• প্যালেস্টাইনঃ ইসরায়েলের মাগনা তালুক
    মাসুদ রানা

    ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইন দেশে গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত বর্ণবাদী ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নিয়ে প্যালেস্টাইনীদের একাংশ - পশ্চিম তীরের কর্তৃত্বকারী মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ সরকার - নিজেদের জন্য প্যালস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের পূর্ণ-স্বীকৃতি চেয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এবার আরও ছাড় দিয়ে তাঁরা ‘নন-মেম্বার অবজার্ভার স্টেইট স্টেইটাস’ - অর্থাৎ, অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করে সফল হয়েছেন। এই ঘটনাটা কি একটি প্যালেস্টাইনীদের জন্য ইতিবাচক অর্জন? বিষয়টি বুঝতে হলে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমরনীতি এবং সর্বোপরি প্যালেস্টাইনী জাতির সমাজতত্ত্ব বিবেচনায় এনে বিচার করতে হবে।

    যে-কোনো-ভাবে একটি রাষ্ট্র হলেই তা ইতিবাচক হয়ে যায় না। ব্রিটিশ-দখলিত বাংলা ভেঙ্গে তার পূর্বখণ্ড এক হাজার মাইল দূরের ভিন্‌-মূল্লুকের সাথে জুড়ে দিয়ে ‘সোনার চান’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। নরখাদক পশুর নাম যুক্ত করে ডাকা এক বাঙালী মুসলিম নেতা এর প্রস্তাবক ছিলেন। সেই গর্বে বাঙালী মুসলমানের বুক বৃথাই ফুলে উঠেছিলো। কারণ, মাত্র এক বছরের মাথায় তাঁদের ‘জাতির পিতা’ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলাভাষাকে উর্দুর পদতলে বিসর্জিত করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠিক হয়নি - অন্ততঃ বাঙালীর জন্য নয়। এই ভুল সংশোধনের প্রয়াসে অর্থাৎ, পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে, বলা হয়ে থাকে, ৩০ লক্ষ বাঙালীর প্রাণ দিতে হয়েছিলো।

    বাংলার মতো প্যালেস্টাইন দেশটিও ব্রিটিশ অধীনে ছিলো। বাংলা তথা ভারত ছাড়ার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে একই কায়দায় ব্রিটিশ কারসাজিতে বাংলার মতোই প্যালেস্টাইনকে দ্বিখণ্ডিত করা হলো।  বাংলায় যেভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিলো, প্যালেস্টাইনেও আরব-ইহুদীতে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিলো। বাংলাকে যেভাবে দ্বিজাতি তত্ত্ব ভাগ করা হয়েছিলো, প্যালেস্টাইনকে তেমনি ভাবে দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্বে ভাগ করা হয়েছিলো। কিন্তু প্যালেস্টাইনীরা মেনে নেয়নি তাঁদের দেশ-বিভক্তি। মেনে নেয়নি ইসরায়েলী রাষ্ট্র।

    যুদ্ধ বাঁধে প্যালেস্টাইনে। ইহুদিবাদী বা জায়নবাদী ইসরায়েল রাষ্ট্রের সাথে প্যালেস্টাইনীদের। হেরে যায় প্যালেস্টাইনীরা। তবুও মেনে নেয়নি ইসরায়েলকে। সেজন্য লক্ষ-লক্ষ প্যালেস্টাইনী তাঁদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হলেন। কিন্তু তবুও তাঁরা মেনে নিলেন না মাতৃভূমির বিভক্তি। আবার যুদ্ধ হলো ১৯৬৭ সালে এবং আবার হারলো প্যালেস্টাইনীরা। নিয়ন্ত্রণ হারালো আরও ভূমির, কিন্তু তবুও মেনে নেয়নি এক ভূমিতে দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্ব।

    কিন্তু হায়, প্রায় অর্ধ-শতাব্দী পর ১৯৯৩ সালে এক সময়কার আপোসহীন নেতা ইয়াসির আরাফাত বাস্তবতার নামে নীতিচ্যুত হয়ে মেনে নিলেন দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্ব। মার্কিন মধ্যস্থতায় তাঁর সংগ্রামী সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশন বা ‘পিএলও’ মেনে নিলো ইসরায়েল রাষ্ট্র আর ইসরায়েল মেনে নিলো পিএলওকে প্যালেস্টাইনীদের কর্তৃপক্ষ হিসেবে। তারপরও, ইয়াসির আরাফাতের আপোস কোনো ফল আনতে পারেনি প্যালেস্টাইনীদের জন্য। সমস্ত প্রতিশ্রুতি, সমস্ত সংঘ ও জাতিসঙ্ঘ উপেক্ষা করে ইসরায়লে তাঁর ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রের সীমানা বাড়িয়ে প্রতিদিন কোন-ঠাসা করছে প্যালেস্টাইনীদের।

    ইসরায়েল শুরু থেকেই দুই রাষ্ট্র চাইছে। একটি ইসরায়েল এবং অন্যটি প্যালেস্টাইন। কিন্তু এর রূপ ও সীমানা কী হবে, তা নিয়ে জায়নবাদী রাষ্ট্রটির নেতৃত্ব স্থির কথা বলেছেন না। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধে জিতে যে ভূমি তাঁরা তাঁদের ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্র-সীমানার অতিরিক্ত হিসেবে দখল করেছিলেন এবং আছেন, তার সবটুকুই চাইছেন এখন। জাতিসংঘের বিধানও মানছেন না তাঁরা।

    সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত আমার পূর্ববর্তী একটি লেখায় আমি দেখিয়েছিলাম, কীভাবে দাস-যুগের নগর-রাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্র চাইছেন ইহুদিবাদীরা। ওঁরা প্যালেস্টাইনের শ্রেষ্ঠতম জায়গাগুলোতে হিহুদি আবাস গড়ে মূল রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে চাইছেন। আর, এর বাইরে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট ভূমিতে প্যালেস্টাইনীদের ঠেলে দিয়ে প্যালেস্টাইন নামের একটি রাষ্ট্র বানাতে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক বিবেচনায় এহেন রাষ্ট্রটি হবে মূলতঃ ইসরায়েলে শ্রম ও কাঁচা মাল যোগান দিতে সক্ষম একটি ঘনবসতির বস্তি, যা প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়লের মধ্যবর্তী ‘বাফার জৌন’ হিসেবেও কাজ করবে।

    নষ্ট-হয়ে-যাওয়া প্যালেস্টাইনী নেতৃত্ব ইউরো-আরব-মার্কিন-ইসরায়েলী সমর্থন নিয়ে এই বস্তির মধ্যেই কর্তৃত্ব করে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে চায়। এতে যে ভৌগলিক ভাবে বিশাল দূরত্ব বিরাজ করবে পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে (পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মতো), তাতে তাঁরা ভাবিত নন। যেভাবে হিন্দুত্ববাদী ও ইসলামবাদী বাঙালী নেতারা ক্ষমতার নিজ-নিজ পরিধি টিকিয়ে রাখার জন্য বাংলার পূর্ব-পশ্চিম বিভক্তি মেনে নিয়েছিলেন, তেমনি ভাবে খণ্ডিত প্যালেস্টাইনের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান মেনে নিচ্ছেন নেতারা।

    কিন্তু জনগণ চাইছেন না তাঁদের দেশের বিভক্তি। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবীরা চাইছেন না মাতৃভূমির বিভক্তি। তাই তাঁরা বিরোধিতা করছেন তথাকথিত দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের। কী চাইছেন তাঁরা তবে?

    প্যালেস্টাইনী জনগণের প্রকৃত পক্ষের শক্তিগুলো চাইছে, রাষ্ট্রের নাম যাই হোক, মাতৃভূমির যেনো বিভক্তি না হয়। জনগণ যেনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন। তাঁরা বলছেন, ভূমিতে বাস্তবে সমগ্র প্যালেস্টাইনে কর্তৃত্ব করছে ইসরায়েল। প্যালেস্টাইন নামে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেও ইসরায়েলের হাতেই থাকবে সমস্ত ক্ষমতা। প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে ইসরায়লের উপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে। আর এর মধ্যেই - অনেকটা ঘেটোর মতো - বাস করতে হবে প্যালেস্টাইনীদের। অর্থাৎ, ইসরায়েল প্রকৃত প্রস্তাবে প্যালেস্টাইনীদেরকে একটি ‘সার্ভেন্ট কোয়ার্টার্স’-এ সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়, যেমনি-ভাবে জার্মানী-সহ ইউরোপের দেশে-দেশে ইহুদিদের রাখা হয়েছিলো।

    শুভবুদ্ধির প্যালেস্টাইনী - এমনকি ইহুদিরাও পর্যন্ত - চাইছেন এক-রাষ্ট্রিক সমাধান। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের অধীনের পরিচালিত একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ-মাটির সমস্ত মানুষের পূর্ণ মানবাধিকার নিয়ে বসবাস। কিন্তু এতে ঘোরতর আপত্তি জায়নবাদীদের। ঘোরতর আপত্তি ইসলামী মৌলবাদীদের। ঘোরতর আপত্তি স্ট্যাস্টাস্কোতে সুবিধাভোগী প্যালেস্টাইনী নেতৃত্বের।

    কারণ, দেশের সমস্ত মানুষের গণতান্ত্রিক ভৌটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচিত হলে নেতৃত্ব চলে আসতে পারে উচ্চ-জন্মহার-সম্পন্ন প্যালেস্টাইনের হাতে। এটি ইসরায়েলী বর্ণবাদীদের কাছে কখনও কাম্য নয়। ঠিক এই ভয়টি হিন্দুত্ববাদী বাঙালী নেতৃত্বেরও ছিলো অখণ্ড বাংলায় বাঙালী মুসলামান সম্পর্কে।

    জায়নবাদীরা ইসরায়লের বর্ণবাদী ‘হিহুদি চরিত্র’ ধরে রাখতে চান। কিন্তু যেহেতু আজকের যুগে গণতন্ত্রের কথা বলে বর্ণবাদী পৃথকীকরণ রক্ষা করা যায় না, তাই তাঁরা পিএলও’র দায়িত্বে প্যালেস্টাইনীদেরকে একটি খোঁয়াড়ের মধ্যে বন্দী করে রাখতে চান। এতে জায়নবাদীরা একদিকে নিজদের মধ্যে ‘সুসভ্য’ গণতন্ত্রের চর্চাও করতে পারবেন এবং ‘এ্যাপারথাইড’ বা বর্ণবাদী পৃথিকীকরণের সমালোচনা থেকেও রেহাই পাবেন। এই হচ্ছে তথাকথিত দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রকৃত চেহারা। আর এই কথাটাই সম্প্রতি লক্ষ্য করা গিয়েছে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্যালেস্টাইনী বুদ্ধিজীবীর লেখায়।

    প্যালেস্টাইনের অধিকার আন্দোলনকারিনী, এক্সেটার ইউনিভার্সিটির গবেষক-শিক্ষিকা ও লেখিকা ডঃ ঘাদা কারমি প্রায় দু’মাস আগে গার্ডিয়ানে লিখেছেনঃ ‘The PA should lead the campaign to prepare Palestinians for the abandonment of the two-state idea and the struggle for equal rights instead. Without a middleman to hide behind, the reality of Israel's occupation will be exposed, and the logic of a civil rights struggle will be inarguable. Israel has hitherto enjoyed a cost-free occupation, with a Palestinian leadership that does Israel's administrative and security work and a donor community that picks up the bill. At one stroke, Plan B shreds these fig leaves, and removes the chimera of a Palestinian state that has diverted attention from the reality on the ground.’

    অর্থাৎ, ‘পালেস্টাইনী কর্তৃপক্ষের উচিত হবে দুই-রাষ্ট্র ধারণা প্রত্যাখান করে সেই স্থলে সম-অধিকারের আন্দোলনের জন্য প্যালেস্টাইনীদেরকে জন্য প্রস্তুত করা। পেছনে লুকিয়ে রাখার মতো মধ্যব্যক্তি (প্যালেস্টাইনী কর্তৃপক্ষ) না থাকলে ইসরায়েলী দখলদারিত্বের প্রকৃত বাস্তবতা উন্মুক্ত হবে এবং সিভিল রাইটসের সংগ্রামের যুক্তি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আসবে। ইসরায়েল এ-পর্যন্ত মাগনা তালুক ভোগ করে আসছে, যেখানে প্যালেস্টাইনী নেতৃত্ব ইসরায়লীর পক্ষ হয়ে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাচ্ছে এবং দাতা সম্প্রদায় তার বিল মেটাচ্ছে। এক ঝটকায় প্ল্যান বি (এক-রাষ্ট্র সমাধান) মাছ-ঢাকা শাক সরিয়ে দিবে এবং উন্মোচিত করবে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের আজগুবি মুখয়াবব যা ভূমির বাস্তবতা থেকে (মানুষের) মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে রেখেছে।’

    নির্যাতিত প্যালেস্টাইনীদের পক্ষে যাঁরা ভাবেন, বলেন, লিখেন ও তৎপর রয়েছেন, তাঁদেরকে বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করে বুঝতে হবে। রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে আবেগে লাফিয়ে ওঠার আগে এর আগ-পাশ-তলা তলিয়ে দেখতে হবে।

    রোববার, ২ ডিসেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন