• পরাবাস্তব প্রতিবেদনঃ অরণ্যে বিশ্বজিৎ
    মাসুদ রানা

    অরণ্যে যায়নি বিশ্বজিৎ দাস। ছিলো জনারণ্যে - নিশ্চিত মানুষের মাঝে; বাড়ীতে দাদার সাথে, বৌদির সাথে, রাস্তায় পথচারীর সাথে, দোকানে ক্রেতার সাথে। সর্বত্রই মানুষ। মানুষে ভরা দেশ, বাংলাদেশ। মানুষে ভরা নগরী, ঢাকা। এখানে অরণ্য কোথায়?

    কিন্তু জীবনের শেষ দিনটিতে বিশ্বজিৎ দাসের বিশ্বাস উবে গেলো। ভীষণ ভয় পেলো বিশ্বজিৎ। কোথায় কোনো মানুষ দেখতে পাচ্ছে না সে। তার চারদিকে শুধু হিংস্র নেকড়ে, দাঁতাল শুয়োর আর বন্য কুকুর। কোথা থেকে এলো এই জানোয়ারের দল? কিছুই ঠাহর করতে পারেনি নগরবিহারী বিশ্বজিৎ।

    বাড়ী থেকে দোকানে যাবার পথে মানুষের জটলা ও কোলাহল দেখেছিলো বিশ্বজিৎ। রাজ্যের কথা মাথায় নিয়ে আনমনে ভাবতে-ভাবতে পথ চলছিলো সে। তাই কিছু আঁচ করার আগেই সে একটি ধাবমান মিছিলের সামনে পড়ে গেলো। এক পলকে বিশ্বজিৎ বুঝে নিলো, এটি কোনো সাধারণ মিছিল নয়। একটি জঙ্গী মিছিল। কার মিছিল সেটি, তাও বুঝা গেলো না। কারণ, তাদের হাতে কোনো ব্যানার নেই, কিংবা পৌস্টারও নেই। কী স্লৌগান দিচ্ছেন তারা, তাও বুঝার উপায় নেই। হতে পারে জামায়াতের, হতে পারে বিএনপির, কিংবা হতে পারে আওয়ামী লীগের।

    থেমে, বুঝে, পদক্ষেপ নেবার বোধ ও সাহস ছিলো না বিশ্বজিৎ দাসের। কারণ, সে কোনো দলই করে না। তাই সবাইকে ভয় করে সে। এছাড়াও বিশ্বজিৎ জানে যে, সে সংখ্যালঘু হিন্দুর ছেলে। বাংলাদেশে হিন্দুদের সাতগুণ সাবধানে থাকতে হয়। তাই, বিশ্বজিৎ দৃশ্যপট থেকে দূরবর্তী হবার জন্য স্বয়ংক্রিয়-প্রতিক্রিয়ার বশে দৌড়াতে লাগলো।

    কিন্তু সে কোনোক্রমেই মিছিলটার সাথে পাল্লা দিয়ে পারছিলো না। এক মুহূর্তে মনে হলো, ওকেই ধাওয়া করছে মিছিলটি। কিন্তু কেনো? কী করেছে সে? কী করে সে বুঝাবে যে, সে জনারণ্যের পথচারী, বাড়ীর সুবোধ ছেলে, দোকানের কর্মচারী। কোনো ঝামেলার লোক নয় সে।

    বিশ্বজিৎ দাসের মাথা কাজ করছে না। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো সে, ‘রাস্তা ছেড়ে কোথাও ঢুকে পড়া উচিত। বিশ্বজিৎ দেখলো এক ফালির লাল চাঁদ চিহ্নিত একটি ক্লিনিক। ‘মিছিল কখনওই ক্লিনিকে ঢুকবে না’, ভাবলো বিশ্বজিৎ। ওর বিশ্বাস, ক্লিনিক কোনো সাধারণ গৃহ নয়। যুদ্ধের সৈনিকেরাও এটি মান্য করেন।

    কিন্তু নাহ,। ভুল, সম্পূর্ণ ভুল ভেবেছিলো বিশ্বজিৎ। ওরা থামেনি চিকিৎসালয়ের ফটকে। বিশ্বজিৎকে ধাওয়া করে ভেতরে ঢুকে গেছে ওরা। বিশ্বজিৎ এবার স্পষ্ট দেখতে পেলো ধাওয়াকারীদের হাতে মারণাস্ত্র। সহসা মৃত্যুভয় পেয়ে বসলো বিশ্বজিৎকে।

    মরিয়া হয়ে একটু লুকাবার জায়গা খুঁজতে লাগলো বিশ্বজিৎ। সে তার আজন্ম লালিত বিশ্বাস থেকে ডাকলো ‘ভগবান, বাঁচাও!’ কিন্তু ‘ভবগবান’ সাড়া দিলেন না। পেছন থেকে কানের পর্দা ফাটিয়ে আওয়াজ এলো, ‘জয় বাংলা!’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু!’

    একি শুনছে বিশ্বজিৎ! মনে ভরসা এলোঃ ‘এরা জামায়ত-শিবির বা বিএনপি নয়। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক।’ বিশ্বজিৎ ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছে, জামায়াত-শিবির হিন্দুদেরকে কাফের মনে করে। বিএনপি হিন্দুদেরকে দুশমনের বান্ধব মনে করে। শুধু আওয়ামীলীগই হিন্দুদের প্রতি সদয়। বিশ্বজিৎ এটি বিশ্বাস করে।  বিশ্বজিৎ হানাদারদের বললো, ‘আমি হিন্দু’। আরও জানালো সে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নয়। বিশ্বজিৎ ভেবেছিলো, ওর হিন্দুত্বের কথা জানলে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা’ ওকে রেহাই দেবে।

    ভুল বিশ্বাস ছিলো বিশ্বজিৎ দাসের। ওরা ওকে রেহাই দেয়নি। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ফিন্‌কি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো বিশ্বজিৎ দাসের বাঙালী-দেহ থেকে। আরও একটা! আরও একটা! এবং আরও, আরও! রক্তে লাল হয়ে গেলো বিশ্বজিৎ দাসের গায়ের জামা।

    এবার বিশ্বজিৎ আর কোনো মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। ঝাপসা হয়ে গিয়েছে ওর চোখের দৃষ্টি। সে দেখতে পাচ্ছে অগণিত ক্ষুধার্থ নেকড়ে, ভয়ঙ্কর শুয়োর, ক্ষ্যাপা কুকুর। ওদের মুখের চির-পরিচিত স্লৌগানগুলো ভয়ঙ্কর পাশবিক উল্লাসের মতো শ্রুত হচ্ছিলো।

    বিশ্বজিৎ নিজেকে সহসা শ্বাপদ-সঙ্কুল ভয়াল অরণ্যের মধ্যে আবিষ্কার করলো। লোকালয়ে পৌঁছুবার জন্য সে মরিয়া হয়ে তার ভুল-ভাবিত ভবন ছেড়ে রাস্তার দিকে ছুটলো। সেখানে অনেক মানুষ আছে। মানুষের বিপদে মানুষ নিশ্চয় এগিয়ে আসবে। পশুগুলো তখন হটে যাবে। এটিও তার বিশ্বাস।
    দৌড়াও! বিশ্বজিৎ, দৌড়াও! এটি ওর জীবন ম্যারাথনের শ্রেষ্ঠ দৌড়। যেভাবেই হোক জিততেই হবে। জেতার জন্যই মা-বাবা নাম রেখেছিলেন বিশ্বজিৎ। বিশ্বজিৎ, দৌড়াও!

    বিশ্বজিৎ ছুটছে মানুষের দিকে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! রক্ত-হীম-হওয়া অবিশ্বাস্য কাণ্ড! নিজের প্রাণটুকু বাঁচাতে চির-পরিচিত এই জনারণ্যের বিশ্বজিৎ যতোই মানুষের কাছে যাচ্ছ, ততোই মানুষগুলো ওর কাছ থেকে দূরবর্তী হচ্ছে।

    বিশ্বজিৎ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, মানুষগুলোর কাছে যেতেই তারা প্রত্যেকে অন্য প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়ে অরণ্যের সাথে মিশে যাচ্ছে। নানা রঙের চমৎকার পোশাক-পরা মানুষগুলো গরু-ছাগল-ইঁদুর-বিড়াল হয়ে অরণ্যের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শার্ট-পরা, পেন্ট-পরা, জিন্স-পরা, স্যুট-পরা মানুষগুলো একটাও মানুষ থাকলো না। বিশ্বজিৎ আরও ভয় পেয়ে গেলো। এটি অরণ্যের ভয়। কোথাও কোনো মনুষ্য না থাকার ভয়।

    এবার বিশ্বজিৎ ক্লান্ত বোধ করছে, ওর শরীরে লোহার শিক, লাঠি, চাপাতি, ইত্যাদির আঘাত আর আঘাত মনে বলে বোধ হচ্ছে না। সহসা এই অরণ্যের মধ্যে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে গেলো। শরিয়তপুরের গ্রামের বাড়ীতে মা-বাবা রয়েছেন। এবার পুজোতে মা-বাবার সাথে কি দেখা হয়েছিলো? কিছুই মনে করতে পারছে না বিশ্বজিৎ। তবে দুঃখিনী মাকে তার খুব মনে পড়ছে।

    বিশ্বজিৎ তার ম্যারথনে দৌড়ে সফল হয়েছিলো, কিন্তু ফীদিপিদেসের মতোই জীবনী শক্তি নিঃশেষিত করে। বিশ্বজিৎ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ওর রক্তাক্ত শরীরটা লুটিয়ে পড়লো পিচ-ঢালা রাস্তায় - মনুষ্যহীন মহানগরে। কোথাও কেউ নেই। মানুষেরা জানোয়ার হয়ে অরণ্যে মিশে গিয়েছে। বিশ্বজিৎকে রক্ষার জন্য কোনো মানুষ দৃশ্যমান হলো না।

    হঠাৎ একটি ছায়ামূর্তি ভেসে এলো রিকশার প্যাডেল ছেড়ে। ‘রিকশাওয়ালা’! আশ্চর্য্য, শার্ট-পেন্ট-স্যুট-পরা পলায়নপর গরু-ছাগল-ইঁদুর-বিড়ালের অরণ্য ভেদ করে লুঙ্গি-পরা এই ‘রিকশাওয়ালা’ অবিকৃত মানুষ হিসেবে এগিয়ে এসে বিশ্বজিৎকে তুলে নিলো পরম ভালোবাসায়। এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। এতে কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই, দল নেই, আদর্শ নেই। আছে শুধু মানুষের প্রতি মানুষের একাত্মতা।

    বিশ্বজিৎ এখন রিকশায়। রিকশাচালক বিশ্বজিৎকে জীবনের আশ্বাস দিচ্ছে, বাঁচার প্রেরণা দিচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্বজিৎ দাসের পরিচয় নিয়ে নিজের পরিচয় দিলো ‘রিকশাওয়ালা’ মোহাম্মদ রিপন। পূর্ণ ভরসায় তাকালো বিশ্বজিৎ ক্লান্ত চোখে, কিন্তু পরক্ষণেই চমকে উঠলো ওর চেহারা দেখে। আশ্চর্য! এ-তো আজ সকালে আয়নায় দেখা তার নিজের ছবি। মোহাম্মদ রিপন ও বিশ্বজিৎ দাস এক ও অভিন্ন।

    বিশ্বজিৎ দাসের শরীর থেকে ফিনকি-দেয়া রক্ত এখন ফোঁটা-ফোঁটা হয়ে ঝরছে। বিশ্বজিৎ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওর খুব ঘুম পাচ্ছে। এখন সে ভয় পাচ্ছে না। একটি অভয়ারণ্যের মধ্যে বিশ্বজিৎ শুধু দেখছে মোহাম্মদ রিপনকে, যে পশুর দল অতিক্রম করে ওকে জীবনের ঠিকানায় বয়ে নিয়ে চলেছে।

    ‘রিকশাওয়ালা’ মোহাম্মদ রিপন ভেবেছিলো জীবন বাঁচাবার ঠিকানা হাসপাতাল। তাই, ডাক্তারদের কাছে আকুতি করলো, ‘এই মানুষটার জান বাঁচান। দয়া করুন, ডাক্তার সাহেব, দয়া করুন।’

    ‘এতো পুলিস কেইস!’ ‘তুই কে হে?’ ‘রিকশাওয়ালা?’ ‘তোর কথা আমাদের শুনতে হবে?’ ‘তুই ওকে কোথায় পেলি?’ ‘আর কীভাবেই এখানে নিয়ে এলি?’ ‘পুলিসের কাছে কেনো গেলি না?’ অসংখ্য প্রশ্ন ডাক্তারদের, যার উত্তর মোহাম্মদ রিপনের কাছে নেই।

    বিশ্বজিৎ দাস এতোক্ষণে রক্তক্ষরণে বাকশক্তিহীন, কিন্তু ঝাপসা-ঝাপসা দেখতে পাচ্ছে চারপাশ।  তবুও চিনতে ভুল করেনি বিশ্বজিৎ। সাদা ডাক্তারী-পোশাক-পরা একেকটা জানোয়ার। ভীষণ কর্কশ এদের আওয়াজ। রক্তলিপ্সু লাল টকটকে চোখ এদের।

    বিশ্বজিৎ দাসের চোখের আলো কম আসছে। আলোর জন্য চারদিকে তাকালো বিশ্বজিৎ। কিন্তু আলোর চিহ্ন পেলো না। ঘন অরণ্যের অন্ধকার সব কিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। এর মধ্যেই ডাক্তারের পোশাক পরা জানোয়ারগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।  বিশ্বজিৎ কতোক্ষণ এই দৃশ্য দেখতে পেরেছিলো তা আমরা কেউ জানি না। তবে এটি নিশ্চিত জানি, বিশ্বজিৎ আর বেঁচে নেই।

    বিশ্বজিৎকে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্বজিৎ দাসকে কে হত্যা করেছে? বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় নাম-ধাম-সহ হত্যাকারীদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে।  কিন্তু তাদের পরিচয় পুলিস জানে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা জানেন না। যে-কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছেনে কারা আছে নিশ্চিত বলে দিতে পারেন যে প্রগলভা নারী, তিনিও জানেন না। জানবেন কী করে?

    আসলে, বিশ্বজিৎ ঠিকই দেখেছিলো। ওর হত্যাকারীরা মানুষ ছিলো না। ওরা ছিলো হিংস্র নেকড়ে, দাঁতাল শুয়োর, আর ক্ষ্যাপা কুকুর। কিন্তু আশঙ্কার কথা হচ্ছে, শার্ট-পেণ্ট-স্যুট-কোট-পরা মানুষগুলোর গরু-ছাগল-ইঁদুর-বিড়াল হয়ে অরণ্যে মিশে যাওয়ার ঘটনাটি।

    তথাপি, আশার কথা হলো, এই অরণ্যের মধ্যে শুধু একজন মানুষ ছিলো, যার নাম মোহাম্মদ রিপন - রিকশা শ্রমিক, সর্বহারা।

    মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

খুব ভালো লাগলো

চোখে পানি এসে গেলো...

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন