• বাংলাদেশের এপ্রিল থিসিস
    মাসুদ রানা

    ইতিহাসের এপ্রিল থিসিস
    লেনিন তাঁর বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’ লিখেছিলেন ১৯১৭ সালের এপ্রিলে। সুইৎজারল্যাণ্ডের নির্বাসন থেকে ৩ তারিখে পেত্রোগ্রাদে ফিরে এসে তিনি ৭ তারিখে লিখেছিলেন মোট ১০টি টীকার একটি থিসিস। তিনি তাঁর দল অল রাশান সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির গৃহীত রাজনৈতিক লাইনকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এপ্রিল থিসিসে।

    তার দু’মাস আগে সামন্তবাদী জারতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ফেব্রুয়ারী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী কালীন পুঁজিবাদী কেরনস্কি সরকার ভূ-সামন্তদের জমিদারী বাজেয়াপ্ত করা, রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পৃথক করা, ইত্যাদি কর্মসূচি ঘোষণা করলে, মার্ক্সবাদীরা বিপ্লবীরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক কর্মসম্পাদনের জন্য সে-সরকারকে সমর্থন করে।

    লেনিন তাঁর এপ্রিল থিসিস দলের বলশেভিক (সংখ্যাগুরু অংশ) ও মেনশেভিক (সংখ্যালঘু অংশ) দু'টি গ্রুপের বৈঠকেই পাঠ করে এ-যুক্তি তুলে ধরেন যে, বুর্জোয়াদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে, তাদের সমর্থন করার অর্থ হবে সর্বহারা শ্রেণীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। তাই বিপ্লবীদের কাজ হচ্ছে, শ্রমিকদের সোভিয়েত বা পঞ্চায়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তোলা; পুলিস, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ভেঙ্গে দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর আইন শৃঙ্খলা, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসন গড়ে তোলা; শিল্প-কারখানায় শ্রমিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সমস্ত জমিতে দরিদ্র কৃষকদের দখল নেয়া, ইত্যাদি।

    আমরা জানি, লেনিনের উপস্থাপনার ১০দিন পর স্ট্যালিন লেনিনের পক্ষে এসেছিলেন এবং একে-একে বলশিভেকদের প্রায় সবাই। পরবর্তীতে, লেনিনের এপ্রিল থিসিসের ভিত্তিতেই রাশিয়াতে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিলো। তাই, সর্বহারা বিপ্লবের ইতিহাসে লেনিনের এপ্রিল থিসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    আজ বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল বলে দাবিদার কমিউনিষ্ট ও সমাজতন্ত্রীরা যখন ধনিক-বণিক শ্রেণীর মধ্যে উদারপন্থী, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক অংশ দেখতে পান এবং তাদের সাথে সহযোগিতা করে বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাবেন বলে প্রচার করেন, তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে আঘাত হানার জন্য লেনিনের এপ্রিল থিসিস আজও আমাদের সশস্ত্র করে তোলে। তাই, বাংলাদেশের শ্রমিক বিপ্লবের প্রশ্নে লেনিনীয় শিক্ষার আলোকে নিচের ১০টি টীকা এবং সাম্প্রতিক শ্রমিক-হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে মে দিবসে পালনীয় একটি কর্মসূচি উপস্থাপন করা হলো।

    (১) প্রতিশ্রুতিঃ  বাংলাদেশ একটি জাতি-রাষ্ট্র, যা ১৯৭১ সালে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ-লক্ষ জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত। যুদ্ধ-পূর্ব ঔপনিবেশিক কালে, মুষ্ঠিমেয় উচ্চবিত্তের বিপরীতে বিকাশোন্মুখ মধ্যবিত্তরা ধর্মভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক পাকিস্তান রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা বাতিল করে বাঙালীর জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যের বাংলাদেশ গঠনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করে। এ-যুক্তি প্রায় সকল বাঙালীর বোধে-বুদ্ধিতে-আবেগে-আচরণে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো। তখন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো, দেশ স্বাধীন হলে 'সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ-বৈষম্য-নিপীড়ন। এ-প্রতিশ্রুতির লিখিত রূপ হিসেবে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো।

    (২) অস্বীকৃতিঃ  ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতিশ্রুতি ছিলো একটা ফাঁকি। প্রথম তিন বছরের মধ্যেই ‘জাতির পিতা’ শেখ মুজিবুর রহমান জাতির ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী পরিচয় নস্যাৎ করে, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে, জাতির ইসলামিক বিশ্বপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করেন। তার পরের বছর, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র উৎখাত করে একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে সমাজতন্ত্রের নামে ব্যক্তি সম্পদের যে-পরিসীমা স্থির করা হয়েছিলো, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তে পরিণত-হওয়াদের বৈধতা দিয়ে সংস্থান করতে শেখ মুজিবুর রহমান সে-পরিসীমা বৃদ্ধি করতে থাকেন। বস্তুতঃ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতির অস্বীকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংসের প্রথম পর্ব। ১৯৭৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সে-পথেই চলছে বাংলাদেশ।

    (৩) বিশ্বাসঘাতকতাঃ  বাংলাদেশের শিক্ষা-বঞ্চিত অসচেতন দরিদ্র সাধারণের সাথে শিক্ষিত চতুর মধ্যবিত্তরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শেষোক্তরা নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা, দূর্নীতি, শঠতা, ধূর্ততা ও মিথ্যাচারকে জীবনের কৌশল হিসেবে অবলম্বন করে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোটি-কোটি শ্রমজীবী মানুষের উপর শোষণ ও নিপীড়ন চালিয়ে, গত ৪২ বছরে বিশাল সম্পদশালী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ আজ স্পষ্টতঃ ধনবান ও দরিদ্র এ-দু'টি শ্রেণীতে বিভক্ত। ধনবান শ্রেণীতে আছে পুঁজিপতি, শিল্পপতি, ভূস্বামী, বণিক, ব্যাংক মালিক, সামরিক-বেসামরিক আমলা, কৌশলবিদ, সুবিধাপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী, ইত্যাদি। বিপরীতে, দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক, কর্মচারী, ক্ষেতমজুর, বেকার, ইত্যাদি। এ-দু'টি শ্রেণীর মানুষের চেহারা-সুরত, আবাস-নিবাস, পোশাক-আশাক, খাদ্য-পানীয়, আনন্দ-আহ্লাদ, শিক্ষা-দীক্ষা, মান-মর্যাদা, রুচি-সংস্কৃতি, ভাষা-বুলি, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন-মনন এতোই পার্থক্যপূর্ণ যে, ‘জাতি’ বা ‘নাগরিক’ নামে এক অভিন্ন প্রকরণে এ-দু'টি শ্রেণীকে দেখা বস্তুতঃ মিথ্যারই নামান্তর।

    (৪) শ্রেণী-রাষ্ট্রঃ শ্রেণী-বিভক্ত বাংলাদেশে ‘সকলের জন্যই সমান’ বলে কিছু নেই - বস্তুতঃ সব কিছুই ধনবান শ্রেণীর পক্ষে। আইন পরিষদ, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, আইন-প্রয়োগী ও প্রতিরক্ষা বাহিনী, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তি - সবকিছুই - পরিচালিত হচ্ছে ধনবান শ্রেণীর পক্ষে। কারণ, প্রাকযুদ্ধের মধ্যবিত্ত তথা যুদ্ধোত্তর উচ্চবিত্তরাই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। দরিদ্র শ্রেণীর কারও পক্ষে পার্লামেন্টের সদস্য হওয়া অসম্ভব; তাই পার্লামেণ্ট তথা সরকার হচ্ছে ধনবান শ্রেণীর। আমলাতন্ত্রে ও বিচারবিভাগে প্রবেশ করতে হলে যে-শিক্ষা ও সংযোগ লাগে, তা দরিদ্র শ্রেণীর নাগালের বাইরে। পুলিস ও মিলিট্যারির উচ্চস্তরে প্রবেশ বস্তুতঃ শুধুমাত্র ধনবান শ্রেণীর জন্য সংরক্ষিত। রাজনীতির কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব একান্তভাবে ধনবান শ্রেণীর হাতে। এমনকি দরিদ্র শ্রেণীর রাজনীতি করে বলে যে দলগুলো আছে, সেখানে যোগ দিয়ে জিন্দাবাদ ও জীবন দেবার সুযোগ থাকলেও নেতৃত্বে আসীন হবার কিংবা শ্রেণী স্বার্থ প্রকাশ করার সুযোগ দরিদ্র শ্রেণীর নেই। অর্থাৎ, নিজেরা ছাড়া দরিদ্র শ্রেণীর পক্ষে কোথাও কিছু নেই।

    (৫) শ্রেণী সংগ্রামঃ  বাংলাদেশের দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে কোনো অভ্যন্তরীণ মৌলিক বিরোধ নেই, কারণ তারা সবাই ধনবান শ্রেণীর দ্বারা শোষিত ও নিপীড়িত। শোষণ ও নিপীড়নের যন্ত্র অর্থাৎ রাষ্ট্র শোষিত ও নিপীড়িতরা নিয়ন্ত্রণ করে না বলে যৌক্তিভাবেই সেই শ্রেণীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরী হওয়ার অভ্যন্তরীণ কারণ নেই। তেমনিভাবে ধনবান শ্রেণীর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ মৌলিক পার্থক্য নেই - কারণ, এ-শ্রেণীর সবাই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সদ্ব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হয়েছেন। তবে, শোষণ ও নিপীড়নের যন্ত্রটি ধনবান শ্রেণীর কোন্‌ অংশ বা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়া সম্ভব। কিন্তু, এ-বিরোধ যতোই যুদ্ধংদেহী মনে হোক না কেনো, তা মৌলিক নয়। বাংলাদেশের মৌলিক বিরোধ হচ্ছে ধনবান শ্রেণীর সাথে দরিদ্র শ্রেণীর, যা পৃষ্ঠদেশে দেখা না গেলেও, দিন-দিন তীব্রতর হচ্ছে। আর, তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়া শ্রেণী-বিরোধ এড়াবার জন্য ধনবান শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ বিরোধকে বিশাল ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দেখানো হয়। অবশ্য, এ-বিরোধ যদি ধনবান শ্রেণীর সমন্বিত স্বার্থকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে, তখন তারা আপোষ কিংবা পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নিয়ে আসে। এ-প্রক্রিয়ার এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে দোষারোপ করে দরিদ্র শ্রেণীকে নিজ গোষ্ঠীর পক্ষে টানতে চায়।

    (৬) পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদঃ  পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়মানুসারেই, পুঁজির কলেবর বৃদ্ধি পেলে, তা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে আরও মুনাফার উদ্দেশ্যে স্বদেশের ধনবান শ্রেণী বিদেশের দরিদ্র শ্রেণীকেও শোষণ ও নিপীড়ন করতে উদ্যত হয়। সে একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী, অন্যদিকে আবার আন্তর্জাতিকতাবাদীও, যার আরেক নাম হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। আন্তর্জাতিকতার সুবাদে পুঁজিবাদী দেশগুলো পরস্পরের সাথে একদিকে সহযোগিতা ও অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। সবলে-সবলে প্রতিযোগিতা তীব্রতা একটি মাত্রায় উন্নীত হলে, তা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আর, সহযোগিতার মাত্রা একটি পর্যায়ে উন্নীত হলে, সাম্রাজ্যবাদী জোট নিয়ে দুর্বল পররাষ্ট্রকে অধীনতামূলক মিত্রতায় বাধ্য করতে এবং অন্যথায় আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। এ-অধীনতামূলক মিত্রতা নিয়েও দুর্বল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে থাকে। এক গোষ্ঠী এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মিত্রতা পেলে, অন্য গোষ্ঠী তার বিরোধী হয়ে, অপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মিত্রতা কামনা করে। আবার এদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেলে, কখনও কখনও তারা শ্রেণীগতভাবে আপাতঃ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী হয়েও উঠতে পারে।

    (৭) সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বযুদ্ধঃ  বিশ্ব পুঁজিবাদ আজ তৃতীয় মহাসঙ্কটে নিপতিত হয়েছে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের পুরনো প্রতিষ্ঠিত ও নতুন বিকাশমান পরাশক্তিগুলো নানা স্বার্থে ও নানা বিবেচনায় নানা প্রকারের ঐক্য ও চুক্তির জাল রচনা করে একটি জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ এ-জটিল জাল থেকে মুক্ত নয়। ভূ-কৌশলিক অবস্থানের কারণে পশ্চিমা পরাশক্তি, রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভারত চাইবে (ক) বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের চীন-সীমান্ত পর্যন্ত সামরিক ও রসদ পরিভ্রমণের উপযোগী অবকাঠামো, (খ) শান্তি ও যুদ্ধকালীন ভারতীয় অর্থনীতির পরিপূরক বাংলাদেশ অর্থনীতি, (গ) ভারতের কাছে স্বচ্ছ ও সহযোগী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ঘ) ভারত-বান্ধব বাংলাদেশ সরকার এবং (ঙ) বাংলাদেশে ভারত-মৈত্রীর সাংস্কৃতিক পরিবেশ। অন্যদিকে, চীন ও পাকিস্তান চাইবে ভারত যেনো বাংলাদেশকে তার সুবিধামতো ব্যবহার করতে না পারে। আবার, চীনের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে যথাসম্ভব নিকট থেকে বিমানাক্রমণ করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের জন্য বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে সর্বোত্তম ভূ-কৌলিক স্থান। তাই, যুদ্ধের ঝুঁকি যতোই বাড়বে, এ-শক্তিগুলো বিভিন্ন সমীকরণে যৌথ ও এককভাবে বাংলাদেশের শাসক ধনবান শ্রেণীকে কিংবা এর এক বা একাধিক গোষ্ঠীকে সাথে রাখার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কেবলমাত্র বাংলাদেশের শাসক ধনবান শ্রেণীর অভ্যন্তীরণ বিভিন্ন গোষ্ঠির প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা হিসেবে না দেখে উপরের জটিল বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।

    (৮) শোষণ ও বঞ্চনাঃ  বাংলাদেশের আন্দাজিত ১৬ থেকে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সিংহভাগ দরিদ্র শ্রেণীর, সামান্য মধ্যবিত্ত এবং মুষ্ঠিমেয় মাত্র ধনবান শ্রেণীর। সাধারণভাবে ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা সম্পূর্ণ মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাঁরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য পাচ্ছেন না; তাঁদের বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংস্থান নেই; শীতকালে দেহ রক্ষার জন্য তাঁদের যথেষ্ট বস্ত্র নেই; তাঁদের অধিকাংশ গৃহহীন কিংবা বস্তিবাসী; তাঁরা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত; তাঁদের সন্তানেরা প্রাথমিক শিক্ষার অধিকারটুকু পাচ্ছে না; তাঁদের সুস্থ বিনোদনের কোনো সঙ্গতি নেই। মোট কথা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ ৪২ বছর আগে স্বাধীন হয়েছে, তাতে নেতৃত্বদানকারী মধ্যবিত্তের বিরাটাংশ রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চবিত্তে পরিণত হলেও, তাদের কেউ-কেউ হাজার-হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেও, যুদ্ধে সর্বাধিক প্রাণ-দেয়া ও অত্যাচারিত-হওয়া দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ আজ মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

    (৯) বঞ্চনা ও মৃত্যুঃ  বাংলাদেশে একটি অমানবিক এবং নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতির চর্চা হচ্ছে, যাকে রীতিমতো চুরি-ঠগবাজি ও লুন্ঠন-ডাকাতির সাথে তুলনা করা যায়। বাংলাদেশের ধনিক-বণিক শ্রেণী দরিদ্র শ্রমজীবী শ্রেণীর শ্রমে উৎপাদিত পণ্য দেশে-বিদেশে বিক্রি করে হাজার-হাজার কোটি টাকা লাভ করলেও, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি তো দিচ্ছেই না, বরং প্রতিশ্রুত অন্যায্য মজুরির টাকাও মাসের পর মাস বকেয়া রেখে বাস্তবে তাঁদেরকে শ্রমদাসত্বে বেঁধে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁদেরকে নুন্যতম মানুষের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে না, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের যে নুন্যতম স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন, সেটুকুও করা হচ্ছে না। অগ্নিদগ্ধ হয়ে, ভবন বিধ্বস্ত হয়ে শতো-শতো শ্রমিকের প্রাণহানি হচ্ছে। ২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনের কারখানায় প্রায় দেড়শো এবং সর্বশেষ ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা বিধ্বস্ত হয়ে যে কতো শতো প্রাণ হারিয়েছেন, তার সঠিক হিসেব এখনও অজ্ঞাত। প্রতিবারই রাষ্ট্র ও সরকারকে চরম দায়িত্বহীনতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিতে দেখা যায়। বস্তুতঃ দরিদ্র শ্রেণীর দুর্বিপাকে-দুর্দিনে ধনবান শ্রেণীর রাষ্ট্র ও সরকার তেমন কোনো কাজেই লাগে না। একমাত্র দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরাই তার নিজের শ্রেণীর সাহায্যে এগিয়ে আসে।

    (১০) কী করতে হবেঃ  উপরের পর্যবেক্ষণ থেকে এ-সত্য বেরিয়ে আসে যে, বাংলাদেশের দরিদ্র শ্রেণীকে পৃথিবীতে মানুষের পরিচয়ে ও মানুষের মর্যাদায় বাঁচতে হলে নিজেদের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সুতরাং বুঝতে হবে যে,

    প্রথমতঃ মুনাফার উদ্দেশ্যে ব্যক্তি-মালিকানাধীন উৎপাদন ব্যবস্থা - অর্থাৎ, পুঁজিবাদকে - সমাজের সকল মানুষের জীবনের মানোন্নয়ের উদ্দেশ্যে সামাজিক মালিকানাধীন উৎপাদন ব্যবস্থা - অর্থাৎ, সমাজতন্ত্র - দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে সুখসমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন অর্জন সম্ভব নয়।

    দ্বিতীয়তঃ সমাজতন্ত্র এমনিতেই আসে না। বিপ্লবের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হলো ধনবান শ্রেণীকে রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তৃত্ব থেকে হটিয়ে দিয়ে শ্রমজীবী শ্রেণীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা। এ-হটানোর কাজটি করতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ও সর্বতোভাবে।

    তৃতীয়তঃ শ্রমিকশ্রেণী ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণীর পক্ষে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করা সম্ভব নয়। তাই, শ্রমিক শ্রেণীকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। কারণ, একমাত্র শ্রমিকরাই হচ্ছে সে-শ্রেণী, যার শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার মতো কিছু নেই, জয় করার মতো আছে সারা দেশ, সারা বিশ্ব। তাই, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক শ্রেণীকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

    চতুর্থতঃ বুঝতে হবে, সংগঠিত শক্তি বিরুদ্ধে অসংগঠিত শক্তি লড়াই করে বিজয়ী হতে পারে না, কিংবা আপাতঃ পারলেও সে-বিজয় ধরে রাখা যায় না। তাই, শ্রমিক শ্রেণীর সবচেয়ে সচেতন অংশের বুদ্ধিমান, সাহসী, ধৈর্য্যশীল, দায়িত্বশীল ও লড়াকু লোকদের নিয়ে বিপ্লবের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে এবং সে-দলই হতে পারে প্রকৃত অর্থেই শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল।

    পঞ্চমতঃ সে-বিপ্লবী দলের অধীনে কারখানায়-কারখানায়, অঞ্চলে-অঞ্চলে ও জেলায়-জেলায় সংগঠন গড়ে তুলতে হবে এবং সে-সমস্ত সংগঠনকে সমস্ত ধরণের শ্রমিক-স্বার্থ বিরোধী বোধ-বুদ্ধি-আবেগ-আচরণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং খোলামেলা আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। ভুল হলেও গণতান্ত্রিকতার বিকল্প হিসেবে জ্ঞানতান্ত্রিকতা গ্রহণ করা যাবে না।

    ষষ্ঠতঃ শ্রেণী হিসেবে একমাত্র শ্রমিক শ্রেণীই পারে সমাজের অন্যান্য শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীর নেতৃত্ব দিতে। তাই, শহরের দরিদ্র কর্মজীবী থেকে শুরু করে গ্রামের ক্ষেতমজুর ও প্রান্তিক কৃষক-সহ সকল নিপীড়িত শ্রেণীর নেতৃত্ব দিতে হবে শ্রমিক শ্রেণীকে - অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনীর সংগঠিত রূপ সেই বিপ্লবী দলকে।

    সপ্তমতঃ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্ত শ্রেণী থেকে কিছু ছাত্র-শিক্ষক, লেখক-সাংবাদিক, শিল্পী-সাহিত্যিক ও পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী বিপ্লবের আকর্ষণে আসতে চাইবে। কিন্তু ওঁদের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতে হবে। কারণ, ওঁরা পুঁজিবাদী সমাজের সুবিধা ও অসুবিধা দু’টিই ভোগ করে বিধায়, ক্ষণে সংরক্ষণবাদী ও ক্ষণে বিপ্লববাদী প্রবণতায় দোল খায়। সুতরাং ওঁরা যতোক্ষণ না পর্যন্ত বোধ-বুদ্ধিতে-আবেগে-আচরণে আপন শ্রেণী ত্যাগ করে, শ্রমিক শ্রেণীর সাথে একাত্ম হবে ও দীর্ঘকালীন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ওঁদের বিশ্বাস করা যাবে না।

    অষ্টমতঃ কোনো বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার জন্য অন্য কোনো শ্রেণীর লোকদের উপর নির্ভর না করে নিজেদের শ্রেণীর লোকদের দিয়ে সে-বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করিয়ে নিতে হবে। অগ্রগামী বিপ্লবী শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। মাতৃভাষা-সহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষাও রপ্ত করতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস, বিশ্বের শিল্প-সঙ্গীত, সাহিত্য, দেশে-দেশে বিপ্লবী আন্দোলনের অতীত ও বর্তমান ধারা ও বিকাশ সম্পর্কে জানতে হবে। ধনবান শ্রেণীর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের যে-বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রমিকদের স্থান নেই, তার বিপরীতে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে শ্রমিকদের জন্য।

    নবমতঃ শ্রমিক শ্রেণীকে সবসময়েই তার মনুষ্য পরিচয় বজায় রাখতে হবে। কারণ, মানুষ মানুষ হয়েছে শ্রমের কারণে। তাই, প্রকৃত মানুষ মানেই শ্রমিক এবং শ্রমিকই মানেই মানুষ। তাই, পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে একটি অখণ্ড সত্ত্বা মনে করতে হবে এবং নিজেদেরকে সমগ্র মানবজাতির অংশ মনে করে পৃথিবীর সকল দেশের শ্রমজীবী মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে তাদের সুখে-দুঃখে সাড়া দিতে হবে।

    দশমতঃ নিজ দেশের পুঁজিবাদকে পরাস্ত করে এর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হলে, শুধু নিজদেশে নয়, বিশ্ব-পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী জোট ও তৎপরতার বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লড়াকু শ্রমিক শ্রেণীর সাথে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এ-ঐক্যের ভিত্তিতে আগামী দিনের যে-কোনো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব ফ্রণ্ট গড়ে তুলে বিশ্ব-শান্তির পক্ষে সংগ্রাম জারি রাখতে হবে এবং জাতির নামে যে-কোনো ধরণের বজ্জাতি রুখে দিতে হবে।

    মে-দিবসের কর্মসূচি
    উপরের উপলব্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর যা করণীয়, তা একটি পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যতো দ্রুত এ-উপলব্ধি অর্জিত হবে, ততো দ্রুতই সে-পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। শ্রমিক শ্রেণীর বাইরে মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত শ্রেণী থেকে যাঁরা ডিক্লাসড্‌ বা শ্রেণীচ্যুত হয়ে শ্রমিক শ্রেণীর সাথে একাত্ম হতে চান, তাঁদের উচিত হবে ‘ফিলান্‌থ্রোপিক স্যাক্রিফাইস’ বা জনহিতকর ত্যাগের ধারণা থেকে না এসে, প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জন করার আনন্দ নিয়ে, শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব মেনে নিয়ে, তার সাথে একাত্ম হয়ে, প্রকৃত শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল গড়ার কাজ শুরু করা।

    আমি মনে করিঃ আসছে মে-দিবস এ-মুহূর্তে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মধ্যে জাগরণ ও উত্থান সৃষ্টি করার জন্য একটি মাহেন্দ্রক্ষণ। ২৪শে এপ্রিল সাভারের শ্রমিকদের যে-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে, তার প্রতিকার কয়েকজন মালিককে গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে হবার নয়। যেটি প্রয়োজন, তা হচ্ছে, শক্তিশালী শ্রমিক-আন্দোলন ও দেশের রাজনৈতিক দিগন্তে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী শক্তির আবির্ভাব। তাই, আজকের সাভারের শোককে শক্তিতে পরিণত করার জন্য এ-মুহূর্তে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর কর্তব্য হচ্ছে আগামী ১লা মে তারিখে ঢাকাতে স্মরণকালের বৃহত্তম শ্রমিক সংহতি সমাবেশে অনুষ্ঠিত করা। আমি প্রস্তাব করছিঃ

    (১) গত ২৪শে নভেম্বরে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ও ২৪শে এপ্রিলে সাভার রানা প্লাজার বিধ্বংসে অজ্ঞাত সংখ্যক শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে এবং সারা দেশের ও সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে মে-দিবসে শাহবাগ চত্তরে সমাবেশে মিলিত হোন। প্রতিটি কারখানা ও অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় শ্রমিকদের সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে সমাবেশের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্ব-পরিকল্পনা-সহ, নিজের কান-উচ্চতার লাঠি ও লাঠির মাথায় লাল পতাকা উড়িয়ে সমাবেশে আসুন। দেশের মূল সমস্যার প্রতি দৃষ্টিহীন ও শ্রুতিহীন মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের তথাকথিত গণজাগরণ জঞ্জাল হটিয়ে দিয়ে, শাহবাগকে শ্রমিক জাগরণের কেন্দ্রে পরিণত করুন এবং সম্পূর্ণ শ্রমিক-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন।

    (২) নিহত ও আহত শ্রমিকদের পূর্ণ তালিকা ও ঘটনার সরকারী শ্বেতপত্র প্রকাশ ও ক্ষতিপূরণ দাবি করুন। সেই সাথে, যাঁদের অবহেলার জন্য কার্যতঃ হত্যাকাণ্ড ঘটলো, তাঁদেরকে বিচারের দাবি তুলুন (দয়া করে বিচারের রায় নিজেরা নির্দেশ করবেন না)।

    (৩) প্রতিটি কারখানা-ভবনের নির্মাণ প্রকৌশলগত উপযুক্ততা ও নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য শ্রমিকদের অংশগ্রহণে ‘হেলথ এ্যাণ্ড সেইফটি কমিটী’ গঠন করে সে-কমিটীর ছাড়পত্র নিয়ে ফ্যাক্টরী চালাতে হবে এবং প্রতিটি শ্রমিকের জন্য স্বাস্থ্য-বীমা, দুর্ঘটনা-বীমা ও জীবন-বীমা নিশ্চিত করতে হবে। এরই সাথে, খণ্ডকালীন, পূর্ণকালীন, স্থায়ী, অস্থায়ী, দক্ষ, অদক্ষ, নারী, পুরুষ, নবীশ নির্বেশেষে প্রত্যেক শ্রমিককে তাঁর কাজের জন্য নিয়োগপত্র দিয়ে প্যে-রোলের অন্তর্ভূক্তি এবং নায্য মজুরি, কর্ম-নিরাপত্তা, ৮-ঘণ্টার কর্মদিবস, ওভারটাইমের সকল ধরণের বাধ্যতা বাতিল ও ট্রেইড ইউনিয়নের অধিকার দাবি করুন।

    (৪) প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি কর্মক্ষম নর-নারীর জন্য কাজ এবং প্রতিটি শ্রমিক ও কর্মচারীর জন্য নুন্যতম ৩ মণ চালের মূল্যের ন্যাশনাল মিনিমাম ওয়েজ বা জাতীয় ন্যুনতম মাসিক মুজরী দাবি করুন। কর্মক্ষম বেকারদের জন্য বেকার ভাতা এবং অসক্ষম ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ভাতা দাবি করুন।

    (৫) লাল পতাকাবাহী শ্রমিকের পদভারে ঢাকা মহানগরী কাঁপিয়ে তুলুন! নিষ্ঠুর, ঠগ, মিথ্যুক, অত্যাচারী, অমানুষ ধনিক-বণিক শ্রেণী ও তাঁদের দালাল দল ও সরকারকে আতঙ্কিত করে তুলুন! কপট শ্রমিক দরদী ও ভুয়া বিপ্লবীদের উন্মোচিত করুন! ভণ্ড ধর্মগুরু, যিনি সাভারের শ্রমিকের মৃত্যুকে তাঁর ‘আল্লাহ্‌র গজব’ বলে চরম নিষ্ঠুরতা ও অমনুষ্যত্ব প্রদর্শন করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মানুষের 'গজব' হাঁকুন! সারা বিশ্বের পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান!

    মে-দিবসের এ-কর্মসূচির ভিত্তিতে বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের উত্থান ঘটলে, তাঁদের মধ্যে যে আত্ম-প্রত্যক্ষণ ও আত্ম-প্রত্যয় সৃষ্টি হবে, তার ভিত্তিতে তাঁরা নিশ্চয় পরবর্তী কর্মসূচি স্থির করতে পারবেন। তবে সমস্ত কর্মসূচির লক্ষ্য হতে হবে আগামী দিনের শ্রমিক বিপ্লব।

    শনিবার, ২৭শে এপ্রিল ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

এ কি স্বপ্ন না বাস্তব কোন পরিকন্পনা? বাংলাদেশের কল-কারখানায় কি এ বার্তা পৌছে গেছে? দেখা যাক, আগামীকান শাহাবাগে কি ঘটে।

The lesson that we must draw from November Revolution is that for the success of a revolution there are three preconditions. The first is, on the basis of a correct revolutionary theory, ideology and base political line, the emergence of a genuine revolutionary party of the proletariat with adequate organizational strength to provide leadership. Evading this basic issue and undermining the importance of the base political line, those who speak only of organizational strength, confuse in reality the main point at issue....... Time and again, the various teachings of Lenin’s and the history of world communist movement have upheld the same truth.

The second essential condition for revolution is the United Front. At the initial stage of democratic movement, building up of United Front of left and democratic forces and after passing this phase, giving birth to the proletarian United Front — a front essential for the anti-capitalist revolution.

The third prerequisite for revolution is to develop through the united mass movements or joint struggles people’s own instrument of struggle, meaning thereby, giving birth to the political power of the people, which will be unlike the municipal committees or the local and district committees of the representatives of the constituent political parties of the United Front. These will be organizations, more or less like the Soviets of the workers and peasants in Russia, developed through united struggle of the workers and peasants having the competence to accept or reject any programme, as also having the initiative and capability to apply them concretely and independently. Unless these three essential preconditions of revolution are fulfilled, movements may come in wave after wave, millions of people may plunge in these movements and lay down their lives again and again, but there will be no revolution. Revolution and revolt or agitation are not one and the same. By revolution we mean the politically conscious, organized and armed uprising of the masses on the basis of a definite aim and object, a correct ideology and the genuine revolutionary political line of the proletariat. And the more the people will advance towards fulfilment of these essential conditions, the brighter will become the prospect of a radical transformation of the present situation in India and the more purposive will be the observance of November Revolution anniversaries in our life. - UNDER THE BANNER OF THE GREAT NOVEMBER REVOLUTION - COMRADE SHIBDAS GHOSH

three conditions are necessary for revolution — first, a correct political line, outlook and ideology for revolution; second a correct revolutionary party, that is, a party really capable of providing leadership to revolution; and, third, a well-forged powerful united front for conducting united mass movement. The right time for revolution comes only when these three conditions are fulfilled together. That is, for revolution it is imperative that there is simultaneous fulfilment of the three conditions. It will not suffice that only the people have become united. Or else, have not the people of West Bengal fought united before this? Have not the people of India ever taken to the streets in hundreds of thousands? Have not the peasants and workers, students and youths of this country laid down their lives? Yes, they have and on many occasions. But, that did not leave behind even a scratch on the present social system. Rather what has happened after each and every movement? Feelings of despondency and frustration have gripped the people. The left movement, mass movements have grown weaker, these have been shattered to pieces. The forces of reaction alone, the capitalists, have become continually stronger.-PROBLEMS OF MASS MOVEMENTS IN INDIA — SHIBDAS GHOSH

Marx and Engels taught that,without its own party, the working class certainly could not win victory over capitalism, could not lead the whole of society forward to the abolition of capitalism and the establishment of socialism. The working class must have its own party, independent of all bourgeois parties. Further developing the Marxist teachings about the party, Lenin showed that the party must act as the vanguard of its class, the most conscious section of its class, and that it is the instrument for winning and wielding political power. ("Materialism and the Dialectical Method" by Maurice Cornforth)
If there is no true working class party in Bangladesh who will implement above theses?

“The philosophers have only interpreted the world, in various ways: the point, however, is to change it.”
― Karl Marx, The German Ideology

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন