• বাঙালীত্বঃ ক্ষমতার গঠনে আছে প্রয়োগে নেই
    মাসুদ রানা

    কেউ পছন্দ করুন বা না-করুন, টাওয়ার হ্যামলেট্‌স হচ্ছে ব্রিটেইনের বাঙালীর রাজধানী। এটি শুধু বাঙালী-বসতির ঘনত্বের কারণে নয়, এটি বাঙালীর রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনের কারণেও।

    টাওয়ার হ্যামলেট্‌সে প্রত্যক্ষ ভৌটে এক্সিকিউটিভ ক্ষমতাধর মেয়র নির্বাচন বিধি প্রবর্তিত হওয়ার পর, গত ২২শে মে গেলো দ্বিতীয় নির্বাচন। এবার মেয়র নির্বাচন ও কাউন্সিলার নির্বাচন সম্পন্ন হলো একই সাথে।

    নানা কারণে, গতবারের চেয়েও এবারের নির্বাচন সারাদেশের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।

    গত নির্বাচনে লেবার পার্টির বিরুদ্ধে লেবারেরই প্রাক্তন নেতা, বাঙালী বংশোদ্ভূত লুতফুর রহমান, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় লাভ করে ব্রিটেইনের রাজনীতিতে একজন বহু-আলোচিত রাজনীতিকে পরিণত হন।

    এবার শুধু লেবার পার্টিই নয়, দৃশ্যতঃ ব্রিটিশ সংবাদ-মাধ্যম বিবিসিও লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে লুৎফুর রহমান অধিক আলোচিত ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে এবারের নির্বাচনে লুতফুর রহমান আবারও বিজয়ী হয়েছেন।

    প্রশ্ন উঠেছেঃ লুতফুর রহমানের এই বিজয়ের পেছনে কারণ কী? বিষয়টি গবেষণা করে জানার ব্যাপার। কিন্তু সাধারণভাবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, তাঁর এই বিজয়ের পেছনে আছে একটি থিওরী ও একটি আইডেণ্টিটি।

    প্রথমতঃ থিওরীটা হচ্ছে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যা তাঁর ভৌটারগণ সত্য বলে বিশ্বাস করেন। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি বাস্তবেই সত্য কি-না, বর্তমান প্রবন্ধের সেটি আলোচ্য নয়। কিন্তু জনমনে বিশ্বাসিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি হচ্ছে এই যে, লেবার পার্টি ও ব্রিটিশ এশটাব্লিশমেণ্ট অন্যায়ভাবে লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অন্যদিকে, ভৌটারগণ মনে করেন, লুতফুর রহমান তাঁর প্রতিশ্রুত পরিষেবা সন্তোষজনক ভাবে সরবরাহ করেছেন।

    দ্বিতীয়তঃ লুতফুর রহমানের ভৌট-বিজয়ের ক্ষেত্রে একটি কৌর ভৌটার গোষ্ঠির নিবিড় সমর্থন তাঁর জনপ্রিয়তা ভিত্তি ভূমি তৈরি করেছে, আর সেটি হলো বাঙালী আইডেণ্টিটি। যদিও লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইসলামবাদীদের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ও ঘনিষ্টতা অনানুষ্ঠানিক প্রচারণায় ব্যাপকভাবে আনা হয়, কিন্তু তাঁর মাঠের কর্মীরা কিন্তু বাড়ীতে-বাড়ীতে গিয়ে “আমাদের বাঙালী ভাই” বলেই প্রচার করেছেন।

    কোনো-কোনো ক্ষেত্রে লুতফুর রহমানের মুসলিম আইডেণ্টিটি তাঁর মাঠ-কর্মীদের পক্ষ থেকে ব্যবহার করা হলেও, বিজয়ের ক্ষেত্রে সেটি ডিসাইসিভ বা নির্ধারক নয় বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। আবারও বলছি, এ-বিষয়ে গবেষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

    আমি টাওয়ার হ্যামলেটসের শিক্ষাক্ষেত্রে গত দুই দশকের ধরে নিয়োজিত একজন পেশাজীবী হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় কমিউনিটির মানুষের সাথে মতবিনিময় করি। এ-সমস্ত বিনিময়ে সচেতনভাবেই রাজনীতির ইস্যু আমি না আনলেও নানাভাবে তাঁদের রাজনৈতিক মনোভঙ্গি ও মতামত প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
     
    আমি কোনো মুসলিম বাঙালী প্যারেণ্টকে “লুতফুর রহমান আমাদের মুসলমান ভাই” বলতে শুনিনি। তবে “আমাদের বাঙালী ভাই” বলতে প্রচুর শুনেছি।

    টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্ববৃহৎ এথনিক মাইনোরিটি হচ্ছে বাঙালী। ফলে, বাঙালী কমিউনিটি লুতফুরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিজয় দেখে। পরপর দুই নির্বাচনে অন্ততঃ মানুষের মধ্যে তাই লক্ষ্য করেছি।

    বাঙালী কমিউনিটির লোকদের মধ্যে বোধটা হচ্ছে এইঃ লুতফুর রহমান আমাদের বাঙালী ছেলে এবং এর বিরুদ্ধে লেবার পার্টি ও বিবিসি মিলে খুবই অন্যায়ভাবে লেগে আছে, যাতে সে ক্ষমতায় আসতে না পারে। সুতরাং মানুষের যে হাতিয়ার ভৌট, সেটি ব্যবহার করে তাঁদের ছেলেকে রক্ষা করার প্রয়াস পেয়েছেন।

    বাঙালী সেণ্টিমেণ্টে ভৌটে বিজয়ী হয়ে লুতফুর রহমান বাঙালীত্বের কতোটুক সেবা করেছেন তা অনুসন্ধানের ব্যাপার। তবে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাঙালীত্বের মধ্যে যে মুসলমানিত্ব আছে, সেটি ব্যাপক সেবায়িত হয়েছে বলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার আছে।

    কাউন্সিলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বাঙালীদের একচ্ছত্র আধিপত্য অবাঙালীদেরকে এই ধারণাই দেয় যে, টাওয়ার হ্যামলেটসের ক্ষমতা বাঙালীদের হাতে চলে গিয়েছে। কিন্তু এই ধারণা কি সত্যকে প্রতিনিধিত্ব করে?

    আমরা যদি আমাদের আলোচনার স্বার্থে ক্ষমতার কনস্টিটিউশন বা ক্ষমতা-গঠন এবং ক্ষমতার এক্সকিউশন বা ক্ষমতা-প্রয়োগ, এই দুই মাত্রার কথা বিবেচনা করি, তাহলে বলা যায়ঃ প্রথম মাত্রায় বাঙালীত্বের বিষয় থাকলেও দ্বিতীয় মাত্রা বলতে গেলে শূন্য। অর্থাৎ, ক্ষমতা তৈরি করে দেয় বাঙালীরা বাঙালী আইডেণ্টিটির ভিত্তিতে, কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগে যখন পরিবর্তন সূচিত হয়, তখন সেই পরিবর্তনে আর বাঙালী আইডেণ্টিটির পক্ষে কিছু লক্ষ্য করা যায় না।

    আমি জানি, এখানে যুক্তি আসতে পারে, নির্বাচন তো এথনিসিটি ভিত্তিক নয়। সুতরাং বাঙালীত্ব আর অবাঙালীত্ব প্রশ্ন আসা ঠিক নয়। ঠিক আছে, এখানে সবাই সিটিজেন, তাই এথনিসিটির ভিত্তিতে বিষয়সমূহকে দেখা ঠিক নয়।

    কিন্তু আমরা যদি মাল্টিকালচারলিজম বা মাল্টিএথনিসিটি মানি, তাহলে স্থানীয় সরকারের গৃহীত নীতিমালার মধ্যে - অর্থাৎ ক্ষমতার এক্সিকিউশনের ক্ষেত্রে - তার প্রতিফলন পড়া চাই। কিন্তু বাস্তবে কী তা হয়?

    একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতি অনুসারে প্রাইমারি স্কুলের কী স্টেইজ টু থেকে শিশুদেরকে ইংরেজির সাথে-সাথে অন্য আরেকটি ভাষা শেখাতে বলা হয়েছে। সাথে এটিও বলা হয়েছে যে, এই ভাষা নির্বচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় কমিউনিটির প্রয়োজন যেনো প্রতিফলিত হয়।

    আমরা জানি মাল্টিকালচারাল প্রতিটি এথনিক গ্রুপের নিজস্ব ভাষা তার অস্তিত্বের ধারক। সমাজ-মনোবিজ্ঞানে ও সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানে এথনিক গ্রুপের নিজস্ব ভাষা নিয়ে টিকে থাকার ক্ষমতাকে ‘এথনোলিঙ্গুয়িষ্টিক ভাইটালিটি’ বলা হয়।

    আমি অন্যত্র বাংলাটাউন সংক্রান্ত একটি লেখায় বিশেষজ্ঞদের গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করেছিলাম যে, বাংলা টাউনে বাঙালীদের মধ্যে এথনোলিঙ্গুয়িষ্টিক ভাইটালিটি বা ভাষাজনজাতিক জীবনীশক্তি ক্ষয়ের দিকে।

    এথনোলিঙ্গুয়িষ্টিক ভাইটালিটির তাত্ত্বিকের বলেন, এই জীবনীশক্তি মরে গেলে মানুষ বেঁচে থাকলেও এথনিসিটি বেঁচে থাকে না। কী হয় তাঁদের? তাঁরা মূলধারা বিলীন হয়ে যায়। ইংরেজিতে তাকে বলা হয় এ্যাসিমিলেশন। কিন্তু আমরা যেখানে সমন্বয় তথা ইণ্টিগ্রেশনের কথা বলছি, সেখানে প্রতিটি এথনোলিঙ্গুয়িষ্টিক গ্রুপের অস্তিত্ব সংরক্ষা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হওয়ার কথা।

    দুঃখজনক হলেও সত্য যে, টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে যেখানে বাঙালী বংশোদ্ভূত শিশুর সংখ্যা সর্বাধিক, সেখানে তাঁদের জন্য দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা শেখার সুযোগ নেই বললেই চলে।

    সেকেণ্ডারি স্কুলগুলোর মধ্য যে ক’টিতে বাংলা আছে, সেখানে তাঁদের কোণঠাসা অবস্থা। বাংলা ভাষা শিক্ষার পক্ষে যুক্তি সেখানে অনুপস্থিত। বাংলার পক্ষে চাহিদার আওয়াজ সেখানে ক্ষীণ।

    এ-বিষয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে সুনির্দিষ্ট আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করা  হলেও এটি মাঠে মারা যায় রাজনীতিকদের মধ্যে “অমুক এলে তমুক আসবে না” প্রকারের সঙ্কীর্ণ মানসিকতার কারণে। অথচ, রাজনীতির ভৌটের বাজারে “আমরা বাঙালী”র রয়েছে শক্তিশালী আবেদন।

    শুধু ভাষা নয়, বাঙালীর ইতিহাস, বাঙালীর সংস্কৃতি, বাঙালীর সাহিত্য, বিভিন্ন বিষয়ের যে চর্চা ও সমৃদ্ধির প্রয়োজন, বাঙালী কমিউনিটিতে তার হদিস তো দূরের কথা, কোনো ভাবনাও আছে বলে মনে হয় না।

    আমি কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই বলবো, টাওয়ার হ্যামলেটের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বে মধ্যে, তথা মেয়র লুতফুর রহমান-সহ কারও মধ্যেই, বাঙালীত্বের ইস্যুটির তেমন কোনো আবেদন নেই। প্রায় সবার মধ্যেই বাঙালীত্বের ইস্যুর চেয়ে মুসলমানিত্বের ইস্যুটি প্রাধান্য পায় বলে আমার মনে হয়েছে।

    আমি এর জন্য রাজনীতিকদের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে দেবো না। কারণ, এখানে বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীদের একটি বিশাল ভূমিকা আছে, যা তাঁরা পালন করছেন না বলেই চলে। বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীদের দ্বারা এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক ইস্যু ও দাবী হিসেবে উত্থিত না হলে রাজনীতিকরা এর প্রতি থোরাই কর্ণপাত করবেন।

    আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে বাঙালীর এথনোলিঙ্গুয়িষ্টিক ভাইটালিটি বা ভাষাজনজাতিক জীবনীশক্তির সংরক্ষা ও সমৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। এই প্রতিষ্ঠান যেমন একদিকে প্রয়োজনীয় বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা করে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান গড়ে তুলবে, অন্যদিকে তেমনি সেই বিশেষজ্ঞ জ্ঞান স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের পক্ষে ফল নিয়ে আসার চেষ্টা করবে।

    আমি আশা করবো, বাঙালী ইণ্টেলিজেনশিয়া তথা সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, গবেষক, পেশাজীবী ও রাজনীতিকগ এ-বিষয়ে  মনোযোগী হয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

    সোমবার, ২ জুন ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন