• ডঃ কামাল হোসেনের ‘দোয়া’ প্রসঙ্গে
    মাসুদ রানা

    ঘটনা ও প্রেক্ষাপট

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদার-গণতন্ত্রী ও বুদ্ধিজীবী নেতা হিসেবে পরিচিত ডঃ কামাল হোসেন শুক্রবার ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর সংবাদ-শিরোনামে উঠে এলেন ‘দোয়া’ নিয়ে। সংবাদ প্রতিবেদন মতে, ডঃ কামাল হোসেন গতকাল ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, আসম রব, প্রমুখ সমভিব্যাহারে টাঙ্গাইলের সখিপুরে এক জনসভায় বলেছেন, ‘আমাদের সমালোচকদের মানসিক সুস্থতার জন্য দোয়া করি।’

    ডঃ কামাল হোসেনের বিদগ্ধ গাম্ভীর্য্য ও বিদিত গুরুত্বের কারণেই তাঁর উক্তি যুক্ত করে দৈনিক ইত্তেফাক এই সংবাদ-শিরোনাম তৈরী করেছে। এর ফলে, যথারীতি, অগণিত মানুষের দৃষ্টিও আকর্ষিত হয়েছে।

    ডঃ কামাল হোসেন যে কেবলই পশ্চিমা-ধাঁচের উদার-গণতন্ত্রবাদের প্রবক্তা বলে বিবেচিত, তা নয়; তিনি বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান-প্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তাই, তাঁর ব্যাপারে মানুষের সঙ্গত প্রত্যাশা যে মননে-বচনে-আচারে তিনি উদার-গণতন্ত্রের প্রকাশ ঘটাবেন।

    রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠের শিক্ষার্থীরাও জানেন, রাজনীতিকদেরকে প্রশ্ন করা ও সমালোচনা করা এবং গ্রহণ ও বর্জন করার অধিকার জনগণের না থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। কিন্তু ডঃ কামাল হোসেন একজন বিদগ্ধ রাজনীতিক হয়ে তাঁর বা তাঁদের সমালোচকদের সম্বন্ধে যা বললেন, তাতে প্রশ্ন জাগেঃ তিনি কি আসলেই গণতান্ত্রিক না-কি সুযোগ-বঞ্চিত সুপ্ত-স্বৈরতান্ত্রিক? তাঁর ভূবনদৃষ্টি কি আসলেই সেক্যুলার, নাকি ঈশ্বরতান্ত্রিক? দেখা যাক তবে তাঁর কথার নমুনা-পরীক্ষা করে কী পাওয়া যায়।

    অন্তর্নিহিত স্বতঃসিদ্ধ

    ‘আমাদের সমালোচকদের মানসিক সুস্থতার জন্য আমি দোয়া করি’ বাক্যটি আপাতঃ দৃষ্টিতে সমালোচনা অস্বীকৃতির একটি নিরীহ প্রকাশ। কিন্তু মনোনিবেশিত বিশ্লেষণে দেখা যাবে, এর ভেতরে আছে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা। কারণ, ডঃ কামাল হোসেনের আপাতঃ নিরীহ কথাটি গড়ে উঠেছে দু’টি ‘এ্যাক্সিয়াম’ বা স্বতঃসিদ্ধকে অবলম্বন করে।

    প্রথম স্বতঃসিদ্ধটি হচ্ছে, যাঁরা ডঃ কামাল হোসেনদের সমালোচনা করেন, তাঁরা মানসিকভাবে অসুস্থ। আর, দ্বিতীয় স্বতঃসিদ্ধটি হলো, ‘দোয়া’র মাধ্যমে মানসিক অসুস্থতা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, এখানে কোনো ‘ট্রীটমেন্ট’ বা মানুষের যুক্তি-তর্ক-কর্মের কোনো ফুরসত নেই।

    পশ্চিমে-শিক্ষিত ডঃ কামাল হোসেন স্যুট-টাইয়ের মতোই ভালোবেসেছেন পাশ্চাত্য-উদ্ভূত এই গণতন্ত্রকে। তাই, এর পক্ষে সব সময়ই কথা বলেন তিনি। কিন্তু ‘স্মার্ট’ পোশাকের নিচে যেমন একটি বেঢপ দেহ থাকতে পারে, তেমনি চৌকস গণতান্ত্রিক বচনের পেছনেও একটি স্বৈরতান্ত্রিক মন থাকতে পারে, যা অসতর্ক অবস্থায় কখনও-কখনও বেরিয়ে পড়ে। ডঃ কামাল হোসেনের কথাটিও তেমনি একটি ঘটনার প্রকাশ, যা নিচে আলোচিত।

    পৃথিবীতে যুগে-যুগে ও দেশে-দেশে ‘অথোরিটি’র বিরুদ্ধ-সমালোচকদের উন্মাদ, মানসিক বিকারগ্রস্ত, অসুস্থ, অশুভ-শক্তি কবলিত, ইত্যাদি অভিধায় ‘স্টিগমাটাইজ’ বা কলঙ্কিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় ইতিহাসে। সেই একই ধারায় আজ বঙ্গদেশে ডঃ কামাল হোসেনও মানসিক বিকারগ্রস্ততার কলঙ্ক-বাণ ছুঁড়ে দিলেন তাঁর সমালোচকদের প্রতি।

    প্রশ্ন ও পরীক্ষা

    কেনো ডঃ কামাল হোসেন এ-কাজটি করলেন? তাঁর কাছে জিজ্ঞাস্যঃ কোন্‌ যুক্তিতে আপনাদের সমালোচনা করলে বুঝে নিতে হবে সমালোচকেরা মানসিক ভাবে অসুস্থ? আপনারা তো কোনো অলৌকিক নিত্য বা ধ্রুব নন, যাকে অজর-অমর-অব্যয়-অক্ষয় ও অবিনশ্বর মনে করা হয়। আপনারা নিতান্তই মানুষ। হতে পারেন নেতা, কিন্তু মানুষ তো? মানুষ হয়ে মানুষের সমালোচনা করা যাবে না কেনো? আর করলে মানসিক অসুস্থতার ‘স্টিগমা’ বা কলঙ্ক পেতে হবে কেনো? আজকাল চরম মৌলবাদীরাও তো তাঁদের আল্লাহ-ঈশ্বর-গডের সমালোচনাকারীকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বলে না - বড়োজোর ‘নাস্তিক’ বলে।

    লোকে বলে, আপনি নাকি ‘জ্ঞানী’। তা হতেই পারেন। তো আপনার জ্ঞানে আপনি নিজেই এমন মুগ্ধ, বিমোহিত এবং সম্ভবতঃ অন্ধ যে, আপনার জ্ঞানগর্ভ কথা বা ভাবনার সমালোচনা করলেই আমাদেরকে মানসিকভাবে অসুস্থ বিবেচনা করতে হবে?

    কী ভাবেন নিজের সম্পর্কে? নিজেকে যিশুর মতো ‘ঈশ্বর-পুত্র’ কিংবা মুহাম্মদের মতো ‘ম্যাসেঞ্জার’ বা বাণীবাহক মনে করেন নাকি, যে সমালোচনা করলেই সমালোচকের জন্য দোয়া বা প্রার্থনা করবেনঃ ‘হে প্রভূ, এই মূর্খদের ক্ষমা করো, আমার মুখ নিঃসৃত তোমার পবিত্র বাণী এই বঙ্গজনগণ বুঝতে পারছে না। আমাকে নেতা স্বীকার করে দেশের ভার আমার হাতে দিচ্ছে না। এরা আমার সমালোচনা করছে। এরা মানসিকভাবে অসুস্থ। এদের সুস্থ করে তোল প্রভূ’?

    আর ‘দোয়া’ মানে কী? ‘দোয়া’ তো কাঙ্খিত ফল লাভের মানসে বিশ্বজগতের নিয়ন্তা বলে বিশ্বাসিত শক্তির কাছে প্রার্থনা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এর ভিত্তি হচ্ছে ধর্মবাদ, যেখানে মানুষের সত্ত্বাকে বিশ্বাসিত ‘পরম সত্ত্বা’র ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক এবং লাগাতার জীবন্ত সংঘর্ষ চলছে। উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক হয়ে আপনি রক্ষণশীল ঈশ্বরতান্ত্রিকদের মতো ‘দোয়া’ করেন কেনো?

    আপনি না ‘সেক্যুলার’ রাজনীতিক? ‘সেক্যুলার’ রাজনীতিকরা তো শুধুমাত্র ইহজাগাতিক বিষয় সমূহে ব্যপৃত থেকে জ্ঞান ও যুক্তিকে আশ্রয় করে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্ম সম্পাদন ও সমস্যার সমাধান করেন। আপনি পীরের মতো দোয়া শুরু করলেন কেনো? আপনি তো বিশ্বাস করেন না যে ‘দোয়া’য় রাজনৈতিক মতানৈক্য দূর হয়ে যাবে। না-কি করেন?

    আসলে আপনার বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিটি কী? আর, মানুষ সম্পর্কেই বা আপনার বোধ ও ভাবনা কী?  মানুষকে কী ‘ব়্যাশ্যনাল বীয়িং’ মনে করেন? প্রায়ইতো জনগণকে রাষ্ট্রের অনুল্লেখিত ‘পিলার’ বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুলভ ভাষণ দিয়ে থাকেন; তো, জনগণকে আলোচনা-সমালোচনা অধিকার-বঞ্চিত করে, তাঁদের মধ্যে মানসিক বৈকল্য নির্দেশ করে ঈশ্বরমুখী ভাব নিলেন কেনো?

    প্রতি-প্রস্তাবনা

    কিন্তু আপনার কৃত বিদ্যা ও গৃহীত পেশা ‘আইন’-এর বচন ধার করে ‘সাজেস্ট’ করিঃ প্রথমতঃ আপনি সমালোচনা-কাতর ও অসহিষ্ণু এবং দ্বিতীয়তঃ ভূবনবোধে আপনি ‘নন-সেক্যুলার’।

    ক্ষমতায় থাকলেই মানুষ স্বৈরাচারী হয়, তা ঠিক নয়। ক্ষমতায় থাকলে স্বৈরতন্ত্র প্রকাশিত হয় মাত্র। কিন্তু প্রকাশের আগেই স্বৈরতন্ত্রের বিকাশ ঘটে বোধে ও মননে। এটি আসে ‘ফেলো হিউম্যান’ বা চারপাশের মানুষ সম্পর্কে হীন ধারণা থেকে। স্বৈরতন্ত্রের মূল কথা কিন্তু এটি নয় যে, ‘দেখো আমার কতো ক্ষমতা!’ স্বৈরতন্ত্রের মূল বোধ হচ্ছেঃ ‘একমাত্র আমার ভাবনাই ঠিক। ভালো মন্দ, সত্য অসত্য একমাত্র আমিই বুঝি। অন্যের ভাবনা গলৎ। তারা নিজের ভাগ্য নির্ধারণেরও উপযুক্ত নয়। তাই সবার জন্য আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

    উপরের ভাবনার ভিত্তিতে একজন ‘বিনেভোলেন্ট ডিক্টেইটর’ বা হিতৈষী স্বৈরশাসকের বিকাশ ও প্রকাশ ঘটতে পারে। কিন্তু এই স্বৈরশাসক যদি জনগণকে শুধু অক্ষম নয়, এর সাথে প্রতিবন্ধক, সমালোচক, কিংবা বিকারগ্রস্ত মনে করেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন ‘রিপ্রেসিভ ডিক্টেটর’ উৎপীড়ক স্বৈরশাসক।

    যে-কোনো পরিস্থিতিতে, দুজনেই কিন্তু ‘সাপ্রেসার’ বা অবদমক। অন্যের মতকে মূল্য না দিয়ে ‘সাপ্রেস’ বা অবদমন করেন দুজনেই। আপনি ‘বিনেভোলেন্ট’ বা হিতবাদী কি-না জানি না, কিন্তু মনের গহীনে-যে আপনি একজন স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতিক, তা আপনার ‘আমাদের সমালোচকদের মানসিক সুস্থতার জন্য দোয়া করি’ কথা মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।

    দ্বিতীয়তঃ ধর্ম-কর্ম না করলেই, কিংবা কথায়-কথায় ধর্ম-বচন না বললেই, মানুষ ‘সেক্যুলার’ হয়ে যায় না। ‘সেক্যুলারিজম’-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে পার্থিব বিষয় সমূহের উপর যে-কোনো ধরনের বিশ্বাসিত অতিপ্রাকৃত সত্ত্বার সংযোগের সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি। আপনি ‘দোয়া’ করে প্রমাণ করলেন যে, কগনিশন বা বোধের জায়গায় আপনি ‘সেক্যুলার’ নন। 

    অথবা, আপনি ‘সেক্যুলার’ হবার পরও মানুষের অতিপ্রাকৃতবাদী ধ্যান-ধারণার সুযোগ নিয়ে, অর্থাৎ তাঁরা আঁধারে আছে জেনে, আঁধারেই রেখে নিজেকে মহিমান্বিত করতে ‘দোয়া করি’ বলেছেন। যে-ভূবনবোধ বা বিশ্বাস আপনার নেই, সেই ভূবনবোধ বা বিশ্বাসকে টুল হিসেবে ব্যবহার করে আপনি মানুষকে ফাঁকি দিয়ে মহৎ হতে চেয়েছেন। আর তাই যদি হয়, তাহলে আপনি হচ্ছেন একজন ‘হিপোক্র্যাট’ - যাকে বাংলায় বলা হয় ‘ভণ্ড’।

    দ্যাটস্‌ অল, নাও ডিফেণ্ড ইওরসেলফ - অর্থাৎ, এই হচ্ছে কথা, এবার আত্মপক্ষ সমর্থন করুন।

    রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন