• প্রসঙ্গঃ পুলিস-প্রাইভেটাইজেশন
    মাসুদ রানা

    রাষ্ট্রকে নাগরিকেরা যতোটুকু না কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান, তার চেয়ে বেশি দেখতে চান নিরাপত্তাদায়ক হিসেবে। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে নাগরিকদের নিরাপত্তার বিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। এই নিরাপত্তা দ্বিবিধ - অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। অর্থাৎ, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার পরিধির ভেতর থেকে ও বাইরে থেকে আসা যে-কোনো অবৈধ জবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিককে রক্ষা করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

    রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অর্থ হচ্ছে নাগরিকদের উপর রাষ্ট্র ছাড়া আর কারও জবরদস্তির বৈধতা অস্বীকার করা। কারণ, রাষ্ট্রই হচ্ছে জবরদস্তি করার এক ও একমাত্র বৈধ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এই অধিকার প্রয়োগ করে তার পুলিস বাহিনীর মাধ্যমে। তাই পুলিস হচ্ছে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

    উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমাদের ব্রিটিশ রাষ্ট্রটির পরিচালনায় থাকা কনসার্ভেটিভ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলসের পুলিসী ব্যবস্থাকে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেবার। গতকাল পত্রিকান্তরে খবর বেরিয়েছে, ওয়েস্ট মিডল্যাণ্ডস ও সারের পুলিস ফৌর্স সারা দেশের পুলিসের তরফে দরপত্র আহবান করেছে প্রাইভেইট কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে।

    কী ধরনের কোম্পানী এগুলো? এদের বলা হচ্ছে নিরাপত্তা কোম্পানী, যেগুলো ব্যাপক হারে বিকশিত হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্বের সুবাদে। যুদ্ধের মধ্যে অস্ত্র বিক্রি, দখলীকৃত তেলক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ থেকে বাণিজ্যিক আয়ের পাশাপশি নতুন ধরনের বাণিজ্য হিসেবে বিকশিত হয়েছে নিরাপত্তা ক্ষেত্র। বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার আয় করছে নিরাপত্তা কোম্পানীগুলো দখল করা দেশগুলো থেকে।

    বিদেশে রক্তাক্ত আর্থিক-মুনাফার স্বাদ পেয়ে এবার তারা স্বদেশকে গিলে খেতে চাইছে। বিবিসি বলেছে, আগামী ৭ বছরে পুলিসী কাজের যে-ঠিকাদারি পাবে কোম্পানীগুলো, তার পরিমাণ প্রাথমিকভাবে ১.৫ বিলিয়ন পাউণ্ড হিসেব করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ৩.৫ বিলিয়ন পাউণ্ডে উন্নীত হবে।

    কেনো এই সিদ্ধান্ত? পুলিস কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার পুলিস বাজেটের উপর ৪ বছর মেয়াদী ২০% কৃচ্ছতা আরোপ করেছে। ফলে, পুলিস নিজস্ব কাঠামোতে স্বল্প অর্থে তার প্রথাগত কাজ নির্বাহ করতে পারছে না। তাই, তার কিছু-কিছু কাজ ছেড়ে দিতে হবে প্রাইভেট কোম্পানীর হাতে।

    কী-কী কাজ? এ-বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বর্তমানে যে-সকল পুলিসী কাজ প্রাইভেট কোম্পানীগুলো করছে, পরবর্তীতে সে-সকল কাজের প্রকার ও পরিধি যে তার চেয়ে বেশি হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তা না হলে তো আর ‘খবর’ও হতো না কিংবা রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনাও হতো না।

    পুলিসী কাজ প্রাইভেট কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দেবার ক্ষেত্রে নীতিগত আপত্তি নেই লেবার পার্টিরও। তবে তার সীমা লঙ্ঘনে তার আপত্তি। কিন্তু কী সেই সীমা? কীসের দ্বারা সেই সীমা নির্ধারিত, তার কোনো খতিয়ান নেই লেবার দলে।

    বর্তমানে এ-ধরনের নিরাপত্তা কোম্পানীগুলো জনস্থানে নজরদারি, ভিডিওগিরি এবং কারাগার থেকে আদালতে কয়েদী পরিবহনের কাজও করে থাকে। বড়ো-বড়ো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পুলিসী নিরাপত্তার কাজ করছে অনেক প্রাইভেট কোম্পানী। সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করার ক্ষমতা আছে তাদের।

    পত্রিকাগুলোতে আলোচনা হচ্ছে প্রাইভেট কোম্পানীগুলো সম্ভবতঃ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার বিধান, গণস্থানে টহলদান, অপরাধ অনুসন্ধান ও গ্রেফতার করার ক্ষমতা অর্জন করবে। যদিও সরকার বলছে, ‘বাজে কথা’।

    অতীতে আমরা দেখেছি, কীভাবে পাবলিক ট্র্যান্সপৌর্ট, টেলি-কমিউনিকেশন, এনার্জী, হাউজিং, হাইয়ার এডুকেশন এবং হেলথ সেক্টরকে ছদ্মাবরণে প্রাইভেট কোম্পানীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সবত্র একই চিত্র। আর্থিক সঙ্কট ও অদক্ষতার দোহাই তোলা হয় প্রথম, তারপর আসে আর্থিক সাশ্রয়ের ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। ফলাফল দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানায় হস্তান্তর এবং কয়েক বছর পর জনগণের উপর একচ্ছত্র শোষণ।

    জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে ব্যক্তিগত মুনাফার সাথে মেলাবেন সরকারের নীতি নির্ধারকগণ? রাজনীতিকগণ এক অদ্ভূত নীরবতা পালন করছেন। রাজনীতির প্রথম পাঠও তাঁরা ভুলে গেছেন যেনো!

    পুলিস ফেডারেশনের ভাইস-চেয়ারম্যান সাইমন রীড বলেছেন, পুলিসী ব্যবস্থায় প্রাইভেট কোম্পানীগুলো অগ্রাধিকার দেবে তাদের মুনাফাকে, জনগণকে নয়। তিনি রাজনীতিক না হয়েও সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের ভুললে চলবে না যে, কোম্পানীগুলোর জবাবদিহিতা থাকবে তাদের শেয়ারহৌল্ডারদের প্রতি - আমরা যে জনগণের সেবা করি, তাদের প্রতি নয়।

    কিন্তু রাজনীতিকেরা এটি বুঝতে যাচ্ছেন না। বুদ্ধিজীবীরা নির্বিকার। রাষ্ট্র তার লেজিটিমেইট এনফৌর্সমেন্টের ক্ষমতা কি মুনাফা প্রত্যাশী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠনের কাছে ছেড়ে দিতে পারে? কী বলবেন লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ্যাণ্ড পলিটিক্যাল সাইয়িন্সের পণ্ডিতেরা?

    ইউরোপে দেখছি, কীভাবে সুপার স্টেইট তৈরীর নামে বাস্তবে ব্যাঙ্ক ও অর্থপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রাচীন সভ্যতার দেশ গ্রীস ও ইতালীর মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের গলা চিপে ধরেছে। তারা নির্বাচিত সরকার প্রধানদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করে তাদের প্রাক্তন কর্মচারীদেরকে দিয়ে রাষ্ট্র চালাচ্ছে।

    এভাবে যদি রাষ্ট্রের কাজ প্রাইভেট কোম্পানীগুলোর থালার খাবার হয়ে ওঠে, তাহলে তো ভবিষ্যতে রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রথাগত সংজ্ঞার বাইরে নিছক প্রাইভেট কোম্পানীগুলোর ম্যানেইজমেন্টের অধীনের বৃহৎ প্রোজেক্ট ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না! আর তাই যদি হয়, তাহলে এমনও একদিন আসতে পারে, যখন পৃথিবীর মোড়ল রাষ্ট্রগুলো ছোটো রাষ্ট্রগুলোর ‘সুচারু’ পরিচালনার জন্য বড়ো-বড়ো প্রাইভেইট কোম্পানীর হাতে দিয়ে দেবে।

    ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-সহ দক্ষিণ এশীয় অনেক দেশেই কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। এ-কথা প্রকাশ করেছে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমাণ্ডের নৌসেনাপতি এ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড।

    বাংলাদেশে প্রায়সঃ অদ্ভুত ও নজিরবিহীন গ্রেফতারের সংবাদ নানা-মাধ্যমে শোনা যাচ্ছিলো, কিন্তু কারা এগুলো করছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিলো না। আপাতঃ ব্যাখ্যাহীন এসব গ্রেফতার ও গুম হবার ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য সদ্য মার্কিন কংগ্রেসে দেয়া এ্যাডমিরাল উইলার্ডের তথ্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। 

    অগ্রগামী-পশ্চাৎপদ নির্বিশেষে দেশে-দেশে আজ বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেশ ও জাতিকে অতিক্রম করে, জাতি-রাষ্ট্রকে অদক্ষ প্রমাণিত করে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। তাই আজ সময় এসেছে নাগরিকদের রাষ্টের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাববার। অন্যথায় সারা পৃথিবীর মানুষ বৈশ্বিক উপনিবেশের বিশাল এক যাঁতাকলে দীর্ঘকাল ধরে পিষ্ট হবে।

    আমাদের মনে রাখতে হবে, কোম্পানীর হাতে দেশ শাসিত হবার ঘটনা পৃথিবীতে নতুন নয়। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী নামে লণ্ডন ভিত্তিক একটি প্রাইভেট কোম্পানী বাংলা নামের একটি দেশকে দখল করে একশতাব্দী শাসন করেছিলো। আর এই একশো বছরে ‘বেঙ্গল প্লাণ্ডারিং’ বা ‘বাংলা লুন্ঠন’ বলে কুখ্যাত প্রক্রিয়ায় ‘সোনার বাংলা’ বলে খ্যাত দেশটিকে কয়েক শতাব্দীর দারিদ্রে ঠেলে দিয়ে তারা গড়ে তুলেছিলো তিলোত্তমা লণ্ডন নগরী।

    ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে-বাংলায় ইংল্যাণ্ডবাসীরা যেতো তাঁদের ইংরেজ-ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে দুই শতাব্দী আগে, আজ বাঙালী নামে সেই বাংলার মানুষ আসে ইংল্যাণ্ডে তাঁদের বাঙালী-ভাগ্য পরিবর্তন করতে।

    কিন্তু আজ কোম্পানীগুলো হচ্ছে বহুজাতিক, আর পৃথিবীর সকল দেশই তাদের নতুন উপনিবেশ। তাই পৃথিবীর সকল মানুষের মুক্তির পথ আজ মিলেছে এক পথে। বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্ব-মানবতার সংগ্রামের সে-পথ মুক্তিকামীদের খুঁজে নিতে হবে।

    রোববার, ৪ মার্চ ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

'নতুন নয়' বলেই উল্লেখ করা হয়েছে লেখার শেষের দিকে (২০নং অনুচ্ছেদে)। নয় কি?

প্রাইভেট কম্পানি দিয়া দেশ চালানোর এক্সপেরিমেন্ট যে হয় নাই তা তো না। মূলত রয়েল ডাচ শেল তেল কম্পানি নাইজেরিয়া চালায়। ব্রিটিশ পেট্রোলিমায় একই কায়দায় ইরান নামক একটা দেশ চালাতো ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন