• ফেইস দ্য ভৌটার্সঃ নজির স্থাপন করুন
    মাসুদ রানা

    সাধারণভাবে, বাঙালী সংগঠনগুলোর মধ্যে নির্বাচন এলে ভৌট প্রাপ্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেনো ব্যক্তিগত লড়াইয়ের রূপ পরিগ্রহ করে। নির্বাচনে জয়-পরাজয়কে একটা মান-সম্মান থাকা-না-থাকার বিষয় হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয়, প্রধান পদগুলোতে প্রার্থীদের প্রার্থীতার বাইরে পরিচয়ের আরও যতো বৃত্ত আছে, তার সবগুলো এর দ্বারা সংক্রমিত হয়। শুরু হয় ভীষণ লড়াই।

    লড়াইয়ে জেতার জন্য হানা হয় আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ। আসে অপপ্রচার, কুৎসা, চরিত্র হনন, এমনকি মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত কোনো-কোনো ক্ষেত্রে। আর এই ডামাডোলে হারিয়ে যায় নির্বাচনের মূল বিষয়। অনেক সময় সদস্যগণ তথা ভৌটাররা না চাইতেও জড়িয়ে পড়েন ঘূর্ণিপাকে। এ-পরিস্থিতিতে যুক্তির চেয়ে আবেগ চলে আসে প্রাধান্যে। সদস্যরা তখন তাঁদের সাংগঠনিক স্বার্থের চেয়েও বড়াও করে দেখেন ‘মান-সম্মান’-এর বিষয়টি।

    লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন হচ্ছে আগামী শনিবার - জুনের শেষ দিন - ৩০ তারিখ। ব্রিটেইনে বাঙালী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হচ্ছে এই লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব। কারণ, ব্রিটেইনের বাঙালী-সাধারণের কাছে পৌঁছানোর জন্য অপরাপর সংগঠন ও ব্যক্তিকে এই সংগঠনটির শরণাপন্ন হতে হয় নানা উপলক্ষ্যে। বর্তমানের এই তথ্য-যুগে সংবাদ-মাধ্যমের গুরুত্ব ও ক্ষমতার বিবেচনায় সাংবাদিকদের এই সংগঠনটি ক্ষমতাশালী না হয়ে পারে না।

    এহেন একটি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের দ্বিবার্ষিক তারিখটি ঘোষিত হলে, শুধু মিডিয়া হাউসগুলোতে নয়, অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে যায়। এমনকি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও ঔৎসুক্য লক্ষ্য করা যায়। কে কোন্‌ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, কে কেমন, কে নির্বাচিত হবেন, ইত্যাদির খোঁজ-খবর শুরু হয়ে যায়।

    আবার, এই ঔৎসুক্যের কারণে এর মধ্যে প্রায়শঃ আরোপিত হয় ভিত্তিহীন আদর্শীকরণ ও রাজনীতিকরণ। বাংলাদেশের সবকিছুতেই যেভাবে একটি রাজনৈতিক দ্বি-মেরুকরণ হয়, লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছায়াপাত ঘটে। তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নেতৃস্থানীয়দের যে-আপেক্ষিক নিরপেক্ষতার প্রয়োজন হয়, তাতে বাংলাদেশী প্রকারের দ্বি-মেরুকরণ এতোটা সফল হতে পারে না।

    তবুও চেষ্টা চলে। সবকিছুতে কর্তৃত্ব করার এবং প্রত্যেককে অনুগত বা ‘লাইনে’ রাখার একটা সর্বগ্রাসী প্রবণতা রাজনীতিকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাই লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি এলে রাজনীতিকেরা ময়দানে নেমে পড়েন।

    রাজনীতিক ছাড়াও প্রভাবশালী কিছু লোক থাকেন কমিউনিটিতে। তাঁদের কাছেও লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন একটি লক্ষ্য করার মতো ঘটনা। কারণ প্রভাব ও প্রতিপত্তি অটুট কিংবা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য, তাঁরাও চান বাংলা প্রেস ক্লাবে তাঁদের ‘নিজেদের লোক’ আসুক।

    সর্বোপরি আছে মিডিয়া হাউসগুলোর নিজস্ব প্রভাব অক্ষুন্ন রাখার বা নতুন করে অর্জন করার প্রতিযোগিতা। সেটি, যাই হোক, সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা, যা একেবারে অবাঞ্ছিত নয়। মোট কথা, লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন এলে বাঙালী কমিউনিটিতে বিষয়টি কিছুদিনের জন্য ‘টক অফ দ্য টাউন’ হয়ে ওঠে।

    শুরুতে ব্রিটেইনের বাঙালী কমিউনিটি-সংগঠনগুলোর মধ্যে নির্বাচনের যে-সংস্কৃতির উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রভাব লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে পড়তে বাধ্য। তবে, বাংলা প্রেস ক্লাবে কখনও এ-ঘটনা ঘটেছিলো, কিংবা ঘটার উপক্রম হয়েছিলো, কিংবা এখন ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে , কিংবা ভবিষ্যতে দেখা দেবে - এর কোনোটাই এখানে বলা হচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে, সমাজ-পরিবেশের অংশ হিসেবে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব সম্পূর্ণরূপে বিপদমুক্ত নয়।

    সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ হিসেবে সাংবাদিকদের-যে একটা ভূমিকার কথা তাঁরা নিজেরা ও অন্যরা ভাবেন ও বলেন, তার সূত্র ধরে সু-নির্বাচনের নজির স্থাপন করার দায়িত্ব রয়েছে সাংবাদিকদের। সু-নির্বাচনের প্রথম কথা হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে একে অন্যের অযোগ্যতা প্রচার করার চেয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ হাজির করা। লক্ষ্যণীয়, এখানে যোগ্যতা দাবির কথা না বলে প্রমাণ হাজির করার কথা বলা হয়েছে।

    এই প্রমাণ হাজির করা যায় দুই পর্যায়ে। প্রথমতঃ বিকাশের পথ নির্দেশ করে উন্নত সাংগঠনিক ও পেশাগত পরিকল্পনা হাজির করে এবং দ্বিতীয়তঃ সমৃদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি প্রণয়ন করে। কিন্তু এর কোনোটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মনোনিবেশ করতে পারবেন না, যদি না সাধারণ সদস্য বা ভৌটারদের মধ্য থেকে এর চাহিদা সৃষ্টি এবং চাহিদা থেকে দাবির সৃষ্টি না হয়।

    প্রার্থীরা বছর-বছর যে-আবেগের ডালা নিয়ে এসে ভৌটারদের মন জয় করার প্রয়াস পান, তা বিনাপ্রশ্নে বরণ না করে ঐ ডালাকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে পারলে বিকাশের চাকায় ঘূর্ণন শুরু হবে। প্রার্থীরা যখন ভৌটারদের কথা শুনতে অভ্যস্ত হবেন, তখনই তাঁদের মধ্যে প্রকৃত বোধের সৃষ্টি হবে। এই বোধ-সৃষ্টি কোনো ব্যক্তি-সদস্যের একার দায়িত্ব নয় - বরং সকল সদস্যের সম্মিলিত দায়িত্ব। তাই, নেতৃত্বের প্রার্থীদেরেকে ভৌটারদের সম্মিলনে প্রশ্নের সম্মুখীন করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত আবেগ ও আনুগত্য দেখিয়ে ভৌট লাভ নয়, বরং নেতৃত্বের প্রকৃত গুণাবলী দেখিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি হাজির করার মধ্য দিয়ে, ভৌটারদের প্রশ্নের মেধাবী উত্তর দিয়ে জয় করে নিতে হবে মনন ও বোধ।

    লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছাই প্রধান বলে আমি বিশ্বাস করি। তাঁরা ব্রিটেইন-সহ সারা বিশ্বের খবর কম-বেশি রাখেন বলে তাঁদের মধ্যে ভালো চর্চার প্রতি একটা আগ্রহ আছে। তাই, প্রেস ক্লাবের এবারের নির্বাচনকে সমানে রেখে একটি বিতর্ক ও প্রশ্ন-উত্তরের অধিবেশনের প্রস্তাব করার সাথে-সাথে পরস্পর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরিষদের নেতৃবৃন্দ সানন্দে সম্মত হন।

    নির্বাচনের দুদিন আগে, আগামী ২৮ জুন বৃহস্পতিবার ব্রিটেইনের প্রথম অনলাই বাংলা দৈনিক ‘ইউকেবেঙ্গলি.কম’-এর  উদ্যোগে ‘ফেইস দ্য ভৌটার্স’ শীর্ষক একটি বিতর্ক অধিবেশনে যোগ দিবেন লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের আসন্ন নির্বাচনের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরিষদের প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী নবাব উদ্দিন (সম্পাদক, জনমত) ও রেজা চৌধুরী (এমডি, চ্যানেল আই) এবং সাধারণ সম্পাদক পদ প্রার্থী এমদাদ চৌধুরী (সম্পাদক, পত্রিকা) ও তারেক চৌধুরী (সম্পাদক, বাংলা পৌস্ট)। বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি সমগ্র বিতর্ক অধিবেশনটি সরাসরি সম্প্রচার করবে উদার ভাবে।

    আমরা আশা করতে পারি, লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের এবারকার নির্বাচনে ভৌটারগণ তাঁদেরকেই নেতৃত্বের জন্য নির্বাচিত করবেন, যাঁরা তাঁদের সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মসূচি, চৌকস ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে ভৌটারদের মনন ও মেধায় নাড়া দিতে পারবেন। আর, ক্লাবের সদস্যগণ সম্মিলিতভাবে ব্রিটেইনে বাঙালী সংগঠনগুলোর জন্য অনুসরণীয় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

    রোববার, ২৪ জুন ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

ঠিক করে দিয়েছি। ২৮ জুন বৃহস্পতিবার। ধন্যবাদ স্বপনদা'

রাণা ভাই,
তারিখটা ২৭শে জুন বৃহস্পতিবার হবে ২৭শে মে নয়।
লক্ষ্য করেননি হয়তো।

একটি খুবই ভালো উদ্যোগ ।শুভেচ্ছা রইলো।
ইউকেবি কে ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন