• ডিজিট্যাল বাংলাদেশঃ রাজনৈতিক স্বরূপ সন্ধানে
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন “ডিজিট্যাল বাংলাদেশ” তৈরি করার। এর দ্বারা তিনি কী বুঝিয়েছিলেন, তা অনেকের কাছেই তখন স্পষ্ট হয়নি। এমনিতেই, ডিজিটায়ন বা ডিজিটাইজেশন একটি জটিল বিষয়।

    ডিজিট্যাল অংক

    যাঁদের কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু আছে, তাঁদের সবাই জানেন উপাত্তের ডিজিটায়ন মানে কী। ডিজিটায়ন মানে হচ্ছে যেকোনো উপাত্তকে বাইনারিতে - অর্থাৎ শুধুমাত্র এক (১) ও শূন্য (০) এই দুই ডিজিটে - বৈদ্যুতিন উদ্দীপনার 'অন' ও 'অফ' এর মাধ্যমে প্রকাশ করা, যার প্রতিটিকে বলা হয় একেকটি 'বিট'।

    সাধারণ অংকের শূন্য (০), বাইনারিতে সঙ্কেতায়িত হয় ০০০০ রূপে। এক (১) সঙ্কেতায়িত হয় ০০০১ রূপে, দুই (২) হয় ০০১০ রূপে, আর তিন (৩) হয় ০০১১ রূপে।

    অর্থাৎ, বাইনারিতে এক (১) ও শূন্যের (০) মাধ্যমেই প্রকাশ করতে হবে সমস্ত উপাত্ত, এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই হচ্ছে ডিজিটাইজেশন বা ডিজিটায়ন।

    উপরে যা বললাম সেটি হচ্ছে কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগোযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক জ্ঞানের বিষয়, যা হয়তো রাজনীতি বিজ্ঞানের লোকদের জানা নেই।

    ডিজিটাল রাজনীতি

    রাজনীতি বিজ্ঞান ও কলা শাস্ত্রের লোকেরা বিষয়দি এ্যানালগেই বুঝে থাকেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর পক্ষে রাজনীতিতে ডিজিটায়ন কী তা বুঝতে পারার কথা নয়। তাতে ক্ষতি নেই।

    বুঝতেন না অনেক কিছুই আকবর বাদশাহও। কিন্তু তাঁর নবরত্ন ছিলো। তাঁরাই তাঁকে জ্ঞান দিতেন। দৃশ্যতঃ শেখ হাসিনার নবরত্ন না থাকলেও একরত্ন আছেন। তাঁর নাম হাসানুল হক ইনু।

    হাসানুল হক ইনু। সত্যই রত্ম। তিনি প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী। মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের। একেবারে খাপে খাপে মিলিয়ে গিয়েছে। তাই তাঁর হাতেই ডিজিটায়ন অর্থাৎ ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকৃত রূপায়ন হবে।

    আজকের সংবাদ অনুযায়ী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা মৌলভীবাজারে গিয়ে বক্তৃতা করেছেন, যেখানে তিনি সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে বলেছেনঃ

    "কি সাংবাদিক, কি বুদ্ধিজীবী সবাইকে পক্ষ নিতে হবে। মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। হয় খুনির পক্ষ, নয় খুনির বিরুদ্ধ পক্ষ। নিরপেক্ষ থাকার ভান করা যাবে না।" - প্রথম আলো ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

    ঠিক একই ভাবে বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেণ্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই সেপ্টেম্বর মাসেই ২০০১ সালে কংগ্রেসে জয়েণ্ট সেশনেঃ

    "Either you are with us, or you are with the terrorists." অর্থাৎ, “আপনি হয় আমাদের সাথে, অথবা আপনি সন্ত্রাসীদের সাথে।” - হোয়াইট হাউজ আর্কাইভ, ২০ সেপ্টেম্বর ২০০১

    ইনু সাহেব শুধু ‘সন্ত্রাসীর’ জায়গায় “খুনী” বলেছেন। আর, জোর দিয়ে বলেছেন নিরপেক্ষ থাকার স্থান নেই। অর্থাৎ, হয় এক (১), না হয় শূন্য (০)। এর বাইরে আর কোনো স্থান নেই।

    অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে বিশুদ্ধ বাইনারি - অর্থাৎ বাইনারী - মানে, যা কিছু আছে তার প্রতিটি হয় শেখ হাসিনার পক্ষে, না হয় খালেদা জিয়ার পক্ষে।

    আমার এ-রচনার প্রথমে আমি বাইনারি তত্ত্ব আলোচনা করে দেখিয়েছি উপাত্তকে বাইনারির মাধ্যমে সঙ্কেতায়িত করে প্রকাশ করাকে বলা হয় ডিজিটাইজেশন বা ডিজিটায়ন। এটি তথ্য প্রযুক্তি ও কম্পিউটার সাইয়েন্সের কথা।

    আর, বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রীর কথা হচ্ছে বাংলাদেশের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদেরকে তাঁদের সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে বাইনারী বা দুই নারীর মধ্যে যে-কোনো একজনের পক্ষাবলম্বনের মাধ্যমে।

    এই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ডিজিটাইজেশন বা ডিজিটায়ন। আর, এহেন বাংলাদেশ হচ্ছে ডিজিট্যাল বাংলাদেশ। তত্ত্ব হিসেবে এর নাম দিলাম আমি ‘পলিটিক্যাল ডিজিটালিজম’ বা রাজনৈতিক ডিজিটবাদ’ আর প্রক্রিয়াটার নাম “পলিটিক্যাল ডিজিটাইজেশন” বা “রাজনৈতিক ডিজিটায়ন”

    এখন কথা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ কি এই ডিজিট্যাল রাজনীতি মানবে? শেখ মুজিবুর রহমানও বাইনারি রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। অর্থাৎ, তিনিও নিজেকে ও নিজের অনুগত দলগুলোকে 'ওভারগ্রাউণ্ড' এবং তাঁর বিরোধী দলগুলোকে 'আণ্ডারগ্রাউণ্ড' করে অতি মারাত্মক বাইনারি বা বাকশাল ডিজিট্যাল তৈরি করেছিলেন।

    বাকশাল ডিজিট্যালের কী করুণ পরিণতি হয়েছিলো, সে আমরা আজ সকলেই জানি। সেই কথা আজ এখানে নাই বা বলি।

    সোমবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স
    ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন