• বাংলাদেশের সুশীল সমাজের ফাঁপা কণ্ঠস্বর মুহাম্মদ ইউনূস
    ওমর তারেক চৌধুরী

    ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাবার মুহাম্মদ ইউনূসের ভাঁওতাবাজিকে লুফে নিয়েছিল সারাবিশ্বের গণমাধ্যম, রক্ষণশীল ঘরনার চিন্তাশালাগুলো আর পণ্ডিতরা। বিজ্ঞাপনের প্রতারণাতুল্য বাস্তবতাবর্জিত একথার মধ্যে আসলে ছিল নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থার সাথে মিল রেখে ক্ষুদ্রঋণের প্রসারে জোরেসোরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আদায়, উন্নত দেশগুলোর বৈদেশিক সাহায্যের ধারা পরিবর্তনে সহায়ক পরিবেশ রচনা এবং বড় বড় লগ্নীকারীকে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্রদের মাঝে চড়া মুনাফায় অর্থ লগ্নী এবং প্রযুক্তি/পণ্য/সেবা বিক্রির (জুতা থেকে সেল ফোন ও সোলার প্যানেল উল্লেখ্য) সম্ভাবনার দরজা চিনিয়ে দেয়া।

    দারিদ্র্য জাদুঘরের অগ্রগতি বোঝা যাবে ছোট দুটি পরিসংখ্যান থেকে। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের ১৯৯০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮৪% মানুষের বাস ছিল দারিদ্র্যরেখার নিচে। ১৯ বছর পর, ২০০৯ সালের প্রতিবেদন বলছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৮০% দৈনিক আয় দিনে দুই মার্কিন ডলারের কম। বাংলাদেশে ৩৫ বছর ধরে ক্ষুদ্্রঋণ পরিচালনার ফলাফলের এই হালকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন ডেনিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক টম হাইনম্যান তার প্রামাণ্যচিত্র ‘দি মাইক্রো ডেট’ এ। গত বছর বিশ্ব জুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম ২৯% বৃদ্ধির ফলে নতুন করে চার কোটি চল্লিশ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। কাজেই পৃথিবীব্যাপী ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপক প্রসারের পরও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে অতি সহজেই দারিদ্র্য দূর করা যাবে, তেমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। বরং চলমান পদ্ধতির ক্ষুদ্রঋণ বিভিন্ন দেশে সৃষ্টি করেছে দরিদ্রদের কাছ থেকে নির্মমভাবে সুদ আদায় (কোনো কোনো দেশে ২২৫% পর্যন্ত), সামাজিক অশান্তি, আত্মহনন, বাস্তুচ্যুতির মতো ঘটনা। বিভিন্ন মাত্রায় বাংলাদেশেও এসব ঘটনার বিপুল আলামত আছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ক্ষুদ্রঋণের কার্যকারিতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন টম তার ডকুমেন্টারিটিতে; সেখানেই প্রাসঙ্গিকভাবে বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের অনিয়মের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার তহবিল নিয়ে অনিয়মসহ গ্রামীণ ব্যাংকের অন্যান্য বিষয় তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিগত ৬ ডিসেম্বর। পর্তুগালে অবস্থানরত ড. মুহাম্মদ ইউনূস যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে সংবাদমাধ্যমের উত্তেজনাকে প্রশমিত করেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, তদন্তের মাধ্যমে জনগণের সামনে সত্য উদঘাটিত হয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটবে।

    কিন্তু, দুর্নীতির বিরোধিতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, জানার অধিকার, প্রভৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরব মু. ইউনূসের প্রকৃত রূপ বের হয়ে আসা শুরু হয়েছে সরকারি তদন্ত শুরু হবার পর থেকেই। তিনি তার আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবহার করে গণমাধ্যম দ্বারা প্রচারণা শুরু করেছেন যে, সরকারি তদন্ত আসলে তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও বিদ্বেষপ্রসূত, গ্রামীণ ব্যাংককে দখল করে নির্বাচনের কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে তার রাজা-রানী-প্রেসিডেন্ট-ফার্স্ট লেডি বন্ধুদের দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই তদন্ত বন্ধ করার জন্য। চারিত্রিক সনদ নিয়ে হাজির হয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটিও।

    নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের সময় থেকে গত ১১০ বছরে পদকপ্রাপ্ত কারো জন্য নোবেল কমিটির (নো.ক.) কোনো বিবৃতি বা চারিত্রিক সনদ দেবার ইতিহাস নেই। নো.ক. বাংলাদেশে এক্ষেত্রে ইতিহাস গড়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ইউনূসের ক্ষেত্রে নো.ক. দু’বার এমন অভিনব কাণ্ড করল। নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর আয়কর না দেবার জন্য ইউনূস নো.ক.এর কাছ থেকে চিঠি আনিয়েছিলেন। সরকারি সুবিধা নেয়ায় উদারচিত্তের ইউনূসের কর প্রদানে সহজাত যে অনুদারতা আছে, তাতে মদত দিয়েছিল নোবেল কমিটি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলাদেশের কোষাগার তথা গরিব মানুষরা।

    দরিদ্র নারীদের রক্ত নিঙরানো টাকায় নির্মিত গ্রামীণ ব্যাংক ভবনের ১১,০০০ বর্গফুটের জন্য মাসিক এক টাকা ভাড়া প্রদানকারী ‘ইউনূস সেন্টার’ থেকে বিবৃতিটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এসেছে। নো.ক.র ওয়েব সাইটে বা আন্তর্জাতিক কোনো মিডিয়াতে বিবৃতিটির অস্তিত্ব না দেখে সঙ্গতভাবে অনুমান করা যায় যে, বাংলাদেশে জনমত গঠন এবং সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্যই বিবৃতিটি আবির্ভূত হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।

    তারা বলছে নরওয়ের টেলিভিশনে প্রচারিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ক্ষুদ্র ঋণের জালে’ এবং বাংলাদেশে প্রকাশিত নানা সংবাদে কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নো.ক. তাদের অবস্থান জানাচ্ছে : নোবেল পুরস্কার দেবার আগে যে ধরনের যাচাইবাছাই করা হয় ‘তার চেয়ে অনেক বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে  সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে’ গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূসকে  পুরস্কার দেবার আগে। ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার দেয়া নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত না হলেও বা এ নিয়ে কারো কোনো সংশয়-উৎকণ্ঠা প্রকাশের আগেই ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’ ধারায় নো.ক. অগ্রিম আশ্বস্ত  করেছে সবাইকে। কিন্তু, বিবৃতিটির একটি লাইন উদ্বিগ্ন ও কৌতূহলী করে তুলবে এর উদ্দেশ্য ও নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে ‘যখন একটি ব্যাংকের ৭০ থেকে ৮০ লাখ ঋণগ্রহীতা থাকে, তখন তার মধ্যে কিছু নেতিবাচক উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে।’ এই বাক্যটির মধ্যে গুরুতর ও ভয়ানক কয়েকটি দিক রয়েছে :

    • নো.ক. তাহলে স্বীকার করছে যে ‘কিছু নেতিবাচক উদাহরণ’ আছে। সেক্ষেত্রে তাদের ‘অনেক বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে  সিদ্ধান্ত নেয়া’র ফল কী দাঁড়ালো? তারা অনিয়ম জর্জরিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করে কি বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দিল?
    • তাদের কথায় মনে হচ্ছে নেতিবাচক উদাহরণের দায়দায়িত্ব যেন ৭০-৮০ লাখ দরিদ্র ঋণগ্রহীতার। কিন্তু, বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে যে অনিয়মের অভিযোগ প্রামাণ্যচিত্রে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদমাধ্যমে এসেছে (নিজ পারিবারের ব্যবসার সাথে গ্রামীণ প্রধানের ব্যবসায়িক চুক্তি করা ও ঋণ দেয়াসহ অন্যান্য অনিয়ম) তার দায়দায়িত্ব কী দরিদ্র ঋণগ্রহীতাদের, নাকি ইউনূসসহ গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনাকারীদের? যাচাই-বাছাই করার সময় তারা কি তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট দাতাসংস্থাগুলোর দলিলপত্র দেখেছিলেন? যদি দেখে থাকেন, তবে মহাফেজখানায় রক্ষিত ‘কনফিডেন্সিয়াল’ ছাপমারা দলিলদস্তাবেজের ভিত্তিতে আনীত অভিযোগের হদিশ নো.ক. কেন পেল না? নরওয়ের করদাতাদের অর্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা একটি ব্যক্তিকে তারা কী দেখে এই খেতাবে ভূষিত করল? নিজ দেশের মানুষের প্রতি নো.ক.র দায়বদ্ধতার যেখানে এই হাল, সেখানে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তারা কতটুকু শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা থেকে এই বিবৃতি দিচ্ছে সে প্রশ্ন তোলা কি যুক্তিসঙ্গত নয়?
    • এই সাফাইমূলক বিবৃতি দেবার মাধ্যমে নো.ক. কি আসলে বাংলাদেশ সরকারের তদন্ত প্রক্রিয়াকে এবং সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করতে জড়িয়ে পড়ছে না? তারা কি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে না? এসব প্রশ্নকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলমহল ও সর্বসাধারণকে গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখতে হবে।

    গ্রামীণ বিষয়ক সরকারি তদন্তকে প্রভাবিত করার অন্য তৎপরতাগুলোর কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে হিলারি ক্লিনটনের ফোন করার পেছনে এই তদন্ত বিষয়ে তদবিরের উদ্দেশ্য ছিল বলে অনেকে অনুমান করছেন। বাংলাদেশের মানুষ আর সরকারকে দুর্নীতি দমনে পরামর্শদাতা বিশ্বব্যাংকসহ কিছু বিদেশী দূতাবাস বিশেষভাবে তৎপর রয়েছে এক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে বিরামহীন তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে। বাংলাদেশের সকল সরকার উদারহস্তে গ্রামীণ ব্যাংকে সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে গেছে এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন এর পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছিল। তাঁর সরকারই ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে ডুবন্ত-প্রায় গ্রামীণ ব্যাংককে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের আংশিক মালিকানা বরাবর সরকারেরই ছিল। এসব সত্যকে উপেক্ষা করে নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, গার্ডিয়ান, ইকোনমিস্ট, সিএনএন, বিবিসি ক্রমাগতভাবে গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় বলছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনূসের প্রতি ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও বিদ্বেষ থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং সরকার ব্যাংকটি দখল করতে যাচ্ছে।

    বিবৃতিটির সাথে সংশ্লিষ্টতা থেকে অনুমান করা যায় যে, আন্তর্জাতিক প্রচারণা দিয়ে জনমত তৈরি ও চাপ প্রয়োগ করে তদন্তকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ইউনূস সেন্টারের ভূমিকা থাকা অস্বাভাবিক নয়। যে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে অবস্থিত ইউনূসের জনসংযোগ শাখাটি তদন্তকে প্রভাবিত করতে যেভাবে সক্রিয়তা দেখাচ্ছে তাতে তদন্তের ব্যাপারে তার প্রকৃত মনোভাব ফুটে উঠেছে। কারো বিষয়ে তদন্ত পরিচালনার সময় তদন্তের স্বার্থে সাধারণত তাকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। অথবা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাবশত তিনি নিজেই সরে দাঁড়ান। কিন্তু, এ দুটির কোনোটিই পরিলক্ষিত হচ্ছে না এক্ষেত্রে। ইউনূসের প্রতি সম্মানবশত তাঁকে সরিয়ে না দিয়ে অর্থমন্ত্রী তাঁকে সরে দাঁড়াবার প্রকাশ্য অনুরোধ জানালেও, মুহাম্মদ ইউনূস তা মেনে না নিয়ে যেভাবে হইচই শুরু করেছেন, তাতে এই তদন্তের প্রতি তাঁর অসহায়তামূলক আচরণ ফুটে উঠছে প্রকটভাবে। তাঁর এমন নির্লজ্জ আচরণই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বরটি কতখানি ফাঁপা।

    ওমর তারেক চৌধুরী Micro Credit: Myth Manufactured (শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা) গ্রন্থের অন্যতম বাংলাদেশী প্রদায়ক।
    ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০১১

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন