• টনি বেন, আহমেদ বেন বেল্লা ও শেখ মুজিব
    মাসুদ রানা

    সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও ব্রিটিশ রাজনীতির প্রধান-স্রোতধারায় বিদ্রোহী ব্যক্তিত্ব টনি বেনের মৃত্যুতে, অনেকেই তাঁর স্মৃতি নিয়ে লিখছেন। এ-সমস্ত স্মৃতি তর্পণের আবহে তাঁকে নিয়ে আমারও একটি স্মৃতি প্রকাশের বাসনা জন্ম নিলো। তবে আমার সে-স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে আরও দু’টি নাম - আহমেদ বেন বেল্লা ও শেখ মুজিবুর রহমান।

    টনি বেনকে আমি প্রথম দেখি ১৯৯০ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৯১ সালের প্রথম দিকে। লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনোমিক্স থেকে আমরা অনেক বিদ্যার্থী দল বেঁধে তাঁর বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম হাইড পার্কে। তিনি তখন প্রথম ইরাক-যুদ্ধের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেণ্টের বিরুদ্ধে।

    টনি বেন এস্টাবলিশমেণ্টের বাইরে ছিলেন না। কারণ, জন্মগত ও ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে তিনি ছিলেন তথাকথিত সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত। আর, সচেতন রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি হাউস অফ কমন্সের সদস্যত্ব থেকে উন্নীত হয়েছিলেন ক্যাবিনেট মিনিষ্টার পদে। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি সেই এস্টাবলিশমেন্টের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের বিপরীতে সীমিত বিদ্রোহ প্রকাশ করে সারা জীবন সেই দ্রোহী অবস্থানটা রক্ষা করেছিলেন।

    টনি বেনকে শুনতে আমি একবার নয়, বারবার গিয়েছি। প্রথমবার হাইড পার্কে দেখার পর, তাঁকে আমি দ্বিতীয়বার দেখি রেড লায়ন স্কোয়ারে, সম্ভবতঃ মধ্য নব্বই-দশকে, একটি মিলনায়তনে, আরও কাছে থেকে। সেখানে তাঁর সাথে মঞ্চে বক্তৃতা দিতে উপস্থিত ছিলেন আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা ও প্রথম প্রেসিডেণ্ট আহমেদ বেন বেল্লা।

    সত্যি বলতে, সে-অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম মূলতঃ আহমেদ বেন বেল্লাকে দেখার জন্য। কারণ, শৈশবে আমার জনকের কাছে ফরাসী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আলজেরীয় এই লড়াকু নেতার কাহিনী শুনে-শুনে তাঁর বীরত্ব সম্পর্কে এক শ্রুতিময় স্মৃতি ধারণ করে রেখেছিলাম। তাই সেই বিখ্যাত বিপ্লবী পুরুষকে দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন।

    যদিও আমি আহমেদ বেন বেল্লাকে দেখতে ও শুনতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে শ্রুত যে-কথা আমার স্মৃতিতে শক্তি নিয়ে অবস্থান করছে আজও, সেটি তাঁর ছিলো না। ছিলো টনি বেনের। টনি বেনের কথাটা আমার বোধের মধ্যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছিলো সেদিন।

    টনি বেন সম্ভবতঃ কানে খাটো ছিলেন - অংশতঃ বধির। সেটি বোঝা যেতো তাঁর কথার উচ্চারণ থেকে। বেন তাঁর স্বভাবসুলভ উচ্চস্বরে কাটা-কাটা কিছু কথা বললেন, যার মর্ম হলোঃ

    আমাদের নেতার দরকার। আমরা নেতাকে শ্রদ্ধা করবো। তাঁকে মাথার উপরে বসাবো। নিশ্চয় বসাবো। কিন্তু আমাদের মাথায় বসাবার আগে যেটি জানা জরুরি, সেটি হচ্ছেঃ নেতাটির ভার যখন মাথা আর বহন করতে পারে না, তখন তাঁকে মাথা থেকে নামানোর পথটা কী? নেতা যতো মহানই হোন না কেনো, তাঁকে যদি মাথা থেকে নামানোর পথ না থাকে, তাহলে তিনি একনায়ক ও স্বৈরাচারী।

    কথাগুলো শুনে ও তার অন্তর্নিহিত যুক্তি বুঝে চমৎকৃত হয়েছিলাম। কিন্তু তারও ঘণ্টা খানেক পর তাঁর কথা বিশাল তাৎপর্য্য নিয়ে আমার উপলব্ধিতে উদয় হলো আহমেদ বেন বেল্লার সাথে পরিচিত হতে যেয়ে।

    আহমেদ বেন বেল্লা সেদিন অনুবাদকের সাহায্য নিয়ে ফরাসী ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন কি-না, তা আজ কিছুতেই মনে করতে পারছি না। তবে, তিনি যে বলেছিলেন আজলেরিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ তাঁরা কয়েক জন শুরু করেছিলেন কয়েকটা পুরনো রাইফেল জোগার করে, সেটি আমার স্পষ্ট মনে আছে।

    আহমেদ বেন বেল্লার বক্তৃতার মূল কথা ছিলোঃ মনুষ্যত্বের নির্যাতনকারী শক্তি যতো শক্তিশালীই হোক এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি আপাতঃ যতোই দূর্বল হোক না কেনো, শেষ পর্যন্ত মনুষ্যত্বের পক্ষের শক্তিরই জয় হয়। তিনি আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে সে-কথাগুলোই বলেছিলেন।

    স্বভাবতঃই আমি একজন বাঙালী হিসেবে তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবছিলাম। আরও ভাবছিলাম, আমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যদি আহমেদ বেন বেল্লার মতো রাইফেল হাতে তাঁর জাতির মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে ব্রতী হতেন, তাহলে কী হতো? কী যে হতো, সেটি কল্পনার ব্যাপার। কিন্তু আমার কল্পনায় যখন শেখ মুজিব, তখন বক্তৃতা শেষে ব্যক্তিগত পরিচয় পর্বে আহমেদ বেন বেল্লা আমাকে অবাক করে দিয়ে অনেকটা ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে ইংরেজিতে বললেনঃ

    ‘ইউ সেইড, ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ? ইউ আর মাই ব্রাদার। আই রিমেম্বার শেখ মুজিবুর রহমান। আই ফীল সরি ফর হিম।”

    এ-কথা বলে তিনি আমার হাতের নৌটবুকে আরবিতে কী যেনো লিখে স্বাক্ষর করলেন। কিন্তু আমি আরবিতে নিরক্ষর বলে বুঝতে পারিনি তিনি কী লিখেছিলেন। আহমেদ বেন বেল্লার সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাত হয়েছিলো কি-না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু আলজেরিয়ার সেনা-রাষ্ট্রপতি হাওয়ারি বুমেদিনের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের করমর্দন ভঙ্গীর বহুল প্রচারিত ছবি আমি দেখেছি।

    আমি আহমেদ বেন বেল্লার জীবনী পড়েছি। তিনিও শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নিজ দেশের স্বাধীনতার প্রেরণা পুরুষ ছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেণ্ট হয়েছিলেন। দু’জনেই নিজ নিজ স্বাধীন দেশে ‘ওয়ান পার্টি স্টেইট’ বা একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের বিবেচনায়, বেন বেল্লা ও শেখ মুজিবুর রহমান দু’জনই একনায়ক ও স্বৈরশাসক। আর, দু’জনেই ক্ষমতা হারিয়েছেন সেনা-অভূত্থানে।

    শেখ মুজিবুর রহমানের পরিণতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তাঁকে যে অসভ্যতায় ও নিষ্ঠুরতায় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, এমন ঘটনা পৃথিবীর আধুনিক কালের ইতিহাসে ঘটেনি। কিন্তু কেনো এ-ঘটনা ঘটলো?

    এ-প্রশ্ন সম্ভবতঃ শেখ হাসিনারও। আমি মাঝে-মাঝে শেখ হাসিনার জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করি তিনি কী অনুভব করেন ১৯৭৫ সালে সেই মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কে। একজন মানুষের জন্য ব্যক্তিগতভাবে এর চেয়ে দুঃখ ও কষ্টের আর কী থাকতে পারে?

    শেখ হাসিনা নিশ্চয় ভেবে পান না, যে জাতি তাঁর পিতাকে এতো সম্মান, এতো ভালোবাসা, এতো শ্রদ্ধা দিলো, সেই জাতির লোকেরা কীভাবে তাঁকে এতো নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পারলো। আর, সমগ্র জাতি, সমগ্র দল, সমগ্র রক্ষীবাহিনী, লাল বাহিনী এই নেতার হত্যায় নীরব থাকতে পারলো। অধিকন্তু, কীভাবে এই জাতির মানুষেরা তাঁর মৃত্যুতে রাস্তায় উল্লাস মিছিল করতে পারলো? তাঁর এ-প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই অত্যন্ত আবেগ জড়িত।

    কিন্তু রাজনীতি বিজ্ঞানের গবেষকদের আবেগ সংবরণ করে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে এ-প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে। এর উত্তর না পেলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে রূপতঃ আবেগের মেঘমালা বিদূরীত হয়ে যুক্তির সূর্যরশ্মি জনগণের হৃদয়ভূমি স্পর্শ করতে পারবে না এবং সেখানে প্রকৃত মানবিক বোধের অঙ্কুরোদগমও হবে না।

    আজও আমি আবার এ-লেখার প্রয়োজনে বাকশাল রিভিজিট করলাম। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী জাতীয় সংসদে এমন একটি রাজনৈতিক মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তা পাস করিয়ে নিলেন, যার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো মানুষের স্বাধীন রাজনৈতিক মত প্রকাশ করার ও দল করার অধিকার থাকলো না। বাকশালে সর্বময় ক্ষমতার চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হলো, কিন্তু এর গঠনতন্ত্রে কোনো বিধান রাখা হলো না কীভাবে একজনকে চেয়ারম্যান পদ বসানো হবে এবং কীভাবেই-বা তাঁকে নামানো যাবে। শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো নিজেকে অমর, অজয়, অব্যয় ও অক্ষয় ভেবেছিলেন, তাই তিনি এ-প্রসঙ্গে ভাবা প্রয়োজন মনে করেননি।

    আহমেদ বেন বেল্লা ক্ষমতাচ্যুত হয়েও বেঁচে ছিলেন। ক্ষমতা হারিয়ে বেঁচে থাকার কারণেই হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন গণতন্ত্রের বিকল্পহীনতা। সম্ভবতঃ সে-কারণেই তিনি বাকী জীবন গণতন্ত্রের জন্য প্রচার করে গিয়েছেন। আর সেই সূত্রেই টনি বেনের সাথে তাঁর যোগসূত্র গড়ে উঠেছিলো।

    আজ টনি বেনের মৃত্যুতে তাঁর বিখ্যাত উক্তি শুধু আমার নয়, অনেকের মনেই পুনরুৎপাদিত হচ্ছে। লক্ষ্য করলাম নিউ স্টেইট্‌সম্যান পত্রিকা তাঁর ১০টি উদ্ধৃতি প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে আমার স্মরণে থাকা ও উপরে উল্লেখিত তাঁর সেই কথাটাও হুবহু দেওয়া রয়েছেঃ

    "If one meets a powerful person - Rupert Murdoch, perhaps, or Joe Stalin or Hitler -  one can ask five questions: what power do you have; where did you get it; in whose interests do you exercise it; to whom are you accountable; and, how can we get rid of you? Anyone who cannot answer the last of those questions does not live in a democratic system."

    অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দেখা পান - হতে পারে রুপার্ট মার্ডক অথবা জৌ স্টালিন অথবা হিটলার - তিনি তাঁকে পাঁচটি প্রশ্ন করতে পারেনঃ আপনার কী ক্ষমতা আছে? এই ক্ষমতা আপনি কোথা থেকে পেলেন? কার স্বার্থে এই ক্ষমতা আপনি ব্যবহার করেন? কার কাছে আপনি জবাবদিহিতা করেন? এবং কীভাবে আমরা আপনার কাছ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি? যিনি এই পাঁচটি প্রশ্নের শেষেরটির উত্তর দিতে না পারেন, তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাস করেন না।

    আমাদের রাজনীতিতে 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা', 'ইসলামী চেতনা', 'বিপ্লবী চেতনা'-সহ যতো চেতনা এবং মানুষের জীবনকে কুরে-কুরে খাওয়া যাতো বেদনা আছে, তাদের ধারক ও বাহকদের কাছে কি সদ্য প্রয়াতঃ টনি বেনের শেষ প্রশ্নের উত্তর জানা আছে?

    প্রশ্নের উত্তরে না পাওয়া গেলেও প্রশ্নের উত্থানটা জরুরি। আর, সে প্রশ্ন যেখান থেকেই উত্থাপিত হোক না কেনো, তা মানুষের বোধকে স্পর্শ করবেই। বহু বছর আগে আমার বোধকে স্পর্শ করেছিল এই প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নের কর্তা টনি বেন। আজ তাঁর প্রয়াণে আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি তাঁকে।

    শনিবার, ১৪ মার্চ ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন