• নিউ ইয়র্ক নির্ভয়ঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাপতি নয়!
    মাসুদ রানা

    শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে ও বিক্ষোভে উত্তপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক,  যার আদ্যাক্ষরে সংক্ষেপিত নাম সিইউএনওয়াই বা কুনি। এর বিখ্যাত ম্যাকোলে অনার্স কলেজে শিক্ষকের পদে ‘অধ্যাপক’ ডেইভিড পট্রিয়াসকে নিয়োগ দেওয়ার বিরুদ্ধে চলছে এ-প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। গেলো মঙ্গলবারে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে হেঁটে-যাওয়া পট্রিয়াসকে হেনস্থা করেন।

    শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ যখন তীব্র ও ব্যাপক হলো, তখন স্বভাবতঃই পুলিস জড়িয়ে পড়লো ‘শৃঙ্খলা’ রক্ষার তাগিদে। আর, সে-সূত্রে দেখা গেলো বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে পুলিসের হাতে ঘুসায়িত, ভূশায়িত ও গ্রেফতারিত হতে। গ্রেফতারিতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে যে, তাঁরা সরকারী প্রশাসনিক তৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন।

    কর্তৃপক্ষীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মার্কিন নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তাই, প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা কোনো অন্যায় বা অপরাধ তো করেনইনি বরং ভালো কাজ করেছেন বলে দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজ। নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ-মুহূর্তের দাবি হচ্ছেঃ ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার ও ডেইভিড পট্রিয়াসের অপসারণ।

    শিক্ষকতার জন্য ডেইভিড পট্রিয়াসের বেতন হওয়ার কথা ছিলো বার্ষিক ২০ লক্ষ ডলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য-প্রাক্তন চ্যান্সেলার মেথ্যু গৌল্ডষ্টাইন এ-গ্রীষ্মে অবসর গ্রহণের আগে যখন পট্রিয়াসের বেতন ধার্য্যে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন খবরটি এপ্রিল মাসে প্রথম প্রকাশ করে ম্যানহাটনের ইণ্টারনেট ভিত্তিক গসিপ-ব্লগ ‘গকার’। পট্রিয়াস বছরে একটি সেমিনার করবেন ও দুটি লেকচার দিবেন – ব্যস! এর জন্য তাঁকে দেওয়া হবে ২০ লক্ষ ডলার?

    পাবলিক ফাণ্ড থেকে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এতো অর্থ ব্যয়ে পট্রিয়াসকে নিয়োগ করা ঠিক হবে কি-না নিয়ে যখন বিতর্ক শুরু হলো, তখন বিতর্কিত পট্রিয়াস লিখলেন ম্যাকোলে কলেজের ডীন এ্যান ক্রিশনারকে, “সত্য হচ্ছে এই যে, আমি আরও বেশি অর্থ ও সম্মানের পদ পেতে পারতাম।” অবশেষে, সিটি ইউনির্ভারসিটি অফ নিউ ইয়র্ক ডেইভিড পট্রিসকে ১৫ লক্ষ ডলার বেতনে পদ গ্রহণের অনুরোধ করলো।

    একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম-পদে একজন অধ্যাপকের বেতন যেখানে মাত্র ৯০ হাজার ডলার, পট্রিয়াসের এতো বেশি বেতন বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। এমনকি নিউ ইয়র্কের সিটি কাউন্সলিলের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি জানিয়ে চিঠি লিখলেন।

    পাঠদানে ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলে যেখানে ছাত্র-বেতন ৫ বছর মেয়াদে ৩০% বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেখানে ১৫ লক্ষ ডলার ব্যয়ে অধ্যাপক নিয়োগ না করে, বরং ছাত্র-বেতনে ভর্তুকি দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চ্যান্সেলার উইলিয়াম ক্যালিকে চিঠি লিখলেন নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ডেমোক্র্যাট দলীয় কাউন্সিলার ব্র্যাড ল্যাণ্ডার। একইভাবে নিউ ইয়র্ক স্টেইটের রিপাবলিকান দলীয় এ্যাসেম্বলিম্যান কীর‍্যান ল্যালৌরও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে পেট্রিয়াসের নিয়োগ পুনর্বিবেচনার জন্য লিখিত অনুরোধ জানালেন।

    বিরাট অঙ্কের বেতন যখন বিতর্কের কেন্দ্রে, তখন বিতর্কিত ও বিব্রত পট্রিয়াস রূপতঃ আগুনে জল ঢেলে দিলেন আপাতঃ এক মহত্ত প্রদর্শন করে। পট্রিয়াস তাঁর আইনজীবী রবার্ট বার্নেটের মাধ্যমে জানালেন, বেতনের অঙ্ক যাতে বিতর্কের বিষয় না হয়, সে-জন্য তিনি মাত্র ১ ডলার বেতন গ্রহণ করবেন। কী মহান!

    অবশ্য, পট্রিয়াস শেষ পর্যন্ত সত্যিই এক ডলার বেতনে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন হয়েছেন কি-না, তা আমি এখনও জানি না। কারণ, ম্যাকোলে  কলেজের ডীন এক বিবৃতিতে বলেছেন, “বেতন ২০ লক্ষ ডলার কিংবা ১৫ লক্ষ ডলারই মিলিয়নই হোক, পেট্রিয়াসের মতো উচ্চ-মাপের ব্যক্তির তা পাওয়ার যোগ্যতা আছে এবং কুনির শিক্ষার্থীরাও এহেন শিক্ষক পাওয়ার উপযুক্ত।”

    বাহ্যতঃ বিষয়টি এখানে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি। কারণ, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিক্ষুব্ধ যাঁরা, তাঁদের প্রতিবাদের জায়গাটা মোটেও আর্থিক নয়। সুতরাং পট্রিয়াসের ১৫ লক্ষ ডলার ত্যাগের ঘোষণা তাঁদেরকে মোহিত করতে পারেনি এতোটুকুও। বস্তুতঃ তাঁদের প্রতিবাদের জায়গাটা অতি উচ্চ পর্যায়ের মানবিক ও নৈতিক।

    স্বাভাবিক প্রশ্নঃ কী সেই মানবিকতা ও নৈতিকতা, যার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠতম শহরের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌভাগ্যবান ও সৌভাগ্যবতী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ ২০ লক্ষ ডলার মূল্যের অধ্যাপক ডেইভিড পট্রিয়াসকে মাত্র ১ ডলার মূল্যে পাওয়ার পরও বিক্ষোভ অনির্বাপিত ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলেন? নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিবাদী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মানবিক ও নৈতিক আপত্তির বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে ডেইভিড পেট্রিয়াস কে।

    কে এই ডেইভিড পট্রিয়াস, যাঁর এক সেমিনার ও দুই লেকচার সম্বলিত অধ্যাপনার বার্ষিক মূল্য কমপক্ষে ১৫ লক্ষ ডলার? কে এই পট্রিয়াস, যিনি ১৫ লক্ষ ডলারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে মাত্র ১ ডলারে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী? কে এই পট্রিয়াস, যাঁকে নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানবিক ও নৈতিক কারণে তাঁদের প্রিয় ক্যাম্পাসে দেখতে চান না? কে এই পট্রিয়াস, যাঁকে দেখতে পেয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিসের নির্যতনের শিকার হন শিক্ষার্থীরা?

    ডেইভিড পট্রিয়াস হচ্ছেন ইহুদি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, যিনি গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মার্কিন দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থার শীর্ষ-কর্তা ছিলেন। তিনি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর ৬ তারিখ থেকে ২০১২ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্রধান ছিলেন।

    সিআইএ’র প্রধান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার আগে ডেইভিড পট্রিয়াস ১৯৭৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট ৩৭ বছর মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেনাবাহিনীতে তাঁর সর্বশেষ পদটি ছিলো আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইণ্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি এ্যাসিস্ট্যান্স ফৌর্সের কমাণ্ডারের। ২০১০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি এ-দায়িত্ব পালন করেন।

    তার আগে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর সেণ্ট্র্যাল কমাণ্ডের কমাণ্ডার ছিলেন। আরও আগে, মার্কিন অধিকৃত ইরাকে বহুজাতিক বাহিনীর কমাণ্ডিং জেনারেল পদে ছিলেন তিনি ২০০৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। এই ইরাকেই ডেইভিড পট্রিয়াস মেজর জেনারেল হিসেবে ২০০৩ সালে জীবনের প্রথম প্রকৃত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

    মার্কিন সেনাপতি জেনারেল ডেইভিড পট্রিয়াসের নেতৃত্বেই ইরাকে ও আফগানিস্তানে সামরিক-বেসামরিক নির্বিশেষে লক্ষ-লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন মার্কিন বাহিনীতে অত্যন্ত অমানবিক ও অমর্যাদাকরভাবে ইরাকে ও আফগানিস্তানে সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিদের নির্যাতন করা হয়। তাঁর নেতৃত্বেই মনুষ্যহীন বোমারু বিমান বা ড্রৌন দিয়ে হাজার-হাজার নর-নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করা হয় আফগানিস্তানে ও পাকিস্তানে। তাঁর নেতৃত্বেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তথ্য আদায়ের জন্য কুখ্যাত সব নির্যাতন পদ্ধতির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করে।

    এহেন জেনারেল ডেইভিড পট্রিয়াসকে নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা 'খুনী জেনারেল' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা ডেইভিড পট্রিয়াসের হাতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানের অগণিত মানুষের রক্ত দেখতে পান। রক্ত-রঞ্জিত হাতে জেনারেল পট্রিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করবেন কীভাবে? কী শিক্ষা দিবেন তিনি?

    শিক্ষার মর্মবস্তু যদি মানবতার  উৎকর্ষতাই হয়, মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই যদি বিশ্বের মহত্তম ও উৎকৃষ্টতম জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-শিল্পের সৃষ্টি হয়, তাহলে লক্ষ-লক্ষ নিরপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীরা কীভাবে তাঁদের শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করবেন? অতি উচ্চ মানবিক ও নৈতিক বোধ এবং আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধে উজ্জীবিত শিক্ষার্থীরা তাই তাঁদের ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়ে ইরাক-আফগানিস্তানের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে তাঁদের তথাকথিত বীর সেনানী জেনারেল ডেইভিড পট্রিয়াসের বিরুদ্ধে। 

    নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের এহেন মানবিক ও নৈতিক শক্তিতে মুগ্ধ হয়েছেন  তাঁদের মহান শিক্ষকগণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে সদ্য এক বিবৃতিতে বলেছেনঃ

    “We emphatically support the efforts of these CUNY students to resist the attempts by the U.S. government and the CUNY administration to turn the university into an infamous “war college" with the appointment of Petraeus.  He is responsible for countless deaths and innumerable destruction in Iraq and Afghanistan as a war commander and chief of the CIA,”

    অর্থাৎ, পট্রিয়াসের নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কুখ্যাত যুদ্ধ-কলেজে রূপান্তরিত করার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও সরকারের এই অপচেষ্টা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কের শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টাকে আমরা জোরের সাথে সমর্থন করি। যুদ্ধের সেনাপতি ও সিআইএ’র প্রধান হিসেবে তিনি (পট্রিয়াস) ইরাকে ও আফগানিস্তানে অগণিত মৃত্যু ও অসংখ্য ধ্বংসের জন্য দায়ী।

    রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন