• বাংলাটাউনঃ নামমোচন ও কিছু কথা
    মাসুদ রানা

    নামমোচন

    পূর্ব-লণ্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বারার একটি ওয়ার্ডের নাম ‘স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন’। এই নামকরণ হয় ১৯৯৭ সালে। কিন্তু, সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের উদ্দেশ্যে সরকারী দলের আইন-প্রস্তাবনার প্রস্তুতির সুযোগে এর নাম পরিবর্তনের একাধিক প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব সুপারিশিত হয়েছে খসড়া প্রস্তাব হিসেবে।

    সুপারিশিত খসড়া প্রস্তাবটির প্রস্তাবক হচ্ছেন জেইমস ফ্রাঙ্কম, যিনি তাঁর পরিচয় দিয়েছেন দীর্ঘকালীন স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাসবিদ ও শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু তাঁর আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ড শাখার ভাইস-প্রেসিডেন্ট আছেন বা ছিলেন।

    এহেন ফ্রাঙ্কমের প্রস্তাবনায়, নামকরণের বিবেচনায় স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের পরিচিতির বিষয়াদি হিসেবে এলেও, এখানে বাঙালীর সংখ্যাগুরুত্ব, তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিশেষত্ব স্থান পায়নি, যেভাবে পেয়েছিলো ১৯৯৭ সালের নামকরণে।

    ফ্রাঙ্কমের প্রস্তাব সুপারিশ লাভ করলেও, নিয়মানুসারে জনগণের সাথে ‘কনসাল্টেশনের’ জন্য তা গত ১৩ নভেম্বর থেকে আগামী ৭ জানুয়ারী পর্যন্ত উন্মুক্ত। তাত্ত্বিকভাবে, এই প্রস্তাব রহিত করা সম্ভব, যদি ব্যাপক মানুষ এর বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিবাদ জানায়।

    প্রতিক্রিয়া

    সুপারিশিত খসড়া প্রস্তাব প্রকাশের সাথে-সাথেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাঙালীদের মধ্যে। এর পুরোভাগে রয়েছেন টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রাক্তন লেবার নেতা ও পরবর্তীতে বিদ্রোহী, দলত্যাগী এবং বর্তমানে নির্দলীয় ও জনভৌটে সরাসরি নির্বাচিত বাঙালী বংশোদ্ভূত মেয়র লুতফুর রহমান।

    কর্তব্যের খাতিরে সমর্থন দিয়ে খানিকটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে প্রতিবাদ তুলেছেন লুৎফুর-বিরোধী সংখ্যাগুরু লেবার কাউন্সিলারও। 

    মেয়র রহমান বলেছেন এবং লেবার পার্টিও বলছে, বাংলাটাউন নামমোচন করা মানে হচ্ছে, এখানে বাংলাদেশীদের (লক্ষ্যণীয়, কেউই ‘বাঙালী’ শব্দটি ব্যবহার করছেন না) ইতিহাস ও ঐতিহ্য অস্বীকার করা। মেয়র রহমান, বাংলাদেশীদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই ‘বাংলাটাউন’ নাম সংরক্ষণের জন্য আইনী লড়াই পর্যন্ত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

    কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, লেবারের স্থানীয় নেতা ফ্রাঙ্কমের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে স্থানীয় কনসার্ভেটিভ পার্টি। কী অদ্ভূত মিল! এর দ্বারা বুঝা যায়, লেবার পার্টি সম্ভবতঃ বাংলাটাউনের নাম রাখা কিংবা পরিত্যাগের পক্ষে একাট্টা নয়। এই দলটি দীর্ঘকাল যাবৎ টাওয়ার হ্যামলেটসে অভ্যন্তরীণ অনৈক্যে ভূগছে। আর এখানেই এর দূর্বলতা বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।

    ফাঙ্কমের প্রস্তাবের প্রতি কনসার্ভেটিভ পার্টি তার সমর্থন জানাতে গিয়ে হাস্যকর যুক্তি উপস্থাপন করেছে। তারা এক অদ্ভূত কৃত্রিম বাঙালী-প্রীতি দেখিয়েছে শব্দের খেলা খেলে। কনসার্ভেটি পার্টি বলছে, নামটি পরিবর্তন করে 'স্পিটালফীল্ডস' রাখাই শ্রেয়, কেনো-না, এতে মনে হতে পারে সারা বারা-জুড়ে বিস্তৃত বাংলাদেশীরা শুধুমাত্র স্পিটালফীল্ডসেই সীমিত। অর্থাৎ, বাংলাদেশীদের বিস্তৃতির 'ইমেইজ' বা ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যই ‘স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন’ ওয়ার্ডের নাম থেকে ‘বাংলাটাউন’ মোচন করা উচিত।

    এ-যুক্তি যদি ‘ভ্যালিড’ বা বৈধ হয়, তাহলে বুদ্ধিমান (কিংবা ভাষান্তরে চতুর) কনসার্ভেটিভরা কি বলবেন যে, যেহেতু বাংলাদেশের বাঙালীরা পৃথিবীর দেশে-দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই এর নাম থেকে ‘বাংলা’ মোচন করে আবার সেই পুরনো ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ নাম রাখা উচিত? কিংবা, যেহেতু ইংলিশ জাতির বিস্তৃতি ঘটেছে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড-সহ সারা পৃথিবীতে, তাই তাঁদের বিস্তৃত ইমেইজ রক্ষার জন্য ইংল্যাণ্ডের নাম পরিবর্তন করে সেই প্রাচীনতম নাম ‘আলবিয়ন’ রাখা? এটি কোনো যুক্তিই নয়; এ-হচ্ছে কুযুক্তি।

    দৃষ্টি

    'বাঙালীরা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নয়' বলে একটি সমালোচনা আছে। এতে বলা হয়, তাঁদের চিন্তা ও তৎপরতা হচ্ছে তাৎক্ষণিক। তাই ‘এ্যাক্ট’ বা ক্রিয়া করার চেয়ে ‘রিএ্যাক্ট’ বা প্রতিক্রিয়া করাই হচ্ছে বাঙালীদের প্রধান প্রবণতা। পরিকল্পনায় স্বস্তি বোধ করেন না বাঙালীরা। তাঁরা অতীত রোমন্থনে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু সেই ইতিহাসেরও বেশি দূরে বা গভীরে প্রবেশ করতে পারেন না তাঁরা।

    বিশাল এক বাঙালী জনগোষ্ঠীর বাস এই ব্রিটেইনে। প্রায়শঃ নিজেদের সংখ্যাগুরুত্ব বুঝাতে ‘তৃতীয় বাংলা’ নাম ধারণ করে আত্মপ্রসাদ লাভের প্রয়াস পান বাঙালীরা। সংখ্যার জোরে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্থানীয় সরকারে দেহগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন তাঁরা, কিন্তু সম্ভবতঃ সম্মিলিতভাবে এর বুদ্ধিগত নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা এখনও হয়নি তাঁদের। তাই, আগে হাঁটার চেয়ে পেছনে থেকে চিৎকার করাটাই তাঁরা পারছেন।

    বহুবার, বহু প্রসঙ্গে বলেছি, ব্রিটেইনে বাঙালীর একটা ‘পলিসি স্টাডি ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, যেখানে চলমান নীতি-নির্ধারণী বিষয়াদি পাঠ, বিশ্লেষণ এবং কমিউনিটি হিসেবে বাঙালীর জন্য এগুলোর সিগনিফিক্যান্স ও ইমপ্লিকেশন বা তাৎপর্য্য কী, তা আলোচনা করা যায় এবং এর ভিত্তিতিতে রাজনীতিকদের পরামর্শ দেয়া যায়।

    ওখানকার মতো এখানেও - অর্থাৎ, বঙ্গদেশের মতো ইঙ্গদেশেও - রাজনীতিকরা বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনেন না। তাঁরা বুদ্ধিজীবীদের দেখতে চান পদলেহী স্তাবক হিসেবে - ক্রিটিক হিসেবে নয়। আর বুদ্ধিজীবীরাও খানিকটা রসদের আশায় পদলেহন ও স্তুতি করেন এক পক্ষের এবং কষে গালি দেন তার বিপরীত পক্ষের প্রতি। স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরা কোথায়?

    গবেষণা

    বাংলাটাউনের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, তা ইঙ্গিত দিয়ে একটি গবেষণা-লেখা ঠিক এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০১১ সালের নভেম্বরে, প্রকাশিত হয় শহর ও নগর ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পণ্ডিত-পত্রিকা  ‘জার্নাল অফ টাউন এ্যাণ্ড সিটি ম্যানেইজমেন্ট’-এর ১ম ভল্যুমের ৪র্থ খণ্ডের ৩৮১-৩৯৫ পৃষ্ঠায়। প্রকাশক হেনরী স্টিউয়ার্ট পাবলিকেশন্স। লেখাটি লণ্ডন মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির টিআরএসি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও সিনিয়র লেকচারার স্টিফেন শ’র দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ফল। লেখাটির শিরোনাম  "Marketing ethnoscapes as spaces of consumption: Banglatown — London’s Curry Capital"

    পত্রিকার পাতায় স্বল্প পরিসরের মন্তব্য প্রতিবেদনে স্টিফেন শ’র গবেষণা-লেখার প্রতি সুবিচার করে বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশ নেই। তবে প্রাসঙ্গিক দুয়েকটি কথা উল্লেখ করছি। বাংলাটাউন তথা স্পিটালফীল্ডসের বর্ণনায় স্টিফেন শ লিখেছেন, ‘‘The streetscape of Spitalfields reminds the onlooker of the area’s long history of immigration and settlement. Over the past 30–40 years, it has accommodated London’s largest concentration of people originating from Bangladesh, one of the UK’s poorest minorities.’’

    অর্থাৎ, ‘‘স্পিটালফীল্ডসের রাস্তাঘাট দর্শনার্থীকে অত্র এলাকায় অভিবাসন ও অধিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি গত ৩০-৪০ বছর ধরে লণ্ডনে সর্ববৃহৎ কেন্দ্রীভবনের স্থান যুগিয়েছে বাংলাদেশ থেকে আসা লোকদের, যারা ব্রিটেইনের দ্ররিদ্রতম সম্প্রদায়গুলোর একটি।’’

    গবেষক তাঁর সমগ্র লেখা জুড়ে  বর্ণনা করেছেন, বৃহত্তর নগরীতে ‘এথনোস্পেইস’ বা নৃগোষ্ঠীর নামে স্থানের নামকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা বিষয়ে বিবিধ নীতি-পদ্ধতি ও ফলাফল-প্রতিক্রিয়া কী। তারপর তিনি উপসংহারের এক স্থানে লিখেছেন, ‘‘The evidence above suggests that, over the last decade, urban authorities have been far less inclined to hard-brand ethnic cultural quarters with somewhat stereotypical territorial symbolism: the established ‘Chinatown model’. The reasons for this may be pragmatic, especially as policy makers seek more cost-effective alternatives to permanent exotic streetscaping and expensive public realm schemes. Further, at times of actual or threatened terrorism, some minority businesses express concern that, although unconnected, overt ethnic branding deters some visitors, especially where it is perceived as ‘Islamic’’.

    অর্থাৎ, ‘‘উপরের প্রমাণ এই নির্দেশনা দেয় যে, প্রতিষ্ঠিত চায়না টাউনের মতো বদ্ধবোধগত ভৌগলিক প্রতীকীবাদ সহযোগে নৃ-সাংস্কৃতিক মহল্লার শক্তিশালী নামকরণের প্রতি নগর কর্তৃপক্ষের সমর্থন গত এক দশক ধরে খুব অল্পই ছিলো। এর কারণ হতে পারে প্রায়োগিক, বিশেষতঃ নীতি নির্ধারকেরা চান রাস্তাঘাটের স্থায়ী বিদেশ-সাদৃশ্যতা ও ব্যয়বহুল গণ-প্রকল্পের বিপরীতে স্বল্প খরচের বিকল্প। অধিকন্তু, সময়ে-সময়ে প্রকৃত ও হুমকিত সন্ত্রাসবাদের মুখে কোনো-কোনো সংখ্যালঘু ব্যবসা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, যদিও সংযোজিত নয়, নৃ-গোষ্ঠিক নামকরণ অনেক দর্শনার্থীকে বাধাগ্রস্ত করে, বিশেষতঃ যখন তা ‘ইসলামিক’ হিসেবে পর্যবেক্ষিত হয়।’’

    এক বছর আগের এই গবেষণা-লেখাটি, যা নগরী ব্যবস্থপনা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ স্কলার্লী জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, তা কি বাঙালী স্বার্থ-সংরক্ষী নীতি নির্ধারকগণ পাঠ করেছেন? কিংবা এ-সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বিষয়ে নেতৃত্বকে অবহিত করার কোনো ব্যবস্থা কি আছে? চোখে পড়ার মতো কিছু থাকলে, পত্র-পত্রিকান্তরে নিশ্চয় আসতো। 

    তো, শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশীত্ব ও ইসলামীত্ব সমার্থক মনে করে মূলতঃ বাংলাটাউনের নামমোচনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। আজ ‘ইসলামোফবিয়া’ বা ইসলামাতঙ্কের যে শৈতপ্রবাহ হচ্ছে, তার ফলে টাওয়ার হ্যামলেটসের আঙ্গিনায় তুষারাবৃত্ত হয়ে মুসলমানিত্ব ও বাংলাদেশীত্ব একাকার দৃষ্ট হচ্ছে। এতে প্রতিরক্ষার জন্য সংস্কৃতির সাথে ধর্মকে মিলিয়ে সবকিছুর ঢেকে দেয়া হচ্ছে এক আজগুবি ওহাবী কম্বলের নিচে। একদিকে আসছে সাংস্কৃতিক আক্রমণ, আর অন্যদিক থেকে আসছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। আর, এই টানাপোড়েনে নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে ব্রিটেইনে বাঙালী সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ক্ষুদে অগ্নিশিখাটুকু যা প্রজ্জ্বোলিত হয়েছিলো ১৯৭১ সালে।

    ১৯৭১ সালে যখন পূর্ববাংলা তথা পূর্ব-পাকিস্তানে ইসলাম রক্ষার নামে বাঙালীদের উপর পাকিস্তানী হানাদারদের গণহত্যা পরিচালিত হয়, তখন এই ব্রিটেইনে ‘বাঙালী’ পরিচয় ধারণ করেই কারখানা ও ফ্যাক্টরী থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলেন হাজার-হাজার শ্রমজীবী বাঙালী। এই বাঙালী পরিচয়ে সত্তর দশকের শেষের দিকে স্পিটালফীল্ডসে বর্ণবাদী হামলা ও খুনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। সে-দিনের বাঙালী-বোধ যে শক্তি, সাহস ও বিজয় দিয়েছিলো, আজ তার সুফলই ভোগ করছেন টাওয়ার হ্যামলেটসের ‘বাংলাদেশী’ নেতারা।

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে যাঁরা চিৎকার করছেন, তাঁদের কাছে বাংলাদেশের উপর আওয়ামী লীগের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' প্রতিষ্ঠাই মোক্ষ। কিন্তু এই দলটিই একাত্তরের গণশত্রু  ইসলামবাদী জামায়াত ইসলামী এবং তদীয় সহযোগী বিএনপি’র মতোই বাঙালীর সংস্কৃতিকে ধর্মের মধ্যে নিঃশেষিত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে। এই দলটির শাসনামলেই ‘বাঙালী’ নামমোচন করে ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাকে আদালতের রায় দিয়ে বৈধ করা হয়েছে। ১৯৭২ সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র সাথে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ রেখে এক বিশ্রী খিচুরি পাকানো হয়েছে। এমনকি, দলটির নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শারিয়া আইন প্রবর্তনের কথাও বলছেন অতি সম্প্রতি। আমরা ভুলে যেতে পারি না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক নীতিকে পায়ে মাড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে ইসলামিক দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে ইসলামিক সম্মেলনে পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

    যেটি বস্তুনিষ্ঠভাবে বুঝা দরকার, তা হচ্ছে বাঙালীর সঠিক আত্মপরিচয়। ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তির বিশ্বাসের ব্যাপার। কিন্তু মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় হচ্ছে জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্য। একজন বাঙালী হিন্দু চাইলে মুসলিম হয়ে যেতে পারেন। একজন বাঙালী মুসলিম চাইলে খ্রিষ্টান হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু একনজন বাঙালী চাইলেই আরব হয়ে যেতে পারেন না। বাঙালীর বাঙালীত্ব তাঁর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, যা চেহারায় মূর্ত, ভাষা-কৃষ্টি-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে মূর্ত। এর আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এতে আছে আত্মমর্যাদা ও আত্মমূল্য লাভ করার মতো ঐশ্বর্য্য, যা নিয়ে পৃথিবীর সকল নৃজাতির মধ্যে মাথা উঁচু করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো যায়।

    কিন্তু এই আত্মপরিচয় এখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি সর্বতোভাবে। ইতিহাসে এই আত্মপরিচয় অন্ততঃ দুবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো, কিন্তু প্রতিবারের মুখ থুবড়ে পড়েছে এর অসম্পূর্ণতা ও অপূর্ণতার জন্য। বাঙালীত্বের প্রথম ঢেউ এসেছিলো অবিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯০৫ সালে। তখন হিন্দুত্ববাদ বাঙালীত্বকে গ্রাস করে মুসলমান সম্প্রদায়কে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। তাই প্রকৃত অর্থে বাঙালী জাতি গড়ে উঠতে পারেনি। এটি ছিলো এক বিষবৃক্ষ, যার ফল পেকে ভূমিতে পতিত হয়ে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে। বাঙালী তার অখণ্ড সত্ত্বা ও অখণ্ড মৃত্তিকা হারায়।

    দ্বিতীয় ঢেউ এসেছিলো ধর্মকে পাশে ঠেলে ১৯৫২ সাল থেকে ভাষা-কৃষ্টি-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ধারণ করে। প্রচুর সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলো এই ঢেউ চূড়ান্ত রূপে ১৯৭১ সালে। যদিও সে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ইত্যাদি নির্বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালীর কথা বলেছে, কিন্তু সে বাস্তবে তার পূর্ববর্তী ভাঙ্গনকে ‘আনডু’ করে মাটি ও মানুষকে ফিরে চায়নি।

    এই-যে দুটো ঢেউয়ের দুটো অসম্পূর্ণতা, তা এখনও বাঙালীর বোধে-মননে-হৃদয়ে পরস্পর বিরোধী সংবেদন তৈরী করে তাঁর বোধ-আবেগ-আচরণকে প্রভাবিত করে। এই দ্বন্দ্বের কারণেই সে আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভোগে - আত্মমর্যদাহীনতায় ভোগে।

    তাত্ত্বিকভাবে, ব্রিটেইনের বাঙালী তার ঐতিহাসিক অসম্পূর্ণতা দূর করে বিশ্বব্যাপী সকল বাঙালীর জন্য আলো দেখাতে পারে। এর জন্য বাঙালীকে ‘বিশ্ববাঙালী’ হতে হবে। ধর্ম নয়, রাষ্ট্র নয়, প্রদেশ নয়, জেলা নয়, উপজেলা নয় - একটিই অখণ্ড পরিচয় - বাঙালী।

    আজকের স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউনের সাথে ঐতিহাসিক যোগসূত্র ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে নয়। মেয়র ভুল বলেছেন। এই যোগসূত্র হচ্ছে বাঙালী হিসেবে। কারণ, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তৈরী হবার বহু কাল আগে থেকেই বাঙালীর বসবাস এখানে। তখন বাংলাদেশী নামে কোনো শব্দও তৈরী হয়নি অভিধানে। ‘বাংলাদেশী’ ধারণা এসেছে বহু পরে, এমন কি দেশ স্বাধীন হবার বহু পরে, যখন নতুন করে বাঙালীর পরিচয়ে বিভক্তি পুনর্ব্যক্ত করার প্রয়োজন হয়েছিলো।

    আজ যদি ‘বাংলাটাউন’ নামমোচন রোখার লড়াইয়ে কিংবা বাঙালীর নায্য হিস্যা প্রাপ্তির ভবিষ্যত সংগ্রামে বিজয়ী হতে হয়, তাহলে অখণ্ড বাঙালী পরিচয়কেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। আর যিনি বা যাঁরা এর নেতৃত্ব দিবেন, তাঁকে বা তাঁদেরকে সমস্ত রকম ঐতিহাসিক ব্যাথা-বেদনা, ক্ষুদ্রতা-নীচতা, অভিযোগ-অনুযোগ, অজুহাত-কৈফিয়তের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

    মনে রাখতে হবে, বাঙালী হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম 'এথনোলিঙ্গুয়েস্টিক গ্রুপ' বা ভাষানৃজাতি। এ-জাতির বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক আত্মপরিচয়গত নেতৃত্ব দানের জন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিদেরকে অনেক উপরে উঠতে হবে। মাউন্ট এভারেষ্টের চেয়েও উপরে, যেটি কবি নজরুল রূপক-যোগে বলেছিলেনঃ

    ‘‘বল বীর, চির উন্নত মম শির
    শির নেহারি আমারি নত শির
    ওই শিখর হিমাদ্রির।’’

    রোববার, ২৫ নভেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অনেক গুরুত্বপূণ লেখা ।অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ রানা ভাইকে।

Its abolutely brilliant. Your wrtting always inform and inspire me. Please dont stop your writing. waiting for your next write up. Many many thanks.

Very insightful and timely writing. Thanks a lot.

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন