• ধিক! হে কর্ণ, ধিক!
    মাসুদ রানা

    হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মহাভারতের হতভাগ্য-বীর কর্ণ। হস্তিনাপুরের সিংহাসন নিয়ে কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি ক্ষমতাসীন কৌরব-পক্ষে লড়েছিলেন।

    কর্ণ ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ও দাতাশ্রেষ্ঠ। কিন্তু রাজপুত্র দুর্যোধন ও দুঃশাসনেরা যখন প্রতিযোগী পাণ্ডবদেরকে পাশা খেলায় হারিয়ে তাঁদের স্ত্রী দৌপদীকে জিতে নিয়ে জনসম্মুখে লাঞ্ছিতা করেন, তখন নারীর অবমাননায় বীর কর্ণ নীরব ছিলেন।

    কর্ণের ন্যায়বোধ, নীতিবোধ কিংবা বীরধর্ম - কোনোটাই জাগ্রত হয়নি তখন। কারণ, নারীর এই অবমাননা করছিলেন যাঁরা, তাঁরা ছিলেন তাঁর অন্নদাতা।

    আজ বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদ নিয়ে রাজকীয়-সদৃশ্য দু’টি পরিবারের মধ্যে যে-কুরুক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নব্য দুর্যোধন ও দুঃশাসনেরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে নারীকে লাঞ্ছিতা করছেন। ভীত-সন্ত্রস্ত, পলায়ণে অক্ষম, অবলা ও নিঃসহায়া একেকজন নারীকে ভূলুণ্ঠিতা করে চক্রবুহ্য রচনা করে এই কাপুরুষেরা লাঠি হাতে নির্মমভাবে প্রহার করেছে।

    অন্য এক ছবিতে বাংলাদেশের পতাকা হাতে এক যুবক ধনুক-বঙ্কিম-ভঙ্গীতে তাঁর লিঙ্গ প্রদর্শনের মাধ্যমে ধর্ষণের ইঙ্গিত দিয়ে ভীতি-প্রদর্শন করছেন। কী বিভৎস! কী কুৎসিত!

    সে-ছবি প্রকাশিত হয়েছে পত্র-পত্রিকার, টেলিভিশনে, ইণ্টারনেটে এবং সামাজিক যোগাযোগের পাতায়-পাতায়। দূরদেশে থাকা একজন বাঙালী হিসেবে, আমার নিজের জাতির মানুষের মধ্যে সংঘটিত এই বর্বরতার চিত্র আমি সহ্য করতে পারছি না। অতি অপমানিত ও লজ্জিত বোধ করছি।

    আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটীর সাংগঠনিক সম্পাদক আমার বন্ধু শফি আহমেদকে এসব হচ্ছে কেনো জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে তাঁর ফেইসবুকে গিয়ে দেখি, তিনি একের পর এক প্রকাশ করে যাচ্ছেন বিএনপি-আমলে আওয়ামী লীগের অত্যাচারিত হওয়ার ছবি, যা সত্য। এগুলোর মধ্যে একটিতে দেখলাম আওয়ামী লীগের মতিয়া চৌধুরী ছিন্নবস্ত্রে ভূলুণ্ঠিতা। বুঝলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করা বৃথা। তিনি হয়তো বলবেন, এটি প্রতিশোধ!

    মনে পড়লো দু’দিন আগের টেলিভিশনে আওয়ামী লীগের ঢাকা শহরের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন মায়া কী বলেছিলন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তাঁর কর্মী বাহিনীকে বলেছিলেন, বিএনপিকে ঠেকাতে না পারলে শাস্তি পেতে হবে।

    আমার বন্ধুটি যিনি নিজেও বিএনপির আমলে কারা নির্যাতন ভোগ করেছিলেন, মায়ার মতো নির্দেশক না হলেও, হয়তো শান্তনা পাচ্ছেন এই ভেবে যে, বিএনপির নির্দেশে পুলিস সেদিন যে-নির্যাতন আওয়ামী লীগের নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর ওপর করেছিলো, তার প্রতিশোধ হিসেবে আওয়ামী-ক্যাডাররা বিএনপি-সমর্থক আজ নারীদের লাঠিপেটা করছে।

    কিন্তু দল-না-করা মানুষ কী বলে শান্তনা পাবেন? আমার মতো লক্ষ-লক্ষ বাঙালী যাঁরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থেকেও প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের চিন্তায় বিভোর থাকেন, বাঙালী পরিচয়ে মাথা সোজা রেখে পৃথিবীর পথে হাঁটতে চান, তাঁদের কাছে শান্তনাটা কী?

    তাঁরা কী তাঁদের বন্ধু, সহকর্মী কিংবা প্রতিবেশী টম-ডিক-হ্যারিকে বলতে পারবেনঃ এখন যাদের দেখছো উন্মত্ততায়, তারা আমরা নই, তারা হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং আগে যাদের দেখেছো, তারা বিএনপি-জামাতী? বিশ্ববাসী কি বুঝবেনঃ না, ওরা বাঙালী নয়; ওরা হচ্ছে আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামায়াতী?

    হায় বাঙালী! হায় বাংলাদেশ! কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে জামায়াতী, কে হেফাজতী, আর কে বাম আর কে সুশীল, বিশ্ববাসী তা বুঝবে নাকো। বিশ্ব বুঝবে, এরা বাঙালী, এরা বাংলাদেশ, এরা কাপড়-পরা জানোয়ারের দল, গণতন্ত্র এদের হজম হবার নয়, এমনকি স্বাধীনতারও এরা যোগ্য নয়।

    আমি আজ খুঁজি, কোথায় সেই বুদ্ধিজীবীর দল, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বুক চেতিয়ে চলেন? বাঙালী নারীর এ-লাঞ্ছনায় তাঁদের চেতনায় কী স্থান পায়?

    কোথায় সেই মুক্তিযোদ্ধার দল, যাঁরা একাত্তরের বাঙালী নারীর লাঞ্ছনার স্মরণে এখনও জ্বলে ওঠেন তারুণ্যের আগুনে? তাঁদের চেতনা কি উত্তপ্ত হচ্ছে না রাস্তায় বাঙালী নারীকে লুণ্ঠিতা ও প্রহৃতা হতে দেখে?

    কোথাও কেউ নেই। কোথাও কোনো বুদ্ধিজীবী নেই। কোথাও কোনো বিবেক নেই। কোথাও কোনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নেই।

    আছে আওয়ামী লীগ। আছে বিএনপি। আছে জামায়াতী। আছে হেফাজতী। আছে বামপন্থী। কিন্তু কোথাও কোনো মানুষ নেই।

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বীর ও বুদ্ধিজীবীরা আজ রূপতঃ কৌরব রাজগৃহে পালিত কর্ণ, যাঁরা নারীর লাঞ্ছনায় নীরব, নির্বীর্য ও ক্লীব! তাই, ধিক! হে কর্ণ, তোমায় ধিক!

    সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

I'm speechless! You are so right. We are not qualified to honor our freedom. Perhaps we needed to struggle like Palistanians or nations which are fighting for their rights for ages.

These people easily forget the gift of Almighty Allah - freedom should be nurtured, respected and cared for. All these revenges, taking eye for an eye attitude only taking us to the path of tribal wars of some Afrinan tribes.
The upper hand of all of our activities (both individually and collectively) are ultimately controlled by Him and Him alone. The Power which gave us this freedom can take it away as well. Let us not abuse it.

Thank you so much.

জনাব রানা ভাই, সালাম। আপনার লেখায় বাজ্ঞালী হ্রদয়ের আকুতি প্রতিটি শব্দে করুণ ভাবে উচ্চারিত হয়েছে।কিন্ত দেশের আপামর সাধারন মানুষগুলো কেমন যেন নিবির্কারা। কলুসিত রাজনীতির প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নেমে আসছে না। কারন তাদের সামনে আদশর্বান কোন দল বা নেত্রীত নেই।

Anek shundor niropkkha ekta lekha porlaam . Ekhane anekdin por Rana bhaike khuje Pelham.

korno was son of kunti and brother of arjun/durjodhon,,,,,,,,,, but now who is representing as Korno!

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন