• পেশাজীবীদের ‘ইজম’ সমস্যর সমাধান কী?
    যায়নুদ্দিন সানী

    কিছুদিন আগে বাংলাদেশের রাজশাহীতে চিকিৎসকদের হরতাল পালিত হলো। এ-নিয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশে প্রচুর কথা-বার্তা, বাক-বিতণ্ডা হলো। চিকিৎসকরা হরতাল করতে পারেন কি-না; রোগীদেরকে জিম্মি করে দাবী আদায় নৈতিক কি-না ইত্যাদি নিয়ে বেশ বিতর্কও হলো। অবশেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, আন্দোলন করলে মানব-বন্ধন পর্যন্ত করা যেতে পারে। তবে যে আলোচনা আড়ালে থেকে গেলো, তা হচ্ছে পেশাজীবীদের ‘ইজম’ বা ‘পেশা প্রীতি’ - নিজ পেশার লোকের ওপর আঘাত এলে, একত্রিত হয়ে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়া। মনোভাবটা এমন যে, "দোষ কার তা পরে দেখা যাবে, প্রথমে চাই একটি আপাতঃ সমাধান যেখানে আমার পেশা অন্ততঃ বাহ্যিকভাবে হলেও জয়ী প্রমাণিত হবে"। কেনো যেনো এ-ফর্মুলাতেই কাজ চালিয়ে নিতে চাচ্ছেন। দৃশ্যতঃ সবাই এড়িয়ে যাচ্ছেন মূল ব্যাপারটা - এ ধরনের অঘটন কেনো ঘটছে? আর এ-থেকে সত্যিকার পরিত্রাণের উপায় কী?

    এদেশে ‘কেইস’ কিংবা ‘মামলা’ র সঙ্গে একটা ব্যাপার বেশ অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। আর সেটি হচ্ছে  ‘কালিমা’। মামলা হয়েছে মানেই কিছু একটা নিশ্চয়ই করেছে! অপরাধ নিশ্চয়ই সে-ই করেছে। খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা অপেক্ষা করি মামলার রায়ের। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে তা বেশ সম্মানেরও অবশ্য। ‘অমুকের নামে ৫টা মার্ডার কেস আছে' — এর অর্থ হতে পারে, বিবাদী একজন ডাকসাইটে সন্ত্রাসী। এই কেসগুলো তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠি। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্যও ব্যাপারটি জনপ্রিয়তার লক্ষণ। বিরোধীদলের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘কেইস’ মানেই সরকার 'ভয় পেয়েছে' - বিরোধীদলকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। জমিজমা-ঘটিত ব্যাপারের কেইস মানেই ‘ঝামেলা’ - বহু বছর ধরে চলবে। যদিও মান-সম্মান ঘটিত সমস্যা নেই তবুও সাধারণ মানুষ ভয় পায়। ভয়টা হয়তো খরচের — অন্যদিকে উকিলের পোয়াবারো।

    সমস্যা হয়ে যায় এ-ধরণের কোনো 'গোত্রেই পড়েন না’ এমন মানুষের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে অন্যতম ভুক্তভোগী হচ্ছেন চিকিৎসকরা। তাদের ‘ভুল চিকিৎসা’ কিংবা ‘অবহেলা’ ঘটিত ব্যাপারগুলো প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় আসে। এসব প্রতিবেদনের বেশিরভাগেরই সূত্র থাকে ‘রোগীর পক্ষের বক্তব্য’। এর মাঝে সত্য থাকে কি-না তা বুঝার সত্যিকারের কোনো উপায় থাকে না। কারণ, প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই কোন্‌ চিকিৎসাটি কিংবা কোন্‌ নিদানটি ভুল তা উল্লেখ করেন না প্রতিবেদকরা। ‘এই ইঞ্জেকশানটা দেয়ার পর থেকেই রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়’ কিংবা ‘ডাক্তার ঠিকমত দেখে নি’ জাতীয় অভিযোগই দেখতে পাওয়া যায় বেশি। কী অসুখ হয়েছিলো কিংবা কী ইঞ্জেকশান দেয়া হয়েছিলো, সে-ইঞ্জেকশান দেয়ার সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল কি-না, সে সম্পর্কে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত থাকে না। আর রিপোর্টের কারণে যে ঘটনাটি ঘটে, তা হচ্ছে ডাক্তার সাহেব সকলের কাছে হেয় হন। বাংলাদেশে পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদক কিংবা সম্পাদকদের যেহেতু জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই, তাই এসব ব্যাপার ঘটতেই থাকে এবং যথারীতি এসবের জন্য কোনো রিপোর্টার কিংবা সম্পাদক কোনো শাস্তিও পান না।

    আইন হয়তো প্রতিটি সম্ভাব্য অপরাধের ক্ষেত্রেই আছে, তবে মামলাকে সবাই বেশ ভীতির চোখেই দেখে। খরচ যেমন একটি কারণ, তেমনি মামলা নিষ্পত্তির ধীরগতিও একটি কারণ। ফলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজেই কিছু করার প্রচেষ্টা। কোনো এক্সিডেণ্ট হয়েছে? কেইস করার চেয়ে প্রচেষ্টা বেশি থাকে সংশ্লিষ্ট ড্রাইভারকে ধরে ‘ধাতানি’ দেয়ার। আর ড্রাইভারও তাই এক্সিডেণ্টের পরে প্রথম যে কাজের চেষ্টাটি করে, তা হচ্ছে ‘চম্পট’ দেয়া। বিশেষ-বিশেষ হাই প্রোফাইল কেইসে শুধুমাত্র ড্রাইভার ধরা পরে। এবং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবস্থা একটু শান্ত হলে ‘ছাড়া’ পায়ে যায়। কেসই সাধারণতঃ পরিণামের মুখ দেখে না। আর যদি কখনও শাস্তি হয়ও, তখন শুরু হয় ‘ইজম’ বা পেশা প্রীতির। একজন ড্রাইভারের বিপদ মানে যেনো সব ড্রাইভারেরই বিপদ। আজকে একজনকে ধরেছে, একসঙ্গে প্রতিবাদ না করলে, কাল অন্য আরেকজনকে ধরবে। তাই শুরু হয় ড্রাইভার সমিতি কিংবা পরিবহন সমিতির ধর্মঘট। ফলাফলও পাওয়া যায় দ্রুত। পত্রিকায় আসে জনগণের দুর্ভোগের কাহিনী, নড়ে চড়ে ওঠে সরকার। শুরু হয় দেন-দরবার করা। অবশেষে — অভিযুক্ত ‘খালাস’। ‘ইজম’ তাঁর খেল দেখায়।

    দেশের প্রতিটি সেক্টরেই ‘ইজম’ ব্যাপারটা বেশ জেঁকে বসে আছে। এর একটি কারণ হতে পারে, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা। তবে সবচেয়ে বড় যে কারণটির দোষ দেয়া হয় তা হচ্ছে, ‘অন্য ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ না থাকা’। এই যুক্তিতে প্রায় সবাই নিজের কম্যুনিটির যেকোনো অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো ‘কেস’ হলে সব সাংবাদিক একযোগে ঝাপিয়ে পড়েন। রিপোর্টের পর রিপোর্ট লিখে প্রমাণ করে দেন, যিনি ‘কেইস’ করেছেন তিনি আসলে বেজায় বাজে লোক। ইচ্ছা করেই একজন মহান সাংবাদিককে হেনস্থা করছেন। এমন অবস্থা সর্বক্ষেত্রেই। যে যেভাবে পারেন তাঁর নিজের পেশাকে আগলাচ্ছেন। উকিলের অসততার জন্য কোনো উকিল শাস্তি পান না। পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা জাজ — সর্বক্ষেত্রেই একই অবস্থা। বলাই বাহুল্য চিকিৎসকরাও এই ‘ইজম’ সমস্যার বাইরে নন।

    চিকিৎসা-সেবা যেহেতু একটি বিশেষায়িত সেবা, তাই ‘চিকিৎসকের ভুল’ সবার পক্ষে ধরা সম্ভব না। একই বিষয়ের আরেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পক্ষেই কেবল তা ধরা সম্ভব। আর এসব ঘটনা যেনো নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ঘটে তা দেখার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেণ্টাল কাউন্সিল। প্রেস কাউন্সিল, বার কাউন্সিল ইত্যাদি পেশাজীবী কাউন্সিলের মত এটিও সেই ‘ইজম’ রোগের শিকার। ফলে উল্লেখযোগ্য কেউই এই সংস্থার মাধ্যমে শাস্তি পাননি। হতে পারে কেউ অন্যায় বা অপরাধই করেননি, আবার এমনও হতে পারে যে, কাক কাকের মাংস খেতে অপারগতা জানিয়েছে। এভাবে চলতে থাকায়, যে উপসর্গটি দিনে-দিনে দানা বেঁধেছে, তা হচ্ছে, আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা। ‘মার শালা ডাক্তারকে, এই শালার জন্যই রোগীটা মরলো।‘

    এই যখন সার্বিক অবস্থা, তখন অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো চিকিৎসকরাও নিজেদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া যে-কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আন্দোলনের আশ্রয় নেন এবং অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন ‘ধর্মঘট’। প্রায়শঃই এতে একটি আপাতঃ সমঝোতা অর্জিত হয়। অভিযুক্ত কিছুদিনের জন্য চৌদ্দ শিকের পেছনে বেড়াতে যান’, বা ক্ষমা চাওয়া ধরণের একটা মীমাংসা হয়। এবং এর পরে যথারীতি আর কিছুই হয় না। কোনো অভিযুক্তর ন্যায়সঙ্গত শাস্তি হয় না। ফলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকে। চিকিৎসকের কি কোনো অবহেলা কিংবা ভুল থাকে না? হয়তো থাকে। হয়তো থাকে না। কখনও ইচ্ছাকৃত, কখনও বা অনিচ্ছাকৃত, আবার কখনও হয়তো অজ্ঞতা জনিত। আইনে এর প্রতিটির জন্যই আলাদা শাস্তির বিধান থাকলেও কোনো ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় না।

    এ-নিয়ে মাঝে মাঝে লেখালেখি হয়। উন্নত দেশের উদাহরণ দেয়া হয়। ওসব দেশে এথিক্যাল কমিটী আছে, আইনের শাসন আছে ইত্যাদি। তবে সে-উদাহরণে অনেক কিছুই বলা হয় না। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা খরচ মেটাতে যে প্রায় প্রত্যেকে রোগীকেই ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যবীমার আশ্রয় নিতে হয় কিংবা সেখানকার চিকিৎসকদের ফী-যে আকাশছোঁয়া - কারণ সেখানকার চিকিৎসকরা চিকিৎসা ফী’র একটি অংশ আলাদা করে জমিয়ে রাখেন উকিল খরচের জন্য — এই তথ্যগুলোর উল্লেখ দেখা যায় না। চিকিৎসার এ-বিশাল ব্যয়ভার টানতে রীতিমতো হিমশিম খায় সেখানকার মানুষ।

    প্রশ্ন যেটা থেকেই যাচ্ছে তা হচ্ছে, এর সমাধান কী? নিজ-নিজ পেশার প্রশ্নে এই ‘ইজম’ ফর্মুলা কতদিন চলবে? অন্য পেশায় আছে তাই আমরাও চালাবো — এই অপযুক্তিই বা আর কতদিন ব্যবহৃত হবে। প্রতিটি পেশাকে তদারক করবার যেসব সংস্থা আছে, সেগুলোকে আর কতদিন ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রাখা হবে? ওরকম বানিয়ে রেখে সে-পেশা বা পেশাজীবীদের জন্য কি খুব কল্যাণ করা হচ্ছে? না-কি এর মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষের ভেতর ‘এক্সট্রিম’ এ যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করছি? যদি প্রতিটি এ্যাক্সিডেণ্টের পর উপযুক্ত ও নিরপেক্ষে তদন্ত হতো, যদি দোষ পাওয়া গেলে চালকের বিচার হতো, তবে জনগণের মাঝেও যেমন চালককে পিটিয়ে আইনের হাতে তুলে দেয়ার প্রবণতা কমে আসতো তেমনি চালকও হয়তো আরও সচেতন থাকতেন গাড়ী চালাবার সময়। একই কথা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রও প্রযোজ্য। যে-কোনো অঘটন যদি বিএমডিসি তদন্ত করতো কিংবা চিকিৎসক এবং রোগীর পক্ষের বক্তব্য শোনার একটি প্রতিষ্ঠান থাকতো, নীতিমালার সুষ্ঠু প্রয়োগ থাকতো, তবে হয়তো এই ‘গায়ের জোর’ দেখাবার প্রবণতা কমে আসতো। আশা করা যায় তাতে ‘ইজম’ সমস্যা বা ভোক্তাকে জিম্মি করে নিজ পেশার জন্য সুবিধা আদায়ের কৌশলের অবসান হতো।

    লেখকঃ কলামিস্ট, গল্পকার
    https://www.facebook.com/ahmad.z.sani

    রোববার, ৬ এপ্রিল ২০১৪

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন