• ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানঃ কুযুক্তির উপাখ্যান
    মাসুদ রানা

    শিরোনামে উল্লেখিত দুই বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে জ্ঞাত আছি দীর্ঘকাল, যদিও তাঁদের বুদ্ধিবচন সাক্ষাতে শ্রবণের সৌভাগ্য অর্জিত হয়নি কোনোদিন আমার। সম্প্রতি লণ্ডন থেকে আরিফ রহমান এবং ঢাকা থেকে পিনাকী ভট্টাচার্যের বদান্যতায় ইণ্টারনেটে ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানের চলচ্চিত্রিক মুখদর্শন ও বাণী শ্রবণে সক্ষম হলাম।

    আমার মতো অকিঞ্চিৎকর বঙ্গভাষী-অনাবাসী লেখকের পক্ষে বঙ্গদেশের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানের ব্যাপারে কথা বলা – বিশেষতঃ সমালোচনা করা - অনেকের কাছে ধৃষ্টতা মনে হতে পারে। কিন্তু এই দুই বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মান নিরিখে আমি কিছু না লিখে পারছি না। তবে, আমার লেখায় আলোকপাতের বিষয় তাঁদের চিন্তা ও চিন্তাপদ্ধতি - ব্যক্তি ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান নন। আমার বিশ্বাস, লেখক হিসেবে তা নেবার মতো দার্শনিক সহনশীলতা তাঁদের উভয়েরই আছে।

    শুরুতে আমার লেখার উদ্দেশ্য আমি পরিষ্কার করে নিতে চাই, যাতে পাঠক এই অনুচ্ছেদেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আমার এ-লেখা পড়বেন কি-না। আমার লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানের ডিসকৌর্সে বা কথাবার্তায় ভ্রান্তি ও অসংহতি চিহ্নিত করে প্রমাণ করা যে, তাঁরা বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিশাল অবয়বের প্রতিদ্বন্দ্বী বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রত্যক্ষিত হলেও, তাঁদের বিচার-পদ্ধতি প্রায়-অভিন্ন ও অনুন্নত।

    উপরে বর্ণিত আমার উদ্দেশ্য জেনে যাঁরা মনে অস্বস্তি, বিরক্তি কিংবা ভীতি বোধ করছেন, তাঁদেরকে এই অনুচ্ছেদেই থামতে বলবো। প্রত্যেক মানুষেরই সম্ভবতঃ একটি বোধিক আশ্রম প্রয়োজন। যাঁরা খান-মজহারের বোধিক আশ্রমে নিশ্চেন্তে আরামে তৃপ্তি সহকারে আছেন ও পরিবর্তন অপ্রয়োজনীয় ভাবছেন, তাঁরা ভালো থাকুন। বিদায়!

    যাঁরা এখনও পড়ছেন, তাঁদের পড়ার কারণ আছে এবং তাঁদেরকে পড়তেই হবে। আপনাদেরকে বলছিঃ দয়া করে নিজের বুদ্ধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং আমার কথাগুলো যুক্তির কঠিনতম কষ্ঠিপাথরে ঘষে ইচ্ছে হলে রাখুন কিংবা ছুঁড়ে ফেলে দিন। কিন্তু দয়া করে আপনাদেরকে বোকা ভাবার সুযোগ কাউকে দেবেন না।

    বাঙালী জাতির ক্ষমতাবান ও ধনবান লোকেরা নিজেদেরকে অযথাই রূপতঃ তেজষ্ক্রিয় ও ভয়ঙ্কর করে তোলেন। নিজেদের সম্পর্কে জনসাধারণের মনে একটি ভীতি-মিশ্রিত সম্ভ্রম-শ্রদ্ধা-ভক্তি সৃষ্টির জন্য দৃশ্যতঃ প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। সেটি বোধগম্য। কিন্তু জ্ঞানবান লোকেদের মধ্যেও যখন একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তখন জাতির উচ্চ-সংস্কৃতিতে নিদারুন দারিদ্রই উন্মোচিত হয়। দুঃখজনকভাবে ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান সেই সংস্কৃতিরই প্রতিনিধিত্ব করে নিজেদের আলোচনায় আবির্ভূত হয়েছেন। আমি একে-একে দু’জনের ওপরেই আলোকপাত করবো।

    ফরহাদ মজহারের বুদ্ধিবৃত্তির নমুনা

    গত ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশের একুশে টিভির একটি কথা-অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসেছিলেন রাজনীতিক আ-স-ম আব্দুর রব ও ফিরোজ রশীদ এবং বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ হয়ে থাকবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। উপস্থাপক ছিলেন এক ভদ্রলোক, যাঁর নাম মনির হায়দার।

    অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহারকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে উপস্থাপক জানালেন যে, তাঁর অতিথি একজন রাষ্ট্রচিন্তক, যিনি নিজেকে ‘চিন্তক’ বলেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিজেকে এভাবে উপস্থাপনের ঘটনাটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, অনুরোধটি এসেছে স্বয়ং ফরহাদ মজহারের কাছ থেকেই। বাঙালী বিশিষ্টজনদের আত্মপ্রচারের উদগ্র আকাঙ্খা দেখে আমি প্রায়শঃ বিমর্ষ হই। পাশ্চাত্যের জ্ঞানীজনদের ‘ডাউন-টু-আর্থ’ চলন-বলনের তুলনায় বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের ‘চির উন্নত মম শির’ ভাবটি যে কী মাত্রার সাংস্কৃতিক দারিদ্রের লক্ষণ, তাঁরাই বুঝবেন, যাঁরা প্রাসঙ্গিক রূপক অর্থে শুধু পুকুর-ডোবা নয় সাগর-মহাসাগরও দেখেছেন।

    সে-যাক, ইণ্টারনেট থেকে আমি রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহারের আলোচনার প্রাসঙ্গিক যে-অংশটি শুনতে পেরেছি, তার মধ্যে দু’টো শব্দ বুঝতে পারিনি বলে প্রথানুসারে বন্ধনীর মধ্যে ‘অস্পষ্ট’ লিখে নীচে তার পূর্ণ পাণ্ডুলিপি তুলে ধরছিঃ

    “বাংলাদেশের এখনকার যে গণমাধ্যমগুলো, তারা নিরপেক্ষ তো নয়ই, একই সঙ্গে তারা গণবিরোধী, গণতন্ত্র-বিরোধী। এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যদি কাউকে দায়ী কত্তে হয়, মানে আমি আপনাদের (অস্পষ্ট) বলবো, আমি তাদেরকে দায়ী করি। তাহলে বাংলাদেশে সন্ত্রাস শুরু করেছে গণমাধ্যম এটি পরিষ্কার বুঝতে হবে আমাদের। ফিরোজ ভাইর কথা থেকে ধরে নিয়ে আমি কথাটা বলবো এটি আমাদের প্রত্যেককে উপলব্ধি কত্তে হবে। আশা করি গণমাধ্যমের লোকগুলো শুনছে। আমি বাংলাদেশের অনেকগুলো গণমাধ্যমকে পরিষ্কার টেলিফোনে বলেছি, আপনারা সন্ত্রাসী, আপনার এদেশে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তো আমি তো মনে করি পটকা ফোটানো তো খুবই কমই হয়েছে, (অস্পষ্ট) তো আরও বেশি হওয়া উচিত ছিলো।”

    উপরের কথাগুলো বিশ্লেষণে ফরহাদ মজহার যে ক্লেইম বা দাবী হাজির করেছেন, তার পক্ষে তিনি কী আর্গ্যুমেণ্ট বা যুক্তি ও এভিডেন্স বা প্রমাণ দিয়েছেন, তা ভ্যালিড বা বৈধ কি-না, তা পরীক্ষা করবো।

    (১) “বাংলাদেশের এখনকার যে গণমাধ্যমগুলো, তারা নিরপেক্ষ তো নয়ই, একই সঙ্গে তারা গণবিরোধী, গণতন্ত্র-বিরোধী।”

    উপরের বাক্যটি একটি গম্ভীর ক্লেইম। এটি একটি দেশের একটি সময়ের গণমাধ্যমকে একটি নির্দিষ্ট প্রকরণে চিহ্নিত করছে। ফরহাদ মজহারকে হয়তো ঠিকই ক্লেইম করেছেন। কিন্তু তিনি যেহেতু পয়গম্বর নন বরং রাষ্ট্রচিন্তক, তাই তাঁকে আর্গ্যুমেণ্ট দিতে হবে অন্ততঃ দু’টি।

    তাঁকে বলতে হবে প্রথমতঃ কী-কী করলে একটি গণমাধ্যম গণবিরোধী ও গণতন্ত্র-বিরোধী হয় এবং দ্বিতীয়তঃ ‘এখনকার’ সময়কে বৈধভাবে চিহ্নিত করার জন্য ‘তখনকার’ সময় নির্দেশ করে বলতে হবে যে, কখন গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে এ-বৈশিষ্ট্যগুলো ছিলো না। দৃশ্যতঃ ফরহাদ মজহার এই আর্গ্যুমেণ্ট বা যুক্তি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি।

    (২) “এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যদি কাউকে দায়ী কত্তে হয়, মানে আমি আপনাদের (অস্পষ্ট) বলবো, আমি তাদেরকে দায়ী করি।”

    পাঠক, বাক্যটি লক্ষ্য করুন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যেখানে প্রধান দু’টি বা তিনটি রাজনৈতিক দল দায়ী বলে দেশের ও সারা বিশ্বের কোটি-কোটি মানুষের কাছে স্পষ্ট প্রতীয়মান, সেখানে রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলছেন, যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তাহলে দায়ী করতে হবে গণমাধ্যমকে। স্পষ্টতঃ এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী কথা।

    আমরা জানি, অনেকই বিশিষ্ট হওয়ার জন্য ব্যতিক্রমধর্মী কথা বলেন। কিন্তু একজন বুদ্ধিজীবী যখন সাধারণ মানুষের সচরাচর চিন্তার বাইরে ব্যতিক্রমধর্মী কথা বলেন, তখন তিনি আর্গ্যুমেণ্ট বা যুক্তি দিয়ে তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তার সত্যতা বুঝিয়ে দিয়ে জনগণকে নতুন জ্ঞানে সমৃদ্ধ করেন। যেমন, গ্যালিলিও যখন তাঁর সময়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ও চিন্তার ব্যতিক্রমধর্মী হয়ে দাবী করলেন যে, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য নয়, বরং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘোরে, তখন তিনি শুধু ক্লেইমই করনেনি, তিনি কিছু ইন্দ্রেয়গ্রাহ্য ও পরীক্ষাযোগ্য যুক্তি দিয়েছিলেন।

    আমরা লক্ষ্য করছি, ফরহাদ মজহার একটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করার মতো পেলেন দেশটির গণমাধ্যমকে। তিনি এমন বলেননি যে, গণমাধ্যমও দায়ী (যাতে অন্য এক বা একাধিক কারণ থাকার সম্ভবনাটি স্বীকার করা হতো); তিনি বলছেন, দায়ী করতে হলে তাদেরকেই দায়ী করতে হবে। ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়ে প্রমাণ না করলে, এ-দাবী যুক্তিহীন ও অগ্রহণীয়।

    সুতরাং, এ-কথা এখানে নিরাপদে বলা যায়, রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার তাঁর দাবীর মধ্যে বুদ্ধি ও যুক্তির ধার ধারেননি, তিনি বস্তুতঃ তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। পাঠক সে-সিদ্ধান্ত মানবেন কি-না, তা নির্ভর করে তাঁর বোধ-বুদ্ধির ওপর।

    (৩) “তাহলে বাংলাদেশে সন্ত্রাস শুরু করেছে গণমাধ্যম এটি পরিষ্কার বুঝতে হবে আমাদের।”

    তৃতীয় বাক্যে ফরহাদ মজহার তাঁর শ্রোতাদের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন না করে - অর্থাৎ তাঁদেরকে কিছুই ব্যাখ্যা না করে - নির্দেশ করছেন তাঁর দাবীটি সবাইকে ‘পরিষ্কার বুঝতে হবে’। কী বুঝতে হবে? আগে যা বলা হয়েছে সেটি নয় - তার চেয়েও অধিক। সেটি কী? সেটি হচ্ছে আরেকটি নতুন ক্লেইম বা দাবীঃ ‘সন্ত্রাস শুরু করেছে গণমাধ্যম’। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বাক্যে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করার পর তৃতীয় বাক্যে এসে তিনি দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে দাবী করছেন যে, সন্ত্রাসের সূচনাকারী হচ্ছে গণমাধ্যম।

    লক্ষ্য করুন, তিনি তৃতীয় বাক্যের নতুন ক্লেইমকে দ্বিতীয়বাক্যের আর্গুমেণ্ট হিসেবে হাজির করেছেন। এখানেই তিনি ক্লেইম ও আর্গ্যুমেণ্টের মধ্যে কনফিউশন বা আলো-আঁধারি সৃষ্টি করে একটি মিথ বা কুহেলিকা তৈরী করেছেন।

    এটি ফরহাদ মজহারে একটি স্টাইল, যেটি চতুর হলেও, সৎ নয়। তাঁকে নিয়ে আমি অতীতের একটি লেখায়ও দেখিয়েছিলাম তিনি কীভাবে তাঁর অডিয়েন্সের সাথে চাতুরী করে নিজের মনগড়া বিষয়কে সত্য বলে বুঝাতে চান।

    (৪) “ফিরোজ ভাইর কথা থেকে ধরে নিয়ে আমি কথাটা বলবো এটি আমাদের প্রত্যেককে উপলব্ধি কত্তে হবে।”

    চতুর্থ বাক্যটি তিনি ব্যবহার করেছেন এভিডেন্স বা প্রমাণ হিসেবে। অর্থাৎ, তিনি তাঁর ‘ফিরোজ ভাই’র কথাকে এভিডেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর আর্গ্যুমেণ্টের ছদ্মবেশে নতুন দাবীর পক্ষে। আর, একই সাথে তিনি তাঁর দাবীর পক্ষে জনবল তৈরির জন্য ‘ফিরোজ ভাই’কে জ্ঞানের উৎস হিসেবে নির্দেশ করে ভদ্রলোকটিকে সম্ভবতঃ নিজের দলে ভেড়াবার চেষ্টা করলেন।

    সম্ভবতঃ একজন বুদ্ধিজীবী যখন একজন রাজনীতিকের কথাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার উৎস হিসেবে নির্দেশ করেন, তখন রাজনীতিকটি সমর্থন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুদ্ধিজীবীটিকে সুরক্ষায় প্রতিভাত হয়ে ওঠে। ফরহাদ মজহার স্পষ্টতঃ এটিই করলেন, যা পঞ্চম ও ষষ্ঠ বাক্যে মূর্ত হয়ে উঠলো।

    (৫) “আশা করি গণমাধ্যমের লোকগুলো শুনছে।”

    উপরের বাক্যে ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমের লোকদেরকে প্রচ্ছন্নভাবে আহবান করছেন তাঁর অথোরিটি বা কর্তৃত্ব উপলব্ধি করার জন্য। এটি আপাতঃ একটি নিরীহ ক্লেইম, যেখানে তাঁর কথা গণমাধ্যমের লোকেরা শুনছেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে গণমাধ্যমের লোকদের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর শ্রোতৃমণ্ডলী ও দর্শকমণ্ডলীর শ্রুতি ও দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তাঁর জাজমেণ্ট ও চূড়ান্ত ক্লেইম শোনাবার জন্য।

    ফরহাদ মজহার আগের বাক্যে যে-শক্তি সঞ্চয় করেছেন, এখানে তার পূর্ণ অথোরিটি নিয়ে ‘লোকগুলো শুনছে’ বলে নিজের তুলনায় তাঁদের একটা আপেক্ষিক নিম্ন মর্যাদা নির্দেশ করে দিয়েছেন। এবার তাঁদের শোনার পালা। তো কী শোনালেন তিনি?

    (৬) “আমি বাংলাদেশের অনেকগুলো গণমাধ্যমকে পরিষ্কার টেলিফোনে বলেছি, আপনারা সন্ত্রাসী, আপনার এদেশে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।”

    ষষ্ঠ বাক্যে ফরহাদ মজহার তাঁর অথরোটির প্রমাণ দিচ্ছেন। আগের বাক্যগুলোতে তিনি যা প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে মনে করেছেন, তার পুনঃউচ্চারণ ও চূড়ান্ত প্রস্তাবনা উচ্চারণের আগে নিজের কর্তৃত্ব প্রদর্শন করেছেন। এখানে তিনি যেনো আর বুদ্ধিজীবী থাকেননি। তিনি যেনো একই সাথে নির্বাহী ও বিচারের ক্ষমতা নিয়ে গণমাধ্যমের লোকদেরকে তাঁর কথা শোনাচ্ছেন এবং রায় দিচ্ছেন যে তাঁরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

    এখানে কোনো আর্গ্যুমেণ্ট বা যুক্তি নেই। এমনকি ক্লেইম বা দাবীও নেই। এখানে তাঁর ক্লেইমটি তাঁর অথোরিটীর সাথে যুক্ত হয়ে জাজমেণ্টে হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ, ইতোমধ্যে তিনি ‘ফিরোজ ভাই’র কাছ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে বলীয়ান হয়ে উঠেছেন। পাঠক ভিডিও লিংকে গিয়ে এ-সময়ে তাঁর শারীরিক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করবেন। ডিসকৌর্স এ্যানালাইসিসের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

    (৭) তো আমি তো মনে করি পটকা ফোটানো তো খুবই কমই হয়েছে, (অস্পষ্ট) তো আরও বেশি হওয়া উচিত ছিলো।”

    উপরের সপ্তম ও শেষ বাক্যটি হচ্ছে ফরহাদ মজহারের সমস্ত ডিসকৌর্সের মূল প্রপোজিশন বা প্রস্তাবনা, যা এক্সিকিউশন বা কার্যকর করার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের বাক্যে তিনি তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে যে রায় ঘোষণা শুরু করেছেন, এই বাক্যে সেটি তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে। তিনি শাস্তি নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করলেন, গণমাধ্যমগুলোর উপর ছোটোখাটো বোমা বা পটকা নয়, আরও বেশি আঘাত হানা উচিত। সেই ঔচিত্যের মধ্যে যে-কোনো মাত্রার আঘাত আসতে পারে।

    রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার আর বুদ্ধিজীবী থাকেননি। তিনি হয়তো তখনও রাষ্ট্রচিন্তক। হয়তো তিনি ম্যাকিয়াভ্যালির মতো রাষ্ট্রচিন্তক কিংবা মুসোলিনির ও হিটলারের মতো, যাঁদের মূল কথা হচ্ছে বোধ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে নয়, বরং ছলে-বলে-কৌশলে, প্রয়োজন হলে ভীতি-সঞ্চার করে মানুষকে কাঙ্খিত আচরণে বাধ্য করা।

    ফরহাদ মজহার সম্পর্কে আমি আগেও একটা লেখা লিখেছি এবং সেখানে প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁর সমর্থিত হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটির ১৩ দফা দাবীর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিলাম যে, ঐ ১৩ দফার অধিকাংশ দাবীই চরিত্রের দিক দিয়ে ফ্যাসিষ্ট। আজ আমার উপলব্ধি হচ্ছে, ফরহাদ মজহারের হেফাজত সমর্থন করার বিষয়টি তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার পরিপূরক।

    ফরহাদ মজহার রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে আছেন বলে রাষ্ট্রকে ফ্যাসিষ্ট বলে গাল দিচ্ছেন, কিন্তু তিনি সেই ফ্যাসিষ্ট চিন্তারই ধারক ও সমর্থক। তিনি বা তাঁর সমর্থিত সংগঠন ক্ষমতা পেলে যে কী চরিত্রের রাষ্ট্র কায়েম করবেন, তা বুঝার জন্য ‘দেখি না ব্যাটা কী করে’ বলে অপেক্ষা করার কোনো ফুরসত নেই। আমি মনে করি, ফরহাদ মজহার সম্পর্কে কুহেলিকার এখানেই অবসান হওয়া উচিত।

    সলিমুল্লাহ খানের বুদ্ধিবৃত্তির নমুনা

    একুশে টিভির কথা-অনুষ্ঠানে বলা ফরহাদ মজহারের কথাগুলোকে ‘ফ্যাসিষ্ট’ বলে নির্দেশ করেছেন সলিমুল্লাহ খান। তিনি তাঁরা সে-কর্মটিকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেও চিহ্নিত করেছেন একাত্তর টিভির একটা কথা-অনুষ্ঠানে। এতে মনে হতে পারে, ফরহাদ মজহারের এ্যাণ্টি-থিসিস হচ্ছেন সলিমুল্লাহ খান। বাস্তবে তা নাও হতে পারে।

    তাঁরা এক সময় একই চিন্তার লোক ছিলেন। তাঁরা উভয়ই রাষ্ট্রচিন্তক। সলিমুল্লাহ খান একসময় ফরহাদ মজহারকে “মহাত্মা” বলতেন। ফরহাদ মজহারের যে-বয়সে সলিমুল্লাহ খান তাঁর মধ্যে “মহাত্মা” দেখেছিলেন, তা মাত্র কয়েক বছরে দুরাত্মায় পরিণত হবার নয়।

    বাস্তবে যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তা হচ্ছে ফরহাদ মজহারের সাথে সলিমুল্লাহ খানের ফল-আউট বা খাতির-খারাপ, বর্তমানে তা ভীষণ দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যেই সলিমুল্লাহ খান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ক্যাম্পের মুখ্য বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠতে পারেন।

    ফরহাদ মজহার সম্পর্কে একাত্তর টেলিভিশনের কথা অনুষ্ঠানে জিজ্ঞেসিত হয়ে বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপক সলিমুল্লহ খান কিছু কথা বলেছেন। আমি সেগুলোরও ট্র্যান্সক্রিপ্ট পেয়েছি, যা নীচে উল্লেখ করে বিশ্লেষণ করতে প্রবৃত্ত হলাম।

    “কাজেই পটকা ছুঁড়ে মারা বা এর মানে হচ্ছে উদাত্তভাবে হত্যার আহবান জানানো। কারণ, পটকা ফোটালে তো লোক মারা যাচ্ছে। এই যে উদাত্ত হত্যার আহবান জানানো, হচ্ছে প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘনের অর্থাৎ বিদ্রোহের আহবান জানানো। এটি আমি মনে করি রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে।”

    “আমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলতে বলছি, রাষ্ট্র বলতে শুধু সরকার বুঝায় না। আ... যখন প্রজাতন্ত্রের সমস্ত সম্পত্তির মালিক জনগণ, আমরা যখন বলি, যেমন আমাদের সংবিধানের ১৪৩ ধারার আছে আমার মাটির নীচে যদি কোনো খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়, সেটির মালিক  হবে রাষ্ট্র, মানে প্রজাতন্ত্র। সেই অর্থে আমি বলেছি এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।”

    এবারও আগের মতোই সলিমুল্লাহ খানের বাক্যগুলো এক-এক করে বিশ্লেষণ করে তাঁর প্রস্তাবনা, যুক্তি, প্রমাণ ও দাবী বুঝার চেষ্টা করবো।

    (১) “কাজেই পটকা ছুঁড়ে মারা বা এর মানে হচ্ছে উদাত্তভাবে হত্যার আহবান জানানো।”

    পাঠক এখানে লক্ষ্য করুন এবং পরেও লক্ষ্য করবেন, বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খানের বাক্য গঠন দূর্বল। উপরের বাক্যটির বস্তুতঃ কোনো অর্থই হয় না। কিন্তু কনটেক্সট বা পটভূমি থেকে ধরে নিতে পারি, তিনি বলতে চাইলেন, পটকা ছুঁড়ে মারা হচ্ছে উদাত্তভাবে হত্যার আহবান জানানো। ‘পটকা ছুঁড়ে মারা’ একটি কাজ, যেটি এই বাক্যের সাবজেক্ট বা কর্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই কর্মটিকে এ্যাটেম্পট টু মার্ডার বলা যেতে পারে, কিন্তু উদাত্তভাবে হত্যার আহবান বলা যায় কীভাবে?

    যেহেতু তিনি ফরহাদ মজহার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে উত্তর দিচ্ছেন, তাই ধরে নেওয়া যায় তিনি পটকা ছুঁড়ে মারাকে লক্ষ্য করে বলেননি বাকী কথাগুলো, তিনি বলেছে পটকা মারা সমর্থন করাকে। আমার এই মনে করা ঠিক হলেও প্রশ্ন থেকে যায়ঃ কীভাবে গণমাধ্যমে পটকা ছুঁড়ে মারার মানে হচ্ছে হত্যার আহবান জানানো?

    সলিমুল্লাহ খান আইন শাস্ত্রের লোক হয়ে কীভাবে একটি আচরণকে অন্য আচরণের মানে হিসেবে ধরে নেন? এর তো বৈধ বিধান থাকতে হবে, তা না হলে তো আমরা যেকোনো কিছুকে যে-কোনো কিছুর মানে বা অর্থ হিসেবে ধরে নিতে পারি। যাক, তিনি একটি বিধান দিয়েছেন দ্বিতীয় বাক্যে।

    (২) “কারণ, পটকা ফোটালে তো লোক মারা যাচ্ছে।”

    দ্বিতীয় বাক্যে তিনি তাঁর ক্লেইমের পক্ষে আর্গ্যুমেণ্ট দিচ্ছেন। স্পষ্টতঃ ‘কারণ’ শব্দ যোগ করে তিনি বলেছেন পটকা ‘ফোটালে লোক মারা যায়’। যুক্তিটি সলিমুল্লাহ খানের কাছে শক্তিশালী মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের যুক্তিতে এবং আইনের যুক্তিতেও এটি টিকে না।

    কারণ, পটকা ফোটালে মানুষ ‘মারা যায়’ বলা অযৌক্তিক। বলা যেতে পারে, ‘মানুষ মারা যেতে পারে’। বস্তুতঃ যে-ঘটনা নিয়ে কথা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু মানুষ মারা যায়নি, যদিও মারা যেতে পারতো।

    একটি ঘটনা ঘটেনি, ঘটতো বলেও নিশ্চিত বলা যায় না, তারপরও সেটি ঘটবেই ধরে নিয়ে যুক্তি করা একটি কুযুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।

    (৩) “এই যে উদাত্ত হত্যার আহবান জানানো, হচ্ছে প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘনের অর্থাৎ বিদ্রোহের আহবান জানানো।”

    পাঠক লক্ষ্য করুন। সলিমুল্লাহ খান ‘উদাত্ত হত্যা’ বলতে কোনো বিশেষ প্রকারের হত্যা বুঝিয়েছেন কি-না, তা বুঝা যায়নি। কিন্তু আমাদের জন্য যেটি বুঝা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় বাক্যের যে ফিবল আর্গ্যুমেণ্ট বা খোঁড়া যুক্তি করা হয়েছে, তাকে এভিডেন্স ধরে তিনি তৃতীয় বাক্যে ক্লেইম করছেন যে, ‘উদাত্ত হত্যার আহবান’ জানানো হচ্ছে ‘প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘনের আহবান জানানো’। এ-বাক্যে অভ্যন্তরীণ সংহতি আছে। হত্যার আহবান জানানোর অর্থ আইন লঙ্ঘন করার আহবান জানানো, তা ঠিকই আছে।

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ফরহাদ মজহার কি ‘উদাত্ত হত্যার’ আহবান জানিয়েছেন? আমরা ফরহাদ মজহারের বুদ্ধিবৃত্তির নমুনা অংশে দেখেছি যে, তিনি বলেছেন পটকা-মারা কম হয়েছে। তিনি মনে করেন, আরও বেশি মারা উচিত। এ-কথাকে ‘উদাত্ত হত্যার’ জন্য আহবান জানানো বলে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক? তাতে কি সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়?

    সলিমুল্লাহ খান এখানেই থেমে থাকেননি, তিনি বাক্যে ‘উদাত্ত হত্যার’ আহবানকে প্রথমে ‘প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘনের আহবান’ এবং পরক্ষণেই ‘বিদ্রোহের আহবান’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং চতুর্থ বাক্য তিনি রায় দিয়ে চূড়ান্ত ক্লেইম তৈরি করেছেন।

    (৪) “এটি আমি মনে করি রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে।”

    সলিমুল্লাহ খান উপরের বাক্যে যে-ক্লেইম বা দাবীটি করেছেন, তার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে অত্যন্ত সৃষ্টিশীল, কল্পনাপ্রবণ এবং অযৌক্তিক ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তাঁর এ-কল্পনাপ্রবণতা কাব্য প্রতিভার মধ্যে পড়লে পড়তেও পারে, কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান-ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে পড়ে না। এ-রকম যুক্তিকরণকে যুক্তি-করা না বলে গোঁয়ার্তুমি কিংবা কুযুক্তি বলা শ্রেয়।

    একজন বুদ্ধিজীবী কিংবা রাষ্ট্রচিন্তক যখন গোঁয়ার্তুমি করেন, তখন তিনি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা রহিত হয়ে সাধারণ যুক্তিবাদী মানুষের পর্যায় থেকেও অনেক নীচে নেমে যান। পাঠক, নীচেই তার প্রমাণ পাবেন।

    (৫) আমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলতে বলছি, রাষ্ট্র বলতে শুধু সরকার বুঝায় না আ... যখন প্রজাতন্ত্রের সমস্ত সম্পত্তির মালিক জনগণ, আমরা যখন বলি, যেমন আমাদের সংবিধানের ১৪৩ ধারার আছে আমার মাটির নীচে যদি কোনো খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়, সেটির মালিক  হবে রাষ্ট্র, মানে প্রজাতন্ত্র। সেই অর্থে আমি বলেছি এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

    উপরের দীর্ঘ বাক্যটি সলিমুল্লাহ খান অতিরিক্ত ব্যাখ্যা হিসেবে যোগ করেছেন। পাঠক লক্ষ্য করুন তাঁর যুক্তি। তিনি পণ্ডিত হিসেবে অনেকটা জাকির নায়েকের কুরানিক শ্লোক উল্লেখ করার মতো করে বৈধতা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪৩ ধারা উল্লেখ করেছেন। কী লেখা আছে ওতে?

    আমাদের অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেছেন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে-ভৌগলিক সীমানা আছে, তার মাটির নীচে যদি কোনো খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়, তাহলে তার মালিক হবে রাষ্ট্র, যার সাংবিধানিক নাম প্রজাতন্ত্র।

    সংবিধানের এই ধারা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। যেটি ক্লেইমটি নানাভাবে বুঝার চেষ্টা করেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারিনি, তা হচ্ছেঃ বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মালিক রাষ্ট্র, তাই গণমাধ্যমে ফরহাদ মজহারের পটকা মারা সমর্থন করা হচ্ছে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। আশ্চর্য্য! বিচিত্র এ-দেশ, বিচিত্র এ-দেশের বুদ্ধিজীবী, সেল্যুকাস!

    আমি সত্যি মুক হয়ে গিয়েছি। একজন বুদ্ধিজীবীর এ-হচ্ছে যুক্তি! শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো ঠিক ঠাহর করতে পারিনি। আমি তাঁর এ-কথাটা বার-বার শুনেছি। পাঠক চাইলে লিংক টিপে নিজেরাও শুনতে পারেন বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের বুদ্ধিবৃত্তিক কথা!

    পাঠক ভাবতে পারেন, এটি কীভাবে সম্ভব হলো? কীভাবে সলিমুল্লাহ খানের মতো এমন বিশাল সংখ্যক ভক্তপরিবেষ্টিত, উচ্চশিক্ষিত, ডক্টরেইট ডিগ্রীধারী, অধ্যাপক এভাবে কথা বলতে পারে? নিশ্চয় এর উত্তর আছে। কিন্তু আপাততঃ ধরে নিতে পারি এটি হচ্ছে বাঙালী জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকরণের স্যাম্পল বা নমুনা।

    ফরহাদ মজহার যেভাবে কু-যুক্তিতে, চাতুরী করে, গায়ের জোরে, কর্তৃত্ব দেখিয়ে গণমাধ্যম বাংলাদেশে সন্ত্রাস শুরু করেছে বলে ক্লেইম করেছেন, সেই মহাত্মারই প্রাক্তন ভক্ত এতোক্ষণে বালেগ হয়ে একই কু-যুক্তি, চাতুরী ও গোঁয়ার্তুমিতে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে ছেড়েছেন। স্পষ্টতঃ ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান সমবোধের, রূপতঃ একই গোয়ালের গরু।

    আমার উদ্বেগের কারণ এই যে, ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খানের মতো বুদ্ধিজীবীরা বঙ্গদেশে চিন্তার জগতে প্রবল প্রভাবক হিসেবে তৎপর। ভক্তরা তাঁদের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝেন না, তা হয়তো নয়। হয়তো তাঁরা ভাবেন, “তবুও তো মন্দের ভালো, এর চেয়ে ভালো কোথায় পাবো?”

    এটিও যুক্তি বটে। তৃষ্ণার্ত মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জল না পেয়ে বদ্ধ ডোবার নোংরা জলও পান করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেঃ এতে কী শেষ পর্যন্ত দেহ রক্ষা হয়? সবাই সুস্বাস্থ্যে থাকুন!

    শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

‘ধানমণ্ডি সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়’, ‘খাঁটি গরুর দুধ’, কিংবা ‘বিরাট গরু-ছাগলের হাট’ -- এরকম নাউন-ফ্রেজ নিয়ে কিছু জনপ্রিয় বিতর্কের বিভ্রমে পড়ে দেশে অনেক কাণ্ড ঘটেছে। অনেক স্কুলের সাইনবোর্ড ও অন্যান্য কাগজপত্র এখন পরিবর্তন হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ছাড়াই। এগুলোতে সমস্যা কোথায়?

‘ধানমণ্ডি সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়’-এর সমস্যা হচ্ছে এখানে ‘উচ্চ বালক’ হয়ে গেছে! আসলে তো বিদ্যালয়টা ‘উচ্চ’, বালক নয়! সুতরাং হয়ে গেল ‘ধানমণ্ডি সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়’! একইভাবে পণ্যের গায়ে, বিজ্ঞাপনে, পোষ্টারে দেখা গেল ‘গরুর খাঁটি দুধ’, ‘গরু-ছাগলের বিরাট হাট’! সবাই খুশী, না রাজার পাখি লেখাপড়া শিখছে!

কোনো এক নিন্দুক বলে উঠলো, ‘সরকারী বালক’ যে হয়ে গেল! এই সেরেছে! ‘সরকারী বালক!’ সে আবার কেমন করে হলো? ওদিকে এখন তাকিও না। লেখাপড়া চলছে!

যে জন্য এ প্রসঙ্গের অবতারণা। খণ্ডবাক্য, বাক্য, অনুচ্ছেদ বা রচনার অর্থ আসলে কিভাবে পাঠকের কাছে শ্রোতার কাছে পৌঁছায় বা বোধোগম্য হয়? এটা কি এরকম যে প্রথমে ‘ধানমণ্ডি’ এটা বুঝতে চাইলাম, বুঝলাম -- এটি একটি জায়গা; তারপর এল ‘সরকারী’, হয়ে গেল ‘ধানমণ্ডি সরকারী’ -- এটা আবার কেমন হলো -- ‘ধানমণ্ডি সরকারী’? তারপর এলো ‘উচ্চ’, হয়ে গেল ‘ধানমণ্ডি সরকারী উচ্চ’ -- এ আবার কি কিম্ভূত ব্যাপার?

কোনো ভাষায়ই ঠিক এভাবে অর্থের রাজ্যে প্রবেশ করা যায় না। একইভাবে যদি একটা অনুচ্ছেদকে ভেঙে বাক্যে-বাক্যে বিচ্ছিন্ন করে অর্থ বুঝে নিতে চাই, সেখানেও এ ধরনের অনুপপত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকবে। আপনার ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান বিশ্লেষণ অনেকটা এরকম বলে মনে হলো। (রাখাল রাহা, ৬ই জানুয়ারী ২০১৪)

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন