• প্রেসিডেণ্টের প্রয়াণঃ অপ্রস্তুত বাংলাদেশ
    মাসুদ রানা

    এক মাসের মধ্যে দুই গোলার্ধের দুই জাতির দুই প্রেসিডেণ্টের মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী আচার অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করলাম। মার্চের ৫ তারিখে প্রয়াত হলেন ভেনেসুয়েলার প্রেসিডেণ্ট উগো চেভেৎস। পক্ষকাল পর, গত ২০শে মার্চ তাঁকে অনুসরণ করলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেণ্ট জিল্লুর রহমান।

    দেশ দু’টির প্রথমটি রাষ্ট্রপতিক এবং দ্বিতীয়টি সাংসদিক পদ্ধতিতে শাসিত হবার কারণে, প্রেসিডেণ্টের মৃত্যুর অভিঘাত সে-দেশ দু’টিতে ভিন্ন-ভিন্ন হতে বাধ্য। শাসনতান্ত্রিক ভিন্নতা জনিত ভূমিকাগত পার্থক্য ছাড়াও রয়েছে প্রেসিডেণ্ট দু’জনের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস, অবদান ও ভাবমূর্তির পার্থক্য। এটি বোধগম্য।

    কিন্তু উল্লিখিত পার্থক্য ছাড়াও, পার্থক্য লক্ষ্য করা গিয়েছে প্রয়াত প্রেসিডেণ্টদ্বয়ের শবযাত্রার আয়োজনে। স্পষ্টতঃ এ-পার্থক্যের সাথে মৃতের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এ-পার্থক্য বরং সংশ্লিষ্ট জাতি দু’টির সাংস্কৃতিক পার্থক্য, তথা আপেক্ষিক অগ্রসরতা ও পশ্চাৎপদতার সাথে সম্পর্কিত।

    সংবাদ-মাধ্যমে লক্ষ্য করলাম ১০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পর গত ১৫ মার্চ শুক্রবারে চেভেৎসের চূড়ান্ত শবযাত্রা। লক্ষ-লক্ষ মানুষ সুশৃঙ্খলার সাথে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে শোক করছেন, আর রাজপথে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য্যের সাথে ধীরগতিতে প্রেসিডেণ্টের শব বয়ে নিয়ে চলেছে একটি ‘হার্স’ - অর্থাৎ, শববাহী কালো রংয়ের গাড়ী বা শবযান।

    ধীরে চলা ও কৃষ্ণবর্ণের শবযানটির কোথাও কোনো উৎকট সজ্জা নেই। প্রেসিডেণ্টের গাড়ীর ছাদ জুড়ে অবঙ্কিম-স্থাপিত রয়েছে পূর্ণ আকারের একটি জাতীয় পতাকা। এবং স্বাভাবিক সময়ের নিয়মানুসারেই সামনের দু’টি ষ্ট্যাণ্ডে উড়ছে ছোটো দু’টি জাতীয় পতাকা।

    প্রেসিডেণ্টের শবযানের দু’পাশে হেঁটে চলছেন কালো পোশাক পরিহিত ছ’জন দেহরক্ষী। সাথে রয়েছেন সুসজ্জিত চার অশ্বারোহী সৈনিক। রাজপথের দু’পাশ থেকে অশ্রুসজল শ্রদ্ধাবনত জনতা পুষ্প বর্ষণ করছেন তাঁদের প্রয়াত প্রেসিডেণ্টের প্রতি শেষ সম্মান জানিয়ে।

    ভেনেসুয়েলা কেমন দেশ? এটি তথাকথিত প্রথম বিশ্বের দেশ নয়। অনুন্নত লাতিন আমেরিকার একটি দেশ মাত্র, যার জনগণের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, তাঁদের প্রেসিডেণ্টকে বিশ্বমানের সম্মান দিয়ে সমাহিত করেছেন ভেনেসুয়েলাবাসী। সেখানে অপ্রস্তুতির এতোটুকু চিহ্নও পরিলক্ষিত হয়নি।

    বিপরীত দিকে দেখলাম, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পর গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ বঙ্গভবনের দিকে তাঁর শবযাত্রার দৃশ্য। জীবিত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের প্রেসিডেণ্ট কী ধরনের গাড়ী চড়তেন, তা লক্ষ্য করিনি কখনও; তবে ধারণা করি, বিশ্বমানের গাড়ীতেই চলাচল করতেন তিনি। কিন্তু, মৃত প্রেসিডেণ্টকে বহন করার যানটি-যে বিশ্বমানের ছিলো না, তা ছবিতে স্পষ্ট।

    ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারীতে, সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের যে-ঘাতক ট্রাকটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের উপর চালিত হয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম ও দেলোয়ারের জীবন থামিয়ে দিয়েছিলো, সে-রকম একটি সেনাবাহী ট্রাকের দেহে মানবিক সজ্জা দিয়ে বহন করা হয়েছে মৃত প্রেসিডেণ্ট জিল্লুর রহমানকে। কিন্তু সেই সজ্জাটাও ছিলো নিম্ন-মানের।

    লক্ষ্য করলাম, ট্রাকের তারপোলিনের ছাউনিটিকে ঢেকে দেয়া হয়েছে সম-মাপের জাতীয় পতাকা দিয়ে। এর ফলে পতাকার আকৃতি যে বিকৃত হয়েছে, তাতে সম্ভবতঃ ভ্রুক্ষেপ করেননি কেউ। উপরন্তু, হলুদ, কমলা, সবুজ, সাদা ও লাল রংয়ের ফুল-পাতার মালা ও ডালা দিয়ে ট্রাকটির ‘বডি’ সাজানো হয়েছে। কিন্তু মৃতের পরিচয়ের সাথে এ-পুষ্প-পত্রের রংয়ের তাৎপর্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তাও সম্ভবতঃ কেউ ভাবেননি।

    স্পষ্টতঃ বাংলাদেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের শবযানটি প্রেসিডেন্টের জন্য উপযুক্ত ছিলো না। বস্তুতঃ ওটি কোনো ‘হার্স’ বা শবযানই নয়। ষোলো কোটি মানুষের একটি জাতীয় রাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্টকে জীবিতাবস্থায় বহন করার জন্য উপযুক্ত যান থেকে থাকলেও, মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বহন করার মতো যান বাংলাদেশে দৃশ্যতঃ নেই।

    বাঙালীরা সম্ভবতঃ ক্ষমতাবানদের মৃত্যুর কথা ভাবতে অভ্যস্ত নয়। সম্ভবতঃ ক্ষমতাবানেরাও ক্ষমতায় অবস্থান-কালে নিজের পক্ষে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যতো পরিকল্পনা করতে পারেন, তার সামান্যাংশও করেন না ক্ষমতার বাইরে নিজেকে কল্পনা করে। তাই, জীবিতকালে প্রেসিডেণ্টের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যে-বন্দোবস্ত লক্ষ্য করা যায়, মৃত্যুকালে তা উধাও হয়ে যায়।

    অতীতে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিক শাসন ব্যবস্থায়, দুর্দণ্ড প্রতাপের দুই প্রেসিডেণ্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও, প্রেসিডেণ্টের মৃত্যুর আশঙ্কাকে কেউ আমলে নেননি।

    বাংলাদেশের প্রথম একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে সপরিবারের হত্যায়িত হবার পর, তাঁর অনুগত একজনকেও পাওয়া যায়নি তাঁকে সমাহিত করার জন্য। কথিত আছে, কাপড় কাচার ‘৫৭০’ সাবান দিয়ে তাঁকে শেষ স্নান করিয়ে, অত্যন্ত সাদামাটাভাবে সমাহিত করা হয়। তিনি প্রেসিডেন্টের প্রাপ্য মর্যাদা নিয়ে সমাহিত হতে পারেননি। 

    প্রথম একনায়কের খুনের ‘বেনিফিশিয়ারী’ বা সুবিধাভোগী দ্বিতীয় একনায়ক জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করা হয় ১৯৮১ সালে। তাঁকে সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হলেও বস্তুতঃ তাঁর মরদেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো কি-না, সে বিষয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

    বাংলাদেশের তৃতীয় একনায়ক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নব্বইয়ের গণ-অভ্যূত্থান পতিত না হলে, তিনিও হয়তো এতোদিনে স্বর্গারোহণ করতেন। সে-দিক থেকে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ভাগ্যবান ও বুদ্ধিমান যে, তিনি নির্বাহী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সশরীরে নামতে পেরেছিলেন।

    রূপতঃ নির্বাহী রাষ্ট্রপতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশে প্রেসিডেণ্টের আসনটি মর্ত্যের চেয়ে স্বর্গের নিকটবর্তী। অর্থাৎ, প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রপতি একবার কেউ হলে, তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না।

    প্রেসিডেণ্টের পদটি নির্বাহী হোক, কিংবা আলঙ্কারিকই হোক, জিল্লুর রহমান হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রথম স্বাভাবিক মৃত্যুপ্রাপ্ত প্রেসিডেণ্ট। সম্ভবতঃ সে-কারণে প্রেসিডেণ্টের স্বাভাবিক মৃত্যুতে কীভাবে সাড়া দিতে হয়, তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি।

    মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসি-চাওয়া শাহবাগ আন্দোলনের মৃত্যুক্ষুধার চিৎকারের মধ্যে প্রেসিডেণ্টের স্বাভাবিক মৃত্যু যেনো সবাইকে অপ্রস্তুতিতে ফেলে দিয়েছে। যেনো ক্ষুধার্ত ও কান্নারত শিশুর মুখে হঠাৎ পড়া দুধের ফোঁটার মতো থামিয়ে দিয়েছে সমস্ত কোলাহল।

    ভারসাম্যহীন বিরোধী দল বিএনপি রাষ্ট্রের সমান্তরাল তিন দিনের দলীয় শোক ঘোষণা করে একটি মানবিক ভাবমূর্তি অর্জনের চেষ্টা করেছে। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছেন। যেনো মেঘ না চাইতেই জল! অর্থাৎ, সবকিছুতেই যেনো একটা অপ্রস্তুতি।

    কিন্তু সবচেয়ে বড়ো অপ্রস্তুতি হচ্ছে, পরবর্তী প্রেসিডেণ্ট কে হবেন, তার উত্তরের ঘাটতি। জিল্লুর রহমানের মৃত্যু কি কাকতালীয়ভাবে বিরোধীদলের দাবিকৃত ‘নিরপেক্ষ তত্ত্ববধায়ক সরকার’-এর কাছাকাছি কিছু একটা পাবার স্থান তৈরী করে দিলো?

    ভারতীয় প্রেসিডেণ্ট প্রণব মুখার্জী বাংলাদেশে সফরে এসে, খালেদা জিয়ার দেখা না পেয়ে বিমুখ হয়ে যাবার পরদিন থেকেই, সুরঞ্জিত সেনের বারংবার উচ্চারিত আপোষ আলোচনার কথা নির্দেশ করে, আওয়ামী লীগ একটা আপোস চাচ্ছে। দৃশ্যতঃ ভারত তৃতীয় কোনো শক্তির উত্থান চাচ্ছে না বাংলাদেশে - অন্ততঃ বিশ্বরাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে।

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেঃ বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর দণ্ডিত ও বিচারাধীন নেতাদের ফাঁসি দাবি করে শাহবাগ-আন্দোলন যে-আপোসহীন অবস্থান তৈরী করে রেখেছে, তার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, আওয়ামী লীগ কী শর্তে বিএনপির সাথে আপোস করবে? আর বিএনপিই বা কীভাবে জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে আপোসে রাজি হবে?

    যে-কোনো আপোসে দু’পক্ষকে যে ছাড় দিতে হয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের প্রতি প্রথম ছাড়টি ‘জামায়াত-নেতাদের মৃত্যুদণ্ড নয়’ ছাড়া আর কী হতে পারে? আর, মহাজোটকে যদি তাই মেনে নিয়ে আপোস করতে হয়, তাহলে শাহবাগ-আন্দোলনের প্রতিশ্রুতির কী হবে?

    শাহবাগ আন্দোলনের যেহেতু কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই, কিংবা সমাজের নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট কোনো শ্রেণী বা গোষ্ঠীতে এটি ভিত্তিষ্ঠিত নয়, তাই আওয়ামী লীগের কাছে এর তেমন আবেদন থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগের কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি আবেদন ও প্রয়োজন রয়েছে কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক ইসলামবাদী শক্তির। ভৌটের হিসেব বিবেচনায় রেখে আওয়ামী লীগ তাদেরকেই জয় করতে চাইবে।

    তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীলদের জন্য আওয়ামী লীগের দুর্ভাবনার কারণ নেই। কারণ, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় আওয়ামী লীগ জানে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি ভীতিবিক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে পারলে ঐ শক্তিগুলোর জন্য আওয়ামী লীগের ‘অক্সিলারী’ বা সহযোগী হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

    বস্তুতঃ জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুতিতে পতিত হয়েছে শাহবাগ-আন্দোলন। কারণ, মৃত্যুকামী যে-আবেগের উপর ভিত্তি করে এ-আন্দোলন গতিবেগ পেয়েছিলো, গত একমাসাধিক কালের বহু মৃত্যু ও ধ্বংসের সোপান বেয়ে, শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক হলেও, প্রেসিডেণ্ট জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর ফলে বাঙালীর সে-আবেগ দমিত হয়েছে।

    সম্ভবতঃ বাংলাদেশের নিও লিবারেল শক্তির উত্থান প্রচেষ্টার একটি এপিসৌড শেষ হয়েছে। পর্যবেক্ষক হিসেবে এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী এপিসৌডের জন্য।

    রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন