের বিচারের দাবীতে বিভিন্ন কর্মকান্ডে স্বকীয় অংশগ্রহন। ফলে আমি কোন অক্ষমতার কারন দেখিনা। আপনার শক্ত লেখনী হয়ে উঠতে পারে গনহত্যা বিরোধী আন্দোলনের একটি হাতিয়ার। আমি আশা করি যারা যুদ্বাপরাধীদের পূনর্বাসিত করেছে, যুদ্বাপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে বা দিয়েছে এবং যুদ্বাপরাধীদের বিচারের নামে জনগনের সাথে প্রহসন করছে তাদের বিরোদ্ধেও আপনার কলম প্রতিবাদের ঝড় তুলবে।

কারো জন্য অপেক্ষা না করে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ক্যাম্পেইন করা উচিত। আমার মতে লন্ডন এর জন্য যথার্থ স্থান। অল্প কজন হলেও আমাদের এ ইস্যূতে এগিয়ে আসা দরকার।

ময়েজ ভাই কি হিন্দু নাকি?

গত দু'তিন বছর ধরে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটিতে নতুন করে বেশ জোরালো আলোচনা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে আলোচনার প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে বিগত কয়েক দশকের প্রচেষ্টার কথা মাথায় রাখা দরকার।

'৯০ এর দশকে জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামাল, বদরুদ্দিন উমর, আহমদ শরীফ এবং আরো অনেকের উদ্যোগে গণ-আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি প্রচেষ্টা নেয়া হয়। বলাই বাহুল্য তখনকার বিএনপির সরকার একে নস্যাৎ করার সব চেষ্টাই করেছে। জাহানারা ইমামকে হতে হয়েছে দেশদ্রোহী মামলার আসামী! তৎপরবর্তীতে '৯৬ সালে আওয়ামীলিগ সরকার গঠন করলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে টু-শব্দটি করেনি।

দুই-পার্টির ডিক্টেটরশীপের দেশ বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় নিয়ম করে আবার বিএনপি এল ক্ষমতায়, আওয়ামীলীগ গেল বিরোধীদলে। কিন্তু কেউ-ই বিচারের কথা তুললো না।

তারপর ঘোমটার আড়ালে এলো সেনাশাসন। মাইনাস টু, প্লাস ইউনূস, পার্টিগুলোর অভ্যন্তরে সংস্কারের নামে 'ডিভাইড এন্ড রুল' ইত্যাকার নানাবিধ পশ্চিমা প্রেসক্রিসশনের পরেও যখন ঠিক কুলোতে পারলো না তারা, শুরু হলো নেগোসিয়েশন। তাদের সেই নেগোসিয়েশনের টার্মসগুলো দেশবাসীর জানার উপায় নেই, তারা কেবল দেখলো নবগঠিত 'সেক্টর কমান্ডারস ফৌরাম' যুদ্ধাপরাধী বিচারের ব্যাপারে ক্যাম্পেইন করছে। বিএনপির এমনিতেই একটি ডান-ঘরানার পার্টি, তার ওপরে তাদের সাথে আছে জামাত সুতরাং বিচারে সক্ষম বাকি রইলো একমাত্র আওয়ামীলিগ। 'ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি' নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হলো তারা।

আশায় বুক বেঁধে মানুষ আবার দাবি তুললো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। পালিত হলো মানব-বন্ধন, স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানসহ আরো নানা কর্মসূচী। সরকার ধীরে-চলো নীতিতে শুরু করেছে বিচার ট্রাইব্যুনালের কর্মকান্ড। নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বললেও, উচ্চপর্যায়ের ব্যাক্তিদের আমেরিকা সফরের পর থেকে তাদের অবস্থান পাল্টেছে। যুদ্ধাপরাধ নয় এবার বিচার হবে মানবতা-বিরোধী অপরাধের।

একই সাথে আবেগী ও ধারালো লেখা। পড়তে পড়তে লেখকের আবেগ স্পর্শ করেছে আমাকেও খানিকোটা। সাধুবাদ জানাই আপনাকে।

আবেগের সাথে সাথে আরো একটি জরূরী প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, সে বিষয়ে আরো কথা-ভাঙার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি হচ্ছে, পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।

শিশু-তোষ মোয়াতে আমরা ভুলবো না। না, না ভুলবো না। ভুলতে চাইও না। বরং এর তরঙ্গ আছড়ে পড়ুক হিমলায় থেকে বিশ্ব-জনমনে।
নমশূদ্রের নমস্কার গ্রহণ করুন।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন