• প্যালেস্টাইনে দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানঃ প্রাচীন নগর-রাষ্ট্রের জায়নবাদী সংস্করণ
    মাসুদ রানা

    রাষ্ট্র কি সমাজের মতো বিকশিত সত্ত্বা নাকি আরোপিত প্রতিষ্ঠান, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েল-যে বাইরে থেকে আরোপিত রাষ্ট্র, এ-বিষয়টি তর্কাতীত।

    প্রতিক্রিয়াশীল ইহুদি জাতীয়াতাবাদ হচ্ছে জায়নবাদ। নির্বাক ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতির দোহাইয়ে জায়নবাদ চেয়েছে প্যালেস্টাইনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি একান্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও সময় নিয়ে এবং আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইহুদিদের পাঠানো হলো প্যালেস্টাইনে জমি কিনে বসতি স্থাপনের জন্য।

    যুগ-যুগ ধরে যে-ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে বাস করছিলো, তারা ছিলো প্যালেস্টাইনী সমাজেরই অংশ। জায়নবাদ সেখান থেকে আসেনি। ওরা বরং এর বিরোধী। জায়নবাদ এসেছে বাইরে থেকে। জায়নবাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই প্রধানতঃ ইউরোপীয় ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে ধীরে-ধীরে জায়গা কিনে ও সংখ্যা বাড়িয়ে এক পর্যায়ে জাতিসংঘের সীলমোহরে পশ্চিমা রাষ্ট্র সমূহের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত করলো তাদের স্বপ্নের ইহুদি রাষ্ট্র। জন্ম নিলো প্যালেস্টাইনের বুকে বর্ণ-রাষ্ট্র ইসরায়েল।

    বর্ণ-রাষ্ট্র ও জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য আছে। জাতি-রাষ্ট্র তার দেহের মধ্যে প্রবল জাতির সাথে দুর্বল জাতির ইন্টিগ্রেশন কিংবা এ্যাসিমিলেশনে বাধা দেয় না বরং উৎসাহিত করে। যেমন ব্রিটেইন, আমেরিকা, ফ্রান্স। এ-দেশগুলো বর্ণগতভাবে এ্যারিয়ান বা ককেশিয়েড হলেও এখানে সেমেটিক ও নিগ্রোয়েড রেইসের লোকেরা ইন্টিগ্রেইট বা এ্যাসিমিলেইট করতে পারছে। ফ্রান্সের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট সার্কোজি এবং যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলীয় নেতা ইহুদি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কালো।

    কিন্তু বর্ণ-রাষ্ট্র কোনোক্রমেই ইন্টিগ্রেশন বা এ্যাসিমিলেশনকে সমর্থন করে না। এ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসী জার্মানী ছিলো একটি বর্ণ-রাষ্ট্র। এ্যারিয়ান রেইসের শ্রেষ্ঠত্ব-সূচক পার্থক্য সংরক্ষণের চেষ্টায় জার্মান বর্ণ-রাষ্ট্র ইহুদিদেরকে শুধু ঘেটোতে আলাদা করে রাখেনি, লক্ষ-লক্ষ ইহুদিকে হত্যাও করা হয়েছে। তবে, এ-পৃথিকীকরণ প্রচেষ্টা পৃথিবীতে নতুন নয়। প্রাচীন নগর রাষ্ট্রেও আমরা এ-পৃথিকীকরণ লক্ষ্য করি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ জার্মান বর্ণ-রাষ্ট্রের ড্রাকুলা-কামড় খেয়ে ইহুদিরা এখন নিজেরাই নাৎসী জার্মানদের মতো বর্ণবাদী হয়ে উঠেছে। একইভাবে আজ ইহুদি-রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনীদের ঘেটোতে রাখছে, নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে এবং যখন-তখন বোমা ও গুলিবর্ষণে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা হত্যা করছে ।

    প্যালেস্টাইন সমস্যার আমরা যতো সংখ্যক রাষ্ট্রিক সমাধানই চিন্তা করি না কেনো, রাষ্ট্র বিষয়ে যে-কঠিন প্রশ্নটি উত্তর দিতে হবে, তা হচ্ছে রাষ্ট্র কি বর্ণবাদী হবে নাকি গণতান্ত্রিক হবে।

    জায়নবাদের সমস্যা হচ্ছে এটি একই সাথে বর্ণবাদী ও গণতান্ত্রিক হতে চায়, যা সংজ্ঞানুসারে অসম্ভব - এ্যাবসার্ড। আর এখানেই জায়নবাদের সঙ্কট। আর এ-সঙ্কট থেকেই ইসরায়েলকে উদ্ধারের জন্য আমদানী করা হয়েছে প্যালেস্টাইন সমস্যার দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধান।

    আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, আদিতে ইসরায়েল ছিলো বর্তমানের চেয়ে আকারে অনেক ছোটো। কিন্তু আরবদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিজয়ী হবার ফলে সে তার রাষ্ট্রীয় পরিধি বৃদ্ধি করেছে।

    পশ্চিমে ভূমধ্য সাগর ও পূর্বে জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত উর্বর ভূমির প্যালেস্টাইনে আরোপিত ইহুদি রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তৃতির রাজনৈতিক ও সামরিক কারণের পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কারণও আছে। খুব সংক্ষেপে, তার দুটো হচ্ছে  কৃষি ও সস্তা প্যালেস্টাইনী শ্রমশক্তি।

    অর্থাৎ, জায়নবাদ চাচ্ছে ইসরায়েল হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যা প্রাচীন নগর-রাষ্ট্রের মতো প্রাচীর ঘেরা, যেখানে শুধু অভিজাতেরা থাকবে এবং এর চারপাশে থাকবে বিশাল বিস্তৃত দাস-বসতি। সেখানে দাসেরা উৎপাদন করবে কৃষিজ দ্রব্য তা ভোগ করবে নগরবাসী। রাষ্ট্র চলবে অভিজাতদের গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে কিন্তু সেখানে প্রাচীরের বাইরের দাসেরা অংশ নিতে পারবে না।

    মধ্যপ্রাচ্যিক একেশ্বরবাদী ভূবনদৃষ্টি - ইহুদিধর্ম, খ্রীষ্টধর্ম ও ইসলামধর্ম - গড়ে উঠেছে প্রাচীন নগর-রাষ্ট্রের যুগে। সুতরাং ঐ ধর্মগুলোর কোনো একটিতে ঈশ্বরের দেয়া প্রতিশ্রুতিকে ভিত্তি করে যদি রাষ্ট্র গঠন করা হয়, তাহলে সে-রাষ্ট্রে যে প্রাচীন নগর-রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য থাকবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।

    আধুনিক যুগে ঈশ্বরের নির্দেশে রাষ্ট্র গড়া হচ্ছে মানবজাতির জন্য একটা মহা বিপত্তির বিষয়। আধুনিক রাষ্ট্র যা গড়ে উঠেছে ঈশ্বরের প্রশ্রয়প্রাপ্ত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে আরাধ্য করে, তার সাথে ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত ইহুদি রাষ্ট্রের সংঘাত লাগতে বাধ্য।

    ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল তার টেরিটোরীতে যদি আধুনিক রাষ্ট্রের মতো গণতন্ত্র চর্চা করতে চায়, তাহলে তাকে সর্বজনীন ভৌটাধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং অবাধ ভৌটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকারের হাত রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দিতে হবে। আর, তাই যদি হয়, তাহলে উচ্চ জন্মহার সম্পন্ন প্যালেস্টানীদের সংখ্যা ইসরায়েল রাষ্ট্রের মধ্যেই এমন সংখ্যায় উন্নীত হবে যে, নির্বাচনে পথে ইহুদি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চলে আসবে প্যালেস্টাইনীদের হাতে।

    এখন, গণতন্ত্র চর্চা করলে যদি ইহুদি রাষ্ট্রই না থাকে, তাহলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করার কী অর্থ থাকে? আর, গণতন্ত্র যদি না থাকে, তাহলে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি চলবে কোন পদ্ধতিতে? বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন ধারা থেকে এসে তথা কথিত ইসরায়েলী জাতি গঠন করা মানুষগুলোর মধ্যে কার আধিপত্য কে কী ভিত্তিতে মানবে? সুতরাং গণতন্ত্র ছাড়া কোনো ইসরায়লের উপায় নেই।

    এই যে, গণতন্ত্রের অত্যাবশ্যকতার প্রয়োজনানুভব, আবার গণতন্ত্রের ফলে রাষ্ট্রের বর্ণ-চরিত্র হারার ভীতি, এটি হচ্ছে জায়নবাদের উভয় সঙ্কট।

    জায়নবাদের কাছে এ-সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হচ্ছে ইসরায়েলের ভিতর যে আর জনসমষ্টি আছে, তাদেরকএ একটি ঘেটোতে স্থানান্তরিত করা। এ-ঘেটোর নাম হবে প্যালেস্টাইন। প্যালেস্টাইন ভূকৌশলিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে ইসরায়লের দ্বারা। এর বিশাল জনগোষ্ঠী হবে একসাথে সস্তা শ্রমশক্তি ও কাঁচামালের যোগানদার এবং ইসরায়েলী পণ্য ও সেবার একচ্ছত্র বাজার।

    ইসরায়েল হচ্ছে আধুনিক প্যলেস্টাইনের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন নগর-রাষ্ট্র যার সেন্টারে প্রভূ-নাগরিকদের আবাসের নাম হবে খোদ ইসরায়েল আর পেরিফেরীতে গঠিত হবে শ্রম-দাসদের বস্তি, যার নাম হবে প্যালেস্টাইন।

    গণ-বিচ্ছিন্ন ও জনমমতা-হীন প্যালেস্টাইনী নেতৃত্ব দৃশ্যতঃ আজ ক্লান্ত ও ভোগবাদে নিপতিত। তাঁরা স্থিতি চাচ্ছেন উচ্ছিষ্ট ভোগ করেই। তাই, দ্বি-রাষ্ট্রিক তত্ত্ব তাঁদের কাছে যথেষ্ট আবেদন রাখে। কিন্তু এ-দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান যে প্যালেস্টাইনীদেরকে ভৌগলিকভাবে বিভক্ত করবে, দূর্বল করবে এবং জাতিসত্ত্বাকে খণ্ডিত করবে, তার দিকে তাঁরা বস্তুতঃ ভ্রুক্ষেপহীন।

    একটি অগ্রসর জাতির ভূমির ও জনসংখ্যার বিভক্তি তাকে যে কতোটুকু পিছনে ফেলে দিতে পারে, তা আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর আগের বাঙালীর সাথে আজকের বাঙালীর তুলনা করলে সহজেই অনুমান করা যায়। আবার, বিভক্ত জাতি পুনরায় এক হলে যে কতোটুকু এগিয়ে যেতে পারে, তা বুঝা যায় ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের মধ্যে আজ ঐক্যবদ্ধ জার্মানীর অবস্থান দেখলে।

    সুতরাং প্যালেস্টাইনী জনগণকে আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা তথাকথিত দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের পথে নিজেদের বিভক্ত ও দূর্বল করবে, নাকি অখণ্ড প্যালেস্টাইনে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করবে। স্বদেশ দুঃশাসন কবলিত হলে এক সময় তাকে মুক্ত করা যায়, কিন্তু স্বদেশ দ্বিখণ্ডিত হলে তাকে সহজে এক করা যায় না।  

    রোববার, ১৩ নভেম্বর ২০১১
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অসাধারণ লেখা! ইজ্রাইল-ফিলিস্তীন নিয়ে আমার পড়া সেরা লেখা এটি। ফিলিস্তিন-ইজ্রাইল সমস্যা ও সমাধানের তাত্ত্বিক কাঠামো পরিষ্কার হলো আজ আমার কাছে।

মাসুদ রানাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এত চমৎকার বুদ্ধিবৃত্তিক একটি লেখা উপহার দেয়ার জন্য। এই বিষয়টি নিয়ে আরও লিখবেন এই আশা করি। কারণ বাংলায় এই নিয়ে ভালো কোন লেখা পাওয়া যায় না।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন