• বাম-বিকল্পঃ পদ্ধতি
    মাসুদ রানা

    পূর্ব-কথন
    বাংলাদেশের কমিউনিস্ট-সৌশ্যালিস্ট এ্যালায়েন্স, অর্থাৎ সিপিবি-বাসদের যৌথাবস্থান, ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’ হিসেবে ১৫-দফা ঘোষণা করেছে ৩ জুলাই রাজধানী ঢাকায় এক সংবাদ-সম্মেলনে। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলদেশের পালা-ক্রমিক শাসক দলদ্বয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দ্বি-মেরুকরণের বিপরীতে বাম-বিকল্প গড়ে তোলা।

    এ-লেখার আগের কিস্তি ‘ভূমিকা’য় দেখানো হয়েছে, বিকল্পের এ-কর্মসূচি দল দু’টির জন্য নতুন নয়। তারও আগে তারা ‘বামফ্রন্ট’ নাম নিয়ে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো, যা এক সময় কোনো ঘোষণা ছাড়াই উধাও হয়ে গিয়েছে। তারা আবার যখন ১৫-দফা নিয়ে এলো, তখন বাধিত বোধ করলো না আগের যৌথতা ও কর্মসূচির কী হলো তার জবাবদিহিতা করতে।

    কর্মসূচির বিকাশ-পদ্ধতি
    সিপিবি-বাসদ যেহেতু তাদের বাম-ফ্রন্টীয় পূর্ববর্তী বিকল্পের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্যায়ণ ও জবাবদিহিতা করলো না, তাই বর্তমান কর্মসূচির প্রতি যে তাঁদের খুব যত্ন আছে, তা দাবি করার কোনো বৈধ কারণ নেই। এছাড়াও, যে-উপায় ও পদ্ধতি অবলম্বন করে এ-কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে রয়েছে পদ্ধতিগত ঘাটতি। এ-ঘাটতি যদি ইচ্ছাকৃত বা মনোবৃত্তিক না হয়ে থাকে, তাহলে তা নিশ্চয় ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক অপর্যাপ্ততার ফল হয়ে থাকবে।

    সিপিবি-বাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বসে ১৫-দফা দাবি প্রণয়ন করে নাম দিয়েছেন ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’। কর্মসূচির বিশ্লেষণে যাবার আগে কর্মসূচি প্রণয়নের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন তার গণসম্পৃক্তি বুঝার জন্য।

    হাতের কাছে যথেষ্ট উপাত্ত না থাকাতে পদ্ধতির কৃত দিক নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব না হলেও অকৃত দিক নিয়ে আলোচনা সম্ভব। এ-দু’টি দলের কর্মী-সমর্থকদের সাথে আলাপ করে এবং সাম্প্রতিক কালের প্রকাশিত সংবাদের উপর নজর রেখে এ-পর্যবেক্ষণে আসা যায় যে, তারা (১) জনগণের বিকল্প শক্তি বিকাশের জন্য জনগণের কাছে যেয়ে তাঁদের কনসাল্ট করেননি, (২) কর্মসূচি প্রণয়নে কর্মীদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পলেমিক্সে যুক্ত করেননি এবং (৩) গণ-সমাবেশে গণ-আন্দোলনের ঘোষণা করেনি।

    জনগণের বিকল্প শক্তি বিকাশের জন্য জনগণের কাছে যাওয়া
    দেশ, রাষ্ট্র, সরকার, দল, জনগণ, ইত্যাদি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ আছে। শব্দের অর্থ-পার্থক্যসূচক ব্যবহার নিশ্চিত না করলে তথ্য ঝাপসা হয়ে যায় এবং যোগাযোগ দূর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি, বুদ্ধিতে ঘাটতি দেখা দেয়। বিজ্ঞানের প্রথম ধাপ হচ্ছে বিষয় সমূহের বস্তুনিষ্ঠ ও দ্ব্যর্থহীন সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠা।

    সিপিবি-বাসদের নেতৃবৃন্দ তাঁদের দলীয় বক্তৃতা-বিবৃতিতে যথাক্রমে ‘বাম বলয়’ ও ‘বাম-বিকল্প’ গড়ে তোলার কথা বললেও, তাঁদের যৌথ ঘোষণায় ১৫-দফাকে ‘জনগণের বিকল্প শক্তি’ গড়ে তোলার কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর দ্বারা তারা সম্ভবতঃ ‘জনগণ’ ও ‘বাম’ শব্দ-দুটোকে এক ও অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে থাকবেন। স্পষ্টতঃ তাদের কাছে জনগণের শক্তিই বাম শক্তি, আর বাম শক্তি মানেই জনগণের শক্তি।

    নিজ দলকে জনগণের দল মনে করার দাবি শুধু বামেরাই করেন না, এটি সবাই করেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরাও তাঁদের স্ব-স্ব শক্তি ও কর্মসূচিও জনগণের শক্তি ও কর্মসূচি মনে করেন। জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, জামায়াতে ইসলামী, আণ্ডার গ্রাউণ্ড সশস্ত্র দল-সহ সবাই ঐ একই দাবি করে থাকে। এ-রকম দাবির মধ্যে সিপিবি-বাসদের কোনো বিশিষ্টতা নেই।

    সিপিবি-বাসদ বিশিষ্টতা দাবি করতে পারতো, যদি তারা জনগণের কাছে গিয়ে, তাঁদের সাথে ‘কনসাল্ট’ বা পরমার্শ করে এই ১৫-দফা প্রণয়ন করতো। পাবলিক-কসাল্টেশনের প্রক্রিয়ায় তারা বস্তুনিষ্ঠভাবে বুঝতে পারতো জনগণ বস্তুতঃ কী চান। একমাত্র কনসাল্টেশনের প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রকাশিত চাওয়াকে ধারণ করে কর্মসূচি প্রণয়ন করলেই তাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের কর্মসূচি বলা যায়।

    মার্ক্সবাদীরা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকতার কথা বলেন, কিন্তু বৈজ্ঞানিকতাকে যে তাঁরা আচরণেও ধারণ করেন, তা নিশ্চিত দাবি করা যায় না। বৈজ্ঞানিকতার ভিত্তি হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠতা। বস্তুনিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। মনে-মনে ভেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে বস্তুনিষ্ঠতা বা বৈজ্ঞানিকতা বলে না।

    জনগণকে কনসাল্ট না করে ‘জনগণ মানে আমরা, আর আমরা মানেই জনগণ’ মনে করে হয়তো আত্মতৃপ্তি পাওয়া সম্ভব, কিন্তু এতে না-যাওয়া যায় জনগণের কাছে, না-বলা যায় জনগণের কথা।  জনগণকে কনসাল্ট করা জন্য যে-বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি-সমূহ রয়েছে, তা অনুসরণ করেই জনগণের কর্মসূচি প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত। ‘আমরা জনগণের সাথে প্রচুর কথা বলি’ দাবি করে এবং ‘জনগণের দাবি কী তা আমরা জানি’ বলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের ভাবনা নিজেই ভেবে বসে থাকলে তা বৈজ্ঞানিক হয় না।

    ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে সিপিবি-বাসদের নেতা-কর্মীরা নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর তালিকা তৈরী করে জনগণের সাথে মতবিনিয়ের নিযুক্ত হতে পারতেন। উদাহরণ স্বরূপ, ‘বাংলাদেশের কৃষিনীতি কী হওয়া উচিত’ শিরোনামে খোদ কৃষক থেকে শুরু করে পেশাদার কৃষিবিদ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের জড়িত মানুষের সাথে আলোচনা করা যেতো। আর, একমাত্র তার ভিত্তিতে গড়ে তোলা কর্মসূচিই হতো বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের কর্মসূচি।

    কর্মসূচি প্রণয়নে কর্মীদের যুক্তকরণ
    কর্মসূচি যদি কাজের তালিকা হয়, তাহলে কাজটি যিনি বা যাঁরা করবেন, তাঁদের সাথে আলাপ করাটা হচ্ছে সুসভ্য, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর পদ্ধতি। বামদের মধ্যে লেনিনীয় দলগুলোতে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ বলে একটি একটি ধারণা আছে। যার মূল কথা হচ্ছে নীতি প্রণয়নে কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত উন্মুক্ততা, বিতার্কিক আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কিন্তু নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে সুশৃঙ্খল অনুসরণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে তাঁরা যতোটুকু না দার্শনিক পর্যায়ে ধারণ করেন, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তার চর্চা তারা ততোটুকু করেন না। বিভিন্ন সঙ্কটে তার উৎকট প্রকাশ ঘটে সমগ্র দলকে বিপন্ন করে তোলে। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে যৌথ-জ্ঞানের সর্বোচ্চ বিশেষীকৃত ও ব্যক্তিকৃত রূপ মেনে নিয়ে, তার ভাবনা ও কথার অনুসরণকেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এভাবেই বৈজ্ঞানিকতার হৌলিস্টিক অব্জেক্টিভিটি বা অখণ্ড বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে যায়।

    সিপিবি-বাসদের উচিত ছিলো স্ব-স্ব দলের কেন্দ্রীয় পর্ষদের পক্ষ থেকে ১৫-দফাকে প্রতিটি শাখায় বিতর্কের জন্য পাঠানো। তিন মাস ধরে এ-বিষয়ে বিতর্ক করে সারা দেশের কর্মীরা যে-ফীডব্যাক পাঠাতেন কেন্দ্রীয় পর্ষদের কাছে, তার ভিত্তিতে আরও তিন মাস ধরে যাচাই বাছাই করে কেন্দ্রীয় পর্ষদ কর্মসূচির উপ-চূড়ান্তকরণ করতে পারতেন। তারপর, দুই দলের শীর্ষ নেতগণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে তার চূড়ান্ত রূপ দিতে পারতেন। একমাত্র এভাবে প্রণীত কর্মসূচিই হতে পারতো গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতায় প্রণীত কর্মসূচি।

    গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার শর্ত পূরণ হওয়া ছাড়াও, এর ফলে সারা দেশে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে অন্তঃপার্টি ও আন্তঃপার্টি পলেমিক্স গড়ে উঠতো। এ-পলেমিক্স দল দু’টির সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের মধ্য ছড়িয়ে পড়তো। এমনকি তা জনগণের মধ্য ছড়িয়ে পড়তো। এর প্রকাশ দেখতে পাওয়া যেতো বিভিন্ন গণ-মাধ্যম থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের ফেইসবুক-সহ বিবিধ সৌশ্যাল নেটওয়ার্কে। আন্দোলন মানে কী? যারা আন্দোলন করবেন তাঁরাই যদি প্রথম আন্দোলিত না হোন, তাহলে আন্দোলন হবে কী করে? পদার্থবিজ্ঞান বলে, যে-বস্তু তরঙ্গ তোলে, প্রথমে সে-বস্তুর অণু-পরমাণু পর্যায়ে তরঙ্গ সৃষ্ট হতে হয়। বিজ্ঞানানুসারী দলগুলোকে তো বিজ্ঞানের নিয়ম মানতে হবে।

    গণ-সমাবেশে গণ-আন্দোলনের ঘোষণা
    সিবিপি-বাসদকে যদি সত্যিই বিকল্প শক্তি হিসেব গড়ে উঠতে হতো, তাহলে জনগণের সামনে তাদেরকে সহযোগিতামূলক যৌথ শক্তির প্রমাণ দিতে হতো। প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা সংবাদ-সম্মেলন ডেকে করলে তার তেমন অভিঘাত সৃষ্টি হয় না। কর্মসূচির প্রথম ঘোষণাটাই উচিত ছিলো রাজধানীতে লক্ষ লোকের মহা-সমাবেশ ঘটিয়ে দেয়া। দল দু’টি তাদের সর্বোচ্চ শক্তি খাটিয়ে ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার লোক সারা দেশ থেকে জমায়েত করতে পারতো বলে ধারণা করা যায়।

    বাম-বিকল্পের কর্মসূচি ঘোষণার মহা-সমাবেশের ব্যাপক প্রচার ও প্রপাগণ্ডায় দেখার জন্য জড়ো হতো সম্ভবতঃ আরও ২৫ থেকে ৩৫ হাজার লোক। দল দু’টি থেকে ১ হাজার সুসজ্জিত ও সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত করে, মোটামুটি ১ লক্ষ লোকের সমাবেশে গণ-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানান্তে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যদি তাঁদের বিকল্প সরকার গঠনের ১৫-দফা কর্মসূচির বলিষ্ঠ ঘোষণাটা দিতেন, তাহলে তা ইতিপূর্বে পলেমিক্স-করা ও অপেক্ষায়-থাকা কর্মীদের মধ্যে এবং কনসাল্ট-করা জনসাধারণের মধ্যে একটি বিশাল আবেদন তৈরী করতে পারতো।

    আর এ-সমাবেশের স্পিরিট ও উত্তাপ নিয়ে নিজ-নিজ এলাকাতে ফিরে গিয়ে অনুরূপ সমাবেশের আয়োজনে যুক্ত হতে পারতেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। হয়তো সেখান প্রধান অতিথি হয়ে যেতেন কেন্দ্রীয় নেতাগণ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তিন মাস দীর্ঘ সফর সূচি প্রণয়ন করে উপজেলা পর্যায়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পারতেন।

    কিন্তু তাঁরা তা না-করে একটি সংবাদ-সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়ে ‘সময়ের দাবি’ পূরণ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুঝা উচিত, বর্তমান বিশ্বের উপযুক্ত সাংগঠনিক, যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা অর্জন এবং এর কার্যকর ব্যবহার ব্যতিরেকে বিকল্প সরকার গঠন তো দূরের কথা, জনগণের বিবেচনার মধ্যেই আসা সম্ভব নয়। কর্মসূচির শিরোনামে ‘জনগণের’ শব্দ যোগ করলেই জনগণ তাতে মনোযোগ দেয় না।

    বামেরা যদি মনে করেন যে, তাঁদের আদর্শিক গন্তব্য ইতিহাস-নির্দেশিত এবং জনগণ তাদের দিকে আসতে বাধ্য, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। তাঁরা যদি মনে করেন যে, তাঁরা খুব সৎ ও আন্তরিক এবং বুঝেন ও বলেন ভালো বলে জনগণকে তাঁদের দিকে আসতেই হবে, তাহলেও তাঁরা ভুল করবেন। এ-পর্যন্ত বামেরা বাংলাদেশে অনেক ভালো কথাই আগে বলেছেন, ভালো কাজই আগে শুরু করেছেন। কিন্তু তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাৎপদতা ও অদক্ষতার কারণে তাঁরা জনগণের হিসেবের মধ্যেই আসতে পারেননি।

    আশির দশকে জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সূচনায় বামদের অগ্রণী ভূমিকা ছিলো। আন্দোলনের আপোসহীন ধারায় বাম পাঁচ-দল আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৫-দলীয় জোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোটের সমান্তরাল হিসেবে জনসাধারণের হিসাবে মধ্যে আসতে পেরছিলো। গঠিত হয়েছিলো শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-সহ আন্দোলনের বিভিন্ন সংস্থা। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিলো এদের নিজস্ব ‘চার্টার অফ ডিমাণ্ডস’ বা দাবীমালা, যা একত্রিত রূপ গড়ে তুলেছিলো ঐ সময়ের সবচেয়ে প্রগতিশীল গণমুক্তির গণদাবি।  

    এ-পরিস্থিতিতে বামদের যেখানে উচিত ছিলো আন্দোলনের সংস্থাগুলোকে নিয়ে কেন্দ্র থেকে শুরু করে নিম্নতম শাখা পর্যন্ত জনগণের ‘সোভিয়েত’ বা ‘পঞ্চায়েত’ তৈরী করে আন্দোলনে বিকশিত সমস্ত দাবী পূরণের হাতিয়ারে পরিণত করে আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা, তাঁরা তা না করে, নিজেদেরকে খুবই ‘স্মার্ট’ ভেবে দাবি তুললেন ‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি’। ব্যস, এরশাদ গেলেন এক সময় এবং তার সাথে চলে গেলো আন্দোলনের সংস্থা-সমূহ ও দাবি-সমূহ। দীর্ঘ আট বছরে বহু প্রাণের বিনিময়ে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলন, যা শ্রেণী সংগ্রামের উপাদান নিয়ে গড়ে উঠছিলো, তা ভুল স্লৌগান তথা ভুল রাজনৈতিক বোধ ও কর্মসূচির কারণে হারিয়ে গেলো।

    মনে রাখতে হবে, বিকল্পের আকাঙ্খাই বড়ো কথা নয়। সে-আকাঙ্খার সাথে-সাথে সঠিক কর্মসূচি, সঠিক সংগঠন, সঠিক সংযোগ ও সঠিক তৎপরতাই একমাত্র কার্যকর বিকল্প শক্তি হয়ে ওঠার গ্যারান্টি।

    এ-কিস্তি শেষ হোক পদ্ধতির উপর আলোকপাত সীমিত রেখে। কর্মসূচির বিশ্লেষণ হবে পরবর্তী কিস্তিতে।

    রোববার, ১৫ জুলাই ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

আপনার এ লেখাটা অল্প কিছুদিন হলো পড়লাম। অসংখ্য ধন্যবাদ চমৎকার বিশ্লেষণের জন্য। আপনার নতুন লেখা কবে পাবো? ukbengali ছাড়া আর কোথাও কি আপনি লিখেন? link পেলে কৃতার্থ হব।
রায়হান
রংপুর, বাংলাদেশ।

বাসদ-সিপিবি'র ঐক্য ও কর্মসূচি ঘোষিত হবার পর ২০১২ সালের জুলাই মাসে আমার তিন-পর্বের লেখার দ্বিতীয়টিতে পর্যবেক্ষণ ছিলোঃ

''কর্মসূচি যদি কাজের তালিকা হয়, তাহলে কাজটি যিনি বা যাঁরা করবেন, তাঁদের সাথে আলাপ করাটা হচ্ছে সুসভ্য, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর পদ্ধতি। বামদের মধ্যে লেনিনীয় দলগুলোতে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ বলে একটি একটি ধারণা আছে। যার মূল কথা হচ্ছে নীতি প্রণয়নে কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত উন্মুক্ততা, বিতার্কিক আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কিন্তু নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে সুশৃঙ্খল অনুসরণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে তাঁরা যতোটুকু না দার্শনিক পর্যায়ে ধারণ করেন, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তার চর্চা তারা ততোটুকু করেন না। বিভিন্ন সঙ্কটে তার উৎকট প্রকাশ ঘটে সমগ্র দলকে বিপন্ন করে তোলে।''

আমার পর্যবেক্ষণে সাংঘাতিক ত্রুটি নির্দেশ করে 'পরবাসী মন' ছদ্মনামের এক সমালোচক আমাকে গালি দিয়ে লিখেছিলেনঃ

''জানি না কি আপনার শ্রেনীচরিত্র। আপনি এই জোটের পদ্ধতিগত দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন যে ,বলেছেন,সিপিবি-বাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বসে ১৫-দফা দাবি প্রণয়ন করে নাম দিয়েছেন ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’ এবং এই জোট জনগণের সাথে কোন কথা বলেনি। এধরনের কথা বলে আপনি ভ্রষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন আর তা না হলে আপনি এই ১৫ দফার কিছুই পড়েন নি । কারণ এই ১৫ দফার কোনটাই আরোপিত নয় এদেশের বহু গনআন্দোলনে যে দাবি উঠে এসেছে তা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে ,এই জমিন থেকে দীর্ঘদিন ধরে দূরে অবস্থান করছেন বলে মনে হয়, আপনার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে ,দুঃখ হয় জনাব মাসুদ।''

দেখুন পরবাসী মন, দু'টির মধ্যে একটি দল (বাসদ) শুধু বিপন্ন নয়, এমনকি আজ বিভক্ত পর্যন্ত। লক্ষ্য করুন, এ-বিভিক্তির কারণসমূহের মধ্যে সিপিবির সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকেও একটি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সুতারং, আমি 'ভ্রষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার পরিচয়' দিয়েছি বলে যে অভিযোগ করেছিলেন, তা ঠিক নয়। বস্তুতঃ আমার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ভিত্তিক সম্ভাব্যতার পূর্বোক্তিটি বুঝতে পারেননি।

আজ আপনাকে লজ্জা দেবার জন্যে লিখছি না, বরং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সঠিকতার বুঝাবার একটি সুযোগ ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরী হওয়াতে আমি এটি কাজে লাগিয়ে আপনাকে সাহায্য করতে চাইলাম। কারণ, এখন আপনার বুঝতে আর কোনোই বেগ পেতে হবে না।

ধন্যবাদ

জনাব রানা, আপনাক ধন্যবাদ যে দূর প্রবাসে থেকেও বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আপনার উৎসাহ দেখে । বামপন্থী রাজনীতির একজন কর্মী বা সংগঠক হওয়ায় আপনার এই লেখার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমার সহজাত প্রবৃত্তি বলা যেতে পারে । আপনি আপনার লেখার শুরুতে বাসদ বনাম সিপিবির জবাবদিহিতার কথা বলেছেন। কারন আগে যে সকল জোট হয়েছে তার জবাবদিহিতা দরকার,আমিও তাই মনে করি ,কিন্তু এর আগে কেবল বাসদ -সিপিবি কোন জোট হয় নাই । আপনি বলেছেন ,এর আগে বামফ্রন্ট এই দাবিনামা ছিলো বা পরে ১১ দলের কথা বলা যেতে পারে ,তাতে কি? এটা তো বাসদ-সিপিবি জোট,তাই বামফ্রন্ট বা ১১ দলের এখানে আসবে কেন ?আপনি এখানে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের অবতারণ ঘটিয়েছেন।
এবার আসা যাক, দাবির প্রতি আন্তরিকতার বিষয় নিয়ে ,বামপন্থী কর্মীরা তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি কতটা সিরিয়াস,সেই বিষয়ে বুর্জোয়ারাও প্রশ্ন তুলে না ,আপনি তাদেরকেও (বুর্জোয়া) হার মানিয়েছেন । জানি না কি আপনার শ্রেনীচরিত্র ।
আপনি এই জোটের পদ্ধতিগত দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন যে ,বলেছেন,সিপিবি-বাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বসে ১৫-দফা দাবি প্রণয়ন করে নাম দিয়েছেন ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’ এবং এই জোট জনগণের সাথে কোন কথা বলেনি। এধরনের কথা বলে আপনি ভ্রষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন আর তা না হলে আপনি এই ১৫ দফার কিছুই পড়েন নি । কারণ এই ১৫ দফার কোনটাই আরোপিত নয় এদেশের বহু গনআন্দোলনে যে দাবি উঠে এসেছে তা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে ,এই জমিন থেকে দীর্ঘদিন ধরে দূরে অবস্থান করছেন বলে মনে হয়, আপনার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে ,দুঃখ হয় জনাব মাসুদ ।
আপনি এও উল্লেখ করেছেন যে ,জনগণের সাথে আলাপ করে এই ১৫ দফা ঠিক করা হয়নি । নিবুদ্ধিতার চমৎকার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন । আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে,একটি পার্টি জনগণের লেজুড় নয় ,পার্টি জনগণকে নেতৃত্ব দিবে । জনগণ অনেক সময় তার চিন্তার পশ্চাৎপদতার কারণে সঠিক চিন্তা ধারণ নাও করতে পারে । তাই যদি পারত তাহলে ৪০ বছর ধরে জনগণ এই মহাজোট -জোট -সামরিক শাসন এসব মেনে নিত না । এখানে জনগণকে আন্দোলিত করার দায়িত্ব বিপ্লবী পার্টি । ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণই একসময় নিজে সেই আন্দোলনের কর্মী /নেতা হয়ে উঠে ।
গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা নিয়ে আপনি অভিযোগ করে বলেছেন,যে এই জোটের সার্বিক বিষয়ে কর্মীদের মধ্যে তেমন আলোচনা হয়নি যে কারণে তাদেরকে আন্দোলিত করা যাচ্ছে না,এটা আপনার(মাসুদ) একটা ব্যক্তি সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয় ,কারণ আজকে যে বাসদ-সিপিবি জোট তার পিছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে সারা দেশে পার্টির সাথে যুক্ত নানা স্তরে কর্মীবৃন্দ,সর্মথক ,দরদী ইত্যাদি । এবং এই বিষয় এই ২টি পার্টি নিজ দলের অভ্যন্তরে কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা করে ,তা না হলে শুধু নেতারা মিলে কি এই জোট সফল হবে ?এখানে কর্মীদের বুদ্ধিভিত্তিক ও শাররিক সিরিয়াসনেসের কারণে অল্প প্রস্তুতিতে ঢাকায় সফল কর্মসূচী পালিত হয়েছে ,এসব না দেখে আপনি যে কেবল গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার অভাব দেখেছেন !
আমার সুচিন্তিত বুদ্ধির সফল প্রকাশ হোক ।

বাসদ এবং সিপিবির অনেক কর্মী ইউকেবেংগলীর নিয়মিত পাঠক। লেখাটা আপলৌড হয়েছে ১৫ তারিখ। এতোদিনে লেখাটি তাদের চোখে পড়েনি তা মানতে কষ্ট হচ্ছে। এই লেখায় তাদের বক্তব্য জানতে পারলে ভালো হতো।

পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন