• বক্তৃতার নৌটঃ এ্যাণ্ডার্সনের তত্ত্বের আলোকে ইত্তেফাকের ভূমিকা
    মাসুদ রানা

    [গত সোমবার পূর্ব-লণ্ডনের মণ্টেফিউরি সেণ্টারে অনুষ্ঠিত ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমি কী বলেছিলাম, তার হুবহু পুনরুৎপাদন সম্ভব হতো, যদি আমার কাছে তা রেকর্ড করা থাকতো। কিন্তু আমার কাছে তা নেই। তবে আমি আলোচনায় কী বলবো, তার কিছু বুলেট-পয়েণ্টে নৌট নিয়েছিলাম বক্তৃতা করার আগে টেবিলে বসে। আমি সেই নৌট থেকেই আমার বক্তব্য পুনর্গঠিত করে নীচে প্রকাশ করলাম। - মাসুদ রানা]

    ভূমিকা

    আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মতো লিজেণ্ডারী কলামিষ্টের উপস্থিতিতে আমাকে ‘কলামিষ্ট’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তা শোনা আমার জন্যে রীতিমতো বিব্রতকর। যদিও আমি এখানে বক্তৃতা করার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি, তথাপি ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আলোচনায় নিঃসন্দেহে গাফফার চৌধুরীর কাছ থেকে শোনা মানে তথ্যে ও বোধে সমৃদ্ধ হওয়া। আমি অন্ততঃ তাই মনে করি।

    আমি মনে করি একটি জাতির বুদ্ধিজীবী বা ইণ্টেলিজেনশিয়া তার অগ্রসর চিন্তার ধারক ও বাহক। আমি মনে করি, তাঁদের উচিত রাজনীতিকদের অগ্রগামী হওয়া। অনুগামী হওয়া তাঁদের উচিত নয়।

    বুদ্ধিজীবীরা যখন রাজনীতিকদের অনুগামী হন – যে কোনো কারণেই হোক না কেনো – তখন দেশ-জাতি-রাজনীতি পিছিয়ে পড়ে, সঙ্কটে পতিত হয়। আর, অগ্রগামী চিন্তার বুদ্ধিজীবী না থাকলে, সঙ্কটে নিপতিত সমাজ সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ, রাজনীতিকদের অনুগামী বুদ্ধিজীবীরা তখন জাতির বিবেক হিসেবে ক্রিয়া করতে পারেন না। এই পরিস্থিতি হচ্ছে রূপতঃ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো বিষয়।

    আমি কী বলবো?

    আমাকে যা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে বলা হয়েছে - অর্থাৎ ‘বাঙালীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ইত্তেফাকের ভূমিকা’ - সে সম্পর্কে আমার প্রস্তুতি নেই। আমি বরং পূর্ববাংলায় বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশে ইত্তেফাকের ভূমিকা সম্পর্কে বলি?

    আমি সুনির্দিষ্টভাবে জাতি বিকাশের ক্ষেত্রে মুদ্রিত-পাঠ্যর ভূমিকা সম্পর্কিত একটি থিওরেটিক্যাল ফ্রেইমওয়ার্ক বা তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করবো। আর, আমি নিজেও যেহেতু গাফফার চৌধুরীর কাছ থেকে শুনতে এসেছি, তাই আমার মনে হয় তিনি যদি সেই ফ্রেইমওয়ার্কের মধ্যে তাঁর ইত্তেফাক-অভিজ্ঞতা ফিট-ইন করে আলোকপাত করেন, তাহলে আমরা সবাই সমৃদ্ধ হবো।

    ইত্তেফাক সম্পর্কে আমার তথ্য ও কিছু প্রশ্ন

    ব্যানারে দেখতে পাচ্ছি ইত্তেফাক পত্রিকার ৬২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু আমি পড়ে জেনেছি যে, ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৪৯ সালে। সে-বছর আওয়ামী মুসলিম লীগেরও জন্ম হয়েছিলো। তাই, ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন।

    ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় ১৯৩৭ সালে, যেটাকে বলা হয়েছিলো প্রোভিনশিয়্যাল ইলেকশন বা প্রাদেশিক নির্বাচন। সে-নির্বাচনে আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বধীন কৃষক প্রজা পার্টি কংগ্রের সাথে জোট বাঁধতে না পেরে মুসলিম লীগের সাথে জোট বেঁধে বিজয়ী হয়ে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী বা চীফ মিনিষ্টার হন তিনি।

    কৃষক প্রজা পার্টির বিজয়ের সাথে শরিক হয়ে মুসলিম লীগই ক্রমে বাংলায় সর্বশক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। আর, সেকারণেই ১৯৪৬ সালের দ্বিতীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিজয়ে মধ্য দিয়ে এর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার চীফ মিনিষ্টার হন।

    সে-সময়ে বাংলায় মুসলিম লীগে দু’টি ধারা ছিলো। একটির নেতা ছিলেন আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দী এবং অন্যটির নেতা খাজা নাজিম উদ্দিন। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলনে হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের উদীয়মান নেতা।

    মুসলিম লীগের দুই গ্রুপের রাজনৈতিক ধারার পক্ষে তখন দু’টি বাংলা পত্রিকা ছিলো। একটি আজাদ এবং অন্যটি ইত্তেহাদ। আজাদ ছিলো খাজা নাজিম উদ্দিনদের সমর্থক আর ইত্তেহাদ ছিলো সোহরাওয়ার্দীদের সমর্থক।

    ১৯৪৭ সালে ভারত তথা বাংলা ভাগ হয়ে গেলে পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, সোহরাওয়ার্দীর পাওয়ার বেইস ছিলো কোলকাতা, ঢাকা নয়। ঢাকা ছিলো খাজা নাজিম উদ্দিনদের পাওয়ার বেইস।

    এই পরিস্থিতিতে আজাদ পত্রিকা ঢাকায় সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারলেও ইত্তেহাদ আসতেই পারেনি। এমনকি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ইত্তেহাদের কপি পর্যন্ত ঢাকাতে ঢুকতে দেওয়া হতো না বলে অভিযোগ রয়েছে।

    এহেন পূর্ববাংলায় সংগ্রামী ছাত্র সমাজ ১৯৪৮ সালে গঠন করে মুসলিম ছাত্রলীগ। এখান থেকেই তখন গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালে। এর নেতা ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের)। তখনই শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

    আমার জানা মতে, ১৯৪৯ সালেই মওলানা ভাসানী ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা করে সাপ্তহিক সংবাদপত্র হিসেবে। ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্ত ফ্রণ্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে নেসেসিটি হিসেবে ইত্তেফাক দৈনিক ইত্তেফাক হিসেবে প্রকাশিত থাকে। আমি শুনেছি, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান চাঁদা তুলে ইত্তেফাক চালাতেন।

    ইত্তেফাকের লোগোর নীচে এখন যেখানে লেখা হয় “প্রতিষ্ঠাতাঃ তোফাজ্জল হোসেনমানিক মিয়া”, তখন সেখানে লেখা হতো “প্রতিষ্ঠাতাঃ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী”। আমি শুনেছি, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চাকুরি দিয়ে ইত্তেফাকে ঢুকিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেই মানিক মিয়া কীভাবে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা হয়ে গেলেন, সেটি খুবই ইণ্টারেষ্টিং প্রশ্ন বটে। তাই প্রশ্ন রাখছি গাফফার চৌধুরীর কাছে*।

    জাতি-কল্পনায় মুদ্রণ-পাঠ্যর ভূমিকা

    জাতীয়তাবাদের এ্যাকাডেমিক জগতের সাথে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা সবাই বেনেডিক্ট এ্যাণ্ডার্সনের নাম জানেন। এর বাইরে যাঁরা তাঁর নাম জানেন না, তাঁদের অনেকই নাম জানেন তাঁর বিখ্যাত বইয়ের। বইয়ের নাম ‘ইমাজিনড্‌ কমিউনিটিজ’, যার অনুবাদ হতেপারে ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়সমূহ’।

    জাতীয়তাবাদের এ্যাকাডেমিক গুরুদের মধ্যে এ্যাণ্ডার্সনই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন প্রিণ্ট-টেক্সট ওপর। এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তিনি মনে করেন প্রিণ্ট-টেক্সটই হচ্ছে জাতির জনক। তিনি মনে করেন, ন্যাশন ইমাজিনেশনে বা জাতি-কল্পনায়, মুদ্রণ-পাঠ্য উৎপাদন ও বিপণনের বিশাল ভূমিকা আছে। তিনি এটিকে প্রিণ্ট-ক্যাপিট্যালিজম বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রিণ্ট-টেক্সট বা মুদ্রণ-পাঠ্যর এই-যে ভূমিকা, তা ঠিক কোথায় পালন করা হয় এবং কেনো হয়, সে-বিষয়ে এ্যাণ্ডার্সনের তত্ত্ব রয়েছে।

    এ্যাণ্ডার্সন বলেন, জাতি-কল্পনার সম্ভাবনা ঐতিহাসিকভাবে উদ্ভূত হওয়ার জন্যে মানুষের মনের ওপর থেকে তিনটি বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ নাশ হওয়া প্রয়োজন। এই তিনটি বিষয় হচ্ছে তিনটি এ্যাক্সম্যাটিক বা স্বতঃসিদ্ধিক প্রাচীন সাংস্কৃতিক ধারণা। মানে, ধারণাগুলো সংস্কৃতির অঙ্গীভূত। স্থায়ীত্বে প্রাচীন। সত্যতা বিষয়ে প্রশ্নহীন - স্বতঃসিদ্ধ। ধারণাগুলো কী? আমি বলছি। এগুলো আমার কথা নয়, এ্যাণ্ডার্সনের কথা।

    প্রথমতঃ অণ্টোলজিক্যাল ট্রুথ - অর্থাৎ সত্তা বিষয়ক সত্য -  জানার প্রিভিলেইজড এ্যাক্সেস বা সুবিধাপ্রাপ্ত প্রবেশাধিকার একমাত্র একটি বিশেষ স্ক্রিপ্ট-ল্যাঙ্গুয়েইজ বা লিপি-ভাষাই দিতে পারে; আর এই লিপি-ভাষাই একমাত্র বিশ্ব-সংসারের যাবাতীয় সত্তা সম্পর্কে সত্যবোধ দিতে পারে। কারণ, এই লিপি-ভাষা ও সত্য পরস্পরর থেকে অবিচ্ছেদ্য। এই লিপি-ভাষা আয়ত্ত করা মুষ্ঠিমেয়ে সৌভ্যাগ্যবান ও সুবিধাপ্রাপ্ত লোকদের অধিকারে। এটি একটি প্রাচীন স্বতঃসিদ্ধিক সাংস্কৃতিক ধারণা।

    দ্বিতীয় স্বতঃসিদ্ধিক সাংস্কৃতিক ধারণাটা হচ্ছে এই যে, সমাজ হলো প্রকৃতিপ্রদত্ত সেণ্ট্রিপেট্যাল হাইয়ারার্কিতে – অর্থাৎ কেন্দ্রভিমূখী নিম্ন থেকে উচ্চ স্তরে - গঠিত, যার কেন্দ্রে রয়েছেন রাজন্যবর্গ বা অভিজাত। অর্থাৎ, সমাজটি যে অভিজাত-ছোটোলোক, আশরাফ-আতরাফ বা ব্রাহ্মণ-শূদ্র, ইত্যাদি স্তরে সজ্জিত, তা প্রকৃতির বিধান। এবং উচ্চস্তরের ব্যক্তিগণ সাধারণ মানুষের চেয়েও অধিক মানুষ এবং সৃষ্টিতাত্ত্বিক পবিত্র বিধান অনুসারে তাঁদেরই রয়েছে অধিকার শাসন করার এবং পবিত্র লিপিও তাঁদের উত্তারাধিকার।

    তৃতীয় সাংস্কৃতিক ধারণাটি হচ্ছে টেম্পোর‍্যাল বা সময়গত। এতে বিশ্বাস করা  হয় যে সৃষ্টিতত্ত্ব ও ইতিহাস অভিন্ন ও বিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ, সৃষ্টির আদি কাল থেকে সমাজ এভাবেই চলে আসছে। কেউ সম্ভ্রান্ত-সামন্ত আর কেউ প্রজা-সাধারণ হয়েছে জন্মেছে সৃষ্টি রহস্যেরই কারণে। হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয়, মানুষও তেমনই জন্মগতভাবে সমান নয়।

    এই তিনটি ধারণা সম্মিলিতভাবে প্রচলিত সমাজ-চরিত্রের গভীরে মানুষকে প্রোথিত করার মাধ্যেম তাঁদের জীবনের দৈনন্দিন দুঃখ-দুর্দশা-মৃত্যুর একটি অর্থ দান করে তা থেকে মুক্তির উপায় বাৎলে দেয়। এই তিনি বিশ্বাস একত্র একটি নিশ্চয়তাবাদ তৈরি করে।

    এই স্বতঃসিদ্ধিক সংস্কৃতিক ধারণাগত পরিস্থিতি হচ্ছে প্রাগ-পুঁজিবাদ পরিস্থিতি। কিন্তু পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে-সাথে এই স্বতঃসিদ্ধিক ধারণা চ্যালেইঞ্জের সম্মুখীন হয়। বেনেডিক্ট এ্যাণ্ডার্সন মনে করেন, প্রথম ইউরোপে এবং পরে অন্যত্র বিভিন্ন মাত্রায় বৈজ্ঞানিক ও আবিষ্কার, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও  দ্রুত বর্ধিষ্ণু যোগাযোগের ফলে প্রতিষ্ঠিত সৃষ্টিতত্ত্ব ও বিকাশমান ইতিহাসের অসঙ্গতি তৈরি করে। এবং এর ফলে নতুন বিন্যাস, ক্ষমতা ও বিষয়াদির নতুন অর্থ অনুসন্ধান অনিবার্য হয়ে ওঠে।

    এ্যাণ্ডার্সনের মতে, পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের সাথে মুদ্রণ-পাঠ্যর দ্রুত উৎপাদন ও বিপণন হয়। তিনি উপাত্ত দিয়ে জানান যে, ১৫০০ সালের মধ্যে ইউরোপে ২ কোটি বই মুদ্রিত হয়েছে এবং ১৬০০ সালে এই সংখ্যা হয়েছে ২০০ কোটি।

    এই মুদ্রণ-পুঁজিবাদ বা প্রিণ্ট-ক্যাপিট্যালিজমই পুরনো পবিত্র লিপি-ভাষায় বিধৃত সত্যকে চ্যালেইঞ্জ করে সংখ্যাগরিষ্ঠের লিপি-ভাষা ব্যবহার যোগে নতুন সত্য অনুসন্ধান মাধ্যমে সমাজের পুরনো কেন্দ্রাভিমূখী স্তরবিন্যাসের পরিবর্তন করে হরাইজণ্ট্যাল বা আনুভূমিক বিন্যাস দাবী করে। আর, প্রতিষ্ঠিত সৃষ্টিতত্ত্বকে পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাসের বয়ান তৈরি করে।

    আমরা যদি এ্যাণ্ডার্সনের তত্ত্বের আলোকে আমাদের পূর্ববাংলার বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশকে বিবেচনা করি, তাহলে কী দেখি?

    প্রথমতঃ বিবেচনা করুন লিপি ও ভাষার বিষয়টি। কোন লিপি ও ভাষাকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হতো? পরম সত্য জানার জন্য কোন লিপি-ভাষাকে অদ্বিতীয় মনে করা হতো? হিন্দুর কাছে সংস্কৃত, মুসলমানের কাছে আরবি, আর শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে ইংরেজি নয় কি? সৈয়দ মুজতবা আলির  গল্প পড়ে দেখুন। দেখবেন তিনি কীভাবে পণ্ডিতের মনে বাংলার প্রতি ঘৃণা ও সংস্কৃতের প্রতি শ্রদ্ধা তুলে ধরেছেন। ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলা লিপিকে আরবি রৌমান ইত্যাদি লিপি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার প্রস্তাব আসেনি? এসেছে।

    ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এবং এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ইত্তেফাক কি তথাকথিত পবিত্র লিপি-ভাষার ধারণাকেই চ্যালেইঞ্জ করে কলেবরে ও সংখ্যায় ক্রমঃবর্ধিষ্ণু হারে সমগ্র জাতির মধ্যে বিপণনীত হয়নি?

    সেই চ্যালেইঞ্জ ও বিপণনে ইত্তেফাকের ভাষা কী ছিলো? ভাষা ছিলো বাংলা।

    ইতোমধ্যে ইত্তেফাকের প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠা মানিক মিয়া 'রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি', 'রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ' ও 'রঙ্গমঞ্চ' শিরোনামে নিয়মিত রচনা লিখে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। সেগুলো কী ছিলো? সেগুলো কি প্রতিষ্ঠিত সত্যকে চ্যালেইঞ্জ করার প্রয়াস নয়?

    সুতরাং দেখছি, এ্যাণ্ডার্সন বর্ণীত প্রথম স্বতঃসিদ্ধিক সাংস্কৃতিক ধারণা পূর্ববাংলায় বাঙালী জাতি-কল্পনায় মুদ্রণ-পাঠ্য হিসেবে ইত্তেফাকের মাধ্যমে চ্যালেইঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ পূর্ববাংলার সমাজে যে হায়ারার্কি ছিলো, তাতে নবাবপুত্র, জমিদারপুত্র এবং সম্ভ্রান্ত ও আশরাফের পুত্ররাই কি রাজনৈতিক ক্ষমতার যাওয়ার জন্য প্রিভিলেইজড বা সুবিধাপ্রাপ্ত ছিলেন না? ছিলেন।

    কিন্তু লক্ষ্য করুন, কীভাবে নবাব পরিবারে খাজা নাজিম উদ্দিনদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সাধারণ বাঙালীর দল হিসেবে বিকশিত হতে লাগলো। কীভাবে সাধারণ বাঙালীর প্রতিনিধি হিসেবে অতি-সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের শেখ মুজিবুর রহমান ধীরে ধীরে নেতৃত্বে উঠে এলনে। এবং তাঁর এই উত্থানে ইত্তেফাকের কী অসাম্য ভূমিকা ছিলো, সে-কথা আমরা সবাই জানি। গাফফার চৌধুরী নিশ্চয় আরও গভীরে বলতে পারবেন।

    তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এ্যাণ্ডার্সনের দ্বিতীয় স্বতঃসিদ্ধিক সাংস্কৃতিক ধারণা তথা সম্ভ্রান্তের হাতেক্ষমতা থাকার স্বতঃসিদ্ধ ধারণার বিনাশে ইত্তেফাক ভূমিকা রেখেছে।

    তৃতীয়তঃ সৃষ্টিতত্ত্ব ও সামাজিক ইতিহাস এক ও অভিন্ন নির্দেশক যে-পবিত্র ও স্বতঃসিদ্ধ ধারণা সুদীর্ঘ কাল থেকে চলে আসছিলো, তার ফলেই বাংলায় ‘জাতে হিন্দু’ ও ‘জাতে মুসলমান’ কিংবা ‘জাতে নাপিত’ বা ‘জাতে জোলা’ ইত্যাদি বলা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে ধর্ম-ভিত্তিক ভুল জাতীয়তাবাদের আদর্শে যখন সকল ভারতীয়কে হিন্দু-মুসলিম প্রকরণে বিভক্ত করা হলো মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ্‌র প্রস্তাবিত দ্বিজাতি তত্ত্বের মাধ্যমে।

    পূর্ববাংলায় বিকাশমান বাঙালী জাতি-কল্পনা কিন্তু সেই পবিত্রজ্ঞাত তত্ত্ব তথা হিন্দু-মুসলমানের সৃষ্টিতত্ত্বকে অস্বীকার করে, জাতি-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে একটি হরাইজণ্টাল বা আনুভূমিক বাঙালীর ‘হাজার বছরের’ ইতিহাস গড়ে তুলতে লাগলো।

    লক্ষ্য করবেন, ইত্তেফাক সেই সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে বাঙালীর ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্দেশ ও সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে শুরু করলো। ১৯৫২ সালকে বাঙালীর ইতিহাস অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইত্তেফাক ভূমিকা রেখেছে।

    উপরে উল্লেখিত ও  ব্যাখ্যাত তিন স্বতঃসিদ্ধিক পুরনো সাংস্কৃতিক ধারণা এতোদিন যাবত বাঙালী মনকে মুষ্ঠিগত করে রেখেছিলো, তার বিপরীতে উচ্চারিত ও লিখিত বয়ান মুদ্রিত পাঠ্য হিসেবে ইত্তেফাক তার বাণিজ্যিক-প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে সারাদেশ জুড়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করলো।

    কীভাবে সেটিহলো, সে-বিষয়ে গাফফার চৌধুরী যদি দয়া করে আমাদেরকে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, তাহলে আমরা সমৃদ্ধ হবো।

    ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন প্রসঙ্গে

    পরিশেষে ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনের বিষয়ে দু’টি কথা বলতে চাই। প্রথমতঃ ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন একটি সর্বজনীন মৌলিক অধিকার। এটি এমন নয় যে, ইউরোপে আমি ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনের পক্ষে বক্তব্য রাখবো, আবার বাংলাদেশে ফ্রীডম অফ এক্সেপ্রেশন ছিনিয়ে নেওয়া হলে নীরব থাকবো। যদি তাই করা হয়, তাহলে সেটি হবে ডবল ষ্ট্যাণ্ডার্ড বা দ্বিচারিতা। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বাংলাদেশে ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন নেই।

    বাংলাদেশে সংবাদ-মাধ্যমগুলোকে ডিক্টেইট করা হচ্ছে। সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রিত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করার কারণে মানুষদের গ্রেফতার করে কারাকারে পাঠানো হচ্ছে। ফলে আমাদের ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনের বোধ যেনো সর্বজনীন হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। সুবিধা বুঝে কথা বললে হবে না।

    ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনের ব্যাপারে আমার অন্য কথাটি হলো, ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন মানে যাচ্ছেতাই প্রকাশ করা নয়। আমার ইচ্ছে হলো আর এই সভাতে কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে নিজেকে এক্সপ্রেস করলাম, এটি কোনো সভ্যতার মধ্যে পড়ে? নিশ্চয় না।

    ইচ্ছে হলেই আপনি অন্যের বিশ্বাসকে অন্যের বিশ্ববোধকে অপমান করতে পারেন না। নবী মুহম্মদকে যাঁরা ধর্মবিশ্বাসের কারণে পয়গম্বর মনে করে তাঁদের জগত ও জীবন সম্পর্কে ধারণা গড়ে তুলেছেন, আপনি চাইলেই তাঁদেরকে আহত করে তাঁকে সমকামী হিসেবে চিত্রিত করে কার্টুন আঁকতে পারেন না।  আপনি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসকে অপমান করতে পারেন না। অপমান করা আর ভিন্নমত প্রকাশ করা এক নয়। অপমান মানে হচ্ছে ঘৃণার প্রকাশ। আর ভিন্নমত হচ্ছে বুদ্ধির প্রকাশ।

    আপনি চাইলে আমার জননীকে পতিতা আর আমার জনককে চোর-বদমায়েশ বলে গালি দিয়ে আমাকে অপমান করতে পারেন না। এমন এক্সপ্রেশনের ফ্রীডম আপনার নেই।

    এখানে কি আপনার ফ্রীডম হবে রানি এলিজাবেথের সাথে প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোনের যৌন সম্পর্ক নির্দেশ করে কোনো কার্টুন আঁকার? পারবেন? (শ্রোতারা 'না' 'না' বললেন)। পারবেন না। আপনাকে ইলিমিনেইট বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। হবে না?

    সুতরাং আপনাকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে, এক্সপ্রেশনের সাথে ইম্প্রেশন যুক্ত। এক্সপ্রেস করা হয় ইম্প্রেস করার জন্যে। এ-বিষয়ে সৌশ্যাল সাইকোলজিতে আর্ভিং গফম্যান থেকে শুরু করে বড়ো পণ্ডিতদের বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। মোট কথা আপনার এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে আমার মনে আপনি কী ইম্প্রেশন দিচ্ছেন, সেটি আপনাকে ভাবতে হবে।

    সোসাইটি ইজ অল এ্যাবাউট কেয়ারিং ঈচ আদার। আপনি 'আই ডৌণ্ট কেয়ার' বলতে পারেন না। আমি বলি, সবাইকে সম্মান করুন, সবার মর্য্যাদা স্বীকার করুন, সবাই সবাইকে মূল্য দিন। দেখবেন, তখনই এক্সেপ্রেশন ও ইম্প্রেশনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা হবে।

    আমাকে আজকের এই আলোচনা সভায় নিমন্ত্রণের জন্য আয়োজকদের এবং আমার কথা শোনার জন্য শ্রোতাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

    বৃহস্পতিবার ১৫ জানুয়ারী ২০১৫
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

    পাদটীকাঃ *আব্দুল গাফফার চৌধুরী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। কিন্তু ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাতে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন