• নাইকো ঘুষঃ সলজ্জ কানাডা ও নির্লজ্জ বাংলাদেশ
    মাসুদ রানা

    উন্নত জাতি ও অনুন্নত জাতি কি শুধু সম্পদের পার্থ্যকের দ্বারা সূচিত? আমি স্বীকার করি না। আমি মনে করি সে-জাতিই উন্নত, যার উচ্চ আত্ম-মর্যাদাবোধ আছে।

    সম্পদ একটি জাতির বস্তুগত দিক। কিন্তু তার স্বাধীনতাবোধ, সম্মানবোধ, মর্যাদাবোধ, এগুলো জাতীয় মননের দিক। আমি সে-জাতিকেই উন্নত জাতি বলবো, যে-জাতি মনোজগতে উন্নত।

    কানাডার আদালত, কানাডারই একটি এনার্জী কোম্পানীকে - নাইকো রিসৌর্সেসকে - ৯.৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে। তাদের অপরাধঃ তারা ২০০৫ সালে বাংলাদেশের মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে ঘুষ দিয়েছিলো টেংরাটিলায় কূপ-বিস্ফোরণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখাবার জন্য।

    নাইকো বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ঘুষ হিসেবে একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুইজার গাড়ী উপহার এবং সপরিবারে কোম্পানীর খরচে উত্তর আমেরিকা ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো।

    কানাডার কৌর্ট অফ কুঈন্স বেঞ্চে রায় ঘোষণা করেছেন জাস্টিস স্কট ব্রুকার। জরিমানা যা করেছেন, তা এ-রকম অপরাধে কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। বিচারপতি ব্রুকার এই ৯.৫ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১.২৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছেন ‘ভিক্টিম’দের জন্য। যদিও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতির তুলনায় এটি কিছুই নয়, তথাপি একটা ‘বোধ’ রয়েছে এর মধ্যে, যার নিদারুণ অনুপস্থিতি দেখি ক্ষতিগ্রস্তদের খোদ দেশে। আর এখানেই উন্নত জাতি ও অনুন্নত জাতির মধ্যে পার্থক্য। মানুষের অধিকার ও মর্যাদার বাইরে সভ্যতা ও উন্নতির আর কোনো বৈধ সূচক হতে পারে না। 

    বিচারপতি ব্রুকারের রায়ে অন্তর্ভুক্ত জরিমানার পাশাপাশি যেটি আমাদের জন্য বুঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে তিনি যে মরাল-ভ্যালু বা নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরেছেন, যা আইনের দ্বারা ব্যাখ্যাত নয় - আইনের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেছেন, নাইকো বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ঘুষ দিয়ে দেশ হিসেবে কানাডাকে লজ্জিত করেছে, জাতি হিসেবে সকল কানাডাবাসীকে বিব্রত করেছে এবং যে প্রদেশে ও যে মহা-নগরীতে নাইকোর অবস্থান, তার নাম কালিমা-যুক্ত করেছে।

    বিচারপতি যদি নাইকোকে ৯.৫ মিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি জরিমানা করতেন, তাতেও কোম্পানীর তেমন কিছু আসতে যেতো না। কারণ, এ-কোম্পানীর চীফ এক্সিকিউটিভ এড স্যাম্পসনের বেতনই বার্ষিক ১৬.৫ মিলিয়ন ডলার।

    কিন্তু বিচারপতি এহেন একটি কোম্পানীকে জাতির সম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রশংসা না করে বরং বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ঘুষ দেবার মধ্য দিয়ে জাতির জন্য লজ্জা কিনে এনেছে বলে ভর্ৎসনা করেছেন।

    আমি বিচারপতির জাতিগত মর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মান-বোধের প্রশংসা করছি। এবং উপলব্ধি করছি, তার দেশ ও জাতির মধ্য নিশ্চয় ইতিবাচক মর্যাদাবোধ ও সম্মানবোধ আছে বলেই বিচারপতি এগুলোর উল্লেখ করেছেন।

    কানাডিয়ান জাতির মধ্য যদি এই মর্যদাবোধ ও আত্ম-সম্মানবোধ না থাকতো, তা হলে নিশ্চয় তিনি বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ঘুষ দেবার ঘটনাকে দেশ ও জাতির জন্য বিব্রত বা লজ্জার বিষয় হিসেবে নির্দেশ করে কথা বলতে পারতেন না।

    কিন্তু বাংলাদেশ? যার সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্ব-ব্যাপী সকল বাঙালীর আত্ম-পরিচয়ের শেকড়, সে-দেশের বোধ কী?

    বাংলাদেশের মর্যাদাবোধ ও সম্মানবোধের কথা ভাবলে আমরা কী দেখি? বিশ্বের দরবারে আমাদেরকে কীভাবে দেখা হয়?

    আমরা যদি কানাডার নাইকো মামলার বিষয়টিই বিবেচনা করি, তাহলে কী দেখি? দেখি বাংলাদেশের মন্ত্রী ঘুষ খায়।

    কী-রকমের ঘুষ খায়? একটি বিলাসী গাড়ী ও পরিবারের জন্য বিলাসী বিদেশ-ভ্রমণ।

    কীসের বিনিময়ে? বিদেশী লুটেরা কোম্পানীর ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর ক্ষতির পরিমাণকে কম বা ‘তেমন কিছুই হয়নি’ করে দেখানো!

    কী লজ্জা, কী লজ্জা! কি বিশ্বাস ঘাতকতকতা! কি নীচুতা!

    হে বিদেশী বিচারপতি! আপনি তো আপনার জাতিগত আত্ম-সম্মানবোধে আঘাত লাগার কারণে সাজা দিয়েছেন আপনার দেশের দুর্বিনীত বাণিজ্য সংগঠনকে। কিন্তু আমরা আমাদের জাতিগত আত্ম-সম্মানবোধে লাগা আঘাতের জন্য সাজা দেবো কাকে?

    আমাদের নাড়ি-পোঁতা দেশে রাজত্ব করে বেড়ায় ‘শিক্ষিত’ ও ‘ভদ্র’ চোরেরা। ওরাই দেশের মালিক। ওরাই রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, আইনে, বিচারে, শিক্ষায় ও  বুদ্ধিবৃত্তিতে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে।

    ওরা স্পষ্ট নিজেদেরকে সম্পদশালী করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ও তাদের স্বার্থ-রক্ষাকারী রাজনীতিক, কূটনীতিক ও আমলাদের পদ-লেহন করে। সোজা কথায়, সাদা চোখে দেখা যায়, তারা দেশটাকে বিক্রি করে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের লজ্জা নেই। বরং যারা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা জন্য, দেশের মানুষকে সমূহ ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য রাস্তায় নেমে দাবী করছে, তাদেরকে তারা নির্যতন করছে। দম্ভ ভরে আস্ফালন করছে।

    আমাদের কি সে-রকম বিচারপতি আছেন যিনি বিদেশে কাউকে ঘুষ দেয়া তো দূরের কথা নিজ-দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশী কারও কাছ থেকে তার দেশের মন্ত্রীর ঘুষ গ্রহণ করার কারণে লজ্জাবোধ করেন?

    আমাদের লজ্জার শেষ নেই যে, লজ্জাবোধ করার মানুষও আমাদের নেই। কারণ, যারা লজ্জাবোধ করবেন, প্রায়শঃ তাদের ব্যাপারেই উলটো লজ্জা পেতে হয়।

    কিছু দিন আগে এক বিচারপতি এক বয়োজ্যেষ্ঠ লেখককে তার লেখার জন্য বিশ্রী-ভাষায় গালাগাল দিলেন। কারণ, লেখক সরকারের একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভুল করেই হোক কিংবা ঠিকভাবেই হোক, নিজের একটি উদ্বেগের কথা লিখেছিলেন। তাতে সংবেদনশীল বিচারপতি তাকে শুধু অশিক্ষিত ও মূর্খ বলেই গালি দিননি, তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা আদলতে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন অঘোষিত শাস্তি হিসেবে।

    আমি গর্বিত হতে পারতাম, বাংলাদেশের এহেন রাগী বিচারপতিরা যদি দেশের সম্মান খাটো করা ও স্বার্থ বিকেয়ে দেয়ার রাজনীতিকদের আদলতে ডেকে এনে কানাডীয় বিচারপতির মতো বলতে যে তার কতো পরিমাণ কালিমা লেপন করছে দেশ ও জাতির নামে এবং কতোটুকু লজ্জিত ও বিব্রত করছে আত্ম-মর্যাদা সম্পন্ন মানুষকে। স্বস্তি পেতাম, যদি তিনি পারতেন শাস্তি দিতে সেই রাজনীতিককে।

    বাংলাদেশের বিচারপতিরা কখনও কখনও ‘স্বতঃপ্রণোদিত’ হয়ে আইনী পদক্ষেপ নেন। আমরা কি আশা করতে পারি না, বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত ও প্রচারিত নাইকোর বিরুদ্ধে কানাডার বিচারকের স্কট ব্রুকারের ঐতিহাসিক রায়কে ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করে কোনো এক বিচারপতি স্বতঃপ্রণোদিত হবেন?

    সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ তারাও মাঝে মাঝে ‘বিব্রত’ হন। তবে জাতির সম্মানের কথা বিবেচনা করে নয়, বরং অন্য কিছুর বিবেচনা করে।

    সুতরাং ভাবিঃ কবে হবে আমাদের সেই আত্ম-মর্যাদাবোধ যখন দেশ-বিকানোর কালোবাজারে আমাদের রাজনীতিক ও আঁধারে লুকানো অন্যান্যদের ঘুষ নেয়া-দেয়ায় আমরা লজ্জিত হবো দেশ হিসেবে, জাতি হিসেবে? সে-দিন আর কতোদূরে, হে আপাততঃ নির্লজ্জ বাংলাদেশ?

     

    মাসুদ রানা
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স
    রোববার, ২৬ জুন ‘১১
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন