• বাঙালীর অনার্য শব্দ-প্রীতি ও ইহুদি-বিদ্বেষ
    মাসুদ রানা

    যে-বাংলাভাষার গৌরব ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের পথে চলতে গিয়ে বাঙালীরা ইতিহাসে একদিন একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছিলো এবং একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলো, আজ সে-জাতির নেতারা সে-ভাষার মর্যাদা কতোটুকু সমুন্নত রাখতে পারছেন? প্রশ্নটির সম্যক উত্তর দিতে প্রয়োজন গম্ভীর ও বিস্তৃত গবেষণার।

    আমার ধারণা, সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানী ও সমাজ-মনোবিজ্ঞানীদের আওতাভুক্ত সে-গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে সম্প্রতি দেশটির জাতীয় সংসদে ব্যবহৃত আইন প্রণেতাগণের ব্যবহৃত খিস্তি। খিস্তি মানে হচ্ছে ইতর ভাষা, জাতীয় সংসদের মতো স্থানে যার স্পর্ধিত ব্যবহার রীতিমতো আতঙ্কিত করে তুলেছে দেশের মানুষকে।

    আইনসভার সরকার-বিরোধী দল বিএনপি’র এক আইন প্রণেতা সরকার বা সরকারী দলের প্রতি আক্রমণ করে ব্যবহার করলেন চ-ধ্বনি যুক্ত একটি নিম্ন-রুচির শ্রুতি-পীড়াদায়ক শব্দ।  আইন প্রণেতার এ-শব্দাচারণ ব্যক্তিগতভাবে শুধু তাঁর নিজের নয়, বরং সার্বভৌম সংসদের সাংস্কৃতিক মানকে উদ্বেগজনকভাবে নীচে নামিয়ে দিয়েছে।

    আমরা জানি, শব্দের সাথে মানুষের রুচি-সংস্কৃতি-মূল্যবোধ এবং সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিক-বোধ যুক্ত। সংস্কৃতি শব্দ সরবরাহ করে; রুচি সেখান থেকে উপযুক্ত শব্দটি চয়ন করে; আর মানুষের বোধ-বুদ্ধি সে-শব্দের উপযুক্ত ব্যবহারটি করে। তাই, উন্নত সংস্কৃতির, উন্নত রুচির ও উন্নত বুদ্ধিবৃত্তির জনসমষ্টি ও ব্যক্তি-বিশেষের ভাষা নিম্ন সংস্কৃতির, নিম্ন রুচির ও নিম্ন বুদ্ধির জনসমষ্টি ও ব্যক্তির চেয়ে ভিন্নতর।

    বিএনপি’র আইন-প্রণেতাটি নিম্ন মানের রুচি-সংস্কৃতি ও বোধ-বুদ্ধির প্রকাশ ঘটিয়ে যে-শব্দটি ব্যবহার করলেন, তাতে দেশবাসী প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেন। পড়তে-পড়তেও যে-মানটি সে-দিন পর্যন্ত ছিলো, তাতেও বিএনপি’র আইন প্রণেতা সে-নারীর ভাষাগত আচরণ জাতীয় সংসদে মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিলো না। দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার বদৌলতে ভাষাবিদ পবিত্র সরকার “অনার্য” কিন্তু “অশ্লীল নয়” বলে রায় দেবার পর শব্দটি গ্রহণীয় এবং কোথাও কোথাও আদরণীয় হয়ে উঠলো। তাতে ‘অনার্য’ শব্দের ব্যবহারে ‘বাঙালরা’ বেশ উৎসাহিত হলো।

    সুতরাং, পরবর্তীতে আরও একজন আইন প্রণেতা – তিনিও সেই বিএনপিরই – আরও এক ধাপ নিচে নামলেন। তিনি নারীর প্রতি অমর্যাদাকর একটি পুরুষালী চ-ধ্বনির ‘অনার্য’ শব্দ ব্যবহার করলেন। তবে তিনি চতুরতার সাথে নিজ থেকে নয়, কবিতার পংক্তি থেকে উদ্ধৃত করে ব্যবহার করলেন শব্দটি।

    ভদ্রমহিলার এ-ইতর উদ্ধৃতি-উচ্চারণ আমাদেরকে একটি সত্য নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ এনে দিলোঃ রাজনীতি হচ্ছে সংস্কৃতির অনুগামী। আমরা ইতিহাসে দেখেছি, বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্ট সাহিত্য ও তাঁর ব্যবহৃত ভাষা কীভাবে শুরুতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিলো।

    অদ্য আমরা লক্ষ্য করলাম, বিএনপি’র আইন প্রণেতাটি কবিতার উদ্ধৃতি হিসেবে যে-কুৎসিত শব্দটি জাতীয় সংসদে তাঁর ভাষণে ব্যবহার করলেন, সেটি বাংলাভাষার রাজনৈতিক চর্চার ইতিহাসে সবচেয়ে অশ্লীল ও নিম্ন সংস্কৃতির। বিষয়টি সাংঘাতিক। কিন্তু তিনি কীভাবে এ-রকম একটি সাংঘাতিক কাজ দৃশ্যতঃ কোনো অপরাধ-বোধ ছাড়াই ব্যবহার করতে পারলেন?

    তিনি পেরেছেন, কারণ তাঁকে সাহস যুগিয়েছেন একজন কবি, যিনি ইতিপূর্বে তাঁর ‘কবিতা’য় সেই শব্দের ব্যবহার করে আদরণীয় হয়েছেন। আজ বাংলাদেশের শিল্পে-সাহিত্য-কাব্যে-নাট্যে-চলচ্চিত্রে  যে-ভাষার চর্চা হচ্ছে, তার পরিপূরক একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলও গড়ে উঠেছে। আর, সে-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এ-রাজনৈতিক আচরণ সংঘটিত হচ্ছে।

    তত্ত্বতঃ অনুন্নত সংস্কৃতির প্রকাশ শুধু ভাষার রূপের মধ্যে নয়, তার মর্মের মধ্যেও মূর্ত হয়ে হয়ে ওঠে। ভাষাগত কদর্যতা শুধু শব্দের মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। শব্দ সমষ্টিতে গঠিত ও প্রদত্ত বার্তাটি বরং অধিক গুরুত্বপূর্ণ।  রাজনীতিতে ব্যবহৃত ভাষায় নিম্ন রুচি-সংস্কৃতি-মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে এমনকি দেশের শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্যেও।

    বস্তুতঃ শব্দস্রষ্টা প্রাণী মাত্রই তার স্বপক্ষের প্রতি ভালোবাসা বা অনুমোদন ও প্রতিপক্ষের প্রতি হিংসা বা প্রত্যাখ্যান প্রকাশে শব্দ ব্যবহার করে থাকে। এটি হচ্ছে প্রাণীর ইনস্টিংক্ট বা সহজাত প্রতিক্রিয়া। মানুষের মধ্যেও সে-সহজাত প্রতিক্রিয়ার প্রবৃত্তি রয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে সামাজিক শিক্ষণের মাধ্যমে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে, তখন সে তার স্বপক্ষের কিংবা প্রতিপক্ষের প্রতি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন হয়ে ওঠে। এ-স্বাধীনতা তার সংস্কৃতি, রুচি, মূল্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা সংজ্ঞায়িত ও নির্ধারিত।

    এ-মুক্তি শুধু ব্যক্তিগত নয়। এটি শ্রেণীগত, সম্প্রদায়গত ও জাতিগতও। ভাষা নিরপেক্ষ নয়। ভাষা শ্রেণীহীন নয় (জানি, মার্ক্সবাদীরা - বিশেষতঃ স্তালিনবাদীরা দ্বিমত পোষণ করবেন)। তাই আমরা যখন ব্রিটেইনে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি, তখন আমরা ‘ব্ল্যাক ল’, ‘ব্ল্যাক মার্কেটিং’, ‘ব্ল্যাক শীপ’ ইত্যাদি শব্দের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি।

    ইউরোপে সাম্যের ও মর্যাদার যে-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম গত কয়েকশো বছর যাবৎ হচ্ছে, ইউরোপীয় শব্দ ও ভাষার রূপে তার প্রতিফলন ঘটছে। ভাষাতে তা ঘটবেই। ভাষা মানেই তাই। ভাষা শুধু বস্তুর প্রতীক নয়, ভাষা সম্পর্কেরও প্রতীক, মূল্যবোধ ও রুচিরও প্রতীক।

    বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিএনপি’র নিম্নরুচির আইন-প্রণেতা সম্প্রতি প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিম্ন মর্মের শব্দাক্রমণ করে বলেছেন, তাঁর পুত্রবধু নাকি একজন ইহুদি। এ-রকম তথ্যদান যে তথ্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে নীচু করার জন্য একটি বর্ণবাদী শব্দাঘাত, সেটি শেখ হাসিনা-সহ সবাই বুঝতে পেরেছিলেন।

    শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জাতীয় নেতা হিসেবে বিএনপি’র আইন প্রণেতার এহেন বর্ণবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি শিক্ষণীয় সংগ্রাম করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ, সে-সংগ্রাম করার জন্য যে-চেতনা ও বোধ প্রয়োজন হয়, সেটি সম্ভবতঃ শেখ হাসিনার নেই।

    শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে যে-বর্ণবাদ-বিরোধী বিশ্ববোধ ছিলো, সেটি তিনি ধারণ করেন না। তাঁর আন্তর্জাতিকতাবোধ ধর্মবোধের দ্বারা শাসিত। তাই তিনি বললেন, “আমার ছেলের বউ ইহুদি না”।

    শেখ হাসিনার পুত্রবধূ ইহুদি নন, কথাটা হয়তো তথ্য হিসেবে সত্য। কিন্তু তিনিও শুধু তথ্য দিতে চাননি। আরও বেশি কিছু চেয়েছেন। তিনি বললেন, ‘সে খ্রিষ্টান’। এটিও হয়তো তথ্য হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু তার পরের কথাগুলো মোটেও ঠিক নয়।

    পরের কথার প্রথামাংশ শেখ হাসিনার অজ্ঞতা ও দ্বিতীয়াংশ ক্ষুদ্রতাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘খ্রিষ্টান আমাদের আহলে কিতাব’।

    ‘আহল্‌ আল-কিতাব’ একটি আরবী ও কুরানিক ধারণা। যার মানে হচ্ছে ‘গ্রন্থের মানুষ’। এ-আরবী কথা দিয়ে শেখ হাসিনা বুঝাতে চাইলেন, তাঁর পুত্রবধু ইহুদি নয়, তিনি খ্রিষ্টান এবং খ্রিস্টানেরা যেহেতু ইসলামে স্বীকৃত গ্রন্থের মানুষ, তাই খ্রিষ্টান পুত্রবধু গ্রহনযোগ্য।

    কিন্তু, কুরানিক ভাষ্য-মতে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও আস্‌-সাবাইয়ুন হচ্ছে মুসলমানদের মতোই ঐশ্বরিক গ্রন্থপ্রাপ্ত ধর্মীয় সম্প্রদায়। কুরানে এঁদেরকেই ‘আহল্‌ আল-কিতাব’ বলে নির্দেশ করা হয়ছে।

    যে-হাসিনা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ১৯৭২ সালের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের স্থলে মুহাম্মদের কালের ইসলামিক ‘মদিনা সংবিধান’ প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাঁর তো জানার কথা যে, মদিনা সংবিধানের মধ্য দিয়ে যে-সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সংরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়ছিলো, তাদের মধ্যে ইহুদি অন্যতম। ইহুদিদেরকে বিশেষ এ-মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো এ-কারণেই যে, ইহুদিরা হচ্ছে ইসলামের কাছে আহল্‌ আল-কিতাব।

    সুতরাং, শেখ হাসিনার একথাগুলো আপাতঃ অজ্ঞতা প্রসূত মনে হলেও বাস্তবে তা না-ও হতে পারে। যদি শেখ হাসিনার মধ্যে অজ্ঞতা কাজ করে না থাকে, তাহলে কী কাজ করে থাকবে তবে? কী-যে কাজ করেছে তাঁর মনে, তা তাঁর পরের কথাতেই তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

    শেখ হাসিনা তাঁর পরের বাক্যে বলেন, “অবশ্য, আমাদের ডক্টর কামাল হোসেনের মেয়ের জামাইটা ইহুদি।” তথ্য হিসেবে শেখ হাসিনা সত্যই বলে থাকবেন। কিন্তু বলার উদ্দেশ্যটা সৎ নয়। কেনো নয়, তা বুঝতে হলে জানা দরকার কামাল হোসেন কে, কামাল হোসেনের মেয়ে কে এবং তাঁর স্বামীই বা কে।

    কামাল হোসেন হচ্ছেন শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন-কালে প্রিয়ভাজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা-পরিবর্তী কালে রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উত্থানের জন্য দায়ী এবং শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার দ্বারা বিতাড়িত হয়ে আওয়ামী লীগ ত্যাগী ও হাসিনার কাছে শত্রুতূল্য। শত্রুর প্রতি শেখ হাসিনার অভিধানে কোনো ভালো শব্দ নেই।

    শেখ হাসিনার ‘শত্রু’ কামাল হোসেনের কন্যা হচ্ছেন সারাহ্‌ হোসেন। তিনি পশ্চিমে সুশিক্ষিতা আইনজীবী। বাংলাদেশের বংশ পরম্পরার রাজনৈতিক চর্চায় সারাহ হোসেনের সম্ভাবনা এ-মুহূর্তে দেখা না গেলেও, ভবিষ্যতে তাঁর পিতার মৃত্যুতে ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বুঝতে না-পারা’ বাঙলীর কাছে উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিতে পারে। শেখ হাসিনা সারাহ হোসেনকে তাঁর পুত্র বা কন্যার ভবিষ্যত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে চান না। তাই, তিনি সুযোগ বুঝে কামাল হোসেনের কন্যা সারাহ হোসেনের স্বামীর ইহুদিত্বের কথা চিরদিনের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করে রাখলেন সংসদের কার্যবিবরণীতে।

    সারাহ্‌ হোসেনের স্বামীর নাম ডেইভিড বার্গম্যান। জাতিসত্ত্বায় তিনি ইহুদি হলেও নাগরিকতায় ব্রিটিশ ও পেশায় সাংবাদিক। তিনিই ১৯৯৫ সালে ‘ওয়্যার ক্রাইম ফাইলস’ নামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী-সহ আরও ঘাতকদের ব্রিটেইনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রাপ্তি ও বাঙালী সম্প্রদায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হবার চিত্রকাহিনী তুলে ধরেছিলেন। তাঁর এ-কাজ যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানুষের সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

    সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় সন্দেহিত পক্ষপাত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে তদন্তমূলক সাংদিকতায় যুক্ত রয়েছেন। তিনিই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কারাগারে  গিয়ে খুঁজে বের করেছেন সেই দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে, যাঁকে সাক্ষ্য দেবার আগেই আদলতের ফটক থেকে ছিনতাই করে বাংলাদেশের সীমান্ত পার করে ভারত সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, যাতে তিনি যমপুরে কিংবা কারাগারে স্থিত থাকেন।

    সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর প্রতি এ-ঘটনাটিকে সরজমিনে তুলে এনে ডেইভিড বার্গম্যান আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের নিরপক্ষেতাকে ভীষণ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন সারা পৃথিবীর কাছে। সুতরাং, শেখ হাসিনা কামাল হোসেনের মেয়ে সারা হোসেনের স্বামী বার্গম্যানের ইহুদি পরিচয় তুলে ধরে তাঁকে জাতির কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেয়েছেন।

    মূলতঃ সমগ্র ঘটনাটার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা খুব সচেতনভাবে মুসলিম প্রাধান্যের বাংলাদেশে অস্তিত্বশীল ইহুদি-বিদ্বেষকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। এ-দেশে ইহুদিবিদ্বেষ এতো তীব্র যে, ইহুদি কথাটাই একটি গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চরম ডানপন্থী ইসলামবাদী জামায়েত ইসলামের নেতা সাঈদী বামপন্থীদেরকে ইহুদি আদর্শের অনুসারী বলে বাঙালী সাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান। সে-একই পদ্ধতিতে বামপন্থীরাও ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘গোলাম আযম-সাঈদী, বাংলার ইহুদি’ বলে স্লৌগান দেন। অর্থাৎ চরম ডানপন্থী ও চরম বামপন্থীরা ‘ইহুদি’ শব্দকে গালি হিসেবে ব্যবহার করে একে অন্যকে জনবিচ্ছিন্ন করতে চায়।

    শেখ হাসিনাকে অনেকে যতো বোকা মনে করেন, তিনি ততো বোকা তো ননই, বস্তুতঃ তিনি অতিশয় চালাক, যা চাতুর্য্যের পর্যায়ে পড়ে। বিএনপির এমপি শেখ হাসিনার দিকে যে ইহুদি-বিদ্বেষের যে ঢিলটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সেটি দক্ষ হাতে ‘ক্যাচ’ করে শুধু নিজেকে, নিজের পুত্রের ভবিষ্যত ও পুত্রবধুকে রক্ষা করেননি, পালটা সেই ঢিলটাই ছুঁড়ে দিয়ে একসাথে তিন-তিনটে পাখী বধ করার চেষ্টা করেছেন।

    রূপতঃ অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে যেয়ে শেখ হাসিনা নিজের নাক কাটলেন। তিনি নিজেকে প্রত্যক্ষভাবে অজ্ঞ ও পরোক্ষভাবে ইহুদি-বিদ্বেষী হিসেবে প্রমাণিত করলেন।

    তবে, বাঙালী জাতির জন্য একটি লজ্জার ব্যাপার হচ্ছেঃ যে-জাতীয় সংসদ ভবনে বসে আজ ইহুদি-বিদ্বেষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চর্চাটা বিএনপির এমপি ও আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা করলেন, সে-জাতীয় সংসদ ভবনটির নকশা ও নির্মাণ করেছেন এমন এক বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি, তিনিও ছিলেন ইহুদি। নাম লুইস কাহ্‌ন (Louis Kahn)।

    সোমবার, ১লা জুলাই ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    Masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন